kalerkantho


আক্রান্ত জাফর ইকবাল যখন প্রেরণা

আফতাব উদ্দিন ছিদ্দিকী রাগিব

১৮ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



আক্রান্ত জাফর ইকবাল যখন প্রেরণা

হাতে তাঁর এখনো সাদা ব্যান্ডেজ। পিঠে সেলাই। মাথায় চার জায়গায় কোপের দগদগে ঘা। ঘা ঢাকতে চাপাতে হয়েছে ক্যাপ। তার পরও ক্যাপের নিচে মুখটা কী জ্বলজ্বলে! এমনকি গায়ের জামাটিও লাল! তাঁকে দেখে কে বলবে, তিনি সদ্য মৃত্যুকূপ থেকে ফিরেছেন? তাঁর হাস্যোজ্জ্বল ও সপ্রতিভ মুখ দেখে কে বলবে, মাত্র কয়েক দিন আগেই তিনি দুর্বৃত্তদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন, মৃত্যুর মুখ দেখে এসেছেন? তাঁর স্বাভাবিক, স্বতঃস্ফূর্ত ও আশ্চর্য ইতিবাচক কথা শুনে অনুমানের উপায় নেই, তিনি মৃত্যুকে জয় করে, মাত্র হাসপাতাল থেকে উড়ে এসেছেন। আরো অবিশ্বাস্য হলো, সিলেটের যে মুক্তমঞ্চে তিনি দিনদুপুরে, শত শত মানুষের সামনে, পুলিশ পাহারায় রক্তাক্ত হয়েছেন; ১১ দিন পর ঠিক সেই জায়গায় এসে বলছেন, ‘আমি ভয় পাইনি এবং এখনো পাচ্ছি না।’ কী দুর্দমনীয় সাহস আর অদম্য মনোবল! হ্যাঁ, বলছি জনপ্রিয় লেখক, শিক্ষক ড. জাফর ইকবালের কথা। সম্প্রতি (১৪ মার্চ) সিএমএইচ থেকে শাবিপ্রবির প্রিয় ক্যাম্পাসে উড়ে গিয়ে সবাইকে সাহসের এমন রূপকথাতুল্য গল্পই শোনালেন তিনি।

‘সাহস’ সম্পর্কে নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, ‘সাহস মানে ভয়ের অনুপস্থিতি নয়, সাহস মানে ভয়কে জয় করা।’ ওই অর্থে জাফর ইকবাল বরাবরই যেন কিছুটা ‘অসম্ভব’ সাহসী। জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী লেখনীর জন্য জীবনে বহুবার হত্যার হুমকি পেয়েছেন। মৃত্যু পরোয়ানা পেয়েছেন। বাসায় কাফনের কাপড় পর্যন্ত এসেছে। তার পরও তিনি নীতিতে অবিচল। ২০১৫ সালে লাগাতার মুক্তমনা লেখক হত্যা ও হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে অনেকেই যখন প্রাণ বাঁচাতে দেশ ছাড়ছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন, ‘হত্যার হুমকি আমার জন্য নতুন কিছু না। এতে আমি ভীতও নই।’ ওই সময় আনসারুল্লাহ-বাংলা টিম ‘টার্গেট’ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক, মুহম্মদ জাফর ইকবালসহ ১০ জনের একটি তালিকা তৈরি করে এবং সবাইকে ডাকযোগে হুমকির চিঠি পাঠায়। ওই চিঠি পেয়ে ঠাট্টার সুরে জাফর ইকবাল বলেছিলেন, ‘এখানে যাঁদের নাম দিয়েছে তাঁরা সবাই সমাজে প্রতিষ্ঠিত মানুষ। তাঁদের ঝুঁকি নেই। কারণ তাঁরা পর্যাপ্ত নিরাপত্তা পান। আমারও গত সাত দিন ধরে পুলিশ পাহারা রয়েছে। তাঁদের রাস্তার মোড়ে চাপাতি দিয়ে মারতে পারবে—এই আশঙ্কা আমি দেখি না।’

তবে সাহসের এবারের কাহিনিটা যেন আগের সব কিছুকেই ছাড়িয়ে গেছে। ৩ মার্চ জাফর ইকবালের ওপর হামলার প্রতিবাদে পুরো জাতি যখন উত্তাল ও উতলা, তখনো তিনি দৃপ্তকণ্ঠে বলেন, ‘আমি ঠিক আছি।’ এমনকি মুক্তমঞ্চে ছুরিকাঘাতের পর মাথা ও শরীর থেকে রক্তের ফোয়ারা বইছিল, তখনো তিনি মানসিক শক্তিতে টইটম্বুর। ছাত্ররা তাঁকে ধরতে চাইলে তখনো তিনি দাবি করলেন, ‘আমি ঠিক আছি।’ চেষ্টা করলেন নিজের পায়ে হাসপাতালে যেতে। এমনকি স্ট্রেচারে শুয়েও স্থির ভঙ্গিতে প্রিয় ছাত্রদের বললেন, ‘তোমরা ক্যাম্পাসে উত্তেজনা সৃষ্টি কোরো না।’

