kalerkantho


স্মরণ

স্মৃতিতে অম্লান ফারুক চৌধুরী

এ কে এম আতিকুর রহমান

১৯ মে, ২০১৭ ০০:০০



স্মৃতিতে অম্লান ফারুক চৌধুরী

কয়েক দিন ধরেই ফারুক আহমেদ চৌধুরীর অসুস্থতার খবর পাচ্ছি ই-মেইলে আমাদের অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতদের অ্যাসোসিয়েশনের বদান্যতায়। তিনি স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

আমাদের সবাইকে তাঁর আশু রোগমুক্তির জন্য প্রার্থনা করতে অনুরোধ করা হয়েছে। আইসিইউতে দর্শনার্থী ঢোকার অনুমতি না থাকায় হাসপাতালে দেখতে যাওয়া হয়নি। তবে তাঁকে দেখার সুযোগ হলো আজ দুপুরে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মসজিদে তাঁর জানাজার পর। সকালেই মেইলে খবর পেয়েছিলাম ফারুক চৌধুরী আর নেই। রাত সাড়ে ৪টায় হাসপাতালেই তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন।   

ফারুক চৌধুরী আমার অনেক সিনিয়র ছিলেন। আমার প্রায় ৩০ বছর আগে তিনি ফরেন সার্ভিসে যোগ দেন। কর্মক্ষেত্রে বা চাকরিজীবনে কখনো তাঁর সাহচর্যে যাওয়ার সুযোগ ঘটেনি। তবে তাঁর অবসরের পর লেখালেখির সূত্র ধরে অনেকটাই কাছাকাছি গিয়েছিলাম।

তাঁর কূটনৈতিক জীবনের সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতার অনেক গল্প বা কাহিনি শোনার সুযোগ পেয়েছিলাম। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু আর নবীন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নিয়ে অনেক ঘটনারই প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন তিনি। সেসব কথা লেখার মানসিকতা বা সময় কোনোটাই এখন নেই বলে ভবিষ্যতের জন্য রেখে দিলাম।

২০০৮ সালের মে মাস। আমি তখন ভুটানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত। ফারুক স্যার আমাকে টেলিফোন করে জানালেন তিনি আর ভাবি ভুটানে বেড়াতে আসতে চাচ্ছেন। শীতের প্রকোপ অনেকটাই কমে সহনশীলতার মধ্যে এসে গেছে। তবু হালকা গরম কাপড় নিয়ে আসতে বললাম। পরের সপ্তাহেই তাঁরা চলে এলেন। আমি পারো এয়ারপোর্ট থেকে তাঁদের বাসায় নিয়ে এলাম। আমার সহধর্মিণী তাঁদের থাকার ঘরটা সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছিলেন। থিম্পুতে তাঁরা এক সপ্তাহ ছিলেন একান্তই নিজেদের বাসার মতো। ভাবি আমাকে দেবর বলতেন আর আমার স্ত্রীকে ছোট বোন হিসেবে নাম ধরে ডাকতেন।    

একদিন আমাকে বললেন যে তিনি ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে চান। পরের দিনই আমি সাক্ষাতের ব্যবস্থা করতে পেরেছিলাম বলে তিনি কী যে খুশি হয়েছিলেন। সেই সাক্ষাতে আমি তাঁর সঙ্গে গিয়েছিলাম। তিনি সঙ্গে করে তাঁর নোট বইটি নিতে কিন্তু ভোলেননি। দেশে ফিরেই তিনি ওই সাক্ষাৎকার নিয়ে পত্রিকায় একটি প্রতিবেদন লিখেছিলেন এবং যেদিন ছাপা হয়েছিল আমাকে টেলিফোনে জানিয়েছিলেন। আমি ওটি পড়ার পর আমার মন্তব্য তাঁকে জানালে তিনি খুব খুশি হন।

