kalerkantho



গোল করতে হবে অথবা করাতে হবে এই ছিল আবাহনীর বিপক্ষে মন্ত্র

বিপক্ষের খেলোয়াড়দের হাতে মার খাওয়া দিয়ে যাঁর ঢাকার ফুটবলে শুরু তাঁর বাংলাদেশ অধ্যায়টা স্মরণীয় হতে বাধ্য। সত্যি বললে হয়েছিল এর চেয়েও বেশি কিছু। তখনকার মোহামেডান ফুটবলারদের কাছে যা ছিল সবচেয়ে বেশি আরাধ্য, আবাহনীর বিপক্ষে ভালো খেলা, সেই ক্ষেত্রে এমেকা পাবেন লেটার নম্বরেরও বেশি কিছু। এরপর তাঁকে আক্রমণ করতে ছুরি নিয়ে দর্শকের ঢুকে পড়া, নাইজেরিয়ার হয়ে বিশ্বকাপ খেলা, আর্জেন্টিনা-নাইজেরিয়া ম্যাচে আমন্ত্রিত হয়ে এসে পিস্তলসহ আটক হওয়া মিলিয়ে এমেকা ইউজিগো আর বাংলাদেশের সম্পর্কের বাঁকে বাঁকে চমক। এমন মানুষের সঙ্গে আড্ডায় বসলে সেটা জম্পেশ এবং দীর্ঘ হতে বাধ্যও। হলোও তাই। বর্ণময় দিনের ঝাঁপি খুললেন এমেকা। শুনলেন নোমান মোহাম্মদ

৯ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



গোল করতে হবে অথবা করাতে হবে এই ছিল আবাহনীর বিপক্ষে মন্ত্র

ছবি : মীর ফরিদ

প্রশ্ন : ঢাকায় আপনার প্রথম খেলা দিয়েই কথোপকথন শুরু করি। মনে আছে সেই স্মৃতি? সেই মারামারি?

এমেকা ইউজিগো : (হাসি) অবশ্যই মনে আছে। কলকাতার ক্লাব ইস্ট বেঙ্গলের হয়ে খেলতে এসেছিলাম প্রেসিডেন্ট গোল্ড কাপে। প্রতিপক্ষ বাংলাদেশ নীল দল। ওরা চার-পাঁচজন মিলে আমাকে মারার চেষ্টা করছিল। লোকে যখন আপনার দিকে সমস্ত শক্তি নিয়ে তেড়ে আসবে, আপনারও তখন সমস্ত শক্তি নিয়ে নিজেকে রক্ষা করতে হবে। এটি পৌরুষের ব্যাপার। আমি ঠিক সেই কাজটিই করছিলাম। পড়ে পড়ে তো আর মার খেতে পারি না।

প্রশ্ন : এই ঢাকাতেই কয়েক মাসের মধ্যে খেলতে এলেন কিভাবে?

এমেকা : মজার ব্যাপার হলো, আমাকে কিন্তু প্রথম প্রস্তাব দেয় আবাহনী। ওই ক্লাবের কর্মকর্তা মনজুর কাদের দুইবার কলকাতা গিয়ে আমার সঙ্গে দেখা করেন। কিন্তু আবাহনীতে খেলতে রাজি হইনি।

প্রশ্ন : কেন? বাংলাদেশ নীল দলের বিপক্ষে ম্যাচের ওই মারামারিতে বেশির ভাগ ছিলেন আবাহনীর ফুটবলার। সে কারণে আপনি আবাহনীতে খেলেননি বলে প্রচারণা ছিল?

এমেকা : না, ব্যাপারটি তা নয়। আসলে এর আগে চিমা ওকেরি আবাহনীতে খেলে গেছে। ওর যে অভিজ্ঞতার কথা বলেছে, তা পছন্দ হয়নি। বাংলাদেশে খেলার ব্যাপারেই তাই অ্যালার্জি ছিল। এখানে আবাহনী বলে আলাদা কোনো ব্যাপার ছিল না।

প্রশ্ন : পরে তাহলে কিভাবে মোহামেডানে এলেন?

এমেকা : সে এক কাহিনি। আনোয়ারুল হক হেলাল কলকাতায় গিয়ে আমাকে মোহামেডানে খেলার প্রস্তাব দেয়। মোহামেডান-আবাহনীর দ্বৈরথের কথা বলে। এটি অনেকটা ইস্ট বেঙ্গল-মোহনবাগানের মতো। এ কথা শুনে আমি অনুপ্রাণিত হই। পরে হেলাল যখন বলেন, আমাকে ছাড়া মোহামেডান চ্যাম্পিয়নশিপ লড়াইয়ে থাকতে পারবে না, যেকোনো মূল্যে আমাকে ওদের চাই—সব মিলিয়ে চলে আসতে রাজি হলাম।

প্রশ্ন : কত টাকায়?

