kalerkantho


নিজেই নিজের তুলনা স্টিফেন হকিং

ড. কানন পুরকায়স্থ

১৬ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



নিজেই নিজের তুলনা স্টিফেন হকিং

গত ১৪ মার্চ, ২০১৮ ভোরবেলায় কেমব্রিজের নিজ বাসভবনে এ শতাব্দীর তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান জগতের এক প্রবাদপুরুষ স্টিফেন উইলিয়াম হকিং ৭৬ বছর বয়সে লোকান্তরিত হয়েছেন। তাঁর মৃত্যুতে বিজ্ঞানজগৎ হারাল এক অনন্যপ্রতিভা। এই প্রতিভা প্রমাণ করেছে যে মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে অন্য কোনো শক্তিই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে না। এএলএস (Amyotrophic Lateral Sclerosis) বা মোটর নিউরনের মতো জটিল রোগ নিয়েও অর্ধ শতাব্দী ধরে স্টিফেন তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান ও কসমোলজির জগতে অবদান রেখে গেছেন। স্টিফেন যখন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতশাস্ত্রের লুকেসিয়ান অধ্যাপক নিযুক্ত হন, তখন কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত বিশিষ্ট বিজ্ঞান লেখক, বিজ্ঞানী কার্ল সাগান বলেছিলেন, তিনি নিউটন ও পল ডিরাকের যোগ্য উত্তরসূরি। রজার পেনরোজ, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতবিদ তাঁর মৃত্যুতে উল্লেখ করেন, ‘He was extremely highly regarded, in view of his in many greatly impressive, sometimes revolutionary, contributions to the understanding of the physics and the geometry of the universe. স্টিফেন অনেক পুরস্কারে ভূষিত হন। তাঁর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, রয়েল সোসাইটির কোপলে মেডেল, রয়েল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির গোল্ড মেডেল, ১৯৮২ সালে সিবিই (CBE) এবং ১৯৮৯ সালে কম্পেনিয়ন অব অনার (CH); তা ছাড়া ২০০৯ সালে তিনি ইউএস প্রেসিডেনশিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম পুরস্কার পান। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব অ্যাপ্লায়েড ম্যাথামেটিকস এবং থিওরেটিক্যাল ফিজিকসে গবেষণা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ভাইস চ্যান্সেলর তাঁর মৃত্যুতে উল্লেখ করেন, ‘Professor Hawking was a unique individual, who will be remembered with warmth and affection, not only in Cambridge but all over the world... his character was an inspiration to millions. He will be much missed.

