kalerkantho


ডাউন দ্য উইকেট

কোচের সন্ধানে

সাইদুজ্জামান

২৪ মে, ২০১৮ ০০:০০



কোচের সন্ধানে

ক্রিকেটে কোচের গুরুত্বটা খুব বেশি দিনের নয়। এই সেদিনের শেন ওয়ার্নের কাছে কোচ মানে নিছকই একজন তল্পিবাহক, সে তিনি যতই জন বুকাননের মতো হাই প্রোফাইল হন না কেন। আবার প্রায় একই সময়কালের ডেভ হোয়াটমোর শ্রীলঙ্কার বিশ্বকাপ জয়ের প্রেক্ষাপটে সুপারকোচের মর্যাদায় আসীন হয়েছেন। বব উলমার ল্যাপটপ কোচ আখ্যা পেয়েছেন। মোদ্দাকথা, সেসময় বড় আর ছোট দলে কোচের মর্যাদায় যথেষ্টই বৈপরীত্য ছিল। বড় দলের তারকারা ছড়ি ঘোরাতেন কোচের ওপর, ছোট দলের ক্ষেত্রে উল্টোটা।

বাংলাদেশের মতো ‘উন্নয়নশীল’ ক্রিকেট দেশে তো কোচই সর্বেসর্বা। অবশ্য এই ক্ষমতা শুধু বিদেশিদের জন্য বরাদ্দ। স্থানীয় কোচ মানেই ‘শিডিউল কাস্ট’, দলীয় সাফল্যে ব্র্যাকেটবন্দি হওয়ারও সুযোগ নেই। বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টের কোচ যে সরওয়ার ইমরান ছিলেন, তা কজনে স্মরণ করেন? দুঃসময় থেকে মুক্তিলাভের জন্য বর্তমান সময়ের তারকারা যে মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের কাছে ছুটে যান, তাঁর কতটা গুরুত্ব আছে বিসিবির কর্তাব্যক্তিদের কাছে? সম্প্রতি এ নামটি আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে। তবে সেটি আরেক বিদেশির চাহিদাপত্র মেনেই। গ্যারি কারস্টেন যদি প্রেসক্রিপশনে উল্লেখ না করতেন, তাহলে গাজী গ্রুপ ক্রিকেটার্স আর কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের চৌহদ্দিতেই ঘোরাফেরা করতে হতো সালাউদ্দিনকে। কারস্টেনের সূত্র ধরে মনে হচ্ছে জাতীয় দলের পরিমণ্ডলে আরেকবার প্রবেশাধিকার পেতে যাচ্ছেন তিনি, তবে সম্মান এবং সম্মানী নির্ঘাত মিলবে দেশীয় স্টাইলেই। শুধু ড্রেসিংরুমে দীক্ষা দিলেই হবে না, কর্তাব্যক্তিদেরও মন জুগিয়ে চলতে হবে সালাউদ্দিনকে। এটা বিলক্ষণ তিনিও জানেন!

অবশ্য এমন পরিস্থিতি তৈরিই হতো না, যদি রিচার্ড পাইবাস ‘হ্যাঁ’ বলে দিতেন। অথবা ফিল সিমন্সের আগ্রহে কর্ণপাত করত বিসিবি। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ‘না’ করে দিয়েছেন পাইবাস। আর সিমন্স খেলোয়াড়দের হয়ে বোর্ডের বিরুদ্ধে লড়বেন—এমন আশঙ্কার পাশাপাশি ধোয়া তোলা হলো বাংলাদেশের চাই ব্যাটিং অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কোচ। সিমন্স ভদ্রগোছের মিডিয়াম পেসার ছিলেন বটে, তবে এই ক্যারিবীয়র মূল পরিচয় কিন্তু টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান। অথচ সিমন্সকে উড়িয়ে দেওয়া হলো তিনি বোলিং ওরিয়েন্টেড বলে!

যাক, দুজনই বেশ ভালো আছেন। ক্যারিবীয় বোর্ডের কোচেস ডিরেক্টর পাইবাস আর সিমন্স কোচিং করাচ্ছেন আয়ারল্যান্ডকে। অথচ কোচশূন্য বাংলাদেশ।

