kalerkantho



আমার ফুটবলে আসা ক্রিকেট খেলতে গিয়ে

২০ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



আমার ফুটবলে আসা ক্রিকেট খেলতে গিয়ে

টিমগেমে কারো কারো ভাগ্যে তারকাখ্যাতি জোটে না। তবে দলের অন্দরমহলে যথেষ্টই কদর তাদের। এই যেমন, ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের কথাই ধরুন। প্রতিপক্ষের আক্রমণ ভেঙে দেওয়াই যার মূল কাজ। গতিময় ফুটবলে এমন ‘ছন্দপতন’ কার ভালো লাগে! তবে দলের প্রয়োজনে খেলোয়াড়ি জীবনে এ কাজটা নিষ্ঠার সঙ্গে করে গেছেন সাইফুল বারি টিটু। কোচিংয়েও নিষ্ঠাবান তিনি এখন ফুটবলাঙ্গনের চেনামুখ। এ সপ্তাহের সাক্ষাৎকারে তাঁর ফুটবল-জীবনই তুলে ধরেছেন নোমান মোহাম্মদ

 

প্রশ্ন : আপনার কোচের পরিচয়ের ছায়ায় ঢাকা পড়ে গেছে খেলোয়াড়ি পরিচয়। এ নিয়ে কোনো আক্ষেপ রয়েছে কি না, তা নিয়েই কথোপকথন শুরু করি।

সাইফু বারী টিটু : না, আক্ষেপ নেই। খেলোয়াড়ি জীবন নিয়ে আমার সন্তুষ্টি রয়েছে। হ্যাঁ, আমি হয়তো সে অর্থে বড় তারকা নই। কিন্তু হিসাব করে দেখুন, কোন প্রজন্মে আমি ফুটবল খেলেছি। চারপাশে কত বড় বড় তারকা। তাঁদের পাশে আমার মতো টিটুকে একটু ম্লান তো লাগবেই। পরবর্তী সময়ে কোচিংয়ে এসে কিছু নামডাক হয়েছে। সামগ্রিক অর্থে আমার খেলোয়াড়ি জীবন, কোচিং জীবন—কোনো কিছু নিয়েই বড় অতৃপ্তি নেই।

প্রশ্ন : সমসাময়িক বড় বড় তারকার পাশাপাশি আপনার ননগ্ল্যামারাস ডিফেন্সিভ মিডফিল্ড পজিশনও কি আপনার তারকা হয়ে ওঠার পথে প্রতিবন্ধকতা ছিল না?

টিটু : অবশ্যই। এটি ‘ডার্টি ওয়ার্ক’ করার পজিশন। কোচদের পছন্দ হতে পারে, কিন্তু সমর্থকদের কাছে এর মূল্য সেভাবে নেই। এ জন্য দায়ী শফিকুল ইসলাম মানিক ভাই ও নাসের হেজাজি।

প্রশ্ন : দায়ী মানে?

টিটু : দায়ী মানে, তাঁরাই আমাকে এই হোল্ডিং মিডফিল্ডার বানিয়েছেন। মানিক ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দলে ওই পজিশনে খেলান প্রথম। উনিই হয়তো পরে হেজাজিকে বলেছিলেন। জাতীয় দলেও ওখানে খেলা শুরু করি। খোরশেদ বাবুল ভাই ছাড়া ওখানে খেলার মতো ফুটবলার তখন সেভাবে ছিল না।

প্রশ্ন : কোচ যে হবেন, তা খেলোয়াড়ি জীবনে ভেবেছেন?

টিটু : মোটেই না। ২০০১ সালে ফুটবলার ক্যারিয়ার শেষে বছর চারেক তো ফুটবলের সঙ্গেই ছিলাম না। ব্যবসা করতাম; ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোতে সাপ্লাইয়ের কাজ। পরে ২০০৫ সালে মোহামেডান ম্যান ইয়াং ক্যাংকে বরখাস্ত করার পর আমাকে ডাকে। ওই আবার ফুটবলে ফিরি। এখন গর্ব নিয়ে বলতে পারি, বাংলাদেশের ফুটবল কোচিংয়ের অবস্থান বদলানোয় একটা ভূমিকা রাখতে পেরেছি। ছয় হাজার টাকার সহকারী কোচের বেতন থেকে এখন মোটামুটি ভালো পারিশ্রমিক পাচ্ছি।

প্রশ্ন : গণমাধ্যমে দেখি অঙ্কটা এবার ৪৫ লাখ!

টিটু : ওই রকমই। আর এই অবস্থাটা এক দিনে পাল্টায়নি। আমি যখন গোলাম সারোয়ার টিপু ভাইকে গিয়ে বলি, ‘আমি কোচিংকে পেশা হিসেবে নিতে চাই’— উনি অবাক হয়ে বলেছিলেন, ‘তুমি পাগল নাকি?’ কিন্তু আস্তে আস্তে সে জায়গাটা তো তৈরি হচ্ছে। মারুফ ভাইয়েরও এ ক্ষেত্রে বড় অবদান রয়েছে।

প্রশ্ন : একটু ফুটবলের শুরু জানতে চাই। খেলাটির প্রতি আগ্রহ নিশ্চয় শৈশব থেকেই?

