kalerkantho


আজ ‘ভাঙচুর’ হোক ফাইনালের মাঠে

সাইদুজ্জামান    

১৮ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



আজ ‘ভাঙচুর’ হোক ফাইনালের মাঠে

‘আর কত দিন এগুলো সহ্য করব’—প্রশ্ন নয়, তীব্র ঝাঁজালো কণ্ঠে খালেদ মাহমুদ বুঝিয়ে দিলেন উত্তরের অপেক্ষায় নেই তিনি!

অর্জুনা রানাতুঙ্গা নিশ্চয় দেখে থাকবেন যে তাঁর দেশের অধিনায়ককে তর্জনী উঁচিয়ে শাসাচ্ছেন বাংলাদেশি এক তরুণ, যিনি কিনা একাদশেই নেই! যদিও এ নিয়ে নুরুল হাসান সোহান সামান্যতম বিচলিত নন, ‘আমাকে ধাক্কা দেবে, রিয়াদ (মাহমুদ উল্লাহ) ভাইয়ের জন্য পানি নিয়ে গেছি বলে গালি দেবে আর আমি ছেড়ে দেব!’

তার আগে-পরে ‘নো বল’ দাবিতে মাঠেই মাহমুদ উল্লাহর রণমূর্তি কিংবা সীমানাদড়ির সামনে দাঁড়িয়ে সাকিবের ইঙ্গিতে ম্যাচের অকাল পরিণতির আশঙ্কা শেষ ছক্কার মতো রোমাঞ্চকর নয় বটে, তবে রোমহর্ষক অবশ্যই। ১৯৯৫ সালে মেলবোর্নের মাঠে আম্পায়ার ড্যারল হার্পারের দিকে তর্জনী উঁচিয়ে ক্রিকেটবিশ্বকে যে ‘স্টেটমেন্ট’ দিয়েছিলেন রানাতুঙ্গা, সেটাকেও কেমন যেন মলিন মনে হচ্ছে প্রেমাদাসায় সাকিব থেকে শুরু করে নুরুল হাসানের বিস্ফোরণের সামনে।

রানাতুঙ্গার প্রতিবাদের ভঙ্গিতে সেদিন প্রবল আপত্তি তুলেছিল অস্ট্রেলীয় মিডিয়া। তবে ফায়দা মিলেছিল শ্রীলঙ্কার, মুত্তিয়া মুরালিধরন তো সেই একই অ্যাকশনে বোলিং করে ম্যাচ জিতিয়ে গেছেন রানাতুঙ্গার দলকে। শুক্রবারের ঘটনাবলিতেও স্বভাবতই বাংলাদেশের পক্ষ নেয়নি লঙ্কান মিডিয়া। তবু প্রাপ্তি আছে, ২৫ শতাংশ ম্যাচ ফি জরিমানা আর একটি করে ডিমেরিট পয়েন্ট গুনেই যে নিষ্কৃতি মিলেছে সাকিব ও নুরুল হাসানের। ‘কোড অব কন্ডাক্টে’র এই কড়াকড়ির যুগে যা মামুলি সাজা বলে মানছে বাংলাদেশ দল। ম্যাচ রেফারির আপাত এই বদান্যতার পেছনে মাঠের ওই আচরণ প্রভাব বিস্তার করে থাকতে পারে ভেবে আড়ালে মুচকি হাসছেনও কলম্বোয় অবস্থানরত দলের অনেকেই।

তামিম ইকবালের ভাষান্তরে এটা ‘অ্যাটিচ্যুড’। মাঠে মাথা গরম করে অতীতে খবর হয়েছেন তিনি। সেই তাঁকে শুরুতে উত্তেজিত দেখালেও শেষ দিকে অবতীর্ণ তিনি শান্তির পতাকা হাতে। ‘এই ম্যাচের ইমোশন থেকে দূরে থাকা কঠিন ছিল। তবে শেষমেশ এটা আরেকটি ম্যাচই। একটা পর্যায়ে সবাইকে থামতে হতো’, সেই কাজটা কোর্টনি ওয়ালশ, মাহমুদ উল্লাহদের সঙ্গে করেছেন তামিমও। অবশ্য ভুলটা যেহেতু মাঠের আম্পায়ারদের, তাই ঘটনাবলি নিয়ে কোনো অনুতাপ নেই তাঁর মনে।

ঘটনার সূত্রপাত মুস্তাফিজুর রহমানকে করা ইসুরু উদানার দ্বিতীয় বাউন্সারটা আম্পায়ার ‘নো বল’ না ডাকাকে কেন্দ্র করে। স্কয়ার লেগ আম্পায়ার সংকেত দেওয়ার পরও বোলিং প্রান্তের আম্পায়ার সেটি উপেক্ষা করাতেই ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছে বাংলাদেশ দল। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রুদ্ধশ্বাস ম্যাচের শেষ ওভারের চাপ নিতেই পারেননি ম্যাচের দুই শ্রীলঙ্কান আম্পায়ার রবীন্দ্র বিমলাসিড়ি ও রুচিরা পাল্লিয়াগুরুগে। উদানার করা প্রথম বলটাই ছিল বাউন্সার। কিন্তু সেটির সংকেত দিতে ভুলে দিয়েছিলেন বোলিং প্রান্তের আম্পায়ার। বাংলাদেশ দলের ধারণা, মুস্তাফিজুর রহমানের বিপক্ষে কট বিহাইন্ডের জোরালো আবেদন শুনেই ঘাবড়ে গিয়ে থাকবেন লঙ্কান আম্পায়ারটি। ওদিকে ওভারে একটি মাত্র বাউন্সারের অনুমোদন থাকায় পরেরটিতে ‘নো বল’ সংকেত দেন স্কয়ার লেগ আম্পায়ার। যদিও সেই সংকেত বোলিং প্রান্তের আম্পায়ার অগ্রাহ্য করেছেন ওটাকেই ওভারের প্রথম বাউন্সার মনে করে। প্রথমটা তো তাঁর নজরেই পড়েনি! অনুসন্ধানের পর বিস্ময়কর এই অভিমত নাকি ম্যাচ রেফারি ক্রিস ব্রডের। তবে আম্পায়ারের ভুলের কারণে শুনানিতে উপস্থিত ক্রিকেটারের ‘ছাড়’ পাওয়ার প্রচলন এই যুগে নেই, বিচারকের রায়ই শিরোধার্য। তাই বাংলাদেশ দলে চাপা উল্লাস এই ভেবে যে, সাকিব-নুরুল হাসানের তবু সাজা হয়েছে। কিন্তু মাহমুদ উল্লাহ যে পুরোপুরি রেহাই পেয়েছেন সেটি নাকি ওই যুদ্ধংদেহী মনোভাবের কারণে!

তাতে ক্রিকেটের ‘অফ দ্য ফিল্ড’ পরিমণ্ডলে অন্তত এই টুর্নামেন্টে ভারতের সঙ্গে ফাইনালে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ই পাওয়া যাবে— এমনটা আশা করতেই পারেন সাকিব আল হাসানরা। তবে কলার উঁচিয়ে, চেঁচামেচি করে তো আর ম্যাচ জেতা যায় না। ম্যাচ জিততে মুশফিকুর রহিম কিংবা মাহমুদ উল্লাহর মতো ব্যাটে-বলের শোডাউনই চূড়ান্ত কথা। ফাইনালের শেষ হার্ডলটা টপকাতে হলে নিজেদের সামর্থ্যের শীর্ষে ওঠার জন্য তৈরি থাকতে হবে সাকিব থেকে শুরু করে প্রত্যেককে।

কিন্তু ফাইনাল মানেই তো বাংলাদেশের দীর্ঘশ্বাস! ফাইনালে ওঠার তৃপ্তির চেয়ে এর ভারই যে বেড়েছে সময়ের প্রবাহে। ২০১২ এশিয়া কাপ থেকে এ বছরের শুরুতে ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনাল মুঠো গলে বেরিয়ে গেছে বাংলাদেশের। এ দেশের ক্রিকেটীয় শোকগাথার হৃদয়বিদারক ফ্রেম হয়ে আছে সাকিব-মুশফিকের অশ্রুসজল মুহূর্তটি। বারবার হোঁচট খাওয়ায় সবশেষ ত্রিদেশীয় সিরিজের কষ্টে কিন্তু এশিয়া কাপ ফাইনালের রাতের ভালোলাগা ছিল না, আম ক্রিকেট অনুসারী থেকে শুরু করে খেলোয়াড় মহলেও। তারই ধারাবাহিকতায় প্রেমাদাসার আজকের ফাইনালকে ঘিরে আরো জোরালো দাবি সাকিবদের কাছে—জিততেই হবে!

খেলায় এমন দাবিকে অবিমৃশ্যকারিতাই মনে হবে। ক্রিকেটে তো সেরা দলও হারে। সেখানে সাকিবদের প্রতিপক্ষ ভারত। হোক, তবু আমরা জিতবই—কলম্বোর মুভেনপিক হোটেলে অবস্থানরত বাংলাদেশ দলের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে খেলোয়াড়দের মাঝে বিচরণ করা ‘ভাইভ’টা এমনই একরোখা। শুধু তা মাঠে ছড়িয়ে দিয়ে ভারতীয় ক্রিকেটারদের বিবশ করাটা বাকি।

ক্রিকেটীয় দক্ষতা দিয়েই সাকিবরা ভাঙুন ফাইনালে হতাশার বৃত্ত। তাহলে ড্রেসিংরুমের দরজার ভাঙা কাচগুলো সেভাবে খোঁচাবে না আর!



মন্তব্য