এমেকা : আমি তখন কলকাতায় সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক পাওয়া ফুটবলার। ইস্ট বেঙ্গল থেকে দলবদল করে কলকাতা মোহামেডানে গিয়েছি তিন লাখ ৮০ হাজার রুপিতে। সেটিও মাত্র মাস দুয়েক আগে। হেলালকে বলি, ‘তোমরা যদি আমাকে চাও-ই, তাহলে সাত লাখ ৬০ হাজার রুপি দিতে হবে।’

প্রশ্ন : অর্থাৎ দ্বিগুণ অর্থ?

এমেকা : ঠিক তাই। হেলাল শুনে বলল, ‘আমাকে দুই ঘণ্টা সময় দাও।’ ঘণ্টা দুয়েক পর ও আমার ফ্ল্যাটে আসে আবার। ব্যাগ থেকে বের করে সাত লাখ ৬০ হাজার রুপি। তা থেকে তিন লাখ ৮০ হাজার রুপি নিয়ে আমি চলে যাই কলকাতা মোহামেডানের সেক্রেটারি ইব্রাহিম মুলারের কাছে। তাঁকে চুক্তির পুরো টাকা ফেরত দিয়ে বলি, ‘আমি নাইজেরিয়া ফেরত যাচ্ছি।’ নইলে তো আমাকে ওরা ছাড়বে না। এরপর হেলালের সঙ্গে চলে আসি ঢাকা মোহামেডানে খেলার জন্য।

প্রশ্ন : সমর্থকরা তো প্রথম থেকেই আপনাকে বরণ করে নেয়। আবাহনীর বিপক্ষে সব সময় ভালো খেলতেন—এটি বোধ হয় বড় এক কারণ?

এমেকা : ঢাকা এবং কলকাতা—দুই জায়গারই মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সমর্থকরা খুব আবেগপ্রবণ। এমন আবেগ বিশ্বের আর কোথাও আমি দেখিনি। আর আবাহনীর বিপক্ষে আমি সব সময়ই ভালো খেলতাম। নিজেকে আলাদা করে অনুপ্রাণিত করতাম।

প্রশ্ন : আর্মি স্টেডিয়ামের ফাঁকা গ্যালারির সামনের লিগ নির্ধারণী ওই ম্যাচটির কথা নিশ্চয়ই ভোলেননি?

এমেকা : অথচ জানেন, সেই ম্যাচটি আমার খেলার কথা ছিল না।

প্রশ্ন : কেন?

এমেকা : আমি তো তখন তুরস্কে চলে গেছি। মোহামেডানের সঙ্গে চুক্তি শেষ। মৌসুমের শেষ ম্যাচ খেলেছি। ওখানে মোহামেডান-আবাহনী খেলা ড্র হওয়ায় দুই দলকে যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করেন দুই অধিনায়ক রণজিৎ ও আসলাম। মৌসুম শেষ। ওদিকে তুরস্কের ক্লাব বেসিকটাস আমাকে ট্রায়ালে ডেকেছে। ওদের ক্লাবে ট্রায়াল দেওয়ার জন্যই তখন আমি তুরস্কে ছিলাম।

প্রশ্ন : পরে ওই ম্যাচটি খেলতে এলেন, গোল করে মোহামেডানকে জেতালেনও...

এমেকা : হ্যাঁ, না এসে উপায় কী! মোহামেডান ক্লাবের গভর্নিং বডির প্রেসিডেন্ট কর্নেল মালেক ফোন করেন। বলেন, ‘এমেকা তোমাকে আসতেই হবে।’ আমি কর্নেল মালেককে কখনো ‘না’ বলিনি। চলে এলাম। পরের দিনই আর্মি স্টেডিয়ামে খেলা। ফাঁকা গ্যালারি। আমরা ২-০ গোলে জিতে লিগ চ্যাম্পিয়ন হই। খুব সম্ভবত এমিলি প্রথম গোল দিয়েছিল; পরেরটি আমি।

প্রশ্ন : কিক অফ থেকে যে গোল দিয়েছিলেন, মনে আছে?