টিটু : আগ্রহ ছিল। কিন্তু ফুটবলার যে হতেই হবে, এমন কোনো ব্যাপার ছিল না। বরং বলতে পারেন, আমার ফুটবলে আসা ক্রিকেট খেলতে গিয়ে।

প্রশ্ন : তাই নাকি!

টিটু : হ্যাঁ। ওয়েস্ট ধানমণ্ডি ইউসুফ হাই স্কুলে পড়তাম। আমাদের স্কুল ফুটবলে খুব ভালো, দুইবার পুরো বাংলাদেশের মধ্যে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। কিন্তু তখন যা হতো আর কি, স্কুলের ছাত্র নয়, এমন অনেককে স্কুল দলে খেলানো হতো। আমার সুযোগ তাই হতো না। আর আমার আগ্রহের জায়গা ফুটবলের চেয়ে ক্রিকেটে বেশি ছিল। ১৯৮৪ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষার আগে আগে নির্মাণ স্কুল ক্রিকেটের জন্য আমাদের স্কুলের দল গঠনের ট্রায়াল হয় আবাহনী মাঠে। সেখানে যাই আমার বন্ধু সোহেল রানার সঙ্গে, ও বিখ্যাত ফুটবলার জুয়েল রানার বড় ভাই। জুয়েল এক বছরের ছোট, কিন্তু আমরা বড় হয়েছি একসঙ্গে। যাহোক, স্কুলের ক্রিকেট দল গঠন করার দায়িত্ব পড়ে মামুন ভাইয়ের ওপর। এই মামুন ভাইকে পুরনো দিনের সবাই চিনবেন। আবাহনী মাঠে ছোট ছোট ছেলেদের নিয়ে পড়ে থাকতেন সারা দিন। অফ সিজনে তাঁর ওখানে সালাউদ্দিন ভাই, প্রেমলাল, পাকির আলীরাও অনুশীলন করতেন। মামুন ভাই স্কুলের ক্রিকেট দলে আমাকে ওপেনার বানিয়ে দেন। আর অফ সিজনে একদিন খেলোয়াড় কম থাকায় আমাকে মাঠে নামিয়ে দেন। এরপর মামুন ভাই বলেন, ‘আরে, তুমি তো ফুটবলও ভালো খেলো।’ উনার উৎসাহেই ফুটবলে মনোযোগ দিই।

প্রশ্ন : প্রথম বুটের কথা মনে আছে?

টিটু : হ্যাঁ। সদরঘাট যাওয়ার পথে নবাবপুরে ‘অপুর স্টোর’ নামে একটি দোকান থেকে কিনি। ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার পরপর। টাকা নিয়েছিলাম আম্মার কাছ থেকে। ‘ওয়েলকো’ নামের বুট কিনি; সঙ্গে আবাহনীর নীল জার্সি, নীল শর্টস, নীল মোজা।

প্রশ্ন : আম্মার কাছ থেকে বুট-জার্সি কেনার টাকা নিয়েছেন বললেন। বাসা থেকে খেলাধুলার প্রতি উৎসাহ ছিল নাকি?

টিটু : ঠিক সেভাবে বলা যাবে না। আবার খুব একটা বাধা ছিল না। আম্মার ব্যাপারটি হয়তো নানার কাছ থেকে এসেছে। আমার নানা ওয়াজে উদ্দিন আকন্দ ছিলেন মহাখালী মডেল স্কুলের হেডমাস্টার। ওনার আরেকটি পরিচয়, ষাটের দশকে ফুটবল খেলেছেন ইপিআইডিসির মতো দলে। ছোটবেলায় মহাখালীতে নানাবাড়িতে বেড়াতে গেলে নানার পুরনো জার্সি, বুট বের করে দেখাতেন নানি। মায়ের তাই আমাদের ভাইদের খেলাধুলার ব্যাপারে প্রচ্ছন্ন একটা সায় ছিল।

প্রশ্ন : আপনারা কয় ভাই-বোন?

টিটু : তিন ভাই, আমি মেজ। আব্বা এম এ মালেক ছিলেন মূক ও বধির স্কুলের সুপারিনটেনডেন্ট। ১৯৭৩ সালে একটি কোর্স করতে ইংল্যান্ডে গিয়ে থেকে যান। ওখানে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু করেন। কিন্তু অনেক চেষ্টার পরও ওখানকার নাগরিকত্ব না পেয়ে দেশে ফিরে আসেন বছর পাঁচেক পর। আব্বা না থাকায় ওই সময়টা আমরা খুব স্বাধীনতা পেয়েছি। যদিও আম্মা আমেনা মালেক ছিলেন এলাকার আলী হোসেন গার্লস স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা হেড মিস্ট্রেস। ‘বড় আপা’র ছেলে হিসেবে এলাকার সবাই আমাদের চোখে চোখে রাখতেন যেন আমরা বিপথে যেতে না পারি।

প্রশ্ন : ছাত্র ছিলেন কেমন?