তাঁর বাম হাত ছিল আক্রান্ত। ডান হাত অক্ষত। আক্রান্ত হওয়ার তিন দিন পরই সেই হাতে তুলে নিলেন কলম। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে নিজের আক্রান্ত হওয়া নিয়ে লিখলেন, ‘অবিশ্বাস্য সুন্দর পৃথিবী’ শিরোনামে অবিশ্বাস্য সুন্দর ও কাব্যিক এক লেখা। ছোট্ট সেই লেখার ছত্রে ছত্রে উপচে পড়েছে তাঁর আশ্চর্য ইতিবাচক ও জীবনবাদী দৃষ্টিভঙ্গি। একটা জায়গায় এঁকেছেন অভূতপূর্ব দৃশ্যপট—‘আমাকে নামানো হয়েছে হেলিকপ্টার থেকে। নামিয়ে একটা ট্রলি বা স্ট্রেচারে শোয়ানো হয়েছে। ওপরে খোলা আকাশ। সেই আকাশে একটা ভরা চাঁদ। কী অপূর্ব একটি দৃশ্য! আমি সেই চাঁদটির দিকে বুভুক্ষের মতো তাকিয়ে রইলাম! পৃথিবী এত অবিশ্বাস্য সুন্দর? খোদা আমাকে এই অবিশ্বাস্য সুন্দর পৃথিবীটিকে আরো কয়েক দিন দেখতে দেবে?’ কমবেশি সবাই আমরা জাফর ইকবালের লেখা পড়েছি। কিন্তু এত সুন্দর, মর্মস্পর্শী ও তাৎপর্যপূর্ণ লেখনী খুব একটা চোখে পড়েনি।

শুধু সাহস নয়, তাঁর উদারতাও দৃষ্টান্তমূলক। আক্রমণের পর ছাত্ররা দুর্বৃত্ত ফয়জুরকে ধরে গণপিটুনি দিচ্ছিল। জাফর ইকবাল তখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। শুনে ওই অবস্থায় কাছের ছাত্রদের তিনি বললেন, ‘ওকে মেরো না।’ তাঁর পরিবারও এ ক্ষেত্রে তাঁরই মতো। পুলিশবেষ্টিত থাকা অবস্থায় আক্রমণ এবং খুনির পাশে মোবাইলে ব্যস্ত পুলিশের ছবি প্রকাশে, সবাই যখন পুলিশের কঠোর সমালোচনায় ব্যস্ত; তখন জাফর ইকবালের স্ত্রী আবির্ভূত হলেন ত্রাণকর্তা হিসেবে। পরদিন সংবাদ সম্মেলনে ড. ইয়াসমিন হক বললেন, পুলিশকে দোষ দেওয়া ঠিক হবে না। কারণ মুক্তমঞ্চে অনেকেই দাঁড়ানো ছিল। হঠাৎ যদি একজন পকেট থেকে ছোট কোনো কিছু বের করে আক্রমণ করে, তাত্ক্ষণিকভাবে বুঝতে তো সময় লাগে।’ তিনি আরো বললেন, ‘আমাদের সঙ্গে ২৪ ঘণ্টাই পুলিশ থাকে। বছরের পর বছর তাঁরা আমাদের নিরাপত্তা দিচ্ছেন। জাফর ইকবাল নিজেই অনেক সময় পুলিশি নিরাপত্তায় বিরক্ত হয়ে যেতেন। শিক্ষার্থীদের তাঁর রুমে আসতে দেওয়ার জন্য পুলিশদের সরে যেতে বলতেন। তার পরও পুলিশ সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দিয়েছে।’

এমনকি ১৪ মার্চ হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে নিজের হত্যাচেষ্টাকারীকে প্রকাশ্য ক্ষমার ঘোষণা দিয়ে জাফর ইকবাল সাংবাদিকসহ সবাইকে জানালেন, ‘তার ওপর আমার কোনো রাগ নাই। বরং তাদের জন্য একধরনের দুঃখ অনুভব করি। এত সুন্দর পৃথিবী। সেখানে এত সুন্দর সুন্দর কাজ করা সম্ভব। তারা সেগুলো না করে এই ধরনের একটা কাজকে জীবনের উদ্দেশ্য হিসেবে নিয়েছে। সে জন্য তাদের প্রতি আমি দুঃখ অনুভব করি।’ লেখকরা সাধারণত মানবতাবাদী হয়। সে ক্ষেত্রে এমন অকল্পনীয় ক্ষমা ঘোষণা মানবতাবাদের অত্যুজ্জ্বল নজির হয়ে থাকবে।

আমাদের কাছে জাফর ইকবাল বরাবরই আশাবাদের প্রতীক। ইতিবাচকতার প্রতীক। আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁর কথা ও আচরণে যে মন, মনন ও জীবনদর্শনের দেখা মিলেছে, তাতে তাঁকে এখন একই সঙ্গে জীবনবাদ, মানবতাবাদ ও সাহসের গৌরবোজ্জ্বল প্রতীক বললে অত্যুক্তি হবে না। সত্যি বলতে কী, অক্ষত জাফর ইকবালের চেয়ে আক্রান্ত জাফর ইকবাল যেন বহুগুণ বেশি প্রেরণাদায়ী, আদর্শিক, আকর্ষণীয় ও শিক্ষণীয়। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, শিক্ষক, লেখক জাফর ইকবাল কতটা কালজয়ী হবেন, সেটা সময় বলবে। কিন্তু ব্যক্তি জাফর ইকবালের সাম্প্রতিক সময়ের কথাবার্তাগুলো এ দেশে ইতিহাস ও প্রবাদপ্রতিম হয়ে উঠবে—এ আমি নিশ্চিত। তাঁর দ্বিতীয় জীবন দীর্ঘায়ু হোক, আরো বেশি প্রেরণাদায়ী হোক—সেই প্রত্যাশাই এখন সবার।

লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

aftabragib2@gmail.com


মন্তব্য