এমেকা : অবশ্যই মনে আছে। তবে প্রতিপক্ষের নাম ভুলে গেছি...

প্রশ্ন : আদমজী।

এমেকা : হ্যাঁ হ্যাঁ, আদমজী। ওদের গোলরক্ষককে একটু এগিয়ে থাকতে দেখলাম। রেফারি বাঁশি বাজালেন, সাব্বির বল ঠেলে দিল, আমি কিক করলাম, গোল। দর্শকদের অনেকেই গোলটি দেখেননি। রেফারি যখন আবার সেন্টারের ইশারা করেন, তাঁরা ভেবেছিলেন আগেরবারের কিক অফে কোনো ঝামেলা ছিল বলে রেফারি আবার তা করতে বলছেন (হাসি)।

প্রশ্ন : আবাহনীর বিপক্ষে ৩-২ গোলের সেই রোমাঞ্চকর জয়...

এমেকা : সমতাসূচক গোলটি আমি দিয়েছিলাম পেনাল্টিতে। অথচ আমি পেনাল্টি মারায় আমার সিরিয়াল ছিল তিন নম্বরে। প্রথম কে যেন, দ্বিতীয় কায়সার, এরপর আমি। কিন্তু প্রথম দুজন ওই চাপের মধ্যে পেনাল্টি নিতে রাজি হলো না। কায়সার তো মাঝমাঠের ওপার থেকেই হাত দেখিয়ে জানিয়ে দিল, ও পেনাল্টি নেবে না। কিন্তু আমি বড় উপলক্ষে ঘাবড়ে যাইনি। ঠিকই পেনাল্টি নিই; গোল করি। পরে খোরশেদ বাবুলের গোলে মোহামেডান পায় দারুণ জয়।

প্রশ্ন : সবই যখন মনে আছে, মিরপুর স্টেডিয়ামে আপনার দিকে দর্শক যে ছুরি নিয়ে তেড়ে এসেছিল, তা-ও নিশ্চয়ই ভোলেননি?

এমেকা : আমার কাছে পুরো ব্যাপারটি মনে হচ্ছিল সিনেমার মতো। সেই মাঠে নামা, হঠাৎ সমর্থকদের মধ্যে মারামারি বেধে যাওয়া, এরপর আমার দিকে কায়সারের দৌড়ে আসা—সব দ্রুত ঘটে যাচ্ছিল। কায়সার ছুরি হাতের লোকটিকে জাপটে ধরে। অস্বীকার করব না, ওই ছুরি দেখে একটু ভয় পেয়েছিলাম। মুখোমুখি হলে ভয় পেতাম না, কিন্তু ওই লোকটি ছিল আমার পেছনে। যেকোনো কিছুই তাই হতে পারত।

প্রশ্ন : ঢাকা মোহামেডানে খেলেছেন দুই মৌসুম। ওই সময় বাংলাদেশের সেরা ফুটবলার মনে হয়েছে কাকে?

এমেকা : কায়সার হামিদ ও সাব্বির। মোহামেডানে আমার সতীর্থ বলে বলছি না, ওরা ছিল সত্যিই বাংলাদেশের সেরা দুই ফুটবলার। এখনকার সময়েও এশিয়ার যে কোনো লিগের যেকোনো ক্লাবে খেলতে পারত। সেটি জাপান, সৌদি আরব, দক্ষিণ কোরিয়া, ইরান কিংবা ইরাকে। সাব্বির ও কায়সার এতটাই ভালো ছিল।

প্রশ্ন : ঢাকা লিগে প্রতিপক্ষের সেরা ডিফেন্ডার?

এমেকা : তেমন কারো কথা আলাদা করে মনে পড়ছে না। (একটু ভেবে) নাহ্, কেউ না।

প্রশ্ন : আবাহনীর মোনেম মুন্না?

এমেকা : মুন্না ভালো ডিফেন্ডার। বেশ শক্তিশালী। আমাকে শক্তি দিয়ে পরাস্ত করতে চাইত। কিন্তু এমেকাকে শক্তি দিয়ে হারানো কি সম্ভব?

প্রশ্ন : ঢাকা লিগের অন্য বিদেশি ফুটবলারদের মধ্যে সেরা কে?

এমেকা : ইরানি ফুটবলাররা ছিলেন বেশ ভালো। ওদের তো ঢাকা মোহামেডানে খেলার জন্য আমিই নিয়ে এসেছি।

প্রশ্ন : তাই!