টিটু : হেড মিস্ট্রেসের ছেলে তো, পড়ালেখায় ভালো না হয়ে উপায় নেই। বেশ ভালো ছাত্র ছিলাম। এসএসসিতে পাঁচটা লেটার ছিল; ৯ নম্বরের জন্য স্টার পাইনি। সেই আমিই ফুটবল-ফুটবল করে এইচএসসিতে ১১ নম্বরের জন্য প্রথম বিভাগ পাইনি। দ্বিতীয় বিভাগে পাস করি।

প্রশ্ন : মা-বাবা রাগ করেননি?

টিটু : এক-দেড় মাস পড়ে ওই ফল করেছি, মন্দ কি! তবে আব্বা খুব রেগে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘বাসা থেকে বেরিয়ে যা’। বড় ভাই সাইফুল কায়সার মিঠু আমাকে খুব সমর্থন দিতেন। এমনিতে মোটা দাগে বললে, সেই সময়ে পড়ালেখার পাশাপাশি ছেলেরা খেলবে—এটিই ছিল নিয়ম। খেলাধুলায় আমার আগ্রহ ছিল খুব। ছোটবেলাতেই ভারতের ‘খেলার আসর’, ‘খেলার কাগজ’ পত্রিকাগুলোর সঙ্গে পরিচয় হয়ে গিয়েছে। পিকে ব্যানার্জির ‘উইং থেকে গোল’ বের হতো কিশোর আনন্দমেলায়; রীতিমতো গিলতাম তা। মনোরঞ্জন কে, গৌতম ভট্টাচার্য কে—সব মুখস্থ ছিল। জালাল মামা নামে দূরসম্পর্কের এক আত্মীয় থাকতেন আমাদের বাসায়। ওনার সঙ্গে খেলা দেখতে ঢাকা স্টেডিয়ামে যেতাম। মনে আছে, ১৯৭৬ সালে আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচে আমরা দুই ভাই তাঁর সঙ্গে গিয়েছি। সোহরাব ভাইয়ের গোলে আবাহনী জেতে। নানা-মা-খালাদের সঙ্গে ম্যাচ দেখেছি আগা খান গোল্ডকাপ; আলী বাকের, ইসা বাকেররা এসেছিল যেবার। শামসু ভাইয়ের গোলে আবাহনী যে জেতে মালয়েশিয়ার পেনাং ক্লাবের বিপক্ষে, সে খেলা দেখি স্টেডিয়ামে বসে। মামুন ভাই তো বলেন, আমার খালা আবাহনীর গ্যালারিতে প্রথম মহিলা দর্শক। ওই পারভীন খালা মাত্র ২২ বছর বয়সে মারা যান। মানে আমি যেটা বলতে চাইছি, খেলাধুলার একটা আবহ আমাদের বাসায় ছিলই।

প্রশ্ন : আপনি ফুটবল খেলবেন, এটি কখন মনে হয়?

টিটু : অনেক পরে। অনেক অনেক পরে। বাসা থেকে লুকিয়ে একা একা স্টেডিয়ামে গিয়ে স্টেডিয়ামে খেলা দেখার সময় তা মনে হয়নি। ১৯৮৪ সালে পাইওনিয়ারে ‘ইস্ট বেঙ্গল’ ক্লাবে খেলার সময়ও না। তিন খেলায় পাঁচ গোল যে করলাম, তখনো মনে হয়নি আমাকে ফুটবলার হতে হবে। পরে কিভাবে কিভাবে যেন ফুটবলের মায়ার জড়িয়ে যাই।

প্রশ্ন : পাইওনিয়ারে তিন খেলায় পাঁচ গোল—ডিফেন্সিভ মিডফিল্ড পজিশন থেকে!

টিটু : আরে নাহ্, আমি তো তখন পুরোপুরি স্ট্রাইকার।

প্রশ্ন : শুরুতে যে বলছিলেন মানকি ভাই ও হেজাজির কথা। তা স্ট্রাইকার পজিশন ছাড়লেন তাঁদের জন্য?

টিটু : ঠিক তা নয়। আমি স্ট্রাইকার পজিশন ছেড়েছি দুঃখ থেকে। পাইওনিয়ারে এক ম্যাচে আমি অনেকগুলো গোল মিস করি। খুব সমালোচনা করা হয়। ১৯৮৫ সালে আরেক ‘ইস্ট বেঙ্গল’ নামের ক্লাবে খেলি তৃতীয় বিভাগে। সেখানেও এক ম্যাচে পেনাল্টিসহ অনেকগুলো গোলের সুযোগ মিস করি। আবারও অনেক সমালোচনা। দুঃখ থেকে ১৯৮৬ সালে আমি পুরোপুরি মিডফিল্ডার হয়ে যাই। মানিক ভাই পরে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার বানিয়ে দেন।

প্রশ্ন : শৈশবে কোনো হিরো ছিল?

