kalerkantho



ত্রয়ীর রেসে এগিয়ে রোনালদো

নোমান মোহাম্মদ সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে   

২৪ জুন, ২০১৮ ০০:০০



ত্রয়ীর রেসে এগিয়ে রোনালদো

রুশ টেলিভিশন চ্যানেল যখন, তখন রাশিয়ার বিশ্বকাপ পারফরম্যান্সই তো তাদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। আর প্রথম দুই ম্যাচে স্বাগতিকদের অমন বিধ্বংসী পারফরম্যান্সের পর আশার আকাশটাও হয়েছে অনেক বড়। ‘রাশিয়া ওয়ান’ চ্যানেলের সাংবাদিক তাই সেন্ট পিটার্সবার্গের মিডিয়া সেন্টারে বিশ্বকাপ কাভার করতে আসা বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকদের কাছে ঘুরে ঘুরে প্রশ্ন করছিলেন এ নিয়ে। বিশ্বকাপে কত দূর যেতে পারবে রাশিয়া? আর ডেনিস চেরিসভ কি হতে পারবেন সর্বোচ্চ গোলদাতা?

চেরিসভ! গত দুই মৌসুমে স্প্যানিশ লিগে ভিয়ারিয়ালের হয়ে যাঁর মোটে দুই গোল! বিশ্বকাপের আগে রাশিয়ার জার্সিতে খেলা ১১ ম্যাচে যাঁর কোনো গোল ছিল না! এসব তথ্য মনে করিয়ে দিতেই রুশ সাংবাদিকের পাল্টা প্রশ্ন, ‘হ্যাঁ, আগে ও সেভাবে গোল করতে পারত না। কিন্তু টুর্নামেন্টের দুই ম্যাচে তো তিন গোল দিয়েছে! গত বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার হামেস রদ্রিগেস যদি সর্বোচ্চ গোলদাতা হতে পারেন, তাহলে এবার চেরিসভ নয় কেন? আর মেসি-নেইমাররা এখনো গোল করতে পারেননি। শুধু রোনালদোই করছেন।’

তখনো পর্যন্ত ব্রাজিলের নেইমার গোলের খাতা খোলেননি। কোস্টারিকার বিপক্ষে ম্যাচের ইনজুরির সময়ের শেষ মুহূর্তে করেছেন টুর্নামেন্টে নিজের প্রথম গোল। আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি প্রথম দুই ম্যাচে গোলশূন্য। পর্তুগালের ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো অবশ্য রয়েছেন বিস্ফোরক শ্রেষ্ঠত্বে। প্রথম ম্যাচে স্পেনের বিপক্ষে হ্যাটট্রিকের পর মরক্কোর বিপক্ষে আরেক গোল। চেরিসভের তিন গোলে রুশ জাতীয়তাবাদের চেতনায় সাংবাদিককুল যতই উচ্ছ্বসিত হোন না কেন, শেষ পর্যন্ত তাঁর সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার আশাটা বড্ড বাড়াবাড়ি।

বিশ্বকাপের আবহে আবার ‘গোল্ডেন বুট’-এর লড়াইয়ে মেসি-রোনালদোকে ফেভারিট ধরা বাড়াবাড়ি ছিল না মোটেও। ইনজুরি কাটিয়ে ফেরা ব্রাজিলের নেইমার হয়তো ছিলেন সম্ভাবনার ব্র্যাকেটবন্দি। রাশিয়া বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় তারকা তো এই তিনজন। চার বছর আগের আসরেও তা-ই ছিল। পর পর দুটি বিশ্বকাপের আবহে সেরা তারকার সম্ভাব্য ত্রয়ী একই—এমনটা ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যাবে না। আর এই ত্রিমূর্তির রাশিয়া বিশ্বকাপ শুরু হলো আবার ভিন্ন ভিন্নভাবে।

রোনালদোর দুর্দান্ত। নেইমারের গড়পড়তা। মেসির বড্ড বাজে।

পর্তুগালের সম্রাটের বিশ্বকাপের এমন শুরু খানিকটা চমক জাগানিয়া। বিশেষত গেল আসরের পারফরম্যান্সের কথা মাথায় রাখলে। ২০০৬, ২০১০, ২০১৪ বিশ্বকাপেও গোল করেছেন রোনালদো। কিন্তু কোনোবারই একটির বেশি নয়। তিন বিশ্বকাপের ১৩ ম্যাচ মিলিয়ে তাঁর গোল ছিল তিনটি। সেখানে কিনা এবার প্রথম ম্যাচেই তিন গোল! সেটিও স্পেনের মতো দলের বিপক্ষে। অবিশ্বাস্য ফ্রি-কিকে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করা গোলটি চলতি বিশ্বকাপের অন্যতম হাইলাইট হয়ে থাকবে। মরক্কোর বিপক্ষে লক্ষ্যভেদেও গোলক্ষুধার্ত এক সেন্টার ফরোয়ার্ডের প্রতিচ্ছবি।

