kalerkantho


জন্মদিনে শ্রদ্ধা

বঙ্গবন্ধুর ‘জয় বাংলার’ জয় হোক

সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

১৭ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



বঙ্গবন্ধুর ‘জয় বাংলার’ জয় হোক

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রথম জন্মদিনে ঢাকায় কেক কেটেছিলেন তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী। ঘরোয়া ওই অনুষ্ঠানে বেগম মুজিব ও তাঁর ছেলে-মেয়েরা ছাড়া আর কেউ উপস্থিত ছিলেন না। এই ১৭ মার্চ, ১৯৭২ সালের সকালে দিল্লি থেকে ঢাকায় গিয়ে পৌঁছেন ইন্দিরা গান্ধী, দুদিনের ওই সফরে ঢাকায় যাওয়ার নেপথ্যে আমরা সাংবাদিকরা দেখেছি ফেব্রুয়ারি মাসে বঙ্গবন্ধুর কলকাতা সফর। ওই সফরে কলকাতার রাজভবনে যৌথ সাংবাদিক বৈঠকের শুরুতে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন, ১৭ মার্চ তাঁর জন্মদিনে ইন্দিরাজিকে বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের পক্ষ থেকে ঢাকায় যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। পাশে বসা ইন্দিরাজি বললেন, বঙ্গবন্ধুর এই আমন্ত্রণ আমি গ্রহণ করেছি একটি শর্তে। শর্তটি কী? শর্তটি হলো : ১২ মার্চের অর্থাৎ তাঁর ঢাকা সফরের পাঁচ দিন আগে সব ভারতীয় সৈন্যকে বাংলাদেশ থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। বঙ্গবন্ধু তাতে গররাজি। ইন্দিরা গান্ধী তখন বললেন, আমি নিক্সন-কিসিঞ্জার-ভুট্টোকে পৃথিবীর সামনে বলতে দেব না, ভারতীয় সৈন্যের পাহারায় আমি ঢাকায় গিয়েছি। বঙ্গবন্ধু বললেন, ভারতীয় সৈন্যরা যাঁরা যুদ্ধোত্তর স্বাধীন বাংলাদেশ পুনর্গঠনে বড় ভূমিকা নিচ্ছেন, তাঁদের তিনি ফেরত পাঠাবেন কিভাবে? ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁর শর্তে অটল, বঙ্গবন্ধুও প্রত্যুত্তরে বললেন, এই আমন্ত্রণ তাঁর নিজের নয়, এই আমন্ত্রণ সাড়ে সাত কোটি বাঙালির, যাঁরা ইন্দিরাজির বদান্যতায় স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছেন।

যাক শেষ পর্যন্ত ইন্দিরাজির শর্তেই রাজি হলেন বঙ্গবন্ধু এবং ১২ মার্চের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে সব ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। আর ইন্দিরাজিও পূর্ব শর্তমতো ১৭ মার্চ সকালে ঢাকা পৌঁছেন। কথা ছিল, তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে খোলা জিপে চেপে বঙ্গবন্ধু তাঁকে বঙ্গভবনে নিয়ে যাবেন। কিন্তু ভারতীয় গোয়েন্দাদের আপত্তিতে উভয় নেতার নিরাপত্তার খাতিরে কর্মসূচিটি বাতিল হয়। হতাশ হন রাস্তার ধারে ভোর থেকে দাঁড়িয়ে থাকা লাখ লাখ জনতা, ইন্দিরাজিকে হেলিকপ্টারে করে বিমানবন্দর থেকে বঙ্গভবনে নিয়ে যাওয়া হয়।