বিজ্ঞানে স্টিফেন হকিংয়ের অবদানকে বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হয় অ্যারিস্টটলের মহাবিশ্ব দর্শনে, যা দুই হাজার বছর ধরে আমাদের চিন্তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। টলেমি ১৪০ খ্রিস্টাব্দে পৃথিবীকেন্দ্রিক ধারণা দিয়ে অ্যারিস্টটলের চিন্তাকে পূর্ণতা দান করেন। কিন্তু কোপারনিকাস (১৪৭৩-১৫৪৩ খ্রি.) সৌরকেন্দ্রিক মহাবিশ্বের তত্ত্ব দিয়ে টলেমির ধারণাকে বাতিল করলেন। তারপর সৌরকেন্দ্রিক ধারণাকে পরীক্ষণ পদ্ধতির সাহায্যে বিশ্বের দরবারে উপস্থাপন করেন গ্যালিলিও। ইয়োহান কেপলার বিভিন্ন গ্রহের গতিবিধির তত্ত্ব প্রকাশ করেন। তারপর আইজাক নিউটন প্রকাশ করলেন মহাকর্ষ তত্ত্ব (১৬৮৭)। নিউটনের মহাকর্ষ তত্ত্বের পর ১৭ ও ১৮ শতকে শক্তির নিত্যতা ও শক্তির রূপান্তর সম্পর্কে নানা তত্ত্ব পাই। ১৮ ও ১৯ শতকে বিদ্যুৎ ও চৌম্বক শক্তির পরিসর পাই এবং ম্যাক্সওয়েল তড়িৎ চৌম্বকীয় বলের ধারণা উপস্থাপন করেন। তারপর অণু ও পরমাণু সম্পর্কে আমরা নানা তত্ত্ব পেয়েছি। যেমন—ডালটনের পরমাণু তত্ত্ব, অ্যাভোগাড্রোর আণবিক প্রকল্প ও পর্যায় সারণি। উনিশ শতকের শেষের দিকে এক্স-রে আবিষ্কার, বেকেরেলের তেজস্ক্রিয়তা, থমসনের ইলেকট্রন, রাদারফোর্ডের পরমাণুকেন্দ্র, প্লাংকের কোয়ান্টাম তত্ত্ব এবং আইনস্টাইনের কালজয়ী আবিষ্কার আপেক্ষিকতাবাদ আমাদের নিউটনের গতিবিদ্যা থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করল। ১৯১৬ সালে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ, দ্য ব্রগলির তরঙ্গ-কণিকা দ্বৈত চরিত্র এবং স্রোয়েডিংগার, হাইসেনবার্গ ও ডিরাকের কোয়ান্টাম বলবিদ্যার নানা ধারণা বিজ্ঞানের জগতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল। এভাবে পরমাণুর জগতে যখন নতুন তত্ত্ব ও তথ্যের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে, ঠিক তখন কসমোলজি বা মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়েও চলেছে নানা কাজ। যেমন—১৯২৯ সালে এডউইন হাবল দেখান যে তারকামণ্ডলী ক্রমে দূরে সরে যাচ্ছে। অ্যালবার, বেথে ও গ্যামও ১৯৪৬ সালে বিগ ব্যাং তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। অপরদিকে ১৯৪৮ সালে হয়লে, বন্ডি ও গোল্ড স্থিরাবস্থা (steady state) মডেল উপস্থাপন করেন। ১৯৬৫ সালে পেনজিয়াম ও উইলসন ব্যাকগ্রাউন্ড বিকিরণের সন্ধান পেলেন, যা সবাই বিগ ব্যাং মহাবিস্ফোরণের অবশিষ্ট বিকিরণ হিসেবে মেনে নিলেন। স্টিফেন হকিংয়ের গবেষণা মূলত কৃষ্ণগহ্বর নিয়ে। তাঁর মতে, মহাবিশ্বের সৃষ্টিলগ্নে বহু ছোট কৃষ্ণগহ্বর সৃষ্টি হয়েছিল এবং এগুলো বিভিন্ন কণা-প্রতিকণা নিঃসরণ করে ক্রমে লোপ পায়। ১৯৭১ সালে হকিং প্রস্তাবিত এই তত্ত্ব হয়লের স্থিরাবস্থা তত্ত্বের বিরোধী এবং বিগ ব্যাং তত্ত্বের সমর্থনকারী।

১৯৭৩ সালে কেমব্র্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস, Large Scale Structure of Space Time নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করে, যার লেখক ছিলেন জর্জ এলিস ও স্টিফেন হকিং। এই বইটি সহজবোধ্য না হওয়ার কারণে এবং ১৯৮২ সালে হার্ভার্ডে লোয়েব বক্তৃতাদানের পর স্টিফেন সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি স্থান ও কাল বিষয়ে সাধারণের জন্য একটি বই লিখবেন। তাঁকে একজন বললেন যে বইটিতে একটি সমীকরণ ব্যবহার করার অর্থ হচ্ছে পাঠকের সংখ্যা অর্ধেক কমে যাওয়া। তাই স্টিফেন স্থির করেন একমাত্র E=Mc2 ছাড়া আর কোনো সমীকরণ তাঁর প্রকাশিতব্য গ্রন্থ ‘এ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম’-এ ব্যবহার করবেন না। ১৯৮৭ সালে ব্যান্টাম প্রেস এই গ্রন্থটি প্রকাশ করে। এই গ্রন্থটি প্রায় এক কোটি কপি বিক্রি হয় এবং স্টিফেনকে এনে দেয় জগজ্জোড়া খ্যাতি। ‘সানডে টাইমস’ পত্রিকা সে সময় এই বইটি সম্পর্কে লিখেছিল, ‘শিশুর সারল্য ও অনুসন্ধিৎসার সঙ্গে এ বইয়ে যুুক্ত হয়েছে অসীম প্রতিভাশালী ক্ষুরধার বুদ্ধি। আমরা অনায়াসে বিচরণ করতে পারি হকিংয়ের মহাবিশ্বে, আর সেই সঙ্গে প্রশংসা করতে পারি তাঁর মানসিক ক্ষমতার।’

