kalerkantho


বুলেট শট

হ্যাটট্রিকে রোনালদোর জয়ধ্বনি

সামীউর রহমান   

১৯ জুন, ২০১৮ ০০:০০



হ্যাটট্রিকে রোনালদোর জয়ধ্বনি

ফ্রি কিক নেওয়ার আগে রোনালদো যখন দম নিচ্ছিলেন, তখন মনে হচ্ছিল রেসের আগে গজরাচ্ছে কোনো রেসিং কারের ইঞ্জিন! তাঁর রংধনুর মতো বাঁকানো শট স্প্যানিশ মানবপ্রাচীরকে পাশ কাটিয়ে, দে গেয়াকে বোকা বানিয়ে জাল ছুঁয়ে ফেলার আগেই উল্লাসে মেতে উঠেছিলেন রোনালদো। যেন শট নেওয়ার মুহূর্তেই তিনি জানতেন, এবারে গোলই হবে! ছবি : এএফপি

এই সময়ের ফুটবলে পবিত্র ত্রিত্ব কিংবা ‘হোলি ট্রিনিটি’ মেসি-রোনালদো-নেইমার। আবার এই তিনজনের ভেতর বিশ্বকাপ জেতার সুযোগটা ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোরই সবচেয়ে কম। ইউরোপের ছোট দেশ পর্তুগাল, জনসংখ্যা এক কোটির অল্প কিছু বেশি। রোনালদোর পর পর্তুগালের একাদশের আর পাঁচজন ফুটবলারের নাম বলতে বললে অনেকেই আটকে যাবেন। তাঁর তুলনায় মেসি বা নেইমারের সুযোগ বহুগুণে বেশি! ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা; দুটিই লাতিন আমেরিকার বড় দেশ, সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। জাতীয় দলে মেসি ও নেইমারকে ঘিরে থাকেন একঝাঁক তারকা। ফলে বিশ্বকাপে তারা চিরকালীন ফেভারিট, পর্তুগাল বরাবরই অনেকের কালো ঘোড়া। রাশিয়া বিশ্বকাপে তিনজনের দলেরই ভাগ্য এখন পর্যন্ত অনেকটা একই রকম! পর্তুগাল, আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল; তিন দলেরই বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচের ফল ড্র। যদিও শক্তিশালী স্পেনের সঙ্গে পর্তুগালের ড্র অনেকটা জয়েরই সমান, যেখানে সুইজারল্যান্ড ও আইসল্যান্ডের সঙ্গে ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনার ড্র করাটা অপ্রত্যাশিত। তিন দলেরই প্রথম ম্যাচ থেকে প্রাপ্তি মাত্র ১ পয়েন্ট করে, তবে রোনালদো-মেসি-নেইমার; টিমগেমও এঁদের মর্যাদার গোপন একটা লড়াই আছে। সে লড়াইয়ে ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে রোনালদো!

তিনি করেছেন হ্যাটট্রিক, মেসি করেছেন পেনাল্টি মিস আর নেইমার তো আক্ষেপে পোড়ার মতো গোলের সুযোগও তৈরি করতে পারেননি!

মেসির বিপক্ষে অভিযোগটা চিরায়ত, তিনি নাকি সেরা খেলাটা জমিয়ে রাখেন বার্সেলোনার জন্য। তবে গত কয়েক বছরে ছবি অনেকটা পাল্টেছে। ২০১৪ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ফাইনালে উঠল, কিংবা দুটি কোপা আমেরিকাসহ মোট তিনটি টুর্নামেন্টের ফাইনালে খেলল সে তো মেসি-জাদুতে ভর করেই। এমনকি বিশ্বকাপ বাছাই পর্বেও টালমাটাল অবস্থায় ‘নক-আউট’ হয়ে ওঠা শেষ ম্যাচটায় ইকুয়েডরের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও শেষ পর্যন্ত ‘আলবিসেলেস্তে’রা যে বিশ্বকাপে খেলছে, সে তো মেসি হ্যাটট্রিক করেছিলেন বলেই! আইসল্যান্ডের বিপক্ষে মেসির পেনাল্টি মিস সমর্থকদের মনে সাময়িক হতাশার মেঘ জমালেও ভবিষ্যতে সেটা কেটে যাবারই প্রত্যাশা।

নেইমার চোট থেকে ফিরে মাঠে নেমে ছন্দটা ফিরে পাওয়ার আগেই সুইসদের কাছে এমন মার খেয়েছেন, যেমনটা ১৯৮৮-র পর কেউ হজম করেনি! তিউনিসিয়ার ফুটবলাররা ইংল্যান্ডের অ্যালান শিয়েরারকে ১৯৯৮-র বিশ্বকাপে ফাউল করেছিলেন ১১ বার, শান্তির দেশ সুইজারল্যান্ডের ফুটবলাররা নেইমারকেই ফাউল করেছেন ১০ বার! ১৯৬৬-র পর কোনো ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারকে এক ম্যাচে এত বেশিবার ফাউল করা হয়নি।

