kalerkantho


রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে চীনের হস্তক্ষেপ চাই

জহুরুল আলম

১৯ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে চীনের হস্তক্ষেপ চাই

বর্তমান রোহিঙ্গা ইস্যুটি তৈরি হওয়ারও বহু আগে ২০১২ সালে সু চি বলেছিলেন, তিনি রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে গণ্য করা যায় কি না সে ব্যাপারে নিশ্চিত নন। বিষয়টির অবতারণা এ জন্যই যে এ থেকেই রোহিঙ্গাদের প্রতি সু চি সরকারের মনোভাবের প্রতিফলন ঘটে। আর এ ছাড়া এটিও পরিষ্কার হয় যে রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার, নিপীড়ন ও তাদের নিজ ভূমি থেকে বিতাড়ন একটি পূর্বপরিকল্পিত বিষয়। এটাকে শুধু মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নৃশংসতার বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করা ভুল। রোহিঙ্গাদের জাতিগত নির্মূলের বিষয়টি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয় এবং এ বিষয়ে মিয়ানমারের নেত্রী সু চির ভূমিকা বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে।

রোহিঙ্গাদের গণ্য করা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে নিপীড়িত জাতিগোষ্ঠীর একটি হিসেবে। মিয়ানমারে তাদের বসবাস হাজার বছরের। তাদের নিজস্ব ভাষা আছে, আছে নিজস্ব সংস্কৃতি। একটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব সে রাষ্ট্রের সব জনগোষ্ঠীর সেই স্বকীয়তাকে সম্মান করা। দুঃখের বিষয়, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে তা করতে শুধু ব্যর্থই হয়নি, বরং এই ভিন্নতার জন্য তাদের নিজ দেশে বসবাসের অধিকার থেকেও বঞ্চিত করছে।

রোহিঙ্গা ইস্যুটি মিয়ানমারের বহু আগের নিজের সৃষ্ট বিষয় হলেও বাংলাদেশের জনগণকে এর মাসুল দিতে হচ্ছে বহুকাল যাবৎ। জিয়ার আমলে এই ইস্যুটিকে বাংলাদেশের সামরিক জান্তা ব্যবহার করেছে তাদের পাকিস্তানি তাঁবেদারি বাস্তবায়নের জন্য এবং সেই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের সহিংসতা জিইয়ে রেখে সেনাবাহিনীর একটি অংশকে সেখানে সার্বক্ষণিকভাবে নিয়োজিত করে নিউট্রালাইজ করে রাখার কাজে। মিয়ানমার থেকে বর্তমান রোহিঙ্গা বহির্গমনের স্রোতধারা এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে যে জাতিসংঘ এটাকে পৃথিবীর মধ্যে বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে মারাত্মক রিফিউজি সংকট বলে অভিহিত করেছে।

১৯৪৮ সালে ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পরেই তৎকালীন বার্মা সরকার একটি নাগরিকত্ব আইন করে, যা Union Citizenship Act নামে পরিচিত। এই আইনের আওতায় রোহিঙ্গা ছাড়া বার্মায় বসবাসকারী অন্য সব ছোট জাতিগোষ্ঠীর জন্য বার্মার নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার সংরক্ষিত করা হয়। অবশ্য আইনে এটিও উল্লেখ করা হয় যে কেউ যদি দুই বা ততোধিক বংশ বা প্রজন্ম সেখানে বসবাস করে, তবে তার বা তাদের পরিচয়পত্র দেওয়া যেতে পারে। রোহিঙ্গাদের প্রাথমিকভাবে এ ধরনের পরিচয়পত্র দেওয়া হয়। এমনকি বার্মার পার্লামেন্টেও রোহিঙ্গারা প্রতিনিধিত্ব করে সে সময়। কাজেই এখন এই জনগোষ্ঠীকে হঠাৎ করে বিদেশি বা বহিরাগত বলার কোনো অবকাশ থাকতে পারে না। এর পেছনে যে সুপ্ত উদ্দেশ্য আছে, তা খুবই অমানবিক।

