kalerkantho


চাঁদ সূর্য শীত বর্ষা আড়ালে চলে গেল!

ড. হারুন রশীদ

১৮ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



চাঁদ সূর্য শীত বর্ষা আড়ালে চলে গেল!

ঢাকার ইতিহাস প্রায় ৪০০ বছরের। প্রত্নতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদদের মতে, মোগল আমল ছাড়াও চারবার এই শহর রাজধানীর মর্যাদা লাভ করে। সেই সময় ঢাকা ছিল এক নয়নাভিরাম নগরী। নাগরিক অনেক সুযোগ-সুবিধাই অবারিত ছিল। বুড়িগঙ্গার তীরে বেড়ে ওঠা ঢাকা নগরী এখন স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের রাজধানীর মর্যাদা লাভের পর ঢাকার যে সমৃদ্ধি হওয়ার কথা ছিল, আকারে তা হলেও নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ও শিল্পিত মানের দিক থেকে তা হয়নি। বরং বেড়ে ওঠা ঢাকা যেন ক্রমেই ইট-কাঠ-পাথরের জঙ্গলে পরিণত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংস্থার নানা জরিপেও ঢাকার অবস্থান তলানিতে। অবশ্য ভুক্তভোগী রাজধানীবাসীর এটি বোঝার জন্য জরিপের প্রয়োজন হয় না। প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট দৈব-দুর্বিপাকে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে তারা কী এক ভয়ানক অবস্থার মধ্যে আছে! অথচ একবিংশ শতাব্দীতে উন্নত নগরায়ণ মানুষের প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে। জীবনযাত্রার অনিবার্য প্রয়োজনে মানুষ এখন নগরমুখী। সে কারণেই নগরায়ণকে পরিবেশবান্ধব, স্বাস্থ্যকর ও সুষম হওয়ার কথা বলা হচ্ছে। বলা যায়, নগরজীবনকে স্বচ্ছন্দ, পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও উন্নয়নমুখী করা এখন সময়ের দাবি। 

আসলে পরিকল্পিত নগর বলতে বোঝায় একটি পরিকল্পিত জনবসতি, যার সব কিছু হবে পরিকল্পনা অনুযায়ী। কোথায় স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল হবে; অফিস-আদালত কোথায়; কোথায় বসবাসের জায়গা—সব কিছুই হবে পরিকল্পনামাফিক। পরিকল্পনামাফিক সব কিছু হলে প্রতিটি নগরেই মানুষ শৃঙ্খলাপূর্ণ নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে। এতে তার নাগরিক জীবন হয় মর্যাদাপূর্ণ, গ্রাম কিংবা মফস্বলের তুলনায় উন্নততর, স্বস্তিদায়ক। কিন্তু এই নগরই আবার পরিকল্পনাহীনভাবে বেড়ে উঠলে তাতে নাগরিকদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। জনজীবনকে তা বিপর্যস্ত করে ফেলে। মানুষের ভোগান্তির কোনো শেষ থাকে না।

শহরের বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এর মান নির্ণয় করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে নগরীতে বসবাসের সুযোগ-সুবিধা, জনসংখ্যার ঘনত্ব, সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, শিক্ষাব্যবস্থা, চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ-সুবিধা, অপরাধের হার, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন, পরিবেশ, যোগাযোগব্যবস্থা, অবকাঠামোর গুণগত মান, পানি সরবরাহের মান, খাদ্য, পানীয়, ভোক্তাপণ্য এবং সেবা, সরকারি বাসগৃহের প্রাপ্যতা ইত্যাদি। এসব দিক থেকে আমাদের নগরগুলোর কী অবস্থা তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

দুই.