টিটু : আবাহনীর ফুটবলাররাই আমার হিরো। সবচেয়ে বড় হিরো সালাউদ্দিন ভাই। আশীষদা, চুন্নু ভাই, এমিলি ভাইদের খেলা দেখেও অনুপ্রাণিত হতাম খুব।

প্রশ্ন : প্রথম বিভাগে প্রথম খেলেন কোন ক্লাবে?

টিটু : ধানমণ্ডি ক্লাবে, ১৯৮৭ সালে। তখন বিটিভির খেলার খবরে ঢাকা লিগের ক্লিপিংস দেখানো হতো। সেগুলো বাসার ভিসিআরে রেকর্ড করে রাখা হতো। অনেক ফুটেজ ছিল। কিন্তু বাসায় একবার চুরি হয়, সব খোয়া যায়। ১৯৮৯ প্রেসিডেন্ট গোল্ড কাপে সবুজ দলে খেলে যে ‘টু ইন ওয়ান’ পুরস্কার পাই, তা-ও চুরি হয়ে যায়। ওই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ লাল দলের ফুটবলারদের টেলিভিশন এবং সবুজ দলের খেলোয়াড়দের টু ইন ওয়ান পুরস্কার দিয়েছিল। এমন অনেক কিছু আমার ঘর থেকে চুরি হয়ে যায়।

প্রশ্ন : এই পর্যায়ের ফুটবলে প্রথম পারিশ্রমিক পান কোন ক্লাবে?

টিটু : পাইওনিয়ারে আমি কোনো টাকা পাইনি; চাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তৃতীয় বিভাগে প্রথমবার খেলার সময়ও না। পরেরবার লালমাটিয়া ক্লাব আমাকে নিতে চায়; পাঁচ শ টাকা দেয়। কিন্তু মামুন ভাই এতে খুব রাগ করেন। পরে ওই দুই ক্লাবের সমাঝোতায় আমার আর ইস্ট বেঙ্গল ছাড়া হয়নি। ওই ক্লাব থেকে লালমাটিয়াকে ৫০০ টাকা দিয়ে দেওয়া হয়। আমি যে ওদের কাছ থেকে টাকাটি নিয়েছিলাম, সেটিই ফুটবলে আমার প্রথম পারিশ্রমিক বলতে পারেন।

প্রশ্ন : ধানমণ্ডিতে?

টিটু : তৃতীয় বিভাগে দুই মৌসুম খেলার পর ওই ক্লাবের পটু ভাই আমাকে একদিন তাঁর বাসায় ডাকেন। বলেন, ‘তোমার জন্য দুটো ক্লাবের প্রস্তাব আছে। ধানমণ্ডি ক্লাব আর আবাহনী ক্লাব। তুমি ধানমণ্ডিতে গেলে নিয়মিত খেলতে পারবে; তবে আবাহনীতে গেলে জার্সি পেলেও খেলতে পারবে কি না—এ নিশ্চয়তা দিতে পারি না।’ তাঁর পরামর্শ মেনে আমি ধানমণ্ডিতে যাই। প্রথম মৌসুমে ঈদ বোনাস পাই শুধু, সম্ভবত দেড় হাজার টাকা। ১৯৮৮ সালে পাই হাজার পাঁচেক টাকা।

প্রশ্ন : ঢাকা লিগে সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পেয়েছেন কোন ক্লাবে?

টিটু : মুক্তিযোদ্ধায় ছয় লাখ টাকা। ওই যে সবাই মিলে মোহামেডান-আবাহনী-ব্রাদার্স ভেঙে মুক্তিযোদ্ধা দল গড়ি, সেবার।

প্রশ্ন : প্রথম বড় ক্লাব তো মোহামেডান। ওখানে খেলার প্রস্তাব পেলেন কিভাবে?

টিটু : ধানমণ্ডিতে দুই মৌসুম খেলি। অনেকে হয়তো জানেন না, ওই সময় দ্বিতীয় বিভাগে আমি ক্রিকেটও খেলেছি। রায়েরবাজার অ্যাথলেটিক ক্লাবে; ওপেনার হিসেবে। ১৯৮৮ সালে বন্যা-পরবর্তী সময়ে ফুটবল মৌসুমটা বদলে যায়। আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচে আসলাম ভাই-রনজিত্দাদের বহিষ্কারাদেশেরও তাতে ভূমিকা ছিল। ফুটবলটা শীতে চলে আসার পর আমাকে একটি খেলা বেছে নিতেই হতো। আর ওই সময় ফুটবল বাদ দিয়ে ক্রিকেট বেছে নেবে কে! আর এর আগেই তো নির্মাণ স্কুলের সেরা ৩০ জন নিয়ে একটি ট্রেনিং ক্যাম্প হয়েছিল। সেখানে সুযোগ পাই; কিন্তু এক দিন গিয়ে আর যাইনি। ফুটবলে আগ্রহটা বাড়ছিল তখন। পরে দ্বিতীয় বিভাগে ক্রিকেট খেললেও ফুটবল শীতে চলে যাওয়ার পর ক্রিকেট ছেড়ে দিই।

প্রশ্ন : মোহামেডানে...