দুপুরে মধ্যাহ্ন ভোজেও উপস্থিত ছিল শুধু মুজিব পরিবার। নৈশ আহারে অবশ্য উপস্থিত ছিলেন উভয় দেশের মন্ত্রী ও আমলারা। ঢাকার এই সফরের দ্বিতীয় দিনে অর্থাৎ ১৮ মার্চ সকালে বঙ্গবন্ধু ইন্দিরা গান্ধীকে নিয়ে হেলিকপ্টারে নারায়ণগঞ্জে যান এবং সেখানে দুই ঘণ্টা ধরে নদীতে স্টিমারে করে ঘুরে বেড়ান, সেখানে অন্য সাংবাদিকরা না থাকলেও এই প্রতিবেদক ও সঙ্গী চিত্রসাংবাদিক প্রয়াত বিশ্বরঞ্জন রক্ষিত শেষ মুহূর্তে লাফিয়ে স্টিমারে উঠে পড়েন। এ ব্যাপারে সাহায্য করেছিলেন এম আর আখতার মুকুল, যিনি তখন বাংলাদেশের তথ্য দপ্তরের উচ্চ পদে আসীন।

ইন্দিরা গান্ধীর সফরকালে দুই দেশের নেতার মধ্যে ১২ দফার এক চুক্তি হয়। ওই চুক্তি ১৮ মার্চ ১৯৭২ থেকে কার্যকর হয়। এই চুক্তির মেয়াদ ছিল ২৫ বছর। চুক্তিতে বলা ছিল—১. ভারত ও বাংলাদেশ একে অপরের সংহতি রক্ষায় সম্মত থাকবে ও সাহায্য করবে। কোনো কারণে তা বিঘ্নিত হলে পারস্পরিক আলোচনায় তার নিষ্পত্তি হবে।

২. এরা কেউই পরস্পরের বিরুদ্ধাচারী কোনো সামরিক  জোটে যোগ দেবে না বা গোপনে কোনো চুক্তি করবে না।

৩. দুই দেশই সম্মত হয় যে কেউ কারোর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয় বা সামরিক ক্ষতি হয়, এমন কাজে নিজ নিজ এলাকাকে ব্যবহার করতে দেবে না।

৪. এশিয়া তথা সমগ্র বিশ্বে স্থায়ী শান্তির স্বার্থে এবং উভয় দেশের জাতীয় স্বার্থে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারণের জন্য ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

৫. এই চুক্তির অন্যতম লক্ষ্য আন্তর্জাতিক উত্তেজনা প্রশমন, উপনিবেশবাদ, বর্ণবৈষম্য ও সাম্রাজ্যবাদের বিলোপসাধন।

৬. এই চুক্তিটি সংস্কৃতি, শিক্ষা,  কৃিবদ্যা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

৭. এই চুক্তির অন্যতম দিক ছিল বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদী অববাহিকার উন্নয়ন ও পানিবিদ্যুৎ শক্তি ও সেচব্যবস্থা উন্নয়নের ক্ষেত্রে যৌথ সমীক্ষা পরিচালনা ও যৌথ কার্যক্রম গ্রহণে চুক্তিকারী  উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন  অভিন্ন মত। দুঃখের বিষয়, তা এখনো কার্যকর করা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে বঙ্গেশ্বরীর দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি।

৮. শান্তি, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদের  আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে এই আদর্শ রূপায়ণের জন্য একযোগে সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে সুদৃঢ় বন্ধুত্বের বন্ধনের কথা ঘোষণা করা হয়।

৯. অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতার কথা বলা হয়।

১০. ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণের উন্নতিতে দুই দেশ একত্রে কাজ করতে অঙ্গীকার করে।

১১. এই চুক্তিটি স্বাক্ষর করার দিন থেকে কার্যকর হয়। বলা হয়, ২৫ বছর মেয়াদের পরে তা পারস্পরিক সম্মতিতে বাড়ানো যেতে পারে।

১২. কোনো ধারা নিয়ে মত পার্থক্য হলে তা পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়ার মাধ্যমে মিটিয়ে নেওয়া হবে।

