kalerkantho



সব মিলিয়ে উপভোগ্য আসর

১৭ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



মধুমাস শেষ হলো। বাঙালিদের জ্যৈষ্ঠ যেমন মধুমাস নানা স্বাদের ফলের বাহারে। ফুটবলরসিকদের কাছে তেমনি বিশ্বকাপ। এক মাসেই দেখা হয়ে যায় বিশ্ব ফুটবলের যত রূপ জৌলুস। নতুনত্ব, ভাঙা-গড়া, সাফল্য-ব্যর্থতার এই আসর নিয়ে বলার আছে অনেক কিছু। যেমন—

নতুন উরুগুয়ে, শক্ত ডিফেন্স আর কাউন্টারই ছিল এত দিন তাদের বৈশিষ্ট্য। এই বিশ্বকাপে দেখেছি দারুণ কিছু তরুণ মিডফিল্ডার নিয়ে ওদের পজেশনাল ফুটবল খেলতে। ৪-৪-২ ফরমেশনে অনেক সময় ডায়মন্ড মিডফিল্ডও সাজিয়েছে তারা।

৪-৪-২, উরুগুয়ের পাশাপাশি সুইডেন আর পর্তুগাল খেলেছে এই ফরমেশনে। যদিও দুই স্ট্রাইকারের একজনের ভূমিকা ছিল অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারের মতো, মূল স্ট্রাইকারের সঙ্গে লিংকআপ করে খেলেছেন তিনি। এই ফরমেশনে সুইডেন ও পর্তুগালকেও দেখেছি তিন লাইনে কঠিন ডিফেন্সিভ ব্লক তৈরি করতে।

ফ্লাইং কাউন্টার, সৌদি আরব, কোস্টারিকা, সুইডেন, ইরান এই দলগুলোর প্রবণতাই ছিল ডিপ ডিফেন্ডিং করে যত দ্রুত কাউন্টারে যাওয়া যায়। দলের শক্তির কথা মাথায় রেখেই এটা করেছেন কোচরা। তাতে সফলও হয়েছেন অনেক ক্ষেত্রে। পরে ফ্রান্সও তা করেছে কিছুটা।

পজেশনের ভবিষ্যৎ, এই বিশ্বকাপে পজেশনাল ফুটবলের মৃত্যু হলো কিনা, প্রশ্নটা উঠে গেছে জার্মানি, স্পেনের মতো দলগুলোর ব্যর্থতায়। তবে ক্রোয়েশিয়া পজেশনাল ফুটবল খেলেও তাদের ওয়াইড মিডফিল্ডারদের কাজে লাগিয়ে সফলতা দেখিয়েছে। ক্লাব ফুটবলে এখনো পজেশনের দাপট আছে, সেখানে বৈচিত্র্য যোগ হয়েছে। স্পেনে এবার লোপেতেগুই থাকলেও হয়তো সেই বৈচিত্র্য আমরা দেখতাম।

তিন ব্যাক, ২০১৪-তে তিন ব্যাক নিয়ে সফলতা দেখিয়েছিলেন লুই ফন হাল। এবার বেলজিয়াম, ইংল্যান্ডের বড় দুই দলও সেভাবে খেলল। তাতে ভালো-মন্দ দুটি দিকই আমরা পেয়েছি। ইংল্যান্ড ৩-৫-২ থেকে বেরোতে পারেনি বলে ডিফেন্ডিংয়ে আউটনাম্বারড হয়ে গেছে মিডফিল্ডে। বেলজিয়াম ৪-৩-৩ বা ৪-৫-১ করে সেই সমস্যা কাটিয়েছে।

ট্যাকটিক্যাল ফ্লেক্সিবিলিটি, এই জায়গাটায় সফলতা দেখিয়েছেন রবার্তো মার্তিনেস। দিদিয়ের দেশমও পেরেছেন। ৪-২-৩-১ ভেঙে ৪-৩-৩ হয়ে গিয়ে প্রয়োজনে সুরক্ষা বলয় তৈরি করেছে তাঁর দল। ফাইনালে এনগোলো কান্তের মতো একজনকে তুলে নিতেও তিনি দ্বিধা করেননি। হলুদ কার্ড একটা কারণ ছিল, তবে সেট পিসে কান্তে কাজে আসছিলেন না। এনজোনজির উচ্চতার সুবিধাটাই নিয়েছেন তিনি।

ডিরেক্ট ফুটবল, দু-একটি ব্যতিক্রম বাদে প্রায় সব দলই ডিরেক্ট ফুটবলে সাবলীলতা দেখিয়েছে। জাতীয় দলের কোচরা সময় কম পান, বিল্ডআপ প্লেতে একটা দল গড়ে তোলার চেয়ে তাদের ডিরেক্ট ফুটবলে অভ্যস্ত করা সহজ, সেটা একটা কারণ হতে পারে। তাতে করে ডিপ প্লেয়িং পজিশন থেকে ডি ব্রুইন, রাকিটিচ, শিবাসাকি, হাসেবের মতো খুব ভালো পাসার আমরা দেখেছি।

হাইপ্রেস, বেলজিয়ামের বিপক্ষে হাইপ্রেসিং ফুটবলের মহড়া দিয়েছে তারা। যেকোনো দলের জন্যই এটা কঠিন। কারণ সবাইকে একতালে এই প্রেসটা করতে হয়। ৪-২-৩-১ ফরমেশন স্ট্রাইকারের পেছনের জন তাঁর সঙ্গে যুক্ত হন, দুই হোল্ডিং মিডফিল্ডার ওপরে উঠে আসেন, সঙ্গে দুই উইংব্যাক। এদের কেউ একটু ভুল করলেই সেই প্রেসটা আর হয় না। জাপান তাতে অনেকটাই সফল হয়েছিল।

সেট পিস, সেট পিসে কার্যকারিতার আসর ছিল এটি। দলগুলোর খুব ভালো প্রস্তুতির কারণেই এটা হয়েছে।

নাম্বার নাইন, টিপিক্যাল নাম্বার নাইনের ভূমিকা কমে গেছে। এই বিশ্বকাপে জিরদ, জেসুস, কেইন, লুকাকুদের পারফরম্যান্স তাই বলছে।

সব মিলিয়ে উপভোগ্য একটি আসরই ছিল এটি। ম্যাড়ম্যেড়ে ম্যাচ হয়ইনি বলতে গেলে। এমন একটা আসরের জন্য আবার চার বছর অপেক্ষায় থাকতে হবে আমাদের।

জাতীয় দলের সাবেক কোচ



মন্তব্য