kalerkantho


জন ওয়াইট

বার্তাটি খুবই স্পষ্ট, পুতিন ভরসার পাত্র

২৩ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



বার্তাটি খুবই স্পষ্ট, পুতিন ভরসার পাত্র

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফল কী প্রমাণ করে? পশ্চিমারা বলে আসছে, তাদের সব বিরোধ-বিতণ্ডা দেশটির সরকারের সঙ্গে, জনগণের সঙ্গে নয়। বিপুল ভোটে ভ্লাদিমির পুতিনের পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর এই গা বাঁচানো যুক্তি তারা আর দেখাতে পারবে না। রাশিয়াকে যারা ঘোর শত্রু মনে করে, যারা এর ধ্বংস চায় তারা এই নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য, ফলাফল প্রভাবিত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। তারা যে এমনটি করবে তা অভাবনীয় কোনো বিষয় ছিল না। তাদের সব চেষ্টা ব্যর্থ—পুতিন জিতলেন। তাঁর জনপ্রিয়তায় কোনো খাদ নেই। কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই সম্পূর্ণ ত্রুটিহীন নয়, রাশিয়ার ব্যবস্থাও নয়। যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্র—তাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাও ত্রুটিহীন নয়।

২০১২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পুতিন ৬৩.৬ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন, ভোটার উপস্থিতি ছিল ৬৫.২৫ শতাংশ। এবার তিনি ৭৬.৬৮ শতাংশ ভোট পেয়েছেন, ভোটার উপস্থিতি ছিল ৬৭ শতাংশের বেশি। তাতে কী! স্ক্রিপাল ইস্যুতে আসক্ত যুক্তরাজ্যের ভাষ্যকাররা নির্বাচনী ফলাফলের একটি অর্থই খুঁজে পেলেন; তাঁরা শুধু এটাই দেখলেন যে জোসেফ স্তালিনের পর পুতিনই রাশিয়ার সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান। তাঁরা অনির্বাচিত একনায়ক স্তালিনের সঙ্গে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট পুতিনের তুলনা করতে গিয়ে তুলনার ভিত্তিটিকেই অবজ্ঞা করলেন। সেটা করতে গিয়ে তাঁরা নিজেদের দিকে তাকাতে ভুলে গেলেন—তাঁদের রাষ্ট্রপ্রধান তো সেই ১৯৫৩ সাল থেকে বাকিংহাম প্রাসাদের গদিতে আসীন। রানিকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নির্বাচনের জন্য যুক্তরাজ্যের একটি লোকও কখনো ভোট দেয়নি।

যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টদের মতো রাশিয়ার প্রেসিডেন্টও দ্বৈত ভূমিকা পালন করেন। তাঁরা রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধান, দুই ভূমিকাই পালন করেন। যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রপ্রধান অনির্বাচিত ব্যক্তি, তবে সরকারপ্রধান নির্বাচিত। সত্য কথাটি হলো, যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রপ্রধান একজন অনির্বাচিত রাজা বা রানি। তিনি শুধু অগণতান্ত্রিকই নন, যুক্তি-প্রমাণ হাজির করে বলা যায় তিনি গণতন্ত্রবিরোধীও বটে।

যা হোক, যুক্তরাজ্যের ব্যবস্থা যুক্তরাজ্যেরই, এটা যুক্তরাজ্যবাসীর জন্যই প্রযোজ্য। তাই যদি হয়, তাহলে রাশিয়ার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিয়ে এত কথা কেন? কেন সবাই সমালোচনায় মুখর? কারণ সমালোচকরা মুক্তবাজার অর্থনীতির পরীক্ষণজনিত বিপত্তি-বিপর্যয় থেকে রাশিয়ার উত্তরণকে মেনে নিতে পারছে না, তারা রাশিয়াকে ক্ষমা করতে পারছে না। এই উত্তরণের পেছনে যে লোকটির (ভ্লাদিমির পুতিন) নিয়ামক ভূমিকা, সেই লোকটি কেন এত জনপ্রিয়, কেন এখনো ক্ষমতায় রয়ে গেছেন, তা তারা মেনে নিতে পারছে না।

