kalerkantho



১১৮ রানের জুটি

মাহমুদ উল্লাহর সেঞ্চুরি এবং ইকারুসের ডানা

নোমান মোহাম্মদ   

১৫ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



মাহমুদ উল্লাহর সেঞ্চুরি এবং ইকারুসের ডানা

ছবি : মীর ফরিদ

পিতা-পুত্র বন্দি নিজেদেরই গড়া গোলকধাঁধায়। সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে অদ্ভুত এক হিংস্র দানব। চারদিকে সমুদ্র। সেখানে অতন্দ্র পাহারা রাজার প্রহরীদের। কিভাবে ওই দ্বীপ থেকে পালাবেন তাঁরা! দক্ষ কারিগর বাবা ডেডেলাস তাই তৈরি করেন ডানা; পালক ও মোম দিয়ে। তবে আকাশে ওড়ার সময় পুত্র ইকারুসকে সতর্ক করে বলেন, ‘বেশি নিচ দিয়ে উড়ো না; পানিতে ভিজে ডানা ভারী হয়ে যাবে। আবার বেশি ওপরেও উড়ো না, সূর্যের তাপে মোম গলে খসে পড়বে তা।’ কিন্তু অল্পবয়সী পুত্র আকাশে ওড়ার আনন্দে ভুলে যায় বাবার উপদেশ। বেশি ওপরে উড়তে গিয়ে সূর্যতাপে গলে যায় মোম। ডানাভাঙা পাখির মতো আকাশ থেকে নিচে পড়ে মৃত্যু ইকারুসের।

বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেট তো আর এই গ্রিক পুরাণের গল্প না। ব্যাটসম্যানদের সুযোগ থাকে মাটি থেকে আকাশে ওড়ার; আকাশ ফুঁড়ে মহাকাশে যাওয়ার। ৫০, ১০০, ১৫০, ২০০... এমনকি ৩০০-৪০০ রান পর্যন্ত তো মানবসাধ্যের সীমা বলে প্রমাণিত। বাংলাদেশের ক্রিকেটাররাও দুই শ পর্যন্ত পৌঁছার উদাহরণ তৈরি করেছেন, যার সর্বশেষ আঁক চলতি টেস্টে মুশফিকুর রহিম। কিন্তু ব্যতিক্রমকে ব্র্যাকেটবন্দি করলে সাদা পোশাকে লাল-সবুজের ব্যাটসম্যানদের ব্যাটে বেশির ভাগ সময় যেন ভর করে ‘ইকারুসের ডানা’। স্বাচ্ছন্দ্য বা কায়ক্লেশে অর্ধশতক পর্যন্ত না হয় গেলেন, কিন্তু শতকের সীমায় পৌঁছতে বিস্তর হ্যাপা। যতবার পারেন, পারেন না তার চেয়ে বেশি।

এই যে মাহমুদ উল্লাহ কাল দ্বিতীয় টেস্ট সেঞ্চুরি করলেন, আরো ১৫ বার তো ফিফটি পেরিয়েও তা পারেননি!

অথচ ক্যারিয়ারের পঞ্চম টেস্টের নবম ইনিংসেই পেয়েছিলেন সেঞ্চুরির দেখা। সেটিও ব্যাটিং অর্ডারের আট নম্বরে নেমে; ২০১০ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে হ্যামিল্টনে। আরেক সেঞ্চুরির জন্য মাহমুদের ৩৬ টেস্টের ৬৮ ইনিংস অপেক্ষার অবসান ঘটল কাল জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। ‘আট বছর আগের একদিন’-এর স্মৃতিচারণ যে করতে হবে সেঞ্চুরির সেই আশ্চর্য অনুভূতির জন্য—তা নিশ্চয়ই ভাবেননি তখন। মাঝে ১৩ ইনিংসে পঞ্চাশ পেরিয়েও সেগুলো রূপান্তর করতে পারেননি এক শতে। আর প্রথম সেঞ্চুরির আগের দুইবার ধরলে সংখ্যাটি ১৫। অর্থাৎ টেস্টে ১৭টি পঞ্চাশ পেরোনো ইনিংসের মধ্যে মাত্র দুই সেঞ্চুরি হওয়ায় মাহমুদের রূপান্তর হার ১১.৭৬%। কালকের ইনিংসের আগে তা ছিল ৬.২৫%।

তাঁর ব্যাটিং সামর্থ্যের প্রতি নিশ্চিতভাবেই ব্যঙ্গ করে এ পরিসংখ্যান।

মাহমুদের নাম তবু ‘মিস্টার ফিফটি’ হয়নি; যেমনটা হয়েছিল হাবিবুল বাশারের। বাংলাদেশের টেস্ট জমানার প্রথমভাগের ব্যাটিং ভরসার ২৭ পঞ্চাশ পেরোনো ইনিংসের মধ্যে সেঞ্চুরি মোটে তিনটি। রূপান্তর হার ১১.১১%। এ যুগে খেললে এ শতাংশ আরো বাড়ত বলে বিশ্বাস সাবেক অধিনায়কের। আরো তিন-চারটি শতরান যোগ হতে পারত বলে মনে করেন হাবিবুল। কিন্তু এ যুগের ক্রিকেটাররাও কি তাঁর ‘রোগ’ থেকে পুরোপুরি মুক্ত? ফিফটি পেরোনোর পর সেঞ্চুরির সঙ্গে কানামাছি খেলা চলে তো আরো অনেকের!

