kalerkantho


স্বাধীনতার স্বেচ্ছাচার

গোলাম কবির

১১ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



স্বাধীনতার স্বেচ্ছাচার

‘স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায়’ বলে রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় পলাশীর প্রাহসনিক পরাজয়ের ১০১ বছর পর এবং সিপাহি বিদ্রোহের পরের বছর ১৮৫৮ সালে পদ্মিনী উপাখ্যানে আপ্তবাণীটি সন্নিবেশিত করেন। গোটা উনিশ শতক, এমনকি এখনো এই চেতনা বাসি হয়নি। পদ্মিনী উপন্যাসের বিষয়বস্তু কল্পকাহিনি না ইতিহাসনির্ভর, সে বিতর্ক এখনো বর্তমান। আমরা সে বিতর্কে শামিল না হয়ে খোঁজার চেষ্টা করব। ওই স্বাধীনতার স্বরূপ কী? কিসের স্বাধীনতা? কার স্বাধীনতা? সে কি মননের? মনুষ্যত্বের, নাকি মানবমুক্তির! এসব প্রশ্নের সমাধান আজও হয়নি। কে জানে, ‘বীরভোগ্যা বসুন্ধরা’য় কবে হবে!

একদা, এমনকি এখনো সাধারণ মানুষ খাদ্য-বস্ত্র-চিকিৎসা-বাসস্থান-বিনোদন ইত্যাদির প্রয়োজনমতো সুবিধা পেলে তেমন উচ্চবাচ্যে সংশ্লিষ্ট হয় না। উনিশ শতকে পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত কিছু ব্যক্তির চেতনায় যে স্বাধীনতাবোধ উপ্ত হয়েছিল, তা সাধারণ্যে ব্যাপক বিস্তার লাভ করেনি। হাজি শরীয়তুল্লাহ বা তিতুমীর স্বাতন্ত্র্যবাদী চেতনা উপ্ত করতে চেয়েছিলেন, তা ফলপ্রসূ হয়নি। রঙ্গলাল স্বাধীনতার কথা বললেও পদ্মিনী উপাখ্যানের উপসংহারে বলতে ভোলেননি, ‘ভারতের ভাগ্য জোর’ তাই তারা ‘ইংরেজের কৃপা’ লাভ করেছে। আর বঙ্কিমচন্দ্র আনন্দমঠে সত্যানন্দ গোস্বামী স্বাধীনতা সংগ্রামী হয়েও ব্রিটিশকে শত্রু ভাবেননি। অনেকে হয়তো একে দ্বিচারিতা বা স্ববিরোধিতা ভাবতে পারেন। তবে স্মরণ রাখা ভালো, ঔপনিবেশিক সংস্কৃতিসেবীদের বিধিলিপি এমনি যে তাঁদের পক্ষে সরাসরি কিছু বলার পরিবেশ তখনো হয়নি।

উনিশ শতকের শেষ পর্ব থেকে অবিভক্ত ভারতে নানাভাবে স্বাধীনতার দাবি বেগবান হতে থাকে। ‘বুড়ো খোকা’রা ভারত ভেঙে বলতে গেলে, ত্রিধাবিভক্ত করলেন। আমরা পূর্ব বাংলার মানুষ লেফাফাদুরস্ত পাকিস্তান পেলাম। অবিলম্বে মানুষ বুঝল, স্বাধীনতার স্বেচ্ছাচারের মোজেজা। তখন অনেকে বলাবলি করতেন, ব্রিটিশই ভালো ছিল। এর অন্তর্নিহিত কারণ হলো, শাসক বদলালেও নিয়ম বদলায়নি। বরং তথাকথিত স্বাধীন নিয়মের আবরণে অধিকতর লুটপাট হতে চলল। রবীন্দ্রনাথ দেশভাগের অর্ধ শতাব্দীকাল আগে আশঙ্কা করেছিলেন, কালান্তর গ্রন্থে যার বিশদ বর্ণনা আছে। তিনি বলেছিলেন, বিদেশি লুটেরারা চলে গেলেও দেশি লুটেরারা জেঁকে বসবে। রবীন্দ্রনাথ স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই স্বীকার করতেন। তবে তার আগে ত্যাগ ও আত্মশক্তির জাগরণকে বাঞ্ছিত ভাবতেন। আর গণতন্ত্র ও স্বাধীনতাবোধের পীঠস্থান খোদ ইউরোপে কবি মিল্টন তাঁর এরিয়োপেজিটিকা গ্রন্থে বলেছিলেন, ক্ষমতাসীনদের সমালোচনায় যারা মুখর থাকে, তারা ক্ষমতা পেলে অনেক সময় অধিকতর নিপীড়ক এবং অধিকার হরণকারী হয়ে ওঠে। তারা স্বেচ্ছাচারের স্বাধীনতা পায়।