মানুষের পায়ে হাঁটার চেয়েও গড় গতি কম যানবাহনের। এ অবস্থায় যানজট ঢাকা নগরীকে কার্যত এক অচল ও স্থবির নগরীতে পরিণত করেছে। এটি একটি স্থায়ী সমস্যা হিসেবে দেখা দেওয়ায় পরিবহন খাতে বড় ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে এগোনো ছাড়া কোনো উপায় নেই। যানজট সমস্যার সমাধান না হওয়ায় প্রতিদিনই অনেক কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। পিছিয়ে যাচ্ছে উন্নয়ন। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে অগ্রগতি। শুধু তাই নয়, শব্দদূষণ ও বায়ুদূষণে নানা ব্যাধিতেও আক্রান্ত হচ্ছে রাজধানীর বিপুলসংখ্যক মানুষ। অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণও বাড়ছে দিন দিন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা যায়, যানজটের কারণে বছরে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ পাঁচ হাজার কোটি টাকারও বেশি। সব রুটে যাত্রীদের চলাচলে কমপক্ষে তিন কর্মঘণ্টা সময় অপচয় হয় প্রতিদিন। যানজটের কারণে বিপুল পরিমাণ জ্বালানিরও অপচয় হয়। কিন্তু এ থেকে পরিত্রাণের যেন কোনো উপায় নেই। বিভিন্ন সময়ে নানামুখী কর্মসূচি-পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হলেও বাস্তবায়ন হয়েছে খুবই কম। ফলে সমস্যা যে তিমিরে ছিল সেখানেই রয়ে গেছে। অথচ দুবির্ষহ যানজটের জন্য পরিকল্পনা ও সমন্বয়হীনতার অভাবকেই দায়ী করা হয়।

রাজধানীতে দিন দিন জনসংখ্যা বেড়ে চলেছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে গাড়ি-ঘোড়া। কিন্তু সে তুলনায় রাস্তাঘাট বাড়ছে না। ফলে যানজট এক অনিবার্য বাস্তবতা হিসেবে দেখা দিয়েছে। যানজট নিয়ন্ত্রণে কঠোর ট্রাফিক আইনের প্রয়োগ, প্রাইভেট গাড়ির ওপর নিয়ন্ত্রণ, যত্রতত্র প্রাইভেট কার পার্কিং নিষিদ্ধ করা, রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, নদীপথ এবং ঢাকার ভেতরের খাল দখলমুক্ত করে নৌপথের উন্নয়ন করা, রিকশামুক্ত সড়কসহ নানা পরিকল্পনার কথা বলা হয়। কিন্তু এগুলো নিয়ে কথাবার্তা যতটা হয় কাজ ততটা হয় না। কিন্তু যানজট এখন এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে যে এ থেকে পরিত্রাণের উপায় খুঁজে বের করতে হবে।

তিন.

শিল্প-কারখানার দূষিত বর্জ্য পানিতে মিশেও ঢাকার পরিবেশকে করে তুলছে বিষাক্ত। বিশেষ করে ট্যানারি বর্জ্যের দূষণ নগরবাসীর জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। হাজারীবাগের ট্যানারি শিল্প সাভারে সরিয়ে নেওয়া হলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে দূষণ চলছেই। বুড়িগঙ্গাকে বলা হয় ঢাকার প্রাণ। কিন্তু দখল-দূষণে এই নদীর অবস্থা এখন বড়ই করুণ। বিশেষ করে ট্যানারির বর্জ্য মিশে নদীর পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হয়েছে। পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে গেছে। যে পরিমাণ অক্সিজেন আছে তাতে জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুবই কম। বুড়িগঙ্গা নদীকে বাঁচাতে হলে ট্যানারিশিল্পের বর্জ্য যাতে নদীতে আর না পড়তে পারে সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

চার.

বেশ কয়েক বছর আগের কথা। বুয়েটের মেধাবী ছাত্রী সনি হত্যার প্রতিবাদে যাঁরা অনশন করছিলেন, কবি শামসুর রাহমান গিয়েছিলেন তাঁদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করতে। কবির বুয়েটে যাওয়ার ঘটনা ফলাও করে প্রচারিত হয় সব কটি দৈনিকে। ফলে আন্দোলনরত ছাত্র-ছাত্রীরা আরো প্রত্যয়ী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। বিয়ষটি ভালো ঠেকেনি বুয়েট ভিসির কাছে। তাই তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে বলেছিলেন, ‘উনি কবি মানুষ, আমরা ইঞ্জিনিয়ার—কবিতার সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই।’ তৎকালীন ভিসির ওই অসার মন্তব্য দেশব্যাপী বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল। তখন তা হাসির খোরাক জুগিয়েছিল অনেকের। সত্যি কবিতার সঙ্গে মানুষের, বিশেষ করে ইঞ্জিনিয়ারদের সম্পর্ক না থাকলে তার পরিণতি যে কী ভয়াবহ হতে পারে তা যেন বলে দিচ্ছে রাজধানীর কংক্রিটের এই জঙ্গল।

