kalerkantho


বরফরাজ্যে আটকে গেলেন মেসি

মস্কো থেকে প্রতিনিধি   

১৯ জুন, ২০১৮ ০০:০০



বরফরাজ্যে আটকে গেলেন মেসি

প্রথমার্ধে এই পেনাল্টি পেলে তা হতো মাঠের উল্টোদিকে। দ্বিতীয়ার্ধে হওয়ায় সেটি একেবারে চোখের সামনে। গ্যালারি পেরিয়ে মাঠ ২০ হাত দূরত্বে; এরপর পেনাল্টি স্পট আর কত দূরে! স্পার্তাক স্টেডিয়ামে লিওনেল মেসির ওই পেনাল্টি দেখার জন্য ঘাড় একটু বাঁকাও করতে হলো না। একটু ভালোভাবে দেখার জন্য জায়ান্ট স্ক্রিন কিংবা দুরবিনের লেন্সেও চোখ রাখতে হলো না।

ম্যাচের তখন ৬৪তম মিনিট। আর্জেন্টিনা-আইসল্যান্ড দ্বৈরথ ১-১ গোলের সমতায়। ম্যাক্সিমিলিয়ানো মেসাকে ফাউল করলে পেনাল্টি পায় ‘আলবিসিলেস্তে’রা। আইসল্যান্ডের ফুটবলাররা প্রতিবাদ করছেন ওদিকে; এদিকে মেসি হাতে তুলে নিয়েছেন বল। পরম মমতায় তা বসান পেনাল্টি স্পটে। কত কিছুই হয়তো তখন বয়ে যাচ্ছে মনের ভেতর দিয়ে! পরম আরাধ্য বিশ্বকাপ জয়ে প্রথম পদক্ষেপটি ভালোভাবে নেওয়ার সুযোগ; আগের দিন হ্যাটট্রিক করা চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোকে মোক্ষম জবাব দেওয়ার উপলক্ষ্য—আরো কত কি!

বল বসিয়ে কয়েক পা পিছিয়ে আছেন মেসি। স্পার্তাক স্টেডিয়াম তখন রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষায়। হঠাৎ যেন থমকে যায় মহাকাল!

পরের মুহূর্ত উল্লাসে ফেটে যাওয়ার জন্যই ছিল সে অপেক্ষা। কিন্তু তা যে আরো স্তব্ধতায় ডুবিয়ে দেয়! আইসল্যান্ডের পাগলপারা সমর্থকদের অংশটুকুন ছাড়া সবাই বিস্ময়ে বিমূঢ়। কারণ পেনাল্টি মিস করেছেন লিওনেল মেসি! পরের অংশেও আর কোনো গোল না হওয়ায় আইসল্যান্ডের সঙ্গে ১-১ ড্রতে বিশ্বকাপ মিশন শুরু হলো আর্জেন্টিনার।

পেনাল্টি মিস করেননি কে! পেলে করেছেন, বিশ্বকাপের মহামঞ্চে ডিয়েগো ম্যারাডোনা মিস করেছেন। মিশেল প্লাতিনি, জিকো, সক্রেতিস, রবের্তো বাজ্জো—কিংবদন্তিদের নামের ভারে তালিকাটি ন্যুব্জ। আর্জেন্টিনা-আইসল্যান্ডের এই ম্যাচে ম্যারাডোনা ছিলেন স্পার্তাকের গ্যালারিতে। তাঁর ভুবনভোলানো, ভালোবাসায় মোড়ানো রঙিন উপস্থিতি নিয়ে। তাঁর জাদুকরী ফুটবল যাঁর খেলায় দেখা যায় হালফিলে, সেই মেসির পেনাল্টি মিসের পর হাহাকার তাঁর অভিব্যক্তিতে। ঘাড় ঘুরিয়ে দুরবিনের লেন্সে চোখে রেখে বোঝা গেল তা। তবে ম্যাচ শেষের প্রতিক্রিয়ায় অনুজকে কিন্তু কাঠগড়ায় দাঁড় করাননি তিনি, ‘আমি টানা পাঁচটি পেনাল্টি মিস করেছি। তবু তো আমি ডিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনাই।’