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ইতিহাস পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম মর্মান্তিক ইতিহাস। আর এ ইতিহাসের আরো মর্মন্তুদ অধ্যায়টি রচিত হচ্ছে এমন একজনের শাসনামলে, যিনি শান্তিতে নোবেল বিজয়ী। একটি জাতির একটি অংশকে যখন অত্যাচার-অবিচার ও নিপীড়নের মাধ্যমে দেশ ছাড়া করা হচ্ছে, তখন যদি শান্তির তথাকথিত অগ্রদূতের ভূমিকা হয় সে কাজের নীরব সমর্থন, তাহলে সে শান্তি ও সম্মানের মর্যাদা কোথায় লুটায়! 

সত্তরের দশকে রোহিঙ্গাদের দেশত্যাগ বৃদ্ধি পেতে থাকে। বাংলাদেশে তাদের অনুপ্রবেশ দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৯৭৮ সালে মিলিটারি শাসক জিয়াউর রহমানের আমলে এক বিশালসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে। কিন্তু জিয়া এটার কোনো সমাধানের দিকে না গিয়ে বিষয়টি গোপন রাখে। অন্যদিকে এমন অনুপ্রবেশে বাধাপ্রাপ্ত না হয়ে একদিকে অত্যাচারিত রোহিঙ্গারা, অপরদিকে অত্যাচারী বর্মী শাসকরা বাংলাদেশকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অনুপ্রবেশের জন্য ভালো স্থান হিসেবে বেছে নেয়। রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়নের মাত্রা বৃদ্ধি করার জন্য বর্মী সরকার স্থানীয় মগদের লেলিয়ে দেওয়ার কৌশল গ্রহণ করে। সেই সঙ্গে রাখাইন প্রদেশে বৌদ্ধ-মগ জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য ও রোহিঙ্গাদের জমিজমা দখল করার জন্য নানা রকম আইনি ও বেআইনি কৌশল গ্রহণ করতে থাকে। রোহিঙ্গাদের দেশ থেকে বিতাড়নের উদ্দেশ্যে রোহিঙ্গাপল্লী ও জনপদগুলোতে খুন, ধর্ষণ চলতে থাকে ধারাবাহিকভাবে। এ অবস্থায় রোহিঙ্গাদের দেশত্যাগও চলতে থাকে অবিরাম।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বহু কারণে। বাংলাদেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, নিরাপত্তা ও সমাজ ব্যবস্থাপনায় এই বিপুলসংখ্যক উদ্বাস্তুর আগমন, বসবাস ও সমাজের সঙ্গে সহজেই মিশে যাওয়ার প্রক্রিয়া এক বিশাল নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, যদি এর আশু সমাধান না হয়। বাংলাদেশ রোহিঙ্গা আগমনের প্রারম্ভিক পর্যায়ে পুশব্যাক করার নীতি গ্রহণ করেছিল স্বাভাবিক নিয়মেই। যেকোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রই তার সীমান্তে বেআইনি চলাচল প্রতিহত করে। কিন্তু যখন বিষয়টি একটি বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত হলো তখন মানবিক দায়িত্ববোধ থেকেই বাংলাদেশের সরকার ও জনগণ রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। সরকারের এ ভূমিকা, বিশেষত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মানবতাবাদী ও শান্তিকামী ভূমিকা সারা বিশ্বের কাছে প্রশংসিত হয়েছে। জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের শর্ত হিসেবে যে পাঁচ দফা প্রস্তাব দিয়েছেন, সেই প্রস্তাবের আলোকে প্রত্যাবাসনই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা করতে পারে। যেমন—১. অবিলম্বে এবং চিরতরে মিয়ানমারে সহিংসতা ও ‘জাতিগত নিধন’ নিঃশর্তে বন্ধ করা; ২. অবিলম্বে মিয়ানমারে জাতিসংঘের মহাসচিবের নিজস্ব একটি অনুসন্ধানী দল প্রেরণ করা; ৩. জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে সব সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা বিধান এবং এ লক্ষ্যে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে সুরক্ষাবলয় (safe zones) গড়ে তোলা; ৪. রাখাইন রাজ্য থেকে জোরপূর্বক বিতাড়িত সব রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে তাদের নিজ ঘরবাড়িতে প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা; ৫. কফি আনান কমিশনের সুপারিশমালার নিঃশর্ত, পূর্ণ ও দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। প্রসঙ্গত, এই প্রস্তাবেরও বিরোধিতা করা হয়েছে আমাদের দেশেরই কিছু রাজনৈতিক দল ও সুধীর পক্ষ থেকে। অথচ তাঁরা এখন পর্যন্ত এর চেয়ে উত্তম আর কোনো প্রস্তাবও দিতে পারেননি।

মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যার আন্তর্জাতিকীকরণের ফলে বাংলাদেশের মানুষের জন্য সৃষ্টি হয়েছে এক দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার পটভূমি, যার প্রতিকারে মিয়ানমার আন্তরিক না হলে শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার জন্য হয়ে দাঁড়াবে এক মারাত্মক হুমকির বিষয়। বাংলাদেশের উগ্রবাদী শক্তিগুলো এই সুযোগ সদ্ব্যবহার করবে যথেচ্ছভাবে, যার পরিণামে এই অঞ্চলটি হয়ে উঠতে পারে পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক (নিরাপত্তাবিষয়ক) এলাকা হিসেবে। বড় দেশ, যেমন চীন, ভারত ও রাশিয়াকেই এগিয়ে আসতে হবে এ সমস্যা সমাধানে। চীনের ভূমিকাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। চীনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে মিয়ানমারের সু চির সরকার কোনো কিছু করারই দঃসাহস দেখাবে না। কারণ চীন হচ্ছে ঐতিহাসিকভাবেই সে দেশের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার প্রধান স্তম্ভ। রাখাইনে চীনের দীর্ঘমেয়াদি ও কৌশলগত স্বার্থের মূল বিষয়টি দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরে এর প্রভাববলয় আরো শক্তিশালীকরণ। আর এই বিশ্বরাজনীতির বলি হতে হচ্ছে এক অতি নিরীহ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণকে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন আমাদের দেশের জন্য যতখানি জরুরি তার ঠিক উল্টোটি হচ্ছে মিয়ানমারের জন্য। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গা গ্রহণ করার কথা বলতে হয়েছে এবং বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তিও করতে হয়েছে।

সরকারকে দ্রুত কিছু বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নিতে হবে এবং সেসব পদক্ষেপের সঙ্গে জাতিসংঘকে বা আরো অন্য কোনো বহুজাতিক সংস্থাকে, যেমন আসিয়ান, সার্ক, ওআইসি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইত্যাদিকে আস্থায় নিতে হবে। সেই সঙ্গে মিয়ানমারের সবচেয়ে বড় মোড়ল চীনকে এ অঞ্চলের শান্তিরক্ষার ফলে তার সুফলভোগী হওয়ার বিষয়টিকে ভালোভাবে উপলব্ধি করার জন্য প্রয়োজনে আরো ইনটেনসিভ লবিং করা যেতে পারে। আমরা বিশ্বাস করি, সরকার এর মধ্যেই এ বিষয়গুলোর প্রতি যথেষ্ট নজর দিয়েছে। মনে রাখতে হবে, দেশের কিছু অপশক্তি বর্তমানে যেকোনো মূল্যবৃদ্ধি বা কুশাসনের সঙ্গে রোহিঙ্গা বিষয়টিকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে যেকোনো ধরনের সংবেদনশীলতা যা অহেতুক সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে, সেদিকে লক্ষ রাখা প্রয়োজন।  

লেখক : অধ্যাপক, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

zalam111@yahoo.com

 

 



মন্তব্য