এমেকা : আসলে হেজাজি, নালজেগার, বোরহানজাদে ওরা সবাই ইরান থেকে ভারতে যায় কলকাতা মোহামেডানের ট্রায়ালে। ক্লাব কোনো কারণে ওদের খেলা পছন্দ করেনি। এরই মধ্যে হেলাল চলে যায় কলকাতা। ওর সঙ্গে আমি বাংলাদেশ চলে আসি ঢাকা মোহামেডানে খেলার জন্য। আসার সময় সব ইরানি ফুটবলারকে রেখে আসি আমার কলকাতার বাড়িতে। বলি, ‘ওখানে গিয়ে আমি খেলা শুরু করি, এরপর এক মাসের মধ্যে তোমাদের নিয়ে যাব।’ এভাবেই ওদের আনি ঢাকা মোহামেডানে। পরে আমার সুপারিশেই হেজাজি হন ক্লাবের কোচ।

প্রশ্ন : তাঁদের সঙ্গে পরে যোগাযোগ ছিল?

এমেকা : অনেক দিন ছিল। ইরান থেকে হেজাজিদের সঙ্গে রহিম গিয়াসি নামে এক ফুটবলারও এসেছিলেন। ওর খেলা আমার পছন্দ হয়নি। পরে ও অস্ট্রেলিয়া চলে যায়। এই গিয়াসির কাছ থেকে হেজাজি, নালজেগারদের খবর পেতাম। ও ইরানে গেলে ফোনেও কথা বলিয়ে দিয়েছে বেশ অনেকবার। পরে আস্তে আস্তে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

প্রশ্ন : আপনার বিশ্বকাপ খেলার অংশে আসছি। তার আগে একটু ছোটবেলা থেকে ঘুরে আসতে চাই। ফুটবল খেলার চল কি পরিবারেই ছিল?

এমেকা : আমার জন্ম আবা শহরে। আমি কিন্তু রাজপরিবারের সন্তান। আমার দাদা ইউজিগো ছিলেন রাজা। উরালা নামক নাইজেরিয়ার ছোট্ট একটি জায়গার। এটির আকৃতি মোনাকোর মতো। আমাদের বিশাল পরিবার। দাদা বিয়ে করেছিলেন ৪৮টি। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ছেলে হওয়ার জন্য খুব সৌভাগ্য লাগে। আমার বাবার সে সৌভাগ্য ছিল না। সবচেয়ে বড় চাচা হন পরবর্তী রাজা। তাঁর বড় ছেলে এখনকার রাজা। ও আমার কাজিন।

প্রশ্ন : শৈশবের ফুটবলের কথা...

এমেকা : আমার বাবা ইউসেবিও নাইজেরিয়া লিগে আবা জায়ান্ট কিলারে খেলেছেন। ওনার সঙ্গে গিয়ে আমি স্টেডিয়ামে খেলা দেখেছি। উনি পরে ব্যবসায় মনোযোগ দেন; মা জেনিট ছিলেন শিক্ষিকা। আমরা পাঁচ ভাই, এক বোন। আমি ফুটবল ভালোবাসতাম শুরু থেকেই। প্রতি সপ্তাহে বল কিনে দেবার আবদার করতাম। জন্মদিন, ক্রিসমাসেও বল চাই।

প্রশ্ন : কলকাতার ইস্ট বেঙ্গলে খেলতে এলেন কিভাবে?

এমেকা : প্রথম সুযোগ পাই আবা শহরের দল এনিয়ামবায়। তখন বয়স ১২ বছর। প্রথম দলে সুযোগ পেতে পেতে ১৬ বছর। এটিই নাইজেরিয়ায় আমার একমাত্র দল। এরপর ভারতে আসি পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে বিএ করার জন্য। চণ্ডিগড় লিগে খেলতাম। তখন হারজিন্দার সিং নামে ভারতীয় জাতীয় দলে খেলা এক ফুটবলার ওখানে খেলতেন। তিনি কলকাতা লিগে খেলেছিলেন। হারজিন্দার সিংই ক্রমাগত বলতে থাকেন, আমি কিন্তু পড়াশোনা শেষ করার আগে তা করতে চাইনি।

প্রশ্ন : বিএ করার পর ইস্ট বেঙ্গলে গেলেন?