টিটু : ও হ্যাঁ, ধানমণ্ডিতে দুই মৌসুম খেলার পর আমি প্রস্তাব পাই পাঁচটি ক্লাব থেকে। মোহামেডান, আবাহনী, মুক্তিযোদ্ধা, ফকিরাপুল—সঙ্গে ধানমণ্ডিতে থাকার প্রস্তাব তো ছিলই। শুরুতে আবাহনীর সঙ্গে কথা পাকাপাকি হয়। ওদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দলে খেলার সুবাদে মোহামেডানের সঙ্গে আমার খুব ভালো সম্পর্ক। কায়সার ভাই, সাব্বির ভাই, কানন ভাই, জনি ভাই, মানিক ভাইরা সব মোহামেডানের খেলোয়াড়। জাতীয় দলের ক্যাম্প থেকে মোহামেডানের কর্মকর্তারা আমাকে নিয়ে যায় তাদের ক্লাবে। ওরা তো মিষ্টি খাচ্ছে আমাকে পেয়ে যাওয়ার আনন্দে। আমি মোহামেডানকে ‘না’ বলতে পারিনি। ছোটবেলা থেকে খুব লাজুক ছিলাম বলে স্পষ্ট করে তা বলতে পারি না। পরে আবার একদিন জাতীয় দলের ক্যাম্প থেকে খেলোয়াড়দের নিজ নিজ ক্লাবে নেওয়ার শোডাউন দেয় বড় বড় দলগুলো। আমাকে জিজ্ঞেস করে, তুমি কোন ক্লাবের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যাবে। আমি বলি, আবাহনী। কারণ আবাহনীতে যাওয়ারই ইচ্ছা ছিল আমার।

প্রশ্ন : তাহলে মোহামেডানে গেলেন কেন?

টিটু : ওই যে, ‘না’ বলতে পারি না। দলবদলের আগে গভীর রাতে মোহামেডানের কর্মকর্তা প্রিন্স ভাই এসে আমাকে নিয়ে যান ওই ক্লাবের গভর্নিং কাউন্সিলের চেয়ারম্যান কর্নেল মালেকের বারিধারার বাসায়। ওখানে গিয়েই যাই ফেঁসে। আমি মোহামেডানে নাম লেখানোয় ঝামেলা কম হয়নি। আবাহনীর সমর্থকরা আমার বাসায় গিয়ে ঢিল ছুড়ে কাচ ভেঙে দেয়। আমি বাসায় ছিলাম না। আব্বা লাইসেন্স করা পিস্তল নিয়ে বেরিয়েছিলেন পর্যন্ত।

প্রশ্ন : ওই আবাহনীতে তো ক্যারিয়ারে আর খেলাই হয়নি। এ নিয়ে কোনো আফসোস?

টিটু : আফসোস নেই বললে ভুল হবে। চুন্নু ভাইরা আমাকে তখন পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন সাবের ভাইয়ের সঙ্গে। বলেছিলেন, পাড়ার প্রথম ফুটবলার হিসেবে আবাহনীর জার্সি উঠবে আমার গায়ে। তা তো আর হলোই না। এ নিয়ে কিছুটা আক্ষেপ আমার এখনো আছে।

প্রশ্ন : প্রস্তাব পাননি পরে?

টিটু : পেয়েছি, কিন্তু কিভাবে কিভাবে যেন যাওয়া হয়নি। পাঁচ মৌসুম মোহামেডানে খেলি। এরপর পাঁচ মৌসুম মুক্তিযোদ্ধায়। শেষে মোহামেডানে ফিরে এক মৌসুম পুরোপুরি খেললাম; দ্বিতীয় মৌসুমে ২০০১ সালে ফেডারেশন কাপের সেমিফাইনালে মোহামেডান হেরে যাওয়ার পর ওই রাতেই ক্লাবে গিয়ে ঘোষণা দিই, খেলা ছেড়ে দিলাম।

প্রশ্ন : ১৯৯৪ সালে মুক্তিযোদ্ধা দল গঠনের প্রেক্ষাপট অনেকের কাছ থেকেই শুনেছি। আপনার কাছেও একটু জানতে চাই...

টিটু : ওটা না করে আমাদের উপায় ছিল না। মুন্না ভাই একবার সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পেলেন ২০ লাখ টাকা; আসলে ১৬ লাখ পেয়েছিলেন, বাকিটা আবাহনী দেয়নি। সাব্বির ভাই সেবার মোহামেডান থেকে ১৯ লাখ টাকা পান ক্যাশ। পরের মৌসুমেই আবাহনী-মোহামেডান-ব্রাদার্স মিলে ‘জেন্টলম্যানস অ্যাগ্রিমেন্ট’ করেন। আগে মৌসুমে ১০-১৫ লাখ টাকার ফুটবলারদের প্রস্তাব করা হয় তিন-চার-পাঁচ লাখ টাকা। সবার মাথা খারাপ! তখনই একেবারে শেষ দিকে মুক্তিযোদ্ধায় যাওয়ার একটা উদ্যোগ নিই আমরা। কিন্তু আবাহনীর ফুটবলাররা শেষ পর্যন্ত যায় পিছিয়ে। ওরা শুনেছি, বেক্সিমকোতে গিয়ে সালমান এফ রহমানের সঙ্গে কথা বলে অন্য রকম চুক্তি করে। পুলের কথা বাইরে থাকবে, এর বাইরে আবাহনীর ফুটবলাররা বাড়তি টাকা পাবে। এ কারণে ওরা পিছিয়ে যায়; যে কারণে সেবার হয়নি।

প্রশ্ন : পরেরবার হলো কিভাবে?

