kalerkantho


পথের বাধা সরিয়ে নাও

রাখী দাশ পুরকায়স্থ

৮ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



পথের বাধা সরিয়ে নাও

বর্তমান সময়ে বিজ্ঞান, তথ্য-প্রযুক্তির বিকাশ আর বিশ্ব মানব সম্প্রদায়ের বিকল্পহীন ভবিষ্যত্মুখী এগিয়ে যাওয়ার যূথবদ্ধ অঙ্গীকার বছরে বছরে নতুনভাবে করণীয় কে নির্ধারণ করে তাকে বাস্তবায়িত করার শপথকে  সামনে আনে দেশ ও সরকার। সময়ের বিবেচনায় ইস্যু নির্ধারণ করে আহ্বান জানায় গোটা বিশ্বে।

এই ২০১৮ সালের ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসের গোটা বিশ্বদরবারে আহ্বান ‘গ্রাম ও শহরের আন্দোলনকর্মীদের জন্য এখনই সময় নারীর জীবনে রূপান্তর আনার (Time is now : Rural and urban activists transforming women’s lives)|

অবশ্যই বলার অপেক্ষা রাখে না, নারী দিবসে এই আহ্বান যাঁদের কাছে, তাঁরা শুধু নারী নন, পুরুষ জনগোষ্ঠীও অন্তর্ভুক্ত। নারী-পুরুষের মিলিত বিশ্বমানবগোষ্ঠীর সম্মিলিত প্রয়াস এগিয়ে যাওয়ার এক বড় সম্পদ। এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে পেছনে থাকা জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা আবশ্যিক শর্ত হিসেবে দাঁড়ায়। সে কারণে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার বিষয়টি বারবার সামনে আসে।

সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায়, নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিতের বিষয়টি নির্ধারিত হয় মূলত পাঁচটি বিষয়ের মাধ্যমে—এক. নীতিমালা পরিবর্তন অর্থাৎ পলিসি পরিবর্তনের মাধ্যমে, দুই. অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে, তিন. সম্পদে অধিকার ও তা বৃদ্ধির মাধ্যমে, চার. সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার মাধ্যমে, পাঁচ. মূল্যবোধ পরিবর্তনের মাধ্যমে। আর বাস্তব সত্য হচ্ছে, এই পাঁচটি বিষয়ই আবার একে অন্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

বর্তমান সময় নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে যে বিষয়টি ব্যাপক গুরুত্ব নিয়ে সামনে এসেছে, তা হলো নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন। নারী আন্দোলনকর্মী, মানবাধিকার আন্দোলনকর্মীদের পক্ষ থেকে এই সময়ে বিশেষত নারী দিবসের বৈশ্বিক আহ্বান সামনে রেখে নির্ধারণ করা হয়েছে ‘নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে প্রধান শর্ত নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর সম অংশগ্রহণ ও সম অংশীদারিত্ব : জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে চাই সরাসরি নির্বাচন।’

একটি আপাত আলোকিত চিত্র : পৃথিবীর ইতিহাসে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জন করা, দেশের জনসাধারণ নারী-পুরুষের মিলিত সংগ্রাম রচনা প্রতিবেশী ভারত ও মিত্র দেশ রাশিয়ার বিভিন্নমুখী সাহায্য-সহযোগিতায় মুক্তিকামী এ দেশটিকে স্বীকৃতি দেওয়া পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সমর্থন নিয়ে ১৯৭১ সালে জন্ম নিল নতুন মানচিত্রের অনন্য এই গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠী-নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যার মালিক জনগণ।

গত কয়েক যুগ ধরে এ দেশের উন্নয়নে পুরুষের পাশাপাশি নারীর উপস্থিতি প্রথা ভেঙে নতুন নতুন মোড় রচনা এক দেখার বিষয়। আমাদের এই স্বাধীন বাংলাদেশেও নারীর ক্ষমতায়ন বিশেষত রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য নারী আন্দোলন মানবাধিকার আন্দোলনকর্মীদের দীর্ঘ ধারাবাহিক সংগ্রামের ইতিহাস রয়েছে। গণপ্রজাতন্ত্রী স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্বের জন্য ১৫টি আসন সংরক্ষণ করা হয়। পরবর্তী সময় পর্যায়ক্রমে ১৯৯৬-২০০১ সালের সপ্তম সংসদে সংরক্ষিত আসনসংখ্যা ৩০, অষ্টম জাতীয় সংসদে (২০০১-২০০৬ সালে) ৪৫ ও দশম জাতীয় সংসদের মেয়াদকালে এই সংরক্ষিত নারী আসনসংখ্যা ৫০-এ বৃদ্ধি পায়। এর পাশাপাশি সাধারণ আসনে কিছু নারী সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে বিভিন্ন সংসদের মেয়াদকালে প্রতিনিধিত্ব করছেন ধারাবাহিকভাবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ছে—অগ্রগতির এ এক আপাত আলোকিত স্বীকৃত দিক। স্থানীয় সরকার পদ্ধতিতে সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচন প্রথা, জনপ্রতিনিধির দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিকে চিহ্নিত করেছে। প্রশ্ন আসে, এই আপাত আলোকিত চিত্র কি বাস্তব অর্থে অর্থবহ নারী প্রতিনিধিত্বকে নিশ্চিত করতে সক্ষম? গণনারীর প্রতিনিধি হিসেবে যাঁরা জাতীয় সংসদে আইনপ্রণেতা হিসেবে আসীন হবেন—তাঁদের যাওয়ার পদ্ধতিটি কী? কারা তাঁদের নির্বাচিত করবেন? নির্বাচনের পদ্ধতিটি কী? একজন নারী তাঁর নিজ জেলার কোন নির্বাচনী এলাকার জন্য প্রার্থী হবেন, কাদের কাছে সমর্থন চাইবেন? এসব বিষয়ের কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও পদ্ধতি এখনো তৈরি হয়নি। ফলে বর্তমান একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে এসেও দেখা যাচ্ছে সংরক্ষণ পদ্ধতিতে নারী আসনে সরাসরি নির্বাচন ও প্রতি সংসদ সদস্যের জন্য সুনির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকা নির্ধারণ না থাকায় জনসম্পৃক্ত উন্নয়নপ্রচেষ্টা এবং জনসম্পৃক্ত রাজনীতিচর্চা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন নারী। সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্যরা জনগণের, বিশেষত নারী জনগোষ্ঠীর কাছে দায়বদ্ধ হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। যেহেতু সংরক্ষিত আসনগুলোতে রাজনৈতিক দলের নীতিনির্ধারকদের করুণার ওপর, ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে নারীর প্রতিনিধিত্ব তাই যথার্থ প্রতিনিধির মর্যাদা ও অধিকার এবং প্রয়োগ করার সুযোগ তাঁদের থাকে না।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বাংলাদেশ সরকারের ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (২০১১-২০১৫) যেখানে জাতীয়, মাঝারি পর্যায়ের উন্নয়ন পরিকল্পনায় বাংলাদেশকে ২০২১ সালের মধ্যে একটি মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করা হয়েছে, নারীকে রাজনৈতিক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার কাজকে ক্ষমতায়নের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, সেখানে ধারাবাহিক নারী আন্দোলনের কর্মীরা, মানবাধিকার আন্দোলনের কর্মীরা অবাক বিস্ময়ে দেখতে পেলেন গত ২৯ জানুয়ারি ২০১৮ মন্ত্রিপরিষদ সভায় জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনব্যবস্থা আরো ২৫ বছর বহাল থাকবে এই মর্মে সংবিধান (সপ্তদশ সংশোধন) আইন, ২০১৮-এর খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

