kalerkantho


এবার তাজমহল নিয়ে বিজেপির টানাটানি

সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

১৮ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



এবার তাজমহল নিয়ে বিজেপির টানাটানি

সম্প্রতি ভারতে তাজমহল নিয়ে একটা দুশ্চিন্তা তৈরি হচ্ছিল। মোদি সরকারের আমলে স্বমহিমায় থাকতে পারবে কি বিশ্বনন্দিত এই সৌধ? নাকি তারও হাল হবে বাবরি মসজিদের মতো। এই দুশ্চিন্তা তৈরি হওয়ার প্রধান কারণটিই ছিল বিজেপি তথা সংঘ পরিবারের একাধিক নেতার তাজ সম্পর্কে একের পর এক বিভ্রান্তিকর দাবিতে। যে ধরনের বিকৃত দাবি বাবরি মসজিদ ধ্বংসের আগেও তোলা হয়েছিল। গেরুয়া বাহিনীর কোনো কোনো নেতা একাধিক জায়গায় তাজমহলকে একটি হিন্দু মন্দির বলেও দাবি করেছিলেন। কেউ বলেছিলেন, এটি আসলে শিব মন্দির। এর আগের নাম ছিল তেজো মহালয়া। কিন্তু সে প্রসঙ্গে না গিয়ে ভারতের শীর্ষ আদালত তাজমহলের রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে তীব্র ঝাঁজালো সুরে আক্রমণ করেছেন।

তাজমহলের চিরন্তন সৌন্দর্য ফিরিয়ে দিতে না পারলে সেটিকে ভেঙে ফেলুন। সপ্তদশ শতাব্দীতে তৈরি ভারতের এই ঐতিহাসিক স্থাপত্যের রক্ষণাবেক্ষণে গাফিলতির জন্য বুধবার এমনই ঝাঁজালো ভাষায় ভারত সরকার, উত্তর প্রদেশ সরকার ও বিভিন্ন সরকারি সংস্থাকে তিরস্কার করেছেন শীর্ষ আদালত।

বুধবার ভারতের শীর্ষ আদালতের দুই বিচারপতি মদন বি লোকুর এবং দীপক গুপ্তাকে নিয়ে গঠিত বেঞ্চ অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে এই মন্তব্য করে বলেছেন, এমন একটি অতুলনীয় স্মৃতিসৌধ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে চরম উদাসীনতা ও অনীহা দেখানো হচ্ছে।

তাঁরা বলেন, ‘আপনারা (সরকার) তাজমহল বন্ধ করে দিতে পারেন। চাইলে এটিকে ভেঙে ফেলতে পারেন। ইতিমধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকলে ধ্বংসই করে ফেলুন তাজমহলকে।’ মোগল সম্রাট শাহজাহান তাঁর স্ত্রী মমতাজের স্মৃতিতে ১৬৪৩ সালে বর্তমান উত্তর প্রদেশের আগ্রায় শ্বেতপাথর দিয়ে এই বিশাল স্মৃতিসৌধ বানিয়েছিলেন। তবে আরো ১০ বছর এর পরবর্তী ধাপের নির্মাণকাজ চলেছে। ইউনেসকো স্বীকৃত বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী জায়গাগুলোর অন্যতম হলো তাজমহল। কয়েক বছর ধরেই পরিবেশদূষণ ও অন্যান্য কারণে তাজমহলের অস্তিত্ব সংকটের মুখে। সুপ্রিম কোর্ট এর সুরক্ষার বিষয়টি তদারক করছেন।

সেই সংক্রান্ত মামলার শুনানিতেই বুধবার সর্বোচ্চ আদালতের তোপের মুখে পড়ে কেন্দ্রীয় সরকার, উত্তর প্রদেশ সরকার এবং ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ বা এএসআইর মতো সরকারি সংস্থা। শুনানিতে দুই বিচারপতির বেঞ্চ অসন্তোষ প্রকাশ করে আরো বলেছেন—সংসদের একটি স্থায়ী কমিটি তাজমহলের ওপর দূষণের প্রভাব নিয়ে এরই মধ্যে রিপোর্ট দিয়েছে। তার পরও এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যাপারে মাথা ঘামায়নি সংশ্লিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষই।

দুই বিচারপতির বেঞ্চ শুনানির সময় তাজমহল এবং প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের মধ্যে তুলনাও টানেন। বেঞ্চ জানান, সম্ভবত ভারতের সৌধটি আইফেল টাওয়ারের থেকেও বেশি সুন্দর। তা সত্ত্বেও তাজমহল ও লাগোয়া অঞ্চলের পরিবেশের কারণে ভারত ক্রমাগত হারাচ্ছে পর্যটক ও বিদেশি মুদ্রা। আট কোটি মানুষ এখন পর্যন্ত আইফেল টাওয়ার দেখেছেন। তাজমহল যত মানুষ দেখতে এসেছেন, তার আট গুণ বেশি। বিচারপতিরা বলেছেন, এ দেশে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেশি। কিন্তু অন্যান্য দেশে নানা জায়গায় উঁচু টাওয়ার নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে পর্যটকরা সেখান থেকে গোটা শহরকে দেখতে পারেন।

কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে আদালতে আইনজীবীর ভূমিকায় ছিলেন অতিরিক্ত সলিসিটার জেনারেল এ এন এস নাদকার্নি। তিনিও বেঞ্চের প্রশ্নের কোনো জবাব দিতে পারেননি। শুনানিতে একজন আইনজীবী বলেন, তাজমহল রক্ষার জন্য পরিকল্পনার দিশা তৈরি করা হচ্ছে। তা কি তাজমহল ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর হাতে পাওয়া যাবে? বেঞ্চ গত বছর ভারতে আসা পর্যটকের সংখ্যাও জানতে চান। তখন অতিরিক্ত সলিসিটার জেনারেল বলেন, সংখ্যাটি এক কোটির মতো। কেন্দ্রীয় পর্যটন মন্ত্রক আরো বিশদে জানাতে পারবে। এর পরেই বেঞ্চ জানতে চান—তাজমহল নিয়ে অনীহার কারণে ভারত প্রতিবছর কত পর্যটক হারাচ্ছে তা বোঝেন? এই একটি কারণে বিদেশি মুদ্রা, পরিকাঠামো—সব হারাচ্ছে দেশ। একটি স্মৃতিসৌধ দেশকে এই সব কিছুই দিতে পারে। কিন্তু অনীহার জন্য কিছু হচ্ছে না।

বেঞ্চ আরো বলেন, সংসদীয় কমিটির রিপোর্টে তাজমহলকে জাতীয় গর্ব বলা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, এটিকে রক্ষা করার জন্য বহুমুখী উদ্যোগ দরকার। কিন্তু কিছুই করা হয়নি। কেন্দ্রীয় সরকার এবং উত্তর প্রদেশে সরকারের তরফে এ ব্যাপারে কোনো জবাব দেওয়া হয়নি।

লেখক : কলকাতার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক



মন্তব্য