এই চুক্তিটি দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাতিল হয় বঙ্গবন্ধু হত্যার রাতেই। হত্যার অব্যবহিত পরে মেজর জিয়া ও তাঁর পরামর্শদাতা খন্দকার মোশতাক আহমদ ঢাকা বেতার কেন্দ্র থেকে এই চুক্তি বাতিলের কথা ঘোষণা করেন।

বঙ্গবন্ধুকে যেদিন হত্যা করা হয়, সেদিন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার সমর সেন কলকাতায় ছিলেন। যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন থাকায় চার দিনের মাথায় সড়কপথে ঢাকায় পৌঁছে প্রথমেই তিনি খন্দকার মোশতাক আহমদের সঙ্গে দেখা করেন। মোশতাক প্রথমেই তাঁকে বাংলাদেশের নতুন সরকারকে ভারতের স্বীকৃতির দাবি জানান। সমর সেন প্রত্যুত্তরে  বলেন, ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি পুনর্বহাল না হলে ভারত নতুন বাংলাদেশি সরকারকে স্বীকৃতি দেবে না। ওই আলোচনায় মেজর জিয়া, মেজর ডালিমসহ বেশ কয়েকজন সামরিক অফিসার উপস্থিত ছিলেন। উপায়ান্তর না দেখে খন্দকার  মোশতাক সামরিক অফিসারদের সঙ্গে পরামর্শক্রমে জানান, তাঁরা প্রস্তাব নেবেন। তখন সমর সেন বলেন, লিখিত সেই প্রস্তাব পেলে তবেই দিল্লি স্বীকৃতির কথা ভাববে। সেই মতো চিঠি দিল্লির হাতে পৌঁছলে দিল্লি জানায়, বাধ্যবাধকতা থাকায় দিল্লি নতুন বাংলাদেশি সরকারকে স্বীকৃতি  দিচ্ছে। ১৯৭২ সালের ১৭ ও ১৮ মার্চের ঐতিহাসিক সফরের আনন্দ ম্লান হয়ে যায় নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডে।

পুরনো কথায় ফিরে যাই। ১৯৭২ সালের ১৮ মার্চ যৌথ সাংবাদিক বৈঠকে মুজিব মন্ত্রিসভার সব মন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন। সাংবাদিক বৈঠকের শুরুতে বঙ্গবন্ধু ইন্দিরা গান্ধীকে ঢাকায় আসার জন্য ধন্যবাদ জানান। উত্তরে ইন্দিরা গান্ধী বলেন, ঢাকা সফরে তিনি যে সংবর্ধনা পেয়েছেন ও আন্তরিকতা দেখেছেন, তাতে তিনি আপ্লুত। সাংবাদিক বৈঠকের মধ্যেই ইন্দিরা গান্ধীর নিয়ে যাওয়া বেনারসি শাড়ি মন্ত্রিসভার সদস্যদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। তৎকালীন বাংলাদেশের খাদ্যমন্ত্রী ফণী মজুমদারের নাম ঘোষণা হতেই বঙ্গবন্ধু বলে ওঠেন, ফণীদা চিরকুমার। ওনার জন্য বরাদ্দ শাড়িটি অন্য এক মন্ত্রীকে দিতে অনুরোধ করেন, যেহেতু তাঁর দুই স্ত্রী, সংবাদ সম্মেলনে হাসির রোল ওঠে।

বাংলাদেশ নয়, সারা দুনিয়ার এক বড় অংশ বলতে শুরু করেছে, যদি আজ থেকে ৯৮ বছর আগে ফরিদপুরের  টুঙ্গিপাড়ায় শেখ মুজিব বলে এক শিশুর জন্ম যদি না হতো, তাহলে বাংলাদেশের কোনো অস্তিত্ব পৃথিবীতে থাকত না, বঙ্গবন্ধুর ‘জয় বাংলার’ জয় হোক।

লেখক : কলকাতার প্রবীণ সাংবাদিক



মন্তব্য