ক্রেমলিনে পুতিনের প্রবেশের আগে রাশিয়ার কী অবস্থা ছিল? এর সামাজিক কাঠামো ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল, অসংখ্য লোক অর্থকষ্টে নিপতিত হয়েছিল; আর গুটিকয়েক লোক রাষ্ট্রের সব সম্পদ কুক্ষিগত করার আয়োজন সম্পন্ন করে ফেলেছিল প্রায়। এমন পরিস্থিতি রাশিয়ায় এর আগে কখনো দেখা দেয়নি। মার্কিন পণ্ডিত ও রাশিয়া বিশেষজ্ঞ স্টিফেন এফ কোহেনের মতে, শান্তিকালীন অবস্থায় কোনো প্রভাবশালী জাতি এমন বিপর্যয়কর আর্থ-সামাজিক দশার মধ্যে এর আগে কখনো পড়েনি। ভ্লাদিমির পুতিনই এই বিপর্যয় ঠেকিয়েছেন। রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর শকুনের মতো জেঁকে বসেছিল আনাড়ি, উচ্ছৃঙ্খল পুঁজিবাদী পক্ষগুলো। তাদের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে রাষ্ট্রের প্রাধান্য নিশ্চিত করায় নিয়ামক ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। এ কাজে তাঁর সাফল্য অর্জন খুবই জরুরি ছিল।

পররাষ্ট্রনীতির প্রসঙ্গটিও উত্থাপন করতে হয়। পুতিনের শাসনামলে রাশিয়ার অর্থনৈতিক উত্তরণের পেছনে রয়েছে সময়োপযোগী পররাষ্ট্রনীতি। দেশীয় পরিমণ্ডলে অলিগার্কদের এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ওয়াশিংটন ও তাঁর মিত্রদের মোকাবেলা করেছেন পুতিন। ২০০৮ সালে জর্জিয়ার মাধ্যমে এবং ২০১৪ সালে ইউক্রেনের মাধ্যমে রাশিয়ায় বিপত্তিকর অবস্থা সৃষ্টি করতে চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। দক্ষ হাতে এসব সামলেছেন তিনি।

আন্তর্জাতিক আইনের দোহাই দিয়ে, জাতিসংঘকে বর্ম হিসেবে ব্যবহার করে নব্বইয়ের দশক থেকে নানা সুরতে দেশে দেশে সরকার পরিবর্তনের (রেজিম চেঞ্জ) নীতির চর্চা করছে যুক্তরাষ্ট্র। সিরিয়াতেও। ২০১৫ সালে (৩০ সেপ্টেম্বর থেকে—বি.স.) সিরিয়া সরকারের আহ্বানে সামরিক অভিযান শুরু করে রাশিয়া। ফলে পরিস্থিতিই পাল্টে গেল।

অতএব, রাশিয়ায় পুতিনের জনপ্রিয়তার কারণ ও উৎস কী, তা অনুধাবন করা কঠিন নয়। পশ্চিম তাঁর প্রতি কেন এত বিরূপ, তা বোঝাও তেমন কঠিন নয়। রাশিয়া সংস্কৃতির দিক থেকে, সামরিক শক্তির দিক থেকে পিছিয়ে রয়েছে—এ কথা মানতে রাজি নয় রুশরা। সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের তিন দশক পর নিজের ওপর বিশ্বাস ফিরে পাওয়া সম্ভব হয়েছে পুতিনের কারণে। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই।

শেষ কথা হলো, স্ক্রিপাল ইস্যুতে পশ্চাৎমুখী মানসিকতার পরিচয় দিয়েছে যুক্তরাজ্যের শাসকগোষ্ঠী। তারা ঔপনিবেশিক মানসিকতা কাটিয়ে উঠতে পারেনি এখনো। বিদ্বেষের বশে রাশিয়ার ঘাড়ে দোষ চাপাচ্ছে তারা, হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। আর এতে নেতৃত্বের দেউলিয়াত্বই প্রকাশিত হচ্ছে। দায়িত্বশীল পদে বসে দায়িত্বহীন আচরণ করছেন নেতারা, যেমন বরিস জনসন (পররাষ্ট্রমন্ত্রী)। এমন আচরণ বিগত কালের বিষয়, আধুনিককালে তা আশা করা যায় না। যত দ্রুত এ মানসিকতা ত্যাগ করা যাবে তত ভালো।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার

সূত্র : স্পুনক ইন্টারন্যাশনাল অনলাইন

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক



মন্তব্য