kalerkantho


‘আমাদের ইলাস্টিক ম্যান’

৯ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



ঠিক বিশ্বাসযোগ্য নয় তবু হাবিবুল বাশারের দাবি, ঘটনা শতভাগ সত্যি। বিদেশ সফরে কেনাকাটায় পোশাকের দোকানের ‘মেল’ সেকশনে নাকি কখনোই ঢুঁ মারতেন না রাজিন সালেহ! সোজা গিয়ে ঢুকে পড়তেন ‘বয়েজ’ সেকশনে। তাঁর ছোটখাটো শরীরের মাপে পোশাক যে পাওয়া যায় ওখানেই!

তা নিয়ে প্রায়ই সতীর্থদের খুনসুটির শিকার রাজিনকে শারীরিক গড়নে দীর্ঘকায়দের সঙ্গে টক্কর দিতে দেখারও অজস্র স্মৃতি হাবিবুলের। তারই একটি মনে করে বাংলাদেশ দলের সাবেক অধিনায়ক হেসেই খুন। কক্সবাজারে গতকাল ক্রিকেট ক্যারিয়ারের শেষ ইনিংসে ৮৭ রানে আউট হওয়ার পর সতীর্থ-প্রতিপক্ষ নির্বিশেষে সবাই যখন বিদায়মাল্যে শোভিত করছে রাজিনকে, তখন ঢাকায় তাঁর একসময়ের অধিনায়ক খুললেন স্মৃতির অ্যালবাম। যেখানে ধরা আছে রাজিনের সীমাবদ্ধতা জয়ের আপ্রাণ চেষ্টার বিস্ময়কর অনেক গল্পও। মাঠের ভেতরে এবং মাঠের বাইরেও।

মাঠের বাইরের একটি গল্প এখনো বিস্ময় হয়ে আছে হাবিবুলের কাছে, ‘‘২০০৭ বিশ্বকাপের পরের ঘটনা। মজা করে নিজেদের মধ্যে মারামারির আয়োজন আমাদের। তো সেখানে রাজিন লাগতে গেল কিনা মাশরাফির সঙ্গে! আমরা ওকে জিজ্ঞেসও করলাম, ‘তুই কিভাবে মাশরাফির সঙ্গে মারামারি করতে গেলি? তুই তো ওর অর্ধেক!’ চরিত্রের দিক থেকে এ রকমই দৃঢ় ছিল সে। যার প্রমাণ আমরা ক্রিকেট মাঠেও পেয়েছি বহুবার।’’ নন-স্ট্রাইকার প্রান্তে দাঁড়িয়ে হাবিবুল এর প্রমাণ পেয়েছিলেন রাজিনের অভিষেক টেস্টেই।

করাচিতে তিন ম্যাচ সিরিজের প্রথম টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে চতুর্থ উইকেটে এই দুজনের ১১১ রানের পার্টনারশিপ। ওই টেস্টে সেঞ্চুরি করা হাবিবুলের বিদায়ের পরও দলকে লড়াইয়ে রাখতে প্রাণপণ লড়েছিলেন রাজিন। শোয়েব আখতার, উমর গুল ও শাব্বির আহমেদ—সেই সময়ের আগ্রাসী পেসত্রয়ীর শরীর ধেয়ে আসা ডেলিভারি সামলাতে সামলাতে উইকেটে পার করে দিয়েছিলেন প্রায় পাঁচ ঘণ্টা। ২৩৫ বলে খেলা ৬০ রানের সেই প্রতিরোধ গড়া ইনিংসের কথা অনেকে ভুলে গেলেও হাবিবুল ভোলেন কী করে? সেখানেই যে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল একজন পরিপূর্ণ টেস্ট উপযোগী ব্যাটসম্যানকে, ‘‘২০০৩ সালে পাকিস্তানে টেস্ট খেলতে গিয়েছিলাম আমরা। ওখানে সে ‘ইলাস্টিক ম্যান’ উপাধি পেয়েছিল। বল ছাড়া থেকে শুরু করে ওর ব্যাটিংয়ের অনেক কিছুই ছিল দেখার মতো।’’

স্থিতিস্থাপক ইলাস্টিকের মতোই হওয়ার কথা ছিল তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারও। কিন্তু তা না হয়ে থেমে যান ২০০৮ সালে। ওই বছরই নিজের সবশেষ টেস্ট খেলা রাজিন পুরোপুরি ক্রিকেটকে বিদায় বললেন এর ১০ বছর পর। এর মাঝেও নিবেদনের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন বলেই রাজিনের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার আরো দীর্ঘ না হওয়ার আফসোস লুকিয়েও হাবিবুল বলতে পারলেন অনেক কিছুই, ‘কঠোর পরিশ্রমী ক্রিকেটার। যে পরের দিকে নিজের ব্যাটিংয়ের ধরনও বদলেছিল। অনেক সময় নিয়ে ব্যাটিং করত। ও কিন্তু মারতেও পারত ভালো। ওর টেস্ট রেকর্ড আরেকটু ভালো হওয়া উচিত ছিল। আমার মতে ও যে ধরনের ব্যাটসম্যান, যে ধরনের খেলোয়াড়, আরো অনেক দূর যেতে পারত। অনেক কষ্ট করত। এখনকার ক্রিকেটার হলে নিশ্চিতভাবেই সে আরো অনেক দূর যেত। ও অবশ্যই ক্রিকেটের এমন এক চরিত্র, যাকে অনুসরণ করা যায়। একজন ক্রিকেটারের জীবন কেমন হওয়া উচিত, ও তার উদাহরণ।’

সময়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা ব্যাপারগুলোতেও সেই আদিকাল থেকেই অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠতে পেরেছিলেন সিলেটের এই ক্রিকেটার। হাবিবুল বলতে বাদ রাখলেন না তাও, ‘রাজিন যখন প্রথম আসল, তখন ফিটনেস আমাদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। এমনকি ফিল্ডিংও আমাদের অগ্রাধিকার তালিকায় ছিল না। ব্যাটিং-বোলিংই ছিল আমাদের কাছে সব। এই জায়গাতেই রাজিন ছিল ব্যতিক্রম। যে আমলে এসব খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, রাজিন সেই সময়ও

সবার জন্য ছিল উদাহরণ।’ রাজিন তাই বাংলাদেশে ছিলেন সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা ক্রিকেটারই। এখনো তাই। সাম্প্রতিক ব্যর্থতায় বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের নিয়ে যখন প্রশ্ন, তখন সেই ২০০৩-র রাজিনের কাছ থেকেও নেওয়া যেতে পারে টেস্ট উপযোগী ব্যাটিংয়ের শিক্ষা।

১৫ বছর আগে থেকেই তো তিনি ‘আমাদের ইলাস্টিক ম্যান’

 



মন্তব্য