kalerkantho



অভিমানী প্যাটারসন এলেনই না

২১ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



অভিমানী প্যাটারসন এলেনই না

প্যাটারসনকে জনারণ্যে ফিরিয়ে আনার উপায় খুঁজে দেখতে পারে জ্যামাইকানরা। অবশ্য প্রস্তুতি ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংস শুরুর সময় ওয়ালশের কথায় তেমন আশার বাণী নেই, ‘এত করে বললাম, ও রাজিও হয়েছিল।’

 

 

দুপুরে ম্যাচের আগে একদফা চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়েও অনুষ্ঠান গুটিয়ে নেওয়া হলো দ্রুত, তিনি আসেননি বলে। দিবা-রাত্রির প্রস্তুতি ম্যাচের মাঝের বিরতিতে আরেকবার হুড়োহুড়ি; তিনি এই এলেন বুঝি! কিন্তু কিসের কি, প্যাট্রিক প্যাটারসন বুকভরা অভিমান আর একসাগর অবসাদের নীল জল ভেঙে এলেনই না স্যাবাইনা পার্কে। অগত্যা প্যাটারসনের জন্য তৈরি সম্মাননার ক্রেস্ট তুলে দেওয়া হলো বাংলাদেশের বোলিং কোচ কোর্টনি ওয়ালশের হাতেই। প্যাটারসনের ‘প্রযত্নে’ বলতে যে ওয়ালশ ছাড়া কোনো নাম আর নেই ক্রিকেট আঙিনায়!

সত্যিই নেই। স্যার ভিভিয়ান রিচার্ডস ডেকেছিলেন, ডাক এসেছিল জ্যামাইকার প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকেও। তবু অন্তরাল থেকে বের করা যায়নি প্যাটারসনকে। সর্বশেষ একবারই তাঁকে দেখা গেছে জনসমাগমে। বছর দুয়েক আগে বাংলাদেশের পেস বোলিং কোচ পদে নিয়োগ পাওয়ার পর ওয়ালশের পার্টিতে নাকি নেচেওছিলেন প্যাটারসন। তাই সম্মাননা অনুষ্ঠানে ‘র‌্যাম্বো’কে হাজির করার দায়িত্ব সমর্পিত হয়েছিল ওয়ালশের ওপর। কলেজজীবন পেরিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও বোলিং পার্টনারের শত অনুরোধেও রা করেননি। সে হতাশায় বেশ কাতর শোনাল ওয়ালশকে, ‘কী যে হলো ওর! আমার পার্টিতে হল্লাগোল্লা করতে দেখে মনে হয়েছিল সমস্যা বুঝি কেটে গেছে। কিন্তু আবার সেই একই অবস্থা। এত করে বললাম, তবু এলো না!’ বিষাদগ্রস্ত বন্ধুকে প্রাপ্য সম্মানটুকু দিতে না পারার কষ্ট তো হবেই।

ক্রিকেটে বিস্মৃত হতে সময় লাগে সামান্যই। আর তিনি, প্যাটারসন তো সেই নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিক থেকেই স্বেচ্ছানির্বাসনে চলে যাওয়া মানুষ। ‘আত্মগোপন’ এতটাই নিরেট ছিল যে তাঁর মানসিক হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার গুজবও রটে জ্যামাইকার ক্রিকেট পরিমণ্ডলে। সেই থেকে একরকম নিরুদ্দেশই হয়ে গিয়েছিলেন প্যাটারসন। তবে টানা ছয় বছরে তিনটি ক্যারিবীয় সফরে অনুসন্ধানের পর তাঁকে খুঁজে বের করেন দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সাংবাদিক ভারত সুদর্শন। পুনরুজ্জীবন লাভ করে ক্যারিবীয় ক্রিকেটের স্বর্ণসময়ের এমন একজন ফাস্ট বোলারের, যাঁর বল সামলাতেই নাকি সবচেয়ে বেশি কষ্ট হতো এখনো পর্যন্ত ওয়েস্ট ইন্ডিজের সর্বকালের সেরা উইকেটরক্ষক বলে বিবেচিত জেফ্রি ডুজনের। জেনে রাখা জরুরি যে ক্যারিয়ারে প্যাটারসনের পাশাপাশি অ্যান্ডি রবার্টস, ম্যালকম মার্শাল, মাইকেল হোল্ডিং, কার্টলি অ্যাম্ব্রোস আর কোর্টনি ওয়ালশের বোলিংয়ের সময়ও উইকেটের পেছনে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা হয়েছে ডুজনের। ক্যারিবীয় ক্রিকেট উপকথায় জুড়ে আছে স্যাবাইনা পার্কের একটি ম্যাচ। জ্যামাইকা-বার্বাডোজ সেই ম্যাচের বাতাবরণে মার্শাল-রবার্টস বনাম হোল্ডিং-প্যাটারসন গতির লড়াই-ই ছিল প্রধানতম আকর্ষণ। সে লড়াইয়ে জিতেছিলেন প্যাটারসন। আরেকবার নিষ্ঠুর স্লেজিংয়ের শিকার হয়ে দিনের খেলা শেষে অস্ট্রেলিয়ার ড্রেসিংরম্নমে ঢুকে প্যাটারসন হুমকি দিয়েছিলেন, ‘কাল আমি তোমাদের খুন করব...তোমাকে, তোমাকে আর তোমাকে!’ পরদিন প্যাটারসনের ঝড়ে ১১৪ রানে অল আউট হয়ে যায় অস্ট্রেলিয়া। ২৮ টেস্টে ৩০.৯০ গড়ে ৯৩ উইকেট এমন আহামরি কোনো ক্যারিয়ার নয়। তবে পরিসংখ্যানে তো আর সবটা থাকে না। ওয়ালশের কণ্ঠে যেমন এখনো আক্ষেপ ঝরে, ‘যা হওয়ার কথা ছিল, তা হতে পারেনি র‌্যাম্বো।’ নাকি সে রকম উচ্চতায় উঠতে দেওয়া হয়নি প্যাটারসনকে? শোনা যায়, সে সময়ের প্রভাবশালী ক্রিকেটার ভিভ রিচার্ডস, গর্ডন গ্রিনিজ, ডেসমন্ড হেইন্স আর রিচি রিচার্ডসনের সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিল না প্যাটারসনের। এর পেছনের কারণ কখনো ম্যাচে, কখনো বা নেটে এই ‘অবাধ্য’ জ্যামাইকানের বিপজ্জনক গতির বোলিং! অবশ্য এত দিন পর পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটাঘাঁটিতে কোনো আগ্রহ নেই ওয়ালশের, ‘ওর মনে কী ঘটেছে জানি না, ফ্যামিলি ইস্যুও হতে পারে। খুব চেয়েছিলাম, মানুষের মাঝে যেন ফিরে এসে স্বাভাবিক জীবনযাপন শুরু করে প্যাট্রিক।’ কতবার ফোন করেছেন পুরনো বন্ধুকে, যেন যথাসময়ে উপস্থিত থাকেন। কিন্তু সবই বিফলে। দেখা করার ইচ্ছাটাও পূরণ হয়নি ওয়ালশের, ‘ওর সঙ্গে টাইমিং মেলেনি। তাই দেখা হয়নি।’