প্রয়াত নাট্যকার  সেলিম আল দীন ১৯৯৪ সালের এপ্রিল মাসে দৈনিক বাংলার সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত ‘মান্দাই নৃগোষ্ঠী’ শিরোনামে এক প্রবন্ধে এই জনগোষ্ঠীর মাটির ঘরের অপূর্ব সুন্দর স্থাপত্যরীতির বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘আধুনিককালের স্থাপত্যকলায় পরিবেশের সঙ্গে গৃহনির্মাণের একটি সুসামঞ্জস্যপূর্ণ মিলন প্রত্যাশিত। চল্লিশ, পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের পাশ্চাত্যের গৃহ স্থাপত্যের সাধারণ নকশাটা আমাদের দেশের স্থাপত্যকাররা গ্রহণ করেছিলেন, নির্বিচারে। ঢাকা শহরের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, রুগ্ণ গৃহ স্থাপত্যের এক দিকচিহ্নহীন অভিযাত্রায় নেমেছি আমরা। সাদা চুনকাম করা দেয়ালের সঙ্গে ঢাকা শহরের মৃত্তিকার কোনো সামঞ্জস্য নেই। যে কাঠামোকলা ভূপ্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন তাই যেন চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে সর্বত্র। পাশ্চাত্যে গৃহ স্থাপত্যের আঙ্গিক ও বৈচিত্র্য তাদের শিল্পায়ন ও বিজ্ঞানের ধারায় স্বাভাবিক। আমাদের প্রকৌশলীরা সেখানকার সেই নকশাই জুড়ে দিলেন এখানে। আমাদের চাঁদ, সূর্য, শীত, বর্ষা আড়ালে চলে গেল। পুঁথিগত বিদ্যাটাকে ধ্রুবজ্ঞানে বিশ্বাস করার যে কী ফল তা আমাদের শহরের নানা অংশের স্থাপত্যরীতি দেখলেই বোঝা যায় অবশ্য।’

বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সিতাংশু রায় তাঁর ‘AN INTRODUCTION TO AESTHETICS’ গ্রন্থে স্থাপত্য অধ্যায়ে বলেছেন, ‘প্রাসাদের ছাদ থেকে বৃষ্টির জল বেরিয়ে যাওয়ার জন্য নালিতে নল লাগিয়ে দিলেই ব্যাবহারিক প্রয়োজন মেটে। কিন্তু নলের প্রান্তে বাঘের মুখের প্রতিকৃতি বসিয়ে দেওয়া হলো। তোরণ বা সোপানের দুই পাশে নির্মিত হলো দম্ভভরে উপবিষ্ট সিংহের গম্ভীর মূর্তি। এতে স্থাপত্যসমগ্র নির্মিতির আদর্শ দান করে ও নির্মাণের পর সামগ্রিক দৃষ্টিতে উপযোগিতার অতিরিক্ত এক সৌন্দর্যের সৃষ্টি করে।’

রবীন্দ্রনাথ বলাকার একটি কবিতায় তাজমহল সম্পর্কে বলেছেন, ‘প্রেমের করুণ কোমলতা/ফুটিল তা/সৌন্দর্যের পুষ্পপুঞ্জে প্রশান্ত পাষাণে।’

পাষাণে প্রাণ দেওয়ার জন্য যে নান্দনিক বোধ থাকা প্রয়োজন তার জন্য বিষয়াতিরিক্ত জ্ঞানের অন্য শাখাগুলোরও অধ্যয়ন জরুরি। আমাদের স্থাপত্যকলায় যার তীব্র অভাব পরস্ফুিট। আমাদের নগরায়ণে যেমন পরিকল্পনার অভাব, তেমনি সৌন্দর্যের পুষ্পপুঞ্জে প্রশান্ত পাষাণের অভাব। স্থাপত্যকলায়  প্রয়োজনের অতিরিক্ত সৌন্দর্যের অনুসন্ধান আমাদের ঐতিহ্যের কারণেই বড় বেশি প্রয়োজন। ঢাকাকে অসম্মান থেকে রক্ষার উদ্যোগে তাই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে সক্রিয় হবে—এমনটিই প্রত্যাশা করি।

লেখক :  সাংবাদিক, কলামিস্ট

harun_press@yahoo.com

 



মন্তব্য