টিটু : সেবার আবার উল্টো অবস্থা। মোহামেডান সেবার আমাদের সঙ্গে কথা বলে অন্যভাবে—মুখে পুল থাকবে কিন্তু এর বাইরে ভালো টাকার প্রস্তাব দেয়। সঙ্গে আমার সেবার মোহামেডানের অধিনায়ক হওয়ার কথা। আবাহনীর কিছু ফুটবলার আবার তখন বেকায়দায় পড়ে যায়। সেবার মনজুর কাদেরকে মুক্তিযোদ্ধা ম্যানেজার করে; উনি অমলেশদাকে দায়িত্ব দেন আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের। আমরা বলি যে, মোহামেডানের ফুটবলাররা সম্ভবত যাব না। পরে খেলোয়াড় সমিতির এক মিটিং হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আবাহনীর রুমী ভাই দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দেয়, ‘আমাদের ফুটবলারদের মধ্যে কোনো ঐক্য নেই।’ মোহামেডানের জুয়েল রানা খেপে দাঁড়িয়ে গিয়ে বলে, ‘চলুন, কোন ক্লাবে যেতে হবে—যাব।’ ওই দিনই কাদের ভাইয়ের বাসায় গিয়ে সব ঠিকঠাক করে আসি।

প্রশ্ন : কায়সার হামিদ, সাব্বির ও মোনেম মুন্না আপনাদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধায় যাননি। কেন?

টিটু : মুন্না ভাইকে তো বলাই হয়নি। এর সঙ্গে ক্লাব রাজনীতির অনেক কিছু জড়িত; আমি এত দিন পর তা বলতে চাই না। তবে কায়সার ভাই ও সাব্বির ভাই আমাদের সঙ্গে শুরু থেকেই ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কী ভেবে মোহামেডানে থেকে যান। এই ঘটনায় আমার ক্ষতি হয় সবচেয়ে বেশি। আর কখনো জাতীয় দলে আমাকে ডাকা হয়নি। পুরো ঘটনায় আমাকে নেতা বানানো হয়। কিন্তু আমি নেতা ছিলাম না। কায়সার ভাইরা আমাকে নেতা বানিয়ে জাতীয় দলে খেলার পথ বন্ধ করে দেন। মোহামেডানে খেললে অবশ্যই জাতীয় দলে খেলতাম আরো।

প্রশ্ন : জাতীয় দলের হয়ে সাফ গেমস খেলেছেন কটি?

টিটু : তিনটি। ১৯৮৯, ১৯৯১ এবং ১৯৯৩ সালে।

প্রশ্ন : ওই তিন সাফে বাংলাদেশের দল তো খারাপ ছিল না। কিন্তু কোনোবার স্বর্ণপদক জিততে পারেনি কেন?

টিটু : ১৯৮৯ সালের দলটি ছিল দুর্দান্ত। নাসের হেজাজি দারুণভাবে দল সাজান। কানন ভাই, মুন্না ভাই, কায়সার ভাই, রেহান ভাই, জনি ভাই, আমি, রুপুদা, মানিক ভাই, সাব্বির ভাই, রুমী ভাই, মিজান—এই ছিল দল। আমি প্রতিটি ম্যাচ খেলেছি সেবার। ফাইনালে পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের জেতা উচিত ছিল। ওদের চায়নিজ কোচের স্ট্রাটেজিতে মারা শুরু করে সাব্বির ভাইকে। বল ছাড়া ঘুষি মেরে দেয়। সাব্বির ভাই ‘অফ’ হয়ে যাওয়ায় আমাদের পুরো দলের খেলা ছন্নছাড়া হয়ে যায়। মারকুটে খেলার মুখে মিজানও খুব গুটিয়ে ছিল। কিন্তু ইলিয়াস ভাই সাসপেন্ড থাকায় কোচের হাতে বিকল্প কোনো ফুটবলার ছিল না।

প্রশ্ন : আর ১৯৯৩ সালে নিজ মাটিতে ব্যর্থতার কারণ?