এখানে উল্লেখ্য, বিখ্যাত বিজ্ঞান পত্রিকা ‘নেচার’-এ স্টিফেন হকিংয়ের প্রবন্ধ ‘কৃষ্ণগহ্বরের বিস্ফোরণ’ সত্তরের দশকে বিশ্বজগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তাঁর পিএইচডি সুপারভাইজার ড. সিয়ামা প্রবন্ধটি পড়ে মন্তব্য করেছিলেন, পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে এই লেখাটি ‘শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধাবলির’ অন্যতম। কৃষ্ণগহ্বর থেকে যে শক্তিকণা বিচ্ছুরিত হয় তার নাম দেওয়া হলো ‘হকিং রেডিয়েশন’। ২০১৬ সালে বিবিসিতে প্রদত্ত রিথ বক্তৃতায় (Reith lecture) স্টিফেন হকিং বলেছেন যে কৃষ্ণগহ্বর কিন্তু কৃষ্ণ নয়। কারণ তার ভেতর থেকে বিকিরণ বেরিয়ে আসে। তার এই বিকিরণে মহাবিশ্ব সম্পর্কে অনেক তথ্য রয়েছে।

বহুকাল থেকেই বিভিন্ন মৌলিক বলকে একটি তত্ত্বের আওতায় আনার চেষ্টা করা হয়েছে। মহাবিশ্বে চার ধরনের বল আছে—অভিকর্ষ, তড়িৎ চৌম্বক, সবল পারমাণবিক ও দুর্বল পারমাণবিক বল। আইনস্টাইন এই বলগুলোকে এক জায়গায় মেলানোর চেষ্টা করে সফল হননি। সালাম, ভাইনবার্গ ও গ্লাসো ইলেকট্রোউইক এবং ইলেকট্রো নিউক্লিয়ার তত্ত্বে চৌম্বক বল ও দুই ধরনের পারমাণবিক বলকে এক জায়গায় জুড়েছেন। হকিংও চেয়েছিলেন এক মহামিলন তত্ত্ব। হকিং ও পেনরোজ আপেক্ষিকতাবাদ ও কোয়ান্টাম তত্ত্বের মিলন ঘটিয়ে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে ‘সব কিছুর তত্ত্ব’ (Theory of everything)-এর দিকে প্রথম পদক্ষেপ ফেলতে সাহায্য করেন। এক বিশ্বসভায় স্টিফেন হকিং বলেছিলেন, There are some grounds for continuous optimism that we may see a complete theory within the lifetime of some of those present here. কিন্তু স্টিফেনের সে আশা তাঁর জীবদ্দশায় পূরণ হলো না।

তাঁর অনেক বক্তৃতা শোনা এবং তাঁকে প্রত্যক্ষভাবে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। ১৯৯৯ সালে কেমব্রিজের লেড মিচেল হলের সভায় আইনস্টাইনের প্রসঙ্গ টেনে তাঁকে প্রশ্ন করেছিলাম, মহাবিশ্ব সৃষ্টি করার সময় ঈশ্বরের কি অন্য রকম কিছু করার সম্ভাবনা ছিল? হকিং বলেছিলেন, তিনি ঈশ্বরের মন বুঝতে চেষ্টা করেছেন। তবে তিনি যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন তা হলো এই যে এই মহাবিশ্বের স্থানে যেমন কোনো কিনারা নেই, কালেও কোনো শুরু বা শেষ নেই এবং স্রষ্টার করার মতো কিছুই নেই। আগামী দিনের বিজ্ঞানীরা স্টিফেন হকিংয়ের কাজের মূল্যায়ন করবেন। বিশ্ব জগতে তাঁর কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি স্মরিত হবেন অনন্তকাল।

লেখক : গবেষক ও অধ্যাপক, যুক্তরাজ্য


মন্তব্য