kalerkantho



মনও জয় করেছে বসুন্ধরা কিংস

শাহজাহান কবির, নীলফামারী থেকে ফিরে   

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



দেশের প্রত্যন্ত জেলা নীলফামারী আড়ালেই ছিল এত দিন। ফুটবল, বিশেষ করে বসুন্ধরা কিংস জাগাল তাদের। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জয়টাই উপহার দিয়েছে তারা নীলফামারীতে।

দেশের প্রত্যন্ত জেলা নীলফামারী আড়ালেই ছিল এত দিন। ফুটবল, বিশেষ করে বসুন্ধরা কিংস জাগাল তাদের। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জয়টাই উপহার দিয়েছে তারা নীলফামারীতে। মালদ্বীপের সবচেয়ে সফল ক্লাব নিউ রেডিয়েন্ট এসসিকে হারিয়েছে তারা ৪-১ গোলে।

যে রেডিয়েন্ট কিনা গত মে মাসেই ঢাকার মাঠে হারিয়ে গেছে জায়ান্ট আবাহনীকে, নিজেদের মাঠে বিধ্বস্ত করেছে ৫-১ গোলে। নীলফামারীর শেখ কামাল স্টেডিয়ামে তাদের স্রেফ উড়িয়ে দিয়ে দেশের ফুটবলেই নতুন বার্তা দিয়েছে কিংস। ইঙ্গিত ছিল অবশ্য আগেই। মাঠে নামার আগেই তো ফুটবলের সেই সোনালি অতীত ফিরিয়ে এনেছে তারা বিশ্বকাপে খেলা কোস্টারিকান ডেনিয়েল কলিনড্রেসকে দলে নিয়ে। নীলফামারীর সবুজ গালিচায় সেই কলিনড্রেসের পায়ে ফুল ফুটল। গোল করেননি, সেটা তাঁর মূল দায়িত্বও নয়, জোড়া অ্যাসিস্টেই বুঝিয়ে দিয়েছেন তাঁর সামর্থ্য। মাপা ক্রস, চোখ ধাঁধানো থ্রু পাস, অনায়াসে ড্রিবল করে বেরিয়ে যাওয়া—এসবই ছিল তাঁর খেলার ছন্দে। তবে কিংস তো শুধু কলিনড্রেসকে আনা চমকের কোনো নাম নয়। তারা মৌসুমে সব জিতে নেওয়ার লক্ষ্যে, এশিয়ান ফুটবলে নাম করতে প্রতিটি পজিশনে নিয়েছে সেরাদের। কলিনড্রেস ছাড়াও যে তিন বিদেশি তাঁদের মধ্যে হাইতিয়ান স্ট্রাইকার কেরভেন্স বেলফোর্ট দেখালেন কি দুর্দান্ত গতি তাঁর, কি বল কন্ট্রোল। আরেক স্ট্রাইকার গাম্বিয়ান উসমান জ্যালো নেমে বোঝালেন গোল ছাড়া আর কোনো কিছুই রোচে না তাঁর, পোস্টের সামনে এতটাই ভয়ংকর তিনি। ডিফেন্সে আফগান সাইঘানি মাসি তাঁর সুঠাম গড়ন নিয়ে নজর কেড়েছিলেন আগেই। মাঠে দেখালেন তাঁর দৃঢ়তা আর বল পায়ে আক্রমণে যোগ দেওয়ার দক্ষতা। সঙ্গে তরুণ ইব্রাহিম, তুখোর তৌহিদুল আলম, পরিশ্রমী ইমন বাবু, মাসুক মিয়া, নাসিরউদ্দিন চৌধুরীরা তো ছিলেনই। এই দলটির শক্তিমত্তার কাছেই স্রেফ উড়ে গেছে সাফ জেতা তিন খেলোয়াড় ও তিন বিদেশিকে নিয়ে গড়া রেডিয়েন্ট।

বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কার আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচের মতোই নীলফামারীতে কিংসের প্রথম এই ম্যাচেও দর্শকের ঢল নেমেছিল। কিংস প্রচারণারও কোনো কমতি রাখেনি। শহরের মোড়ে মোড়ে কলিনড্রেস, ইব্রাহিম, সবুজদের বিলবোর্ড উত্তরবঙ্গবাসীকে স্বাগত জানিয়েছে বিদেশি ক্লাবের বিপক্ষে এই ম্যাচটি উপভোগের জন্য। উদ্যমী সমর্থকরা মোটর শোভাযাত্রায় পুরো শহর ঘুরে এরপর মাঠে ঢুকেছে। শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে আগস্টে ভাঙা মনে যাঁরা বাড়ি ফিরেছিলেন কিংসের ডাকে আবারও মাঠে এসে তাঁরা হতাশ হননি, বরং গোছানো ফুটবলের স্বাদ উপভোগ করেছেন তারিয়ে তারিয়ে। গর্বিত বুকে দেখেছেন দেশের একটি ক্লাব কতটা সামর্থ্য নিয়ে বর্তমান সাফ চ্যাম্পিয়ন মালদ্বীপের সেরা দলটিকে এভাবে গুঁড়িয়ে দিতে পারে! ড্রাম, ভুভুজেলার শব্দ আর তীব্র উচ্ছ্বাসের মধ্যে খেলা শুরু হওয়ার পর পরতে পরতে সেই আনন্দ আর উচ্ছ্বাস শুধু বেড়েছেই। বেলফোর্ট তাঁর ড্রিবল, কন্ট্রোলিংয়ে গ্যালারি মাতাচ্ছিলেন শুরু থেকেই, বিশ্বকাপে খেলা কলিনড্রেসের পায়ে বল গেলেই আরেক দফা উল্লাস। এই কোস্টারিকান তাঁর সামর্থ্য ও পরিমিতি নিয়ে স্রেফ মুগ্ধতা ছড়াচ্ছিলেন। শুরুতেই পর পর কয়েকটি গোলের সুযোগ তৈরি করে ফেলে কিংস। প্রথমটায় তৌহিদুলের ক্রস ধরে বেলফোর্ট মেরেছেন পোস্টের পাশ দিয়ে, কলিনড্রেসের লং বল ধরে তাঁর পরের শটটা হয়েছে ব্লকড। তৃতীয় সুযোগেই এই হাইতিয়ান যে গোলটা করেছেন তার জন্য নিশ্চিত কলিনড্রেসকেই পুরো কৃতিত্ব দিয়েছেন। মাসির কাছ থেকে বল পেয়ে বাঁ-দিক দিয়ে ওপরে উঠে কলিনড্রেস যে ক্রসটা করেছেন তা গলফের ‘পারফেক্ট ড্রাইভের’ কথাই মনে করিয়ে দেবে। একটু বেশিও না আর একটু কমও না, বলে যতটা জোর দেওয়া দরকার ততটাই দিলেন, গোলরক্ষকের সামনে থেকেই ফ্লিকে সেই বল পোস্টে পাঠাতে কোনো সমস্যা হয়নি বেলফোর্টের। খেলার ১৮ মিনিটে এই গোল এবং তার আগে প্রতিপক্ষ বক্সের মধ্যে কিংসের খেলোয়াড়দের দাপিয়ে বেড়ানোই বুঝিয়ে দিয়েছিল ম্যাচে কী হতে যাচ্ছে। তা-ই হয়েছে শেষ পর্যন্ত। খেলার আধঘণ্টা বাকি থাকতেই স্কোরলাইন ৪-০। দ্বিতীয় গোলটা গত ঘরোয়া লিগে স্থানীয়দের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গোল করা তৌহিদুল আলমের। কিংসের অধিনায়কও তিনি। বেলফোর্টের ক্রসে তাঁর ডাইভিং হেড গত লিগে তাঁর টানা গোল করার ফর্মটাই মনে করিয়ে দিয়েছে। ৩২ মিনিটে পেনাল্টি পেয়েও ম্যাচে ফেরার সুযোগটা নষ্ট করেছেন রেডিয়েন্টের আলি ফাসির, যার মাসুল দিতে হয়েছে তাদের চড়া দামে। দ্বিতীয়ার্ধে বদলি নামা ওসমান জ্যালোকে দিয়েও গোল করিয়েছেন কলিনড্রেস চমৎকার এক ক্রসে। বাংলাদেশে প্রথম ম্যাচেই সতীর্থ খেলোয়াড়দের সঙ্গে তাঁর বোঝাপড়া ছিল চোখে পড়ার মতো। ইব্রাহিম, ইমনরাও তাঁর সঙ্গে খেলেছেন সংগতি রেখে। প্রস্তুতি ম্যাচ বলেই দ্বিতীয়ার্ধে বেশ কিছু বদল আনেন অস্কার ব্রুজন। তৌহিদুলের বদলি মাহবুবুর রহমান সুফিলও সুযোগ পেয়ে নাম তোলেন গোলের খাতায়। ইব্রাহিমের ক্রসে বল জালে পাঠান জাতীয় দলের এই স্ট্রাইকার। মিতুল হাসানের বদলি নামা গোলরক্ষক আনিসুর রহমানের ভুলে অবশ্য শেষ দিকে একটা গোল শোধ দিতে পেরেছে রেডিয়েন্ট। যাতে তাদের ঠিক সান্ত্বনাও হয়নি। বাংলাদেশের ফুটবলের নতুন শক্তি কিংসকে কুর্নিশ করেই মাঠ ছাড়তে হয়েছে মালদ্বীপের দলটিকে।



মন্তব্য