যোগ্যতার পরিপ্রেক্ষিতে সাম্য, জীবনাচরণের সংস্কৃতিতে স্বাধীনতা জনগণ মৌলিক অধিকার হিসেবে পেতে চায়, দয়া হিসেবে নয়। ধর্মীয় আবেগের ভিত্তিতে বাংলা তথা ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলে কেন্দ্রীয় শাসকবর্গ বাঙালিদের দয়ার পাত্র গণ্য করে। ছিটেফোঁটা উচ্ছিষ্ট দিয়ে শাসনের নামে শোষণে লিপ্ত হয়। শাসকদলের প্রায় সর্বস্তরের ব্যক্তি হয়ে ওঠেন স্বাধীনতার ইজারাদার, আর ব্রিটিশ আমলাদের উত্তরাধিকার পাকিস্তানি আমলারা হয়ে ওঠেন প্রতিপত্তিবাদী। বাঙালির বঞ্চনার অবসান সুদূরপরাহতরূপে লক্ষণীয় হয়ে উঠতে থাকে। তাই প্রথমে মাতৃভাষার অধিকারের প্রশ্নে, তারপর কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার বিষয় সামনে এনে বিধিবদ্ধ আন্দোলনের পথে অগ্রসর হলেন বাঙালি জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বঙ্গবন্ধু। কায়েমি স্বার্থের পরিপন্থী ভেবে দমন-পীড়ন চালিয়ে তা স্তব্ধ করতে চেয়েছিল স্বাধীনতার স্বেচ্ছাচারীরা, পারেনি।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। তিনি ছাত্রজীবন থেকেই বাংলার মানুষের স্বাধীনতা ও মুক্তির স্বপ্ন দেখতেন। দেশভাগের পর যে স্বাদ অধরা থেকে যাওয়ার বিড়ম্বনা তিনি সামনে থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন। মুক্তির সংগ্রামে তিনি জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময় পাকিস্তানি বন্দিশালায় অন্তরীণ থাকেন। তিনি বুঝেছিলেন, ভূখণ্ড ও স্বতন্ত্র পতাকাই প্রকৃত স্বাধীনতা নয়। প্রভাব-প্রতিপত্তি পুঁজি করে স্বেচ্ছাচারিতা প্রদর্শন পরাধীনতার নামান্তর।

দেশ পরিচালনার দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে বঙ্গবন্ধু ‘সবহারাদের মাঝে’ সুখে-দুঃখে, বিপদে সন্তাপে একসঙ্গে থাকার অভিপ্রায়ে ক্যান্টনমেন্ট কিংবা সুরক্ষিত বিলাসবহুল প্রাসাদে অবস্থান না করে প্রায় অরক্ষিত সাধারণ বাড়িতে বসবাস করা শুরু করেন। ইতিহাস বলছে, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে নিঃশর্ত মুক্ত হয়ে তিনি রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতাকে সাক্ষী রেখে ২৩ ফেব্রুয়ারি ঘোষণা করেছিলেন, বাঙালির রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবেন না। করেননি। তাদের মুক্তির উদ্দেশ্যে তিনি দ্বিতীয় বিপ্লবের পরিকল্পনা হাতে নেন। এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হলো সাধারণ মানুষকে যেন কেউ অধিকারবঞ্চিত করতে না পারে। স্বাধীনতার রক্ষক বলে কথিত ব্যক্তিরা যেন স্বেচ্ছাচারী হয়ে না ওঠে। যথাসময়ে তা বাস্তবায়নের আগে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সাবধান করে দিতে চেয়ে বলেছিলেন, যারা ক্ষমতার উৎস এবং যাদের ট্যাক্সের টাকায় দেশ চালিত হয়, তারা যেন অবহেলা কিংবা অবজ্ঞার পাত্র না হয়। ইতিহাসের মর্মন্তুদ ট্র্যাজেডি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই দেশি-বিদেশি কুচক্রীরা দৃশ্যপট থেকে সপরিবারে তাঁকে সরিয়ে দিল। বাংলাদেশ ‘উদ্ভট উটের পিঠে’ পেছনের পানে চলা শুরু করল। গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার নামে রাজনীতিকে কঠিন করার পতাকাতলে নানা কিসিমের চিন্তার মানুষ সমবেত হয়ে স্বাধীনতার স্বেচ্ছাচারে লিপ্ত হলো। পেশিশক্তি আর দুর্বৃত্তায়নকে সামনে রেখে জনগণের কাছে বানোয়াট বিকৃত ইতিহাসের ফাঁদ পেতে গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার স্বাদ পাওয়ার ধুয়া তুলল। সে ধুয়া এখনো গীত হচ্ছে। জনগণ ক্ষমতার উৎস। তাদের কল্যাণব্রতী রাজনীতিকদের সহকর্মী হওয়া ইতিহাসের শিক্ষা। এ শিক্ষা থেকে বিচ্যুত হলে ইতিহাস প্রতিশোধ নেয়।

লেখক : সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ


মন্তব্য