গ্যারি কারস্টেন এসেছেন উপদেষ্টা হিসেবে, তাও খণ্ডকালীন। দীর্ঘ মেয়াদে কোচ খুঁজে হয়রান বিসিবি আপাতত তাঁর কাঁধেই সঁপেছে সাকিব আল হাসানদের গুরু খোঁজার দায়িত্ব। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের যুগে স্থায়ী কোচ খুঁজে পাওয়ার কঠিন কাজটা নতুন ফর্মুলায় সহজ করে নিয়েছেন কারস্টেন। সাদা এবং লাল বলের জন্য ভিন্ন ভিন্ন কোচ নিয়োগের ব্যাপারে তাঁর প্রস্তাবে সায়ও দিয়েছে বোর্ড। কারণটা পরিষ্কার। আইপিএল, বিগ ব্যাশ আর সিপিএলে নামিদামি কোচেরা ব্যস্ত। অল্প পরিশ্রমে বিপুল আয়ের সুযোগ রয়েছে যে! তাতে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট বিসর্জন দিয়ে জাতীয় দলের ‘দায়’ কাঁধে নেওয়ার মতো চেনা কোচের সংখ্যা অতি নগণ্য। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, কারস্টেনের সখ্যর সূত্র ধরে সাদা বলের জন্য উপযুক্ত কাউকে নিয়োগ দেবে বোর্ড। আর ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট থেকে খণ্ডকালীন কাউকে তুলে আনা হবে লাল বলের সংক্ষিপ্ত পরিসরের ক্রিকেটের জন্য। কোচের কাজ যদি শুধুই স্ট্র্যাটেজি নির্ধারণে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সমস্যা নেই। বিশেষ করে প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর ক্ষেত্রে এই আধুনিক যুগেও কোচের মাহাত্ম্য অতটা নেই। কিন্তু দলটা যখন বাংলাদেশের মতো উঠতি ক্রিকেট শক্তি, তখন স্থায়ী কোচের কোনো বিকল্প নেই।

কেন? বাংলাদেশের জন্য কোচের কাজ শুধুই গেম প্ল্যানিং নয়। এটা ঠিক যে দলে সাকিব, মাশরাফি বিন মর্তুজা, তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিমদের মতো পোড় খাওয়া ক্রিকেটার আছে। কিন্তু এই চার কিংবা পাঁচজনই তো দলীয় সাফল্যের অব্যর্থ অস্ত্র নন। বাকি অংশেরও ভূমিকা থাকতে হবে। সেই তরুণদের তৈরি করার ওপর সাফল্য-ব্যর্থতা অনেকখানি নির্ভর করে। এখন হবে কি, টেস্টের ‘এক্স’ কোচ তরুণ ব্যাটসম্যানের জন্য এক ধরনের স্টান্স ঠিক করে দিলেন। আবার লাল বলের ‘ওয়াই’ কোচের মনে হতেই পারে যে ওই স্টান্সটা ভুল। কিংবা বিশেষ কোনো শট খেলার কৌশলে গরমিল আছে। তখন ওই তরুণ ক্রিকেটারটি কোন কোচের পরামর্শ মেনে নিজেকে তৈরি করবে?

তা ছাড়া ‘ড্রেসিংরুম এনভায়রনমেন্ট’ বলে একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার রয়েছে। এটা অনস্বীকার্য যে প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর চেয়ে বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমে বিদেশি কোচের মানসিকতার প্রভাব অনেক বেশি। এখন দুই ফরম্যাটে খেলেন এমন যে কারোর জন্যই দুই কোচের মানসিকতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াটা কঠিন হতেই পারে। দুই কোচের মানসিকতার এই ব্যবধান ঘোচাবেন কে? আরো বড় সমস্যাও আছে। এ দেশীয় সংস্কৃতিতে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ সংশ্লিষ্টদের মনে বিস্তর প্রভাব ফেলে। সাফল্য সত্ত্বেও একজন চন্দিকা হাতুরাসিংহেকে নিয়েই তো কত মত দেখেছি। সেখানে এক জোড়া কোচকে নিয়ে ‘কথাবার্তা’ শুরু হতে খুব বেশি সময় লাগার কথা নয়। যাক, এসবই ভবিতব্য ঠিক করবে। তবে বাংলাদেশের ক্রিকেট কোচদের অতীত ঘাঁটাঘাঁটি করলে এ জাতীয় শঙ্কা অমূলক নয়।

আরো পীড়াদায়ক ব্যাপার হলো, এত দিন হেড কোচ পদে বিদেশির কোনো বিকল্প খুঁজে পায়নি বিসিবি। এর উপযুক্ত কারণও অবশ্য আছে, সে মানের কোচই যে তৈরি হয়নি কিংবা করা হয়নি। এখন সেই হেড কোচ খুঁজতেও বিদেশি উপদেষ্টার শরণাপন্ন হতে হচ্ছে বিসিবিকে।

তবে কি ধরে নেব যে, সেদিন খুব দূরে নেই যেদিন একজন পরামর্শক নিয়োগ করতেও কোনো বিদেশির সহায়তা নিতে হবে বোর্ডকে?


মন্তব্য