তাঁদের দুজনের চেয়ে রোনালদোর বিশ্বকাপটা শুরু হয়েছে বেশ ‘শান্তিপূর্ণ’ভাবেই! এমনিতেই কোচ কাণ্ডে এলোমেলো স্পেন, তার ওপর ম্যাচের চতুর্থ মিনিটেই নাচোর ফাউলে পেনাল্টি পায় পর্তুগাল। স্পট কিকে গোল করে চারটি বিশ্বকাপে গোল করার কৃতিত্ব দেখান রোনালদো, যা এর আগে ছিল শুধু পেলে, উয়ে শিলার এবং মিরোস্লাভ ক্লোসার। কান টানলে যেভাবে মাথা আসে, সেভাবেই দ্বিতীয় গোলে রোনালদোর কৃতিত্বের সঙ্গে অবশ্য দাভিদ দে গেয়ার ভুলের প্রসঙ্গও আসবে। তবে সেসব তো খেলারই অংশ! তৃতীয় গোলটা করেছেন ফ্রি কিকে। ম্যাচের ৮৮ মিনিটে, দল যখন ৩-২ গোলে পিছিয়ে। ক্লাব ফুটবলেও চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দলের ফুটবলার পিকে, তিনিই স্পেনের জার্সিতে ডি বক্সের ঠিক বাইরে ফাউল করেন রোনালদোকেই। ফ্রি কিক নেওয়ার আগে রোনালদো যখন দম নিচ্ছিলেন, তখন মনে হচ্ছিল রেসের আগে গজরাচ্ছে কোনো রেসিং কারের ইঞ্জিন! তাঁর রংধনুর মতো বাঁকানো শট স্প্যানিশ মানবপ্রাচীরকে পাশ কাটিয়ে, দে গেয়াকে বোকা বানিয়ে জাল ছুঁয়ে ফেলার আগেই উল্লাসে মেতে উঠেছিলেন রোনালদো। যেন শট নেওয়ার মুহূর্তেই তিনি জানতেন, এবারে গোলই হবে!

ফ্রি কিক থেকে গোল করতে অবশ্য অনেকটা সময়ই অপেক্ষা করতে হয়েছে রোনালদোকে। এই প্রথমবার বড় কোনো আসরের মূল পর্বে ফ্রি কিক থেকে তাঁর গোল করা। এর আগে ৪৪টি ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর ৪৫তম বারে ফ্রি কিক থেকে গোল করেছেন ‘সিআর সেভেন’, তাতেই পূর্ণ হয়েছে হ্যাটট্রিক। ৩৩ বছর ১২০ দিন বয়সে বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করে এই কীর্ত গড়া সবচেয়ে বেশি বয়সী ফুটবলার বনে গেছেন রোনালদো! রোনালদোর হ্যাটট্রিকটা বিশ্বকাপের ৫১তম, তাঁর ক্যারিয়ারেরও ৫১তম। এই হ্যাটট্রিক রোনালদোকে এনে দিয়েছে স্পেন-পর্তুগাল ম্যাচের সেরা খেলোয়াড়ের সম্মাননা। আর এই সবই তিনি করেছেন স্পেনের কর আদালতে কর ফাঁকির মামলায় ১৮.৮ মিলিয়ন ইউরো পরিশোধ করতে সম্মত হওয়ার পর! রোনালদো নিজেও খুব উচ্ছ্বসিত বিশ্বকাপটা এমন সাফল্য দিয়ে শুরু করতে পেরে, তাঁকে নিয়ে গর্বিত সতীর্থরাও। রোনালদো হ্যাটট্রিকের পর জানিয়েছেন, ‘আরেকটি ব্যক্তিগত অর্জনের পর ভালো লাগছে, আমার ক্যারিয়ারে আরেকটি পালক যোগ হলো।’ স্পেনের সঙ্গে ড্র করার কৃতিত্বে সতীর্থদের বড় ভূমিকা দেখছেন রোনালদো, ‘আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটা হচ্ছে, বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিটদের বিপক্ষে গোটা দল যেভাবে খেলল সেটাই।’ রোনালদোর এমন পারফরম্যান্সে উচ্ছ্বসিত সতীর্থ বের্নার্দো সিলভার মন্তব্য, ‘সে যখন এভাবে খেলে, তখন যেকোনো কিছুই সম্ভব।’

রোনালদোর ফেসবুক পাতায় ১৪ জুন বিশ্ব রক্তদাতা দিবসে তাঁর হাসিমুখের ছবি। নিয়মিত রক্ত দেওয়া রোনালদো এ জন্য শরীরে উল্কিও আঁকান না। যেখানে নেইমার ও মেসি তাঁদের দেহে আঁকিয়ে নিয়েছেন হরেক নকশার উল্কি। নিজেকে সেখানে আলাদা করে রাখা রোনালদো বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচের পারফরম্যান্সেও বাকি দুজনকে ছাড়িয়ে। কেউ পেনাল্টি মিসের হতাশায় মুষড়ে পড়েছেন তো কেউ ফাউলে জর্জরিত। রোনালদোই হাসছেন হ্যাটট্রিকের হাসি!

 



মন্তব্য