kalerkantho



আয়োজনে ‘চ্যাম্পিয়ন’ রাশিয়া

মস্কো থেকে প্রতিনিধি    

১৬ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



আয়োজনে ‘চ্যাম্পিয়ন’ রাশিয়া

বিশ্বকাপে বিশ্ব কাঁপে তো বরাবরই। চার বছর পর পর ফুটবলের এই মহাযজ্ঞের সৌজন্যে ভূমিকম্প হয়ে যায় জগত্জুড়ে। কিন্তু পম্পেইর ভূমিকম্পই থেমে যায়, বিশ্বকাপ ফুটবলের না থেমে উপায় কী! কাল তাই মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে শেষ ঝাঁকি দিয়ে স্থির হয়ে সব। শুরু হলো আবার কাকপ্রতীক্ষা। চার বছরের!

মহাকালের আয়নায় ২০১৮ আসরকে দেখা হবে অঘটনের বিশ্বকাপ হিসেবে। বিশ্ব ফুটবলের পরাশক্তিদের এমন টুপটাপ ঝরে পড়া আর কবে দেখেছে বিশ্ব! বিস্ময়ের শুরু জার্মানিকে দিয়ে। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা বাদ প্রথম রাউন্ডেই। অথচ মেক্সিকোর কাছে প্রথম ম্যাচ হারের পরও তাদের কোচ ইওয়্যাখিম লোভ কী অহং মেশানো কণ্ঠেই না বলেছিলেন, ‘আপনারা নিশ্চিত থাকতে পারেন, আমরা নক আউট পর্বে যাচ্ছি।’ সে অহং মিশে গেছে ধুলোয়।

তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে আর্জেন্টিনা। অশনিসংকেত ছিল গ্রুপ পর্বের পারফরম্যান্সেই। আইসল্যান্ডের সঙ্গে ড্র ও ক্রোয়েশিয়ার কাছে হারে নক আউট পর্বে ওঠাই অনিশ্চিত হয়ে যায় একটা সময়। নাইজেরিয়ার বিপক্ষে জিতে তা পেরেছে বটে, কিন্তু গ্রুপ রানার্স-আপ হওয়ায় শেষ ষোলোতেই মুখোমুখি ফ্রান্সের। প্রতিভায় ঠাসা তারুণ্যনির্ভর দলটির সঙ্গে আর পেরে ওঠেনি আর্জেন্টিনা। লিওনেল মেসির বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নটা আরো একবার ভেসে যায় কান্নার জলে।

দুঃখের সে সমুদ্রে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোকেও পেয়েছেন এই আর্জেন্টাইন। আলবিসেলেস্তেদের বিদায়ের ঘণ্টা কয়েক পরই যে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়ে পর্তুগাল! উরুগুয়ের কাছে হেরে। স্পেনের বিপক্ষে হ্যাটট্রিকে শুরু বিশ্বকাপটা রোনালদোর জন্য দুঃখেরই হয়ে রইল।

দুঃখের নোনা জলে এরপর ভেসে যাওয়া পরাশক্তি ব্রাজিলের। আদেনর বাক্কি তিতের দলের মধ্যে চ্যাম্পিয়নের সব উপাদান রয়েছে বলে মনে হচ্ছিল। ক্রমশ বিকশিত নেইমারের খেলায় ছিল বিশ্বজয়ের প্রতিশ্রুতি। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের সঙ্গে বিস্ময়করভাবে পেরে ওঠে না পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ভূরি ভূরি গোলের সুযোগ হাতছাড়া করার খেসারত দিয়ে বিশ্বকাপকে বিদায় জানায় ব্রাজিল। ২০০২ সালে সর্বশেষ শিরোপা জয়ের পর অন্তত ২০ বছরের আরেক ব্যবধান তৈরি হয়ে গেল; ২০২২ আসতে আসতে। এই গ্রহণকাল যে চার বছরে কাটাতে পারবে ব্রাজিল, সে নিশ্চয়তাও কোথায়!