একা মাহমুদ সে দোষে দুষ্ট নন কিছুতেই।

বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে সর্বোচ্চ টেস্ট সেঞ্চুরি তামিম ইকবালের। আটটি। পঞ্চাশ পেরোনো সর্বোচ্চসংখ্যক ইনিংসও তাঁর। ৩৩টি। অর্থাৎ ২৫ ইনিংসে ফিফটিকে সেঞ্চুরিতে বদলে দিতে পারেননি। ১৪.২৪ শতাংশের সেই রূপান্তর হার বাঁহাতি ওপেনারকে অস্বস্তিতে না ফেলে পারে না। ২৮ বার পঞ্চাশ পেরোনো সাকিব আল হাসানের বেলায় সে শতাংশ ১৭.৮৫। ২৩ ফিফটির বিপরীতে মোটে পাঁচ পাঁচটি সেঞ্চুরি বলে। মুশফিকুর রহিমের ১৯ হাফ সেঞ্চুরি ও ছয় সেঞ্চুরি। রূপান্তর হার ২৪%। ১০-এর বেশি পঞ্চাশ পেরোনো ইনিংসে বাংলাদেশের বাকি দুজন মমিনুল হক ও মোহাম্মদ আশরাফুলের বরং এ ক্ষেত্রে তৃপ্তি বেশি। প্রথমজনের অমন ১৯ ইনিংসে সাত সেঞ্চুরি, রূপান্তর হার ৩৬.৮৪%। পরেরজনের ১৪ ইনিংসে ছয় শতক; রূপান্তর হার ৪২.৮৫%। এ জায়গাটি বিস্ময়কর রকম ভালো ইমরুল কায়েসের। টেস্টে যে সাতবার পঞ্চাশ পেরোন, তার মধ্যেই তাঁর তিন সেঞ্চুরি। রূপান্তর হার আশরাফুলের ঠিক সমান।

বাংলাদেশের বাকি সেঞ্চুরিয়ানদের মধ্যে জাভেদ ওমর বেলিমের পঞ্চাশ পেরোনো ৯ ইনিংসের এক শতক (১১.১১%)। শাহরিয়ার নাফীস ও জুনায়েদ সিদ্দিকী আট ইনিংসের মধ্যে একটি (১২.৫%) করে; নাসির হোসেনের সাত ইনিংসের মধ্যে একটি (১৪.২৮%)। একটি করে টেস্ট সেঞ্চুরি পাওয়া মোহাম্মদ রফিক (২০%) ও খালেদ মাসুদের (২৫%) রূপান্তর হার তাঁদের ব্যাটিং সামর্থ্যের তুলনায় যথেষ্ট ভালো। তিনটি পঞ্চাশ পেরোনো ইনিংসে এক সেঞ্চুরি পাওয়া আমিনুল ইসলাম ও নাফীস ইকবালের শতকরা হার ৩৩.৩৩। দুয়ের মধ্যে এক শতকে নাঈম ইসলামের তা ৫০%।

সেঞ্চুরিয়ানদের মধ্যে রইলেন বাকি যে তিন, তাঁদের পঞ্চাশকে সেঞ্চুরিতে রূপান্তরের হার চোখ কপালে তুলে দেওয়ার মতো। ১০০%! সোহাগ গাজী, শামসুর রহমান ও আবুল হাসান তো যে তিনবার পঞ্চাশ পেরোন, কোনোবার থামেননি সেঞ্চুরির আগে! ‘ইকারুসের ডানা’ তাঁদের ব্যাটে ভর করেনি কখনো।

আর সবচেয়ে বেশি? মাহমুদ কাল নিজেকে ওপরে তুলে এনেছেন কিছুটা; তাঁর পাশাপাশি হাবিবুল-তামিম-সাকিব-মুশফিক সবারই আফসোস থাকতে পারে। কিন্তু কারোটাই হয়তো রাজিন সালেহর চেয়ে বেশি না। বাংলাদেশের হয়ে টেস্টে সবচেয়ে বেশিবার পঞ্চাশ পেরিয়ে শতক করতে না পারা দুর্ভাগা যে তিনি! সাত ফিফটির বিপরীতেও নেই সেঞ্চুরি। ২৪ টেস্টের ৪৬ ইনিংসের মধ্যে সর্বোচ্চ ২০০৫ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে চট্টগ্রামের ৮৯।

রাজিনের ব্যাটেই তাহলে ‘ইকারুসের ডানা’ ভর করত সবচেয়ে বেশি!

 

 



মন্তব্য