তা ঠিক। টানা পাঁচ পেনাল্টি মিস করলেও ম্যারাডোনা ম্যারাডোনাই রয়েছেন। যেমনটা মেসি রয়েছেন মেসিই। তবু পেনাল্টি স্পট থেকে তাঁর ব্যর্থতা খেলোয়াড়ি দক্ষতার সঙ্গে মানানসই নয়। ২০১৬ কোপা ফাইনালে চিলির বিপক্ষে পেনাল্টি মিস করেছিলেন। ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে ক্যারিয়ারে ৮৮ পেনাল্টির মধ্যে গোল দিয়েছেন ৭১টি। সাফল্য ৮০.৬৮ শতাংশ। আর্জেন্টিনার হয়ে ১৬ পেনাল্টির ১২টি গোল; চারটি মিস। ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে সর্বশেষ সাত পেনাল্টির মধ্যে চারটি মিস করলেন তিনি। একটু বেশি বেশিই নয় কি!

নিজের পেশাদার ক্যারিয়ারের এক হাজারতম গোল পেনাল্টিতেই দিয়েছিলেন পেলে। তবু আত্মজীবনীতে তাঁর উপলব্ধি, ‘গোল করার কাপুরুষোচিত উপায় হচ্ছে পেনাল্টি।’ সেভাবে যখন গোল করতে পারছেন না, অন্যভাবে তো পারবেন মেসি। আইসল্যান্ডের বিপক্ষে পারেননি তা-ও। ওই বরফরাজ্যে বারবার আটকে গেছেন তিনি। গোলে ১১টি শট নিয়েও খুঁজে পাননি জাল। বিশ্বকাপে কোনো আর্জেন্টাইনের জন্য যা সর্বোচ্চ। আর সব মিলিয়েই সর্বোচ্চ ১৯৬৬ আসরের পর। সেবার ইতালির স্ট্রাইকার লুইগি রিভা সুইডেনের বিপক্ষে গোলমুখে ১৩ শট নিয়েও গোল করতে পারেননি।

আর্জেন্টিনা জিততে পারেনি বলে মেসির পেনাল্টি মিস বারবার উঠে আসছে ময়নাতদন্তে। কিন্তু আর্জেন্টিনা কি খেলেছেও আর্জেন্টিনার মতো? ৪-২-৩-১ ফরমেশনে রক্ষণভাগে নিকোলাস ওতামেন্দি, মার্কোস রোহো, নিকোলাস তাগলিয়াফিকো ও এদুয়ার্দো সালভিও অরক্ষিত হয়ে পড়ছিলেন বারবার। গোলরক্ষক উইলি কাবাইয়েরোও আস্থার প্রতীক নন। তাঁর ভুল পাসে রোহোর সঙ্গে ভুল-বোঝাবুঝিতেই ম্যাচের দশম মিনিটেই এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ আসে আইসল্যান্ডের সামনে। একা গোলরক্ষককে পেয়েও বিয়ারনাসন যে কিভাবে বলটি বাইরে মারলেন!

১৯তম মিনিটে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। ওপরে ওঠা রোহোর কাছ থেকে বল পেয়ে সের্হিয়ো আগুয়েরো দুর্দান্ত টার্নে চকিত শটে করেন গোল। তৃতীয় বিশ্বকাপে এসে এটি তাঁর প্রথম গোল! যাতে গনসালো হিগুয়াইনকে বাদ দিয়ে তাঁকে একাদশে রাখার যৌক্তিকতা করেন প্রমাণ। কিন্তু এ অগ্রগামিতা যে পাঁচ মিনিটও ধরে রাখতে পারেনি আর্জেন্টিনা! এবার সিগুর্দসনের প্রচেষ্টা কোনোমতে ঠেকাতে পারেন কাবাইয়েরো, তবে ফিরতি বলে ফিনবোগাসন আর ভুল করেননি। গোল খাবার ৪ মিনিট ১৫ সেকেন্ড পরই তা শোধ করে দেয় আইসল্যান্ড।