টিটু : আমার দেখা সেরা আধুনিক কোচ ওল্ডরিখ সোয়াব। তবে কোচের দুটো ভুলের কথা এখন আমার মনে হয়। এক নম্বর, কায়সার ভাইকে রাইট ব্যাকে খেলানো। দুই নম্বর, মুন্না ভাই ও রুপুদাকে হোল্ডিং মিডফিল্ডে খেলানো; দুজন হোল্ডিং মিডফিল্ডারের প্রয়োজন আসলে ছিল না। আরেকটি ব্যাপার হলো, সেই দলের মাঠের খেলার পরিকল্পনা খুব ভালো হলেও মাঠের বাইরে দলের রসায়ন তৈরি করতে পারেননি সোয়াব। সব মিলিয়েই আমরা পারিনি। আরেকটি কথা, আমি কিন্তু সেই সাফের একটি ম্যাচেও খেলিনি। অতিরিক্ত ফুটবলার হিসেবে বসে ছিলাম।

প্রশ্ন : ক্যারিয়ারে সাফল্য তো কম পাননি। সবচেয়ে স্মরণীয় কোনটি?

টিটু : বললে অনেকের পক্ষে বিশ্বাস করা কঠিন যে, আমার লিগ চ্যাম্পিয়নশিপ মাত্র দুটো। মোহামেডানে একবার; মুক্তিযোদ্ধায় একবার। এর মধ্যে আনন্দটা বেশি মুক্তিযোদ্ধায়। ওই ক্লাবে গিয়ে আমাদের অনেক কিছুর সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তৃতীয় মৌসুমে গিয়ে লিগ চ্যাম্পিয়ন হতে পারায় মনে হয়, মুক্তিযোদ্ধায় নাম লেখানোয় আমাদের যে প্রতিবাদ, তা পূর্ণতা পেয়েছে। আর সেবার মোহামেডানের বিপক্ষে প্রথম পর্বের ম্যাচে আমার পায়ে লেগে একটি আত্মঘাতী গোল হয়ে যায়। তখন অনেকে বলেন, মোহামেডানকে টিটু ইচ্ছে করে ছেড়ে দিয়েছে। সুপার লিগে সব ম্যাচ জিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়াটা তাই সব দিক মিলিয়েই আমার জন্য বেশি তৃপ্তির।

প্রশ্ন : ক্যারিয়ারের স্মরণীয় কিছু ম্যাচের কথা যদি বলেন?

টিটু : জাতীয় দলের হয়ে সব ম্যাচ স্মরণীয়। ১৯৮৯ প্রেসিডেন্ট গোল্ড কাপে সবুজ দলের হয়ে ভারতকে হারানোটা মনে আছে খুব। মোহামেডানের হয়ে ১৯৯৩ লিগে তিনটি গোল করি। অগ্রণী ব্যাংক ও ভিক্টোরিয়ার বিপক্ষে উইনিং গোল। আর রহমতগঞ্জের বিপক্ষে নকীব হ্যাটট্রিক করার পর আমি একটি গোল করি। এগুলো স্মরণীয়। এ ছাড়া মোহামেডানের হয়ে এশিয়ান ক্লাব কাপে আমার দুটো গোল আছে মালদ্বীপে নিউ রেডিয়েন্টের বিপক্ষে। গোলগুলোর কথা বললাম কেন, আমার পজিশন যে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ড সেখানে আলাদা করে ভালো খেলার কথা মনে করা কঠিন।

প্রশ্ন : আপনার সমসাময়িক ফুটবলারদের মধ্যে সেরা গোলরক্ষক, ডিফেন্ডার, মিডফিল্ডার ও স্ট্রাইকার কাকে বলবেন?

টিটু : একজন করে বেছে নেওয়া কঠিন। আমি যাঁদের সঙ্গে বেশি খেলেছি, তাঁদের প্রতি পক্ষপাত থাকাটাই স্বাভাবিক। আমি তাঁদের সেরা বলব না, বলব প্রিয়। ডিফেন্ডার হিসেবে কায়সার ভাই, মুন্না ভাই ও জুয়েল রানা তিনজনই দুর্দান্ত। আমার প্রিয় কায়সার ভাই। মিডফিল্ডার হিসেবে সাব্বির ভাই, জাকির, আরমান, ওয়াসিম ভাই, রুপুদা, নুরুল হক মানিক অনেকেই দুর্দান্ত। উইং দিয়ে খেললেও সৃজনশীলতা ও বলের সঙ্গে চুম্বকের মতো সম্পর্কের কারণে আমি একটু হলেও সাব্বির ভাইকে এগিয়ে রাখব। স্ট্রাইকার হিসেবে মিজান আমার খুব পছন্দের খেলোয়াড়; খুব ক্লাসিক প্লেয়ার। রুমী ভাই, আসলাম ভাইয়ের সঙ্গেও কিছুদিন খেলেছি। নকীবের সঙ্গে খেলেছি অনেক দিন। বেশি খেলার সুবাদে নকীবকে একটু এগিয়ে রাখছি। গোল তেমন করেনি বলে আমি মিজানকে নিতে পারছি না। কিন্তু অবিশ্বাস্য ফুটবলার ছিল ও। কায়সার ভাই, মুন্না ভাই, রেহান ভাই সবাইকে শুইয়ে দিয়েছে নিজের দিনে। স্যার স্টানলি ম্যাথুজের মতো ‘ম্যাথুজ টার্ন’ করতে পারত। কিন্তু স্ট্রাইকারদের মূল কাজ তো গোল করা। ওখানে মিজান পিছিয়ে।

প্রশ্ন : আর গোলরক্ষক?