এমেকা : শেষ পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর ইস্ট বেঙ্গলের কর্মকর্তারা আমাকে পাঠিয়ে দিলেন সৌদি আরবের রিয়াদের এক হোটেলে। নইলে যদি মোহনবাগান আমাকে নিয়ে যায়। এটি ১৯৮৬ সালের কথা। এক লাখ ২০ হাজার রুপিতে ইস্ট বেঙ্গলে নাম লেখালাম।

প্রশ্ন : ইস্ট বেঙ্গলে তো দুর্দান্ত খেলেছেন। তবু এক মৌসুম পরই কলকাতা মোহামেডানে গেলেন কেন?

এমেকা : বলতে পারেন রাগ করে। আমি ইস্ট বেঙ্গলে প্রথম মৌসুমে ২৮ গোল করেছি। লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা। অথচ পরের মৌসুমে দেখি, ওরা চিমাকে আনার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। ব্যাপারটি ভালো লাগেনি। তখন কলকাতা মোহামেডান প্রস্তাব নিয়ে এলো। তিন লাখ ৮০ হাজার রুপির। চলে যাই ওখানে। কিন্তু মাস দুয়েক যেতে না যেতেই তো চলে আসি ঢাকা মোহামেডানে। সে গল্প করেছি শুরুতেই।

প্রশ্ন : ঢাকা মোহামেডানে দুই মৌসুম খেলে কলকাতা মোহামেডানে ফিরে যান। ওখানে নেহরু গোল্ডকাপ নামের টুর্নামেন্টে প্লেয়ার অব দ্য টুর্নামেন্টও হন আপনি।

এমেকা : ঠিক তাই। এই দেখুন, আমার ফেসবুক পেজে সে টুর্নামেন্টের ছবিও আছে।

প্রশ্ন : আপনার মাথায় তখন দেখছি ‘ড্রেড লক’। এই স্টাইলের কোনো গল্প?

এমেকা : নাহ্, এমনিই রেখেছিলাম।

প্রশ্ন : আপনাকে তো রুদ খুলিতের মতো লাগছে।

এমেকা : হ্যাঁ, কলকাতার লোকে তখন তাই বলত।

প্রশ্ন : এবার নাইজেরিয়া জাতীয় দলের কথা একটু যদি বলেন। বিশ্বকাপ খেলে আসা ফুটবলার দেখেছে ঢাকা লিগ। কিন্তু ঢাকা লিগে খেলে গিয়ে পরে কেউ বিশ্বকাপ খেলেছে—এটি আপনার ক্ষেত্রেই হয়েছে একমাত্র। ১৯৯৪ বিশ্বকাপ খেলার গল্পটি শুনতে চাই।

এমেকা : এটি সুররিয়াল; পরাবাস্তব এক ব্যাপার। একজন ফুটবলারের জন্য বিশ্বকাপ খেলার চেয়ে বড় সম্মানের আর কিছু হতে পারে না। আমি পুরোটা সময় ঘোরের মধ্যে ছিলাম। বিশ্বকাপ এলো, তাতে খেললাম, বিশ্বকাপ চলেও গেল—অথচ আমি যেন টেরই পেলাম না কিছু। অবশ্যই বিশ্বকাপ খেলার চেয়ে বড় অর্জন আর কিছু হতে পারে না।

প্রশ্ন : বিশ্বকাপে একটি মাত্র ম্যাচেই তো নামে নামার সুযোগ হয় আপনার, তা-ও বদলি খেলোয়াড় হিসেবে?

এমেকা : এটি আমার দুর্ভাগ্য। অবশ্য দুর্ভাগ্যই বা বলি কিভাবে! ওই ইনজুরির পর বিশ্বকাপে যে খেলতে পেরেছি, এটাই তো বড় সৌভাগ্যও। এ কারণেই আমি বলছিলাম, বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতাটি একেবারে পরাবাস্তব।

প্রশ্ন : কী ইনজুরি হয়েছিল?

এমেকা : আমার ঊরুর পেশি ছিঁড়ে যায়। ৬ জানুয়ারিতে ইনজুরিতে পড়ার পর মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত আমি দৌড়াতে পারতাম না। জগিং পর্যন্ত করতে পারতাম না। নাইজেরিয়া জাতীয় দলের কোচ বিশ্বকাপ মাথায় রেখে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডে অনেককে খেলাচ্ছিলেন। কাউকে পছন্দ হচ্ছিল না বলে বাধ্য হয়ে নেন আমাকে। মার্কো ফন বাস্তেনের গোড়ালিতে বেলজিয়ামের যে চিকিৎসক অস্ত্রোপচার করেন, তিনি ইনজেকশন দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে আমাকে বিশ্বকাপ স্কোয়াডে থাকার মতো সুস্থ করে তোলেন।

প্রশ্ন : নাইজেরিয়ার ওই দলটি সম্পর্কে একটু যদি বলেন। দেশের ফুটবল ইতিহাসের সোনালি প্রজন্ম ছিল তা...