ওদিকে হতাশার হালকা মেঘ গ্যালারিতেও। যে বয়সশ্রেণির দর্শকের সংখ্যা বেশি, সন্দেহাতীতভাবে তারা এ মাঠেই প্যাটারসনকে গতির ঝড় তুলতে দেখেছেন। এত দিন পর আরেকবার হারিয়ে যাওয়া সাবেক ফাস্ট বোলারকে দেখার ইচ্ছা তো তাদের হতেই পারে। বাংলাদেশের বিপক্ষে ভাইস চ্যান্সেলরস একাদশের মধ্যকার এক দিনের প্রস্তুতি ম্যাচে তাই দর্শকদের জন্য আয়োজক সংস্থার বিশেষ অফার ছিল প্যাটারসন ও গেইলকে একসঙ্গে সম্মাননা দেওয়ার। সে আর হয়নি। সম্মাননাটুকু কাউকে দিয়ে প্যাটারসনের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়াই পরিকল্পনা ওয়ালশের।

স্থানীয় দলটিতে ক্রিস গেইল আর আন্দ্রে রাসেলের সংযুক্তি কি ঢল নামাল নাকি স্যাবাইনা পার্কে? বাংলাদেশের দলীয় সূত্রের ‘আদমশুমারি’ বলছে, এ মাঠে অনুষ্ঠিত টেস্টের চেয়ে প্রস্তুতি ম্যাচের দর্শক বেশি। টেস্টের গ্যালারি দেখিনি, তবে প্রস্তুতি ম্যাচে কুড়িয়ে-বাড়িয়ে হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে দর্শক উপস্থিতি। আর এই দর্শকদের বেশির ভাগই ক্যারিবীয় ক্রিকেটের সোনালি যুগের। তাঁদেরই একজন দেখি ক্রিস গেইলকে দেখে পাশের সঙ্গীকে জিজ্ঞেস করছেন, ‘লোকটা কে?’ জার্সির রংটাই কি বিভ্রম ঘটিয়েছে তাঁর চোখে? হতে পারে। তবে জ্যামাইকানদের কারো গেইলকে না চেনার যৌক্তিক কোনো কারণ নেই, যদি কেউ ক্রিকেটের ন্যূনতম খোঁজখবরও রাখেন। অবশ্য এঁদের একেবারে ক্রিকেট অজ্ঞ বলে উড়িয়েও দেওয়া যাচ্ছে না। প্যাট্রিক প্যাটারসনের বিশাল শরীর, অদ্ভুত রান আপ, আগ্রাসী গতি আর অন্তরালে চলে যাওয়ার গল্প যেন সবারই জানা। সেই গল্পের শেষটা বিষাদের।

বৃহস্পতিবারের স্যাবাইনা পার্কের আবহাওয়ায় ক্ষণিকের মুখভার দেখে এক ফুটবল কিংবদন্তির কথা মনে পড়ছিল। উপযুক্ত সম্মান না পেয়ে এবং রোগে ধুঁকে পরলোকে চলে যাওয়া গ্যারিঞ্চা এখনো তুমুল জনপ্রিয় ব্রাজিলে। জ্যামাইকানদের কাছে ঠিক যেন একই সমাদর প্যাট্রিক প্যাটারসনের। গ্যারিঞ্চাও আড়াল নিয়েছিলেন ক্যারিবীয় ফাস্ট বোলারটির মতো। তবে ভক্তের ভালোবাসার চোখ ঠিকই খুঁজে ফেরে তাঁদের।

গ্যারিঞ্চাকে তো আর ফিরে পাওয়ার সুযোগ নেই। তবে প্যাটারসনকে জনারণ্যে ফিরিয়ে আনার উপায় খুঁজে দেখতে পারে জ্যামাইকানরা। অবশ্য প্রস্তুতি ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংস শুরুর সময় ওয়ালশের কথায় তেমন আশার বাণী নেই, ‘এত করে বললাম, ও রাজিও হয়েছিল।’ বন্ধুর অনুরোধও পায়ে ঠেলা প্যাটারসনকে তাই জনসমক্ষে দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। দীর্ঘদিনের বন্ধু ওয়ালশের ভঙ্গিতে তেমন আশাবাদের সামান্যতম রংও দেখা যায়নি।



মন্তব্য