kalerkantho


টেস্টের ভাগ্যে অশনিসংকেত

২২ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



টেস্টের ভাগ্যে অশনিসংকেত

এটা খুব কষ্টের। খারাপ সময়ে আপনি সব সময় চাইবেন কেউ একজন পাশে থাকুক। আমরা টেস্টে খুব খারাপ খেলেছি। সমালোচনা হবেই। তাই বলে এমন অভিযোগ। তাহলে তো ধরে নিতে হবে আমরা যখন অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডকে টেস্টে হারিয়েছিলাম, তখন অনিচ্ছা থেকে খেলেছিলাম! সেসব তো খুব বেশিদিন আগের কথা নয়। তখন কেন কেউ এ কথা বলল না?

 

আপনি নাকি টেস্ট খেলতে চান না?

ঠোঁটের কোণে একচিলতে হাসি ধরে রেখে এদিক-ওদিক তাকালেন কিছুক্ষণ। প্রশ্নটা এড়ানোর জন্য একজনকে পেয়েও গেলেন সাকিব আল হাসান, ‘এই যে মাশরাফি ভাই, আপনি নাকি টেস্ট খেলতে চান না?’

বাংলাদেশের টেস্ট অধিনায়ককে যতটুকু চেনা যায় তাতে এই হাসি, প্রশ্নের পিঠে পাল্টা প্রশ্নের মানে একটাই—পুরো বিষয়টিতে আপত্তি রয়েছে তাঁর। ৪৮ ঘণ্টা আগে সিনিয়র ক্রিকেটারদের টেস্টবিরাগ নিয়ে বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসানের মন্তব্যের অনুমোদন মেলেনি ক্যারিবিয়ানের এ-দ্বীপ থেকে ও-দ্বীপে উড়ে বেড়ানো বাংলাদেশ দলকে। বিষয়টি নিয়ে বোর্ড সভাপতির সঙ্গে সাকিবের টেলিফোনে যোগাযোগও নাকি হয়েছে। তবে সেই কথোপকথনের ইতিবৃত্ত অজানা। বাংলাদেশ ক্রিকেটের যে ট্রেন্ড, তাতে আশা করা যায় কয়েক দিনের মধ্যে হয়তো সেসব জানা যাবে বোর্ড সূত্রেই!

এমনটাই তো হয়ে আসছে। দল ভালো করলে কখনো-সখনো অযৌক্তিক সব পুরস্কারের ঘোষণা এসেছে। আবার খারাপ খেললে হয়ে আসছে উল্টোটা। সিনিয়র ক্রিকেটাররা, সাকিবের নাম উল্লেখ করে টেস্ট খেলতে না চাওয়ার যে তথ্য মিডিয়ায় সরবরাহ করেছেন বোর্ড সভাপতি, সেটির প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় জ্যামাইকায় একজন ক্রিকেটার বলছিলেন, ‘খারাপ খেলেছি যখন, তখন কথা তো শুনতেই হবে। এতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি আমরা।’ যাঁরা সরাসরি বোর্ড সভাপতির মন্তব্যে ক্ষতিগ্রস্ত নন, তাঁরা হেসেই উড়িয়ে দিয়েছেন বিষয়টি। আগামী দুই মৌসুম বিদেশি কোনো লিগে খেলতে দেওয়া হবে না যাঁকে, সেই মুস্তাফিজুর রহমান জ্যামাইকা থেকে গানায়ার ফ্লাইটে বসে কী বলবেন, বুঝে উঠতে পারছেন না, ‘কী বলব ভাই। আমি এখনো কিছুই জানি না!’ আরেকজন সরাসরি ‘অভিযুক্ত’ নন, অথচ মনে হলো তাঁর মনেই সবচেয়ে বেশি দাগ কেটেছেন বোর্ড সভাপতি, ‘এটা খুব কষ্টের। খারাপ সময়ে আপনি সব সময় চাইবেন কেউ একজন পাশে থাকুক। আমরা টেস্টে খুব খারাপ খেলেছি। সমালোচনা হবেই। তাই বলে এমন অভিযোগ। তাহলে তো ধরে নিতে হবে আমরা যখন অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডকে টেস্টে হারিয়েছিলাম, তখন অনিচ্ছা থেকে খেলেছিলাম! সেসব তো খুব বেশিদিন আগের কথা নয়। তখন কেন কেউ এ কথা বলল না?’

যুক্তি আছে। সেই যুক্তি আরো সুতীব্র বোর্ডের শীর্ষমহলের চিন্তাভাবনার কারণেই। ক্রিকেটাঙ্গনে প্রায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে যে সাকিবের ঘাড়ে টেস্ট অধিনায়কত্ব একরকম চাপিয়েই দেওয়া হয়েছে বিশেষ একটি কারণে। যেন তিনি টেস্ট সিরিজ এলেই ছুটির বায়নাক্কা না করেন। বোর্ডের এমন ভাবনার সূত্রপাত ঘটে দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজ থেকে টেস্টের ১ নম্বর অলরাউন্ডার ছুটি নেওয়ায়। মজার ব্যাপার হলো, সেই ছুটি অনুমোদন দিয়েছিল বোর্ডই। আবার ওই ছুটি চাওয়ার ‘শাস্তি’ হিসেবেই সাকিবকে দেওয়া হয়েছে অধিনায়কত্ব, এ যেন ছেলেখেলা! সে সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে মুশফিকুর রহিমকে সরিয়ে, যাঁকে টেস্ট নিবেদিতপ্রাণ মনে করে পুরো দল। ‘টেস্ট আমরা সবাই-ই খেলতে চাই। তবে মুশফিকের মতো প্যাশনেট আর কেউ নেই’, একজনের এ অভিমত আসলে সবার। আরো নিশ্চিত হওয়ার জন্য তাঁকে ধরতেই তিনি হেসে খুন, ‘তাই নাকি? কী যে বলেন!’

তবে টেস্ট নিয়ে একটা খুঁতখুঁতানি তো অবশ্য আছে বাংলাদেশ দলে, বৈশ্বিক ক্রিকেটেও। বাংলাদেশে তা আরো বেশি সব ফরম্যাটে প্রায় একই ক্রিকেটারদের ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে খেলানোর কারণে। রুবেল হোসেনকে যেমন দেখলেই মনে হয় কার ওপর যেন ফুঁসছেন! টেস্টে বাজে বোলিংয়ের কারণে তাঁকে ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগের কথা শোনা গিয়েছিল নির্বাচক কমিটির পক্ষ থেকে। টিম ম্যানেজমেন্টও অসন্তুষ্ট রুবেলের টেস্ট বোলিংয়ে। তবে তারাই আবার ওয়ানডেতে রুবেলকে রেখে দেওয়ার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে সফল হয়েছে, যার সুফল মেলার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে এক দিনের প্রস্তুতি ম্যাচে। তাতে সেই টিম ম্যানেজমেন্টই স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে আপাতত তাদের টেস্ট ভাবনায় রুবেল হোসেন থাকবেন না।

তাহলে কে থাকবেন? আর টেস্ট মানের পেস বোলার কোথায়? অ্যান্টিগায় ক্যারিবীয় পেসাররা প্রায় বলে বলে উইকেট নিয়েছেন, সেখানে স্পিনাররাই সফলতম বাংলাদেশ দলে। পেসাররা অসফল, কারণ এ কন্ডিশনে বোলিং করার উপযুক্ত সিম পজিশনে অভ্যস্তই নন তাঁরা। বাজেভাবে হারের পর বাংলাদেশ দল অজুহাত দিতে সাহস করে না। তবে এটা তো দীর্ঘদিনের বাস্তবতাই যে সিম বোলিংয়ের সহায়ক কন্ডিশনেও অসহায় বাংলাদেশি পেসাররা। তামিম ইকবাল দুই দিন আগে বলছিলেন, ‘এখানে বল কাট করাতে হয়। ওরা কাট করিয়েই উইকেট নিয়েছে। আমাদের একমাত্র মাশরাফি ভাই কাট করাতে পারেন, আল আমিনও পারে।’ পরের জন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেই এখন ব্রাত্য। আর মাশরাফি তো টেস্ট খেলছেন না সেই ২০০৯ সাল থেকে।

বাস্তবতার আরো আশঙ্কাজনক রূপ আছে। টেস্ট বিশেষজ্ঞ হিসেবে বাংলাদেশ দলে যাঁর পরিচয়, সেই মমিনুল হকও কেমন যেন সংক্ষিপ্ত ফরম্যাটের আঁচ নিতে মরিয়া! মেহেদী হাসান মিরাজের লেন্থ বদলে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে টি-টোয়েন্টির আকর্ষণে। গতরাতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের যে দুজন মহারথীর সঙ্গে একই ফ্লাইটে গায়ানায় এসেছে বাংলাদেশ দল, সেই ক্রিস গেইল আর আন্দ্রে রাসেলও একই শ্রেণিভুক্ত। প্রথমজন তো ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের টানে একসময় সবই ছেড়ে দিয়েছিলেন। আর টি-টোয়েন্টিতে ডুবে থাকা রাসেল ওয়ানডেতে ফিরলেন ২০১৫ সালের পর। ২০ ওভারের ক্রিকেট খেলেই যদি বিলাসী জীবনের স্বাদ নেওয়া যায়, তাহলে পাঁচ দিনের হাড়ভাঙা খাটুনির মানে কী? প্রশাসনের লোকজনও তো রঙিন ক্রিকেটেই বেশি অনুরক্ত। শুনছি ওয়ানডেতে দেখা মিলবে বোর্ড কর্মকর্তাদের কারো কারো। ফ্লোরিডায় টি-টোয়েন্টিতে দল ভারী হওয়ার কথা আরো। বিপিএল এলে বোর্ড কর্মকর্তাদের ব্যস্ততা দেখে মনে হয়, এত দিনে তারা একটি সত্যিকারের কাজ পেয়েছেন!

খেলোয়াড়-কর্মকর্তা এমনকি মিডিয়ারও দিকবদল হয়েছে এবং হচ্ছে। ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ততম ফরম্যাট ক্রমাগতই পেছনে ফেলছে টেস্ট আকর্ষণকে। তাই বিষয়টি নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। টেস্টে আকণ্ঠ ডুবিয়ে দেওয়ার মতো আর্থিক প্রণোদনা না থাকলে সাদা পোশাকে অনিচ্ছার ধুলাবালি জমবেই। পাশাপাশি শুধুই টেস্টের জন্য কিছু ক্রিকেটারকে তৈরি করা। সেই কাজটি বোর্ডের। কে টেস্ট ক্রিকেট খেলতে চায় না চায়—আহা, সেসব বাছাই করার চেয়ে এই কাজটিকে যদি অগ্রাধিকার দিত বোর্ড!



মন্তব্য

Zulfikar commented 30 days ago
এই হল দেশপ্রেম ! জাতীয় দল ছাড়া তুমি জিরো সাকিব, শুধু তুমি না সবাই। কোন আই পি এল ও পাবানা কোন কমার্শিয়াল এড ও পাবানা। রাজনিতিতে ঢুকছে তো এই জন্য বেইমানিটা শিখছে।