kalerkantho


উচ্চ আদালতে এই রায় টিকবে না

জয়নুল আবেদীন

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



উচ্চ আদালতে এই রায় টিকবে না

বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় পাঁচ বছর কারাদণ্ডের রায় দিয়েছেন রাজধানীর বকশীবাজারে অবস্থিত বিশেষ জজ আদালত। রায়টি সরকারের রাজনৈতিক প্রভাবে প্রভাবিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। এই রায় সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও একটি বাজে দৃষ্টান্ত সৃষ্টিকারী রায়।

নিম্ন আদালতের এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে। আপিল করার জন্য রায়ের সার্টিফায়েড কপি লাগবে। এটি পেতে দেরি হলে আমরা আদালতকে বলেছি, রায়ের ফটোকপি সত্যায়িত করে সরবরাহ করতে, যাতে আমরা দ্রুত উচ্চ আদালতে আপিল দায়ের করতে পারি।

আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, উচ্চ আদালতে নিম্ন আদালতের রায়টি টিকবে না। খালেদা জিয়াসহ অন্যরা উচ্চ আদালতে এই মামলায় খালাস পাবেন। কারণ এই মামলায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) যিনি তদন্ত কর্মকর্তা, তিনি বিএনপির আমলে দুর্নীতির দায়ে সাময়িক বরখাস্ত হয়েছিলেন। সেই ক্ষোভ থেকেই তিনি মামলাটির অভিযোগপত্রে খালেদা জিয়াসহ অন্যদের বিরুদ্ধে একটি ভিত্তিহীন চার্জশিট দিয়েছেন। সেই চার্জশিটের ওপর ভিত্তি করে রায় দিয়েছেন আদালত। আদালত তাঁর রায়ের পর্যবেক্ষণে তেমন কিছু বলতে পারেননি। পর্যবেক্ষণে শুধু এটুকু বলেছেন, খালেদা জিয়ার সামাজিক মর্যাদা ও বয়স বিবেচনায় পাঁচ বছর কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হলো। এ ছাড়া এই মামলায় যিনি প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন, তিনি বলেছেন জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামে খালেদা জিয়া কোনো অর্থ আত্মসাৎ করেননি। এই অভিযোগ ভিত্তিহীন। কিন্তু প্রথম তদন্ত কর্মকর্তার তদন্ত উপেক্ষা করে আবার দ্বিতীয় তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে।

এই মামলায় দণ্ডবিধির ৪০৯ ও দুদক আইনের ৫(২) ধারায় বিচার পরিচালিত হয়েছে। দণ্ডবিধির ৪০৯-এ বলা আছে, ‘যে ব্যক্তি তাহার সরকারি কর্মচারীজনিত ক্ষমতার বা একজন ব্যাংকার, বণিক, আড়তদার, দালাল, অ্যাটর্নি বা প্রতিভূ হিসাবে তাহার ব্যবসায় ব্যাপদেশে যে কোন প্রকারে কোন সম্পত্তি বা কোন সম্পত্তির উপর আধিপত্যের ভারপ্রাপ্ত হইয়া সম্পত্তি সম্পর্কে অপরাধমূলক বিশ্বাস ভঙ্গ করেন, সেই ব্যক্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে বা ১০ বৎসর পর্যন্ত কারাদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন এবং তদুপরি অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।’ দুদক আইনের ৫(২) ধারা অনুযায়ী, ‘কোন সরকারি কর্মচারী অপরাধমূলক অসদাচরণ করিলে বা করার উদ্যোগ গ্রহণ করিলে তিনি সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের যোগ্য হইবেন।’ আদালতে উপস্থাপিত দুদকের নথিপত্র কোথাও এসব অপরাধের প্রমাণ করতে পারেনি। সরকার যেসব নথি উপস্থাপন করেছে, সেগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। সম্পূর্ণ রাজনৈতিকভাবে খালেদা জিয়া তথা বিএনপিকে কোণঠাসা করার জন্য এই রায় এসেছে।

এই রায়ের পেছনে বড় ধরনের পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র রয়েছে। ষড়যন্ত্র যত বড়ই হোক, তা টিকবে না। কারণ বাংলাদেশের মানুষ খালেদা জিয়ার সঙ্গে রয়েছে। এ ছাড়া আমরা উচ্চ আদালতে এই রায়ের বিরুদ্ধে যথাযথ প্রতিকার পাব। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আরো ১৪টি মামলা বকশীবাজারে অবস্থিত বিশেষ জজ আদালতে স্থানান্তর করা হয়েছে। নাইকো দুর্নীতি মামলা, গ্যাটকো দুর্নীতি মামলা, বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি দুর্নীতি মামলা, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা, বাসে অগ্নিসংযোগে যাত্রী নিহতের ঘটনায় কুমিল্লায় দায়ের করা দুই মামলাসহ মোট ১৪টি মামলার কার্যক্রম চলছে। এখন রায় ঘোষণার দিক থেকে এগিয়ে আছে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা। আগামী ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি মামলাটির পরবর্তী শুনানি। এ মামলার অন্যতম আসামি জিয়াউল ইসলাম মুন্নার পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করা হয়েছে। খালেদা জিয়া ছাড়া এ মামলার অপর আসামিরা হলেন হারিছ চৌধুরী, জিয়াউল ইসলাম মুন্না (হারিছ চৌধুরীর একান্ত সচিব) ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকার একান্ত সচিব মনিরুল ইসলাম খান। দুদকের পক্ষে এ মামলায় মোট ৩২ জন সাক্ষী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন।

আজ আমাদের দলীয় অফিসে মাসের পর মাস আটকে রাখা হয়। সেই সময়ে বাইরের নানা ঘটনার জন্য খালেদা জিয়াকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। দলের নেতাকর্মীদের দিয়ে জেলগুলো ভরে ফেলা হয়েছে। হাজার হাজার মামলা দায়ের করা হয়েছে। যারা লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে মানুষ খুনের নির্দেশ দেয়, গানপাউডার ছিটিয়ে আগুন দিয়ে বাসযাত্রী পুড়িয়ে মারে, যারা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনের নামে ব্যাংকে আগুন, পেট্রল পাম্পে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে, রেললাইন তুলে দিয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দর বন্ধ করেছে, দেশজুড়ে তাণ্ডব চালিয়েছে—তারাই আজ বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা করছে। আমরা সন্ত্রাসে বিশ্বাস করি না। সারা দেশে প্রকাশ্যে সন্ত্রাস করছে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয় না। তাদের কোনো বিচার হয় না।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায়ের মাধ্যমে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হলো, তা ভবিষ্যতের জন্য ভালো কোনো নজির স্থাপন করল না। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, উচ্চ আদালতে নিম্ন আদালতের এই রায় টিকবে না। খালেদা জিয়াসহ অন্যরা খালাস পাবেন।

 লেখক : সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি



মন্তব্য