এমেকা : কোনো রকম সন্দেহ ছাড়াই নাইজেরিয়ার সর্বকালের সেরা দল সেটি। অবিশ্বাস্য সব ফুটবল ছিল দলে। একইসঙ্গে এত্ত বড় বড় ইগোও। আমাদের ড্রেসিংরুম ভার হয়ে থাকত ইগোতে। এমনিতে সবাই হাসিখুশি, ঠাট্টা-মজা করছে, কিন্তু তলে তলে ইগোর উপস্থিতি বুঝতে পারতাম সবাই।

প্রশ্ন : এ কারণেই কি বিশ্বকাপে ততটা ভালো করতে পারেনি নাইজেরিয়া? মানে, আপনারা নক আউট পর্বে উঠেছিলেন কিন্তু প্রত্যাশা তো ছিল আরো বেশি।

এমেকা : আমি মনে করি, নাইজেরিয়ার সেই দলের বিশ্বকাপ জয়ের সামর্থ্য ছিল।

প্রশ্ন : বিশ্বকাপ জয়!

এমেকা : কেন নয়? আমাদের দলের সেই সামর্থ্য ছিল। কিন্তু সমস্যা হলো, আমাদের ডাচ কোচ ক্লেমেন্স ভেস্টারহফের কোনো ধারণা ছিল না দলের সামর্থ্য সম্পর্কে। এ ছাড়া আমাদের দলের অনেক ফুটবলারের এজেন্ট ছিলেন তিনি। বিশ্বকাপকে তিনি কাজে লাগিয়েছেন ওই ফুটবলারদের বিক্রির মঞ্চ হিসেবে। দলের চাহিদা কী ছিল, তা দেখেননি। ফুটবল ফেডারেশনের সঙ্গেও আমাদের ঝামেলা ছিল খুব। প্রথম ম্যাচে গোলের পর রাশিদির জাল ধরে উল্লাসের কথা মনে আছে না? সেটি কিন্তু শুধুই উল্লাস ছিল না, ছিল প্রচণ্ড রাগের বহিঃপ্রকাশও।

প্রশ্ন : ওই দলের সবচেয়ে স্কিলফুল ফুটবলার ছিলেন কে?

এমেকা : নির্ভর করছে আপনি স্কিলকে কিভাবে দেখছেন। স্কিলকে যদি বিনোদনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন, তাহলে জে জে ওকোচা সেরা। গোলমুখী ফুটবলের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে ইমানুয়েল অ্যামোনিকে, নওয়ানকো কানুর কথা বলতে হবে। যদিও কানু বিশ্বকাপ স্কোয়াডে শেষ পর্যন্ত সুযোগ পায়নি। তখন মোনাকোতে খেলা ভিক্টর ইকপেবার কথা বলা যায়। আন্ডারলেখটে খেলা চিদি নওয়ানুর কথা বলা যায়। ও সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার কিন্তু খেলত ‘নাম্বার টেন’-এর মতো।

প্রশ্ন : ওই দলে আপনার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ছিলেন কে?

এমেকা : টারিবো ওয়েস্ট, চিদি নওয়ানু, ইয়েকিনি, ভিক্টর আর রাশিদি ইয়েকিনি। রাশিদি সব সময় আমাকে রুমমেট রাখত।

প্রশ্ন : টারিবো ওয়েস্টের সঙ্গে যোগাযোগ আছে এখনো?

এমেকা : হ্যাঁ। প্রায় প্রতিদিনই কথা হয় ফেসবুকে। নাইজেরিয়ায় থাকে।

প্রশ্ন : চুল কি এখনো অমন রঙিন?

এমেকা :  (হেসে) হ্যাঁ, ভীষণ আমুদে ছেলে। অমনই আছে। রাশিদিও জীবনটা উপভোগ করত খুব। ওর সঙ্গেও যোগাযোগ হতো প্রায় প্রতিদিন। কিন্তু কয়েক বছর আগে হঠাৎই মরে গেল।

প্রশ্ন : জাতীয় দলে খেলা নিশ্চয়ই উপভোগ করেছেন খুব?

এমেকা : নাইজেরিয়া ফুটবলের রেকর্ডবুক ঘাