kalerkantho


জিততে হয়েছে অন্য লড়াইও

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



জিততে হয়েছে অন্য লড়াইও

অধিনায়ক যখন, তখন তিনি হাল ছাড়লেই পুরো দলের ওপর সেটি ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ থাকে। সেই সুযোগ রাখতে চাননি বলেই প্রাণপণে নিজের সঙ্গে লড়ে যাওয়া মাশরাফি তবু আগের রাতের কষ্টকর অভিজ্ঞতা ভুলে যাননি, ‘মনে হচ্ছিল, শরীরের ভেতর মুরগি ঠোকর মারছে।’

ম্যাচের পর হোটেলে ফিরে কাপড় বদলাতে গিয়েই নিজের ঊরুতে চোখ আটকে যায় তাঁর। বিশাল জায়গাজুড়ে যে রীতিমতো কালশিটে পড়ে গেছে! মোবাইলে তুলে রাখা সেই ছবিই কাল দেখাচ্ছিলেন মাশরাফি বিন মর্তুজা। মরুর উত্তপ্ত উনুনে চার দিনের মধ্যে তিন-তিনটি ম্যাচ খেলার ধকল বোঝানোর পক্ষে ওই একটি ছবিই যথেষ্ট।

এরই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় তিনি নিজেও আফগানিস্তান ম্যাচে ঠিক সেরা ছন্দে ছিলেন না। শরীরী ভাষাতেই কখনো কখনো ফুটে উঠছিল তা। কিন্তু অধিনায়ক যখন, তখন তিনি হাল ছাড়লেই পুরো দলের ওপর সেটি ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ থাকে। সেই সুযোগ রাখতে চাননি বলেই প্রাণপণে নিজের সঙ্গে লড়ে যাওয়া মাশরাফি তবু আগের রাতের কষ্টকর অভিজ্ঞতা ভুলে যাননি, ‘মনে হচ্ছিল, শরীরের ভেতর মুরগি ঠোকর মারছে।’

সেই ঠোকর খেতে খেতেই নিজে বোলিং করেছেন, শেষ পর্যন্ত করিয়ে ছেড়েছেন মুস্তাফিজুর রহমানকে দিয়েও। নিজের ক্যারিয়ারের শুরুর দিকেও এমন অভিজ্ঞতা আছে মাশরাফির। ২০০১ সালের ডিসেম্বরে নিউজিল্যান্ড সফরে গিয়ে ওয়েলিংটন টেস্টে পাঁজরের চোটে বোলিং চালিয়ে যেতে অনীহা প্রকাশ করেছিলেন তিনিও। কিন্তু তখনকার অধিনায়ক খালেদ মাসুদ অন্যদের ওপর ঠিক ভরসা করে উঠতে পারছিলেন না। তাই নিজের দলের সেরা ফাস্ট বোলারকে বলেছিলেন বোলিং করেই যেতে হবে।

হ্যামিল্টনে এর আগের টেস্টে নিউজিল্যান্ডের একমাত্র ইনিংসে ২৭ ওভার বোলিং করেছিলেন। ওয়েলিংটনে পরের টেস্টে প্রতিপক্ষের একমাত্র ইনিংসে চোট নিয়েই করেছিলেন ১৬ ওভার। কী আশ্চর্যের ব্যাপার! ১৭ বছর পর পুরোপুরি ভিন্ন কন্ডিশনে ঠিক একই রকম আবদার নিয়ে তাঁর কাছে হাজির দলের সেরা বোলার মুস্তাফিজ। কাফ মাসলের টানে নিজের দ্বিতীয় স্পেলের তৃতীয় ওভার করার পর থেকেই ‘কাটার মাস্টার’ বলে যেতে থাকেন যে ‘আর পারছি না।’

একজন বাড়তি স্পিনার খেলানোয় রুবেল হোসেন ছিলেন একাদশের বাইরে। কাজেই ওই সময় অন্য কাউকে এনে বোলিং করানোর সুযোগও তো ছিল না। ওই অবস্থায় মুস্তাফিজের কথায় অধিনায়কের অনুভূতি কেমন হয়েছিল, সেটি না বললেও চলছে। মাশরাফি অবশ্য বললেন ভিন্ন কথা, ‘অনুভূতি-টনুভূতির কোনো ব্যাপার ছিল না। বোলিং করতে হবে, এটাই ছিল শেষ কথা। কারণ রুবেলও ছিল না। মুস্তাফিজকে দিয়ে আমার বোলিং করাতেই হতো।’

আবার বোলিং করানোর আগে বিশ্রাম নিয়ে একটু চাঙ্গা হওয়ার সুযোগও অবশ্য মাশরাফি দিয়েছেন এই বাঁহাতি পেসারকে। মুস্তাফিজ নিজেও কাল এসে বলে গেলেন সে কথা, ‘‘ভাই আমাকে একটি কথাই বলেছিলেন যে, ‘তোর বোলিং করা লাগবেই।’ মাঝখানে ৩ ওভার বোলিংয়ের সময় ভাইকে বলেছি যে পায়ে লাগছে। ভাই তখন বলেছেন যে ‘তুই বিশ্রাম নে। শেষে করবি আবার।’ আমি বলেছি যে ভাই ঠিক আছে, যেভাবে পারি করব।”

শেষে সেটি করেছেনও। কিন্তু এর আগে মুস্তাফিজকে কিছুটা সুস্থির হতে দেওয়ায় বাকি ছিলেন কেবল একজন পেসারই। ওদিকে আবার ডেথ ওভারের বোলিংয়ে সমস্যা হচ্ছিল সাকিব আল হাসানেরও। রাতে কিছুটা শিশির পড়ছিল আবুধাবিতে।  যে কারণে প্রায় সব বোলারেরই সমস্যা হচ্ছিল বল গ্রিপ করতে। এ জন্যই বারবার তাঁদের উইকেটের বালুতে হাত ঘষতে দেখা গেছে। কিন্তু এর পরও সমস্যা হচ্ছিল। সব মিলিয়ে ভীষণ প্রতিকূল পরিস্থিতি তখন। এর মধ্যে তাই অধিনায়ককেই চলে আসতে হয় বোলিংয়ে।

মুস্তাফিজকে বিশ্রাম দেওয়ার পর ৪০তম ওভারে যখন বোলিংয়ে আসেন, তখন মাশরাফির নিজের অবস্থাও সুবিধার নয়। গরমে পুড়ে, ঘামে ভিজে এমনই অবস্থা যে ম্যাচ জেতার আগে নিজেকে ধরে রাখার চ্যালেঞ্জও জিততে হয়েছে মাশরাফিকে, ‘আমারও শরীর ছেড়ে দিচ্ছিল। কিন্তু ভেবে দেখলাম, আমি ছেড়ে দিলে তো ওরা আরো ছেড়ে দেবে। তাই নিজেকে ঠিক রাখার চেষ্টা করলাম। মুস্তাফিজ ঠিক থাকলে হয়তো ওই সময় (৪০, ৪২ ও ৪৪তম ওভার) আমাকে বোলিংই করতে হয় না।’

ম্যাচের আগের সেই অন্য লড়াইয়ে অধিনায়কও জিতেছেন ভালোভাবেই। কারণ এর আগে কিছুটা ম্লান মাশরাফি জ্বলে উঠলেন ওই ৩ ওভারেই। হাসমতউল্লাহ শহীদি ও প্রতিপক্ষ অধিনায়ক আসগর আফগান মিলে ততক্ষণে ৭৮ রানের তৃতীয় উইকেট পার্টনারশিপে জয়ের রাস্তায় তুলে দিয়েছেন দলকে। উইকেট ফেলতে না পারার সেই হতাশার মধ্যেই আলোর রেখা ফোটান অধিনায়ক। ওই স্পেলের প্রথম ওভারেই আসগরকে ফেরান, এরপর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম বাংলাদেশি বোলার হিসেবে ২৫০ উইকেটের মাইলফলকেও পৌঁছান দুই ওভার পর শহীদিকেও তুলে নিয়ে।

অধিনায়ক চোখের সামনে এমন উদাহরণ রাখার পর অন্যরাও উজ্জীবিত হতে বাধ্য। মুস্তাফিজও তাই শারীরিকভাবে ভালো অবস্থায় না থেকেও বোলিংয়ে ফেরেন। সে জন্য নিজের বোলিংয়ের চেনা ধরনের সঙ্গে সমঝোতাও করেছেন কিছুটা, ‘রান আপে বেশি জোরে দৌড়ালে আমার পায়ে টান লাগছিল। আমি এ জন্য এমনভাবে দৌড়ালাম যেন পায়ে না লাগে। ওভাবেই বোলিং করেছি।’

ওই বোলিংয়েই জয়। তার আগে অন্য লড়াইয়েও জিততে হয়েছে মাশরাফি-মুস্তাফিজদের। সেই লড়াইয়ে প্রতিপক্ষ ছিল নিজেদের শরীরই।



মন্তব্য