গেল ১০ বছর ধরে যাঁর সঙ্গে তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের দ্বৈরথ, সেই মেসির মধ্যে এই ক্ষুধার প্রকাশটাই দেখা যাচ্ছে না চলতি বিশ্বকাপে। এ জন্য অবশ্য তাঁর সতীর্থদের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন আর্জেন্টিনার কোচ হোর্হে সাম্পাওলি। কিন্তু মেসি নিজেও তো প্রথম ম্যাচে পেনাল্টি থেকে গোল করতে পারেননি! ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ছিলেন নিজের ছায়া হয়ে। ম্যাচ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কারো দিকে না তাকিয়ে সোজা হেঁটে ঢুকে গেছেন ড্রেসিংরুমে। ক্রোধের স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ ছিল সেখানে। শুধু তো আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন না, ‘ফিফা দ্য বেস্ট’ বা ‘ব্যালন ডি’অর’-এর মতো ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট জয়ের আশাও তো কমে যাচ্ছে তাঁর ক্রমেই।

গেল ১০ বছরে ওই পুরস্কারগুলো এ দুজনেরই সম্পত্তি। সমান পাঁচবার করে তা জেতেন মেসি-রোনালদো। এবারের লড়াইয়ে এমনিতে পর্তুগিজ মহাতারকা এগিয়ে আছেন রিয়াল মাদ্রিদকে চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতিয়ে। আর বিশ্বকাপে গড়পড়তা এক দল নিয়েও অমন দুর্দান্ত শুরুর পর ব্যালন ডি’অরের লড়াইয়ে রোনালদো এগিয়ে গেলেন আরো।

দুজনের সেই আধিপত্যে পরের প্রজন্মে ভাগ বসানোর মতো ফুটবলারদের তালিকায় সবার ওপরেই থাকে নেইমারের নাম। অনেক দিন ধরেই। কিন্তু প্রত্যাশাকে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সে অনূদিত করায় এখনো দক্ষ হয়ে ওঠেননি ততটা। ২০১৪ বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যায় ভয়ংকর ইনজুরিতে। এবারও ইনজুরির কারণে সাড়ে তিন মাস বাইরে থাকার পর খেলায় ফিরেছেন। ব্রাজিলের কোচ লিওনার্দো বাচ্চি তিতে তাঁকে আগলে রাখার চেষ্টা করছেন যথাসাধ্য। কিন্তু সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে বাজে পারফরম্যান্সের পর সমালোচনার জ্বালামুখ খুলে যায় ঠিকই। তুলনায় কোস্টারিকার বিপক্ষে উজ্জ্বল ছিলেন অনেক। আর ইনজুরি সময়ের শেষ মুহূর্তে পেয়ে যান পরম প্রার্থিত গোলও।

১৯৭৪ সালে আফ্রিকার দেশ জায়ারের বক্সিং রিংয়ে হয়েছিল শতাব্দীর অন্যতম সেরা ক্রীড়া দ্বৈরথ—জর্জ ফোরম্যান ও মোহাম্মদ আলীর মধ্যে। ‘দ্য র‌্যাম্বল ইন দ্য জাঙ্গল’ খ্যাত সে লড়াইয়ের আগেই আলী ঘোষণা দিয়েছিলেন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফোরম্যানের বিপক্ষে নতুন এক কৌশলে লড়বেন তিনি। সে কৌশলটাই ‘রোপ-এ-ডোপ’। রিংয়ে দেখা যায়, শুরুর দিকে প্রতিপক্ষের আঘাতের পর আঘাত হজম করছেন আলী; কিন্তু নিজের মাথা বাঁচিয়ে। তাতে ফোরম্যান আক্রমণে আক্রমণে ব্যতিব্যস্ত করে রাখলেও কাজের কাজ করতে পারছিলেন না; নিজেকে বরং করে ফেলছিলেন ক্লান্ত। সে ক্লান্তির সুযোগ নিয়ে পরের রাউন্ডগুলোয় আধিপত্য আলীর; পরে তো নক আউটই করে দেন বিশ্বচ্যাম্পিয়নকে।

ফুটবল তো আর দুজনের ব্যক্তিগত দ্বৈরথ না। কিন্তু দলীয় খেলার মোড়কেও ওই ব্যক্তিগত লড়াইয়ে শুরুতে পিছিয়ে পরে এগিয়ে যাওয়ার অনেক নজির আছে এখানে। রোনালদো না হয় চার গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং সেরা খেলোয়াড়ের লড়াইয়ে শুরুতে অনেক এগিয়ে গেছেন। তাই বলে ‘রোপ-এ-ডোপ’ কৌশলে পরে যে প্রবলভাবে ফিরবেন না মেসি-নেইমার, তা কে বলতে পারেন!

বিশ্বকাপে এই ত্রয়ীর ‘গোল্ডেন বুট’, ‘গোল্ডেন বল’-এর লড়াইয়ে সবে তো মাত্র দুই রাউন্ড শেষ হলো!

 



মন্তব্য