kalerkantho


পারমাণবিক যুদ্ধের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে

পল ক্রেইগ রবার্টস

২১ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



পারমাণবিক যুদ্ধের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে

পারমাণবিক যুদ্ধ বাধলে ‘কোলেটারাল ড্যামেজ’—এর অর্থ দাঁড়াবে সমগ্র মানবজাতির বিলুপ্তি। কথাটি বলেছিলেন ফিদেল কাস্ত্রো।

রুশদের আচরণে মনে হয়, তারা পশ্চিমাদের প্রতি বন্ধুসুলভ আচরণই করতে চায়। এ জন্য তারা খুবই সচেষ্ট। কিন্তু ওয়াশিংটন এটিকে সুযোগ হিসেবে নিয়েছে। তারা সিরিয়ায় খুঁটি গেড়েছে; আবার যুদ্ধ শুরুর চেষ্টায় আছে। রুশদের আভিযানিক ব্যর্থতা সিরিয়ার একটি ছিটমহলে ওয়াশিংটনের ভাড়াটে বিদেশি সেনাদের টিকে থাকার সুযোগ করে দিয়েছে। মার্কিন প্রেস্টিটিউট (প্রেস+প্রস্টিটিউট, মূলধারার গণমাধ্যমকে এ সম্বোধনই করেন লেখক—বি.স.) এদের ‘মুক্তিসেনা’ অ্যাখ্যা দিয়ে মিথ্যাচার করে যাচ্ছে। যুদ্ধটা চালিয়ে যেতে হলে এদের সাহায্যার্থে ওয়াশিংটনকে একটি পথ খুঁজে বের করতে হবে।

ট্রাম্প প্রশাসন একটি উপায় পেয়েছে, তাদের কথাবার্তায় তা-ই মনে হয়। সেটি ওবামা প্রশাসনের উপায়েরই পুনরুজ্জীবন। কী সেই উপায়? সেটি হলো সিরিয়ার বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ তোলা। রুশদের হস্তক্ষেপের কারণে ওবামা প্রশাসনের বানোয়াট গল্পের ইতি ঘটেছে; প্রমাণিত হয়ে গেছে, সিরিয়ার কাছে রাসায়নিক অস্ত্র ছিল না। যত দূর মনে পড়ে, ধ্বংস করে ফেলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ওই রাসায়নিক অস্ত্রগুলো দিয়ে দিয়েছিল রাশিয়া। আমি মোটামুটি নিশ্চিত—ওয়াশিংটনের কাছে এখনো সেগুলো আছে এবং সেগুলোর কিয়দংশ তারা সিরিয়ায় এমন কায়দায় ব্যবহার করবে, যাতে দায়টা বাশার আল আসাদের ঘাড়ে চাপানো যায়। অন্যভাবে বলা যায়, ওয়াশিংটন একটি পরিস্থিতি তৈরি করবে, আসাদ ও পুতিনের ওপর দোষ চাপাবে এবং কংগ্রেসের অনুমোদন নিয়ে বা না নিয়েই ভাড়াটে সেনাদের পক্ষে সিরিয়ায় হস্তক্ষেপ করবে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিসের কথা বিশ্বাস করলে বলতে হয়, সিরিয়া তার জনগণের বিরুদ্ধে ক্লোরিন গ্যাস ব্যবহার করছে। অথচ সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্র নেই, ওয়াশিংটনের গুটিকয় ভাড়াটে সেনার বিরুদ্ধে অভিযানের জন্য সেসবের প্রয়োজনও নেই। সিরিয়ায় হামলা চালানোর পক্ষে যুক্তি দেখাতে গিয়ে ওবামা যে শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেছিলেন, ম্যাটিসও সেগুলোই ব্যবহার করছেন। তিনি বলেছেন, আসাদ ক্লোরিন গ্যাস ব্যবহার করবেন—এমন তথ্য তিনি পাচ্ছেন। এটাও বলেছেন, এ ব্যাপারে তাঁর কাছে কোনো প্রমাণ নেই।

সিরিয়া সরকার ক্লোরিন গ্যাস ব্যবহারের জন্য ‘হাসপাতালগুলোকে’ বেছে নিয়েছে—এ অভিযোগও করেছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং এ ব্যাপারেও কোনো প্রমাণ যে নেই, সে কথাও স্বীকার করেছেন। সাধারণ মানুষকে হত্যায় রাশিয়া জড়িত—এ অভিযোগও করেছেন ম্যাটিস। অথচ এ রকম হত্যাকাণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র খুবই সিদ্ধহস্ত।

নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, ওয়াশিংটনের ভাড়াটে সেনাদের ব্যবহারের আগে সিরিয়ায় ক্লোরিন গ্যাস ব্যবহারের ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু ওয়াশিংটনের কাছে বাস্তব তথ্যের কোনো গুরুত্ব নেই, ইসরায়েলের চাওয়াই তার কাছে একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হিজবুল্লাহর সমর্থকদের থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য ইসরায়েল চায় সিরিয়া ও ইরানকে ধ্বংস করে দিক ওয়াশিংটন, যাতে লেবাননের উত্তরাঞ্চল তারা দখল করে নিতে পারে।

আরো অনেক পক্ষের স্বার্থ রয়েছে। তেল কম্পানিগুলো তেল ও গ্যাস পাইপলাইনসংশ্লিষ্ট জায়গাগুলোর নিয়ন্ত্রণ চায়। উন্মত্ত নব্য রক্ষণশীলরা ‘আমেরিকান বৈশ্বিক আধিপত্য’-এর ভাবাদর্শ নিয়ে বসে আছে। সামরিক নিরাপত্তা কমপ্লেক্সের দরকার শত্রু, যাতে বিশাল বাজেট বরাদ্দের ন্যায্যতা প্রতিপন্ন করা যায়। সব পক্ষেরই স্বার্থ রয়েছে। ইসরায়েলের লক্ষ্য সীমানা বাড়ানো, পানির উৎস বাড়ানো এবং তার স্বার্থ-লক্ষ্যই মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করছে।

রাশিয়া কি এটা বুঝতে পারছে, নাকি পশ্চিমাদের (সে নিজেও পশ্চিমের অংশ) অনুকূল অভিমত পাওয়ার অপেক্ষায় বসে আছে? যদি পরেরটি হয়, তাহলে বলতে হয় বিশ্ব একটি পারমাণবিক যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে। রাশিয়া মনে হয় বুঝতে পারছে না, তাদের এই দ্বিধা ওয়াশিংটনের আগ্রাসী মনোভাবকে উসকে দিচ্ছে এবং বিশ্বকে চূড়ান্ত যুদ্ধের দিকে নিয়ে যাওয়ার অবকাশ সৃষ্টি করছে।

রাশিয়া প্রতিবার এমন দ্বিধার পরিচয় দিয়েছে—কি সিরিয়ায়, কি ইউক্রেনে। কিন্তু দ্বিধা করেও ওয়াশিংটনের বন্ধুত্ব সে পায়নি। ওয়াশিংটনের বন্ধুত্ব রাশিয়া পায় না, কিন্তু তারা বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে রাখে। ওয়াশিংটনের শুরু করা সংঘাতে ওয়াশিংটনকেই টিকে থাকার সুযোগ করে দিচ্ছে তারা। প্রবল বাধা না পাওয়া পর্যন্ত ওয়াশিংটন থামবে না। মনে হয়, রাশিয়া বাধা দিতে আগ্রহী নয়। এ কারণে ওয়াশিংটন বিশ্বকে পারমাণবিক যুদ্ধের দিকে নিয়ে যাওয়ার কাজটি অব্যাহত রাখতে পারছে।

ম্যাটিস, টিলারসন, নিকি হ্যালে থেকে শুরু করে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রত্যেকে, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী—সবাই যে রাশিয়ার বিরুদ্ধে হুমকি সৃষ্টি করে চলেছে, সেটা রাশিয়া কখন বুঝবে? এখনো রুশরা তাদের ‘অংশীদার’ মনে করছে। পশ্চিমাদের সঙ্গে তারা আর কতটা পথ হাঁটতে চায়?

ব্রিটিশরা রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামবে, এমন সম্ভাবনা নেই। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী যতই আলটিমেটাম দিন, যুদ্ধ বাধালে গোটা যুক্তরাজ্য নিমেষে ধ্বংস হয়ে যাবে। গোটা পশ্চিমা বিশ্ব উন্মাদ হয়ে গেছে। কানাডার অর্থনীতিবিদ মাইকেল খসুদভস্কি বলেছেন, পশ্চিমা রাজনীতিকরা এবং তাদের দোসর প্রেস্টিটিউট বিশ্বকে বিলুপ্তির দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সরকারি কর্মকর্তা

সূত্র : গ্লোবাল রিসার্চ অনলাইন

ভাষান্তর : শামসুন নাহার

 

 


মন্তব্য