ক্ষমতার অসম বণ্টন নারীর অবদমনের অন্যতম এক কারণ। যাদের হাতে ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ ও অধিকার থাকে, তারা উত্কৃষ্ট আর যাদের হাতে তা থাকে না তারা নিকৃষ্ট। নারী-পুরুষের এই বৈপরীত্যমূলক সম্পর্কটিও ব্যাপক অর্থে রাজনৈতিক। বিবেচনায় নেওয়ার বিষয় হচ্ছে অগ্রগতি-আধুনিকায়নের দিকে ধাবমান কোনো দেশ ও সমাজে কোনো বৈষম্যকে স্থায়ী হিসেবে বিবেচনা করে কোনো মতবাদ লালন কিংবা একই কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ সুবিবেচনা হিসেবে ধরা যায় না। সে কারণেই গত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালে নারী আন্দোলন মানবাধিকার আন্দোলনকর্মীদের যে প্রত্যাশা প্রকৃত অর্থে সংরক্ষিত আসনের নারী সংসদ সদস্যদের মূলধারার রাজনৈতিক কর্মী, নেতা, সংগঠক নীতিনির্ধারক হিসেবে ভূমিকা রাখার নিশ্চয়তার জন্য যে আইনি ভিত্তি প্রয়োজন, তার জন্যই সরাসরি নির্বাচন এবং আসনসংখ্যা এক-তৃতীয়াংশ থাকার প্রয়োজনীয়তা রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেশের উন্নয়নের স্বার্থে বিবেচনায় নেবেন।

নির্বাচন প্রাক্কালে প্রচারিত ইশতেহারে রাজনৈতিক দল, বিশেষত বর্তমান ১৪ দলীয় সরকারের প্রধান রাজনৈতিক দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহার অনুচ্ছেদ ১২.২ নম্বরে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বলেছিল, জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা ৩৩ শতাংশে উন্নীত করা হবে এবং সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 এই জাতীয় সংসদের মেয়াদকালে সংরক্ষিত আসনের মেয়াদও শেষ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি ধারাবাহিক ও পর্যায়ক্রমে নারী ও মানবাধিকার আন্দোলনকর্মীরা নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিতে এনে সরাসরি নির্বাচন ও এক-তৃতীয়াংশ আসনসংখ্যা বৃদ্ধির চলমান দাবির মধ্যেই ২৯ জানুয়ারি ২০১৮ মন্ত্রিপরিষদ সভায় জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনব্যবস্থা আরো ২৫ বছরের জন্য বলবৎ থাকবে মর্মে সংবিধান (সপ্তদশ সংশোধন) আইন ২০১৮-এর খসড়া অনুমোদন দেওয়া বাস্তব অর্থে দেশের নারীসমাজের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বৈপরীত্যমূলক এবং এই সরকারের নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে সময়ে সময়ে গৃহীত পদক্ষেপ ও বক্তব্যের সঙ্গে এমনকি জাতিসংঘ ঘোষিত সিডও সনদ ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের (এসডিজি) সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।

বলা হয়ে থাকে, নারীবান্ধব সরকার, নারীবান্ধব সরকারপ্রধান—তাই প্রত্যাশা এবং আহ্বান, এবারের এই নারী দিবসে নারীর যথার্থ রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের স্বার্থে মন্ত্রিপরিষদের সভায় নেওয়া খসড়া অনুমোদন আবার মূল্যায়ন করে পেছনে সরে যাওয়াকে রোধ করুন—সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুত ব্যবস্থা নিশ্চিত হোক। নারীর মর্যাদা, নাগরিকের মর্যাদা, যা জাতির মর্যাদা। একে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে পথের সব বাধা সরিয়ে দিন।

লেখক : আইনজীবী ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ



মন্তব্য