আর্জেন্টিনা এলোমেলো হয়ে যায় আরো। রক্ষণের সামনে হাভিয়ের মাসচেরানো ও লুকাস বিলিয়া যথেষ্ট সুরক্ষা দিতে পারেন না। বিশেষত আইসল্যান্ডের প্রতি-আক্রমণের সময় তাদের গতিহীনতা ছিল প্রবল। তাতে তো আরো কয়েকটি ওপেনিং পেয়ে যায় আন্ডারডগরা। প্রথমার্ধের একেবারে শেষদিকে সিগুর্দসনের গোল না পাওয়াটাও ছিল দুর্ভাগ্য।

রক্ষণের মতো অ্যাটাকিং থার্ডেও পরিকল্পনাহীন আর্জেন্টিনা। দুই উইংয়ে আনহেল দি মারিয়া ও মেসা বিল্ডআপে রাখতে পারেননি কোনো ভূমিকা। বিশেষত অভিজ্ঞ দি মারিয়া ছিলেন হতাশাজনক। বল পেয়েছেন প্রচুর, ড্রিবলিংয়ে সাফল্য ও ফাইনাল পাস সে তুলনায় বড্ড কম। সব দায়িত্ব তাই কাঁধে তুলে নিতে হয় মেসিকেই। কিন্তু আইসল্যান্ড কি আর পাঁচবারের ব্যালন ডি’অর জয়ীকে এমনিতেই ছেড়ে দেবে! ছেঁকে রেখেছিল তারা এই জাদুকরকে। সতীর্থদের বল ছেড়ে ফিরতি পাস তাই পাননি তেমন। নিজের প্রচেষ্টাগুলো সীমিত রাখতে হয় দূরপাল্লার শটে। এমন কয়েকটি শট বার ঘেঁষে, পোস্ট উঁচিয়ে গেছে বটে। কিন্তু তেকাঠির পেছনে জালের চুমু আর পায়নি বল।

ম্যাচ ফিটনেসের অভাবে থাকা বিলিয়ার পরিবর্তে এভার বানেগাকে নামালে উন্নতি হয় আর্জেন্টিনার খেলায়। মেসা তখন ইনসাইড চ্যানেলে ছোটার সুযোগ পান বেশ কয়েবকার। অমন এক দৌড়েই আদায় করেন পেনাল্টি। কিন্তু সেটি আর কাজে লাগাতে পারলেন কই মেসি! বদলি হিসেবে নামা হিগুয়াইনও করতে পারেননি কাজের কাজ। হতাশার ড্রতেই তাই বিশ্বকাপ অভিযান শুরু হয় আর্জেন্টিনার।

আর আইসল্যান্ড? ২০১৬ ইউরোর প্রথম ম্যাচে ড্রতে আটকে দিয়েছিল তারা রোনালদোর পর্তুগালকে। ২০১৮ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে তাদের সামনে একই পরিসমাপ্তি আর্জেন্টিনার মেসির। আইসল্যান্ডের বরফরাজ্য ভাঙা তাই সহজ কাজ নয় মোটেই। যেমনটা আর্জেন্টিনার জন্য কঠিন হবে বিশ্বকাপ জয়হীনতার ৩২ বছরের হিমশৈল ভাঙা।

স্পার্তাকের সবুজ থেকে জার্সির হাতায় মুখের ঘাম মুছতে মুছতে বেরিয়ে যাওয়া লিওনেল মেসিও কি আর সেটি জানেন না!

 



মন্তব্য