বিস্ময় উপহার দিয়ে ইংল্যান্ড অবশ্য টিকে ছিল অনেক দূর। গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে, নক আউট পর্বের দুই ম্যাচ ছাড়িয়ে সেমিফাইনাল পর্যন্ত উঠে যায় তারা। সেখানেই নিভে যায় ইংরেজদের আশার মশাল। অতিরিক্ত সময়ে ক্রোয়েশিয়ার কাছে হেরে। অঘটনের বিশ্বকাপে সবচেয়ে বড় অঘটন এই ক্রোয়াটদের ফাইনালে ওঠা। নক আউট পর্বের প্রথম দুটি ম্যাচ টাইব্রেকারে এবং সেমিফাইনাল অতিরিক্ত সময়ে গিয়ে জিতেছে তারা। ১৩তম দেশ হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলা ইউরোপের এই ছোট্ট দেশটির জন্য বিশাল এক অর্জন। যদিও শেষটা সুখকর হয়নি ক্রোয়াটদের। ফাইনালে আত্মঘাতী গোল, ভিএআরে পেনাল্টি থেকে গোল হজম করে ৪-২ গোলে হেরে রানার্স-আপ হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে মডরিচ-রাকিটিচদের।

মাঠের খেলায় প্রত্যাশিতভাবেই গোলের বন্যা বয়ে যায়নি। সাফল্যের রেসিপি হিসেবে দলগুলো জমাট রক্ষণের দিকেই জোর দিয়েছে। ট্যাকটিকস-ফরমেশনে কোনো বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পথেও হাঁটেনি ফুটবল। জয়ের জন্য সব কোচের প্রধান লক্ষ্য ছিল গোল না খাওয়া। সেখানে ফুটবল সৌন্দর্যের জয়গান গায়নি কেউ। সাফল্যবুভুক্ষু এই সময়ে আরেকজন তেলে সান্তানাকে যে আর কখনো দেখবে না বিশ্ব, এবারের বিশ্বকাপ সেই পুরনো সত্য জানিয়ে গেল নতুন করে।

বিশ্বকাপের আগে সবচেয়ে বড় তারকা ছিলেন মেসি-রোনালদো-নেইমার। কেউই প্রত্যাশা পূরণ করার মতো খেলতে পারেননি। ওদিকে ক্রোয়েশিয়ার লুকা মডরিচ খেলেছেন প্রত্যাশা ছাড়ানো ফুটবল। নতুন তারকার আবির্ভাব কিলিয়ান এমবাপ্পেতে। বিশ্বকাপের মঞ্চের চেয়ে নিজেকে প্রমাণ করার ভালো জায়গা কোথায় পাবেন ফুটবলাররা!

প্রতি বিশ্বকাপ শেষেই সেটির গায়ে ‘সেরা বিশ্বকাপ’-এর তকমা সেঁটে দেওয়া দস্তুর। ব্যতিক্রম হয়নি এবারও। ফিফার তরফ থেকে, স্থানীয় আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে সর্বকালের সেরা বিশ্বকাপ আয়োজনের তৃপ্তির ঢেঁকুর আছে। সামগ্রিকতায় তা কতটা সত্যের কষ্টিপাথরে যাচাই করা, মহাকাল করবে এর বিচার। তবে স্বাগতিক হিসেবে আয়োজন নিয়ে তৃপ্ত হওয়ার যথেষ্ট কারণে রয়েছে রাশিয়ার।

ইংল্যান্ডের মতো আগ্রহীদের টপকে ২০১৮ বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বত্ব পেয়েছিল রাশিয়া। সেই প্রক্রিয়া নিয়ে তখন থেকেই ফিসফাস। রাশিয়ার তাতে থোড়াই কেয়ার। পশ্চিমা প্রগাগান্ডা ভুল প্রমাণ করার মিশনে এই আসর আয়োজন করেছে দুর্দান্ত দক্ষতায়। দারুণ আন্তরিকতায়। আর স্বাগতিক দলের সাফল্যও তাদের উদ্দীপিত করেছে নিঃসন্দেহে। মাঠের ফুটবলে ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে স্বাগতিক হিসেবে ধরা হচ্ছিল রাশিয়াকে। আয়োজনেই তাই চ্যাম্পিয়ন হতে চেয়েছিল রাশিয়া। কিন্তু তাদের জাতীয় দলও তো ঠিকই সব বাজির দান উল্টে উঠে যায় কোয়ার্টার ফাইনালে। সমগ্র জাতি তাই একতাবদ্ধ হয়ে দাঁড়ায় জাতীয় দলের পেছনে। বিশ্বকাপের পাশেও।

তাতেই ২০১৮ বিশ্বকাপ আয়োজনে ‘চ্যাম্পিয়ন’ রাশিয়া।



মন্তব্য