টিটু : গোলরক্ষক হিসেবে কানন ভাই ও মহসিন ভাইকে পেয়েছি। আমি বেছে নেব মহসিন ভাইকে।

প্রশ্ন : সেরা বিদেশি?

টিটু : ঝুকভ। আমি তাঁর সঙ্গে খেলিনি, কিন্তু আবাহনীতে ওর খেলা অদ্ভুত লেগেছে! কী অবিশ্বাস্য যে খেলেছেন! মোহামেডানের রহিমভও দুর্দান্ত। এমেকার সঙ্গে মাত্র দুটো টুর্নামেন্ট খেলেছি। ও-ও অসাধারণ ফুটবলার ছিল।

প্রশ্ন : সেরা কোচ?

টিটু : নাসের হেজাজি, ওল্ডরিখ সোয়াব, ওয়ার্নার বেকেলহফট—সবাই দুর্দান্ত। প্রথম দুজনকে জাতীয় দলে পেয়েছি আর বেকেলহফট ১৯৮৮ সালে অনূর্ধ্ব-১৬ ও অনূর্ধ্ব-১৯ দলের তিন মাসের একটি ক্যাম্পের জন্য আসেন। তবে একজনকে বেছে নিতে বললে আধুনিক কোচ হিসেবে সোয়াবের কথা বলব। আর দেশিদের মধ্যে কায়কোবাদ ভাই, টিপু ভাই, রহিম ভাইরা রয়েছেন। ধানমণ্ডির পেয়ারু ভাই এবং শুরুর সেই মামুন ভাইয়ের কথাও উল্লেখ করতে হবে।

প্রশ্ন : কোচ হিসেবে আপনার স্মরণীয় সাফল্য কী?

টিটু : আমি জাতীয় দলের কোচ হয়েছি তিনবার। প্রতিবার অন্তর্বর্তীকালীন। বাফুফেতে চাকরি করতাম; অন্য কোচ বরখাস্ত হলে আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হতো। জাতীয় দলের কোচ হওয়াটা সম্মানের। আর ক্লাব দলগুলোর মধ্যে শেখ জামাল ক্লাব নিয়ে পোখরা গোল্ডকাপ এবং ফেডারেশন কাপে চ্যাম্পিয়ন হই। মোহামেডানকে নিয়ে সুপার কাপ চ্যাম্পিয়ন হই। মারুফ ভাইয়ের শেখ রাসেল সেবার ট্রেবল জেতে; ওদের সামনে ছিল চতুর্থ শিরোপার হাতছানি। সেটি আমরা আটকে দিই। মারুফ ভাইয়ের মতো কোচের দলের বিপক্ষে এটি ছিল খুব তৃপ্তির।

প্রশ্ন : একটু ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে আসি। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে একটু যদি জানান?

টিটু : আমি বিয়ে করেছি ১৯৯১ সালে। স্ত্রীর নাম রিজিয়া সুলতানা তৃষিতা। আমাদের দুই সন্তান। মেয়ে আদিবা নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে বিবিএ পড়ছে। ছেলে আরিয়ান ইউরোপিয়ান স্ট্যান্ডার্ডে ক্লাস নাইনে পড়ে। কোচিংয়ে আসার পর স্ত্রী আমাকে খুব সাহায্য করেছে। ও আমাকে পুরোপুরি ছেড়ে দিয়ে সংসার সামলেছে। ও আমার জন্য নিজের ক্যারিয়ার স্যাক্রিফায়েস করেছে। তবে এখন আবার লেখিকা হয়েছে। এবারের বইমেলাতেও দুটো বই বেরিয়েছে।

প্রশ্ন : শেষ প্রশ্ন। ক্যারিয়ার নিয়ে, জীবন নিয়ে আপনার তৃপ্তি কতটা?

টিটু : নিয়তিতে আমি বিশ্বাস করি। আমি যে ফুটবলার হয়েছি, এখন কোচিং করছি—এটি নিয়তি। আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু লায়েক আলী মাইক্রোসফটে চাকরি করে; যে টিম উইন্ডোজ সেভেন আপগ্রেড করে—ও সেই দলে ছিল। কিন্তু ওকে কজন চেনেন! ফুটবল খেলার সুবাদে আমাকে তো কমবেশি অনেকে চেনেন। বন্ধু-আত্মীয়রা আমাকে নিয়েই বরং উচ্ছাস দেখান। আমার পছন্দের জায়গা ফুটবলে জীবন কাটিয়ে দিতে পারছি—এটি অবশ্যই তৃপ্তির। জীবন নিয়েও আমি খুব সন্তুষ্ট। অতৃপ্তির জায়গা বলতে পারেন, আমি চেষ্টা করলে আরেকটু ভালো ফুটবলার হয়তো হতে পারতাম।



মন্তব্য