ভাবির কেনাকাটার খুব শখ। থিম্পুর অদূরে প্রায় ১২ হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত দোচুলা নামক পর্যটন স্থানে একটি স্যুভেনিরের দোকান আছে। একদিন ওখানে গেলে ভাবি ওই দোকান থেকে রুপার তৈরি কয়েকটি জিনিস কিনলেন। দাম মোটামুটি কম ছিল না। আমরাও একটি কিনেছিলাম। মাসখানেক পর দেখা গেল ওই রুপা ভালো মানের নয়। আমাদের জিনিসটি আমরা ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু বিষয়টি তাঁদের জানাইনি, পাছে তাঁরা কষ্ট পান। আসলে এত শখ করে কিনেছেন, তাই তাঁদের বিশ্বাসে আঘাত দিতে চাইনি।

স্যারদের নিয়ে ভুটানের শীতকালীন রাজধানী পুনাখা দেখতে গিয়েছিলাম। থিম্পু থেকে দুই ঘণ্টার পথ। দুটি নদীর সংগমস্থলে অবস্থিত কারুকার্যময় পুনাখা জং ঘুরেফিরে দেখলাম। ভুটানের ইতিহাসে পুনাখা জং বিখ্যাত হয়ে আছে ১৯৪৯ সালে ভারত ও ভুটানের মধ্যে ‘পুনাখা চুক্তি’ নামে ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কারণে।

একদিন ভোরে উঠে দেখি স্যার বাগানে পায়চারি করছেন। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম ঘুম ঠিকমতো হয়েছিল কি না। তিনি বললেন যে ঘুমের কারণে নয়, ভোরে টেলিফোন করার সুবিধার জন্যই তাড়াতাড়ি উঠেছেন। তাঁর ছোট ভাই ড. ইফতেখার চৌধুরী তখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা। আমাকে ভুটান থেকে ভালো একটি দেশে বদলির অনুরোধ করার জন্যই তিনি ছোট ভাইকে টেলিফোন করছিলেন। আমি অবাক হয়ে গেলাম। আমি কিন্তু কোনো সময়ই তাঁকে অনুরোধ করিনি। তিনি নিজেই হয়তো বুঝেছিলেন এবং ওই কাজটি করেছিলেন। অবশ্য আমার কোথাও যাওয়া হয়নি ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার আগে।

বয়োবৃদ্ধ মানুষ বলে আমার স্ত্রী তাঁর বেশ যত্ন নিতেন। ঠাণ্ডার দেশ, তাই গরম পানি ছাড়াও যখন-তখন চা-কফি বানিয়ে দিতেন। আমরা একসঙ্গে দুপুরের খাবার খেতাম। আমি অফিসে চলে গেলেও তাঁরা আমার স্ত্রীকে নিয়ে আশপাশে ঘুরতে চলে যেতেন। সন্ধ্যার পর আমরা গল্পের ঝুরি নিয়ে বসতাম, চলত রাতের খাবার অবধি। তাঁরা যেদিন দেশে ফিরে গেলেন সেদিন আমাদের খুব কষ্ট হয়েছিল। মনে হয়েছিল, কত আপন মানুষ যেন চলে গেলেন।

তিনি পররাষ্ট্রসচিব ছিলেন, একজন সফল কূটনীতিক ছিলেন। কিন্তু সব কিছু ছাড়িয়ে তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত অমায়িক ও বড় হৃদয়ের মানুষ। ছোটদের যেমন স্নেহ করতেন, তেমনি তাদের বিপদাপদে ঝাঁপিয়ে পড়তেন, উপকার করতে চেষ্টা করতেন। তিনি কখনো কারো ক্ষতি করেছেন কি না আমার জানা নেই। পরোপকারী এই মানুষটি ছিলেন বিশাল সাগরের মতো।  

ফারুক চৌধুরী চিরদিন আমাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন। মহান আল্লাহর কাছে তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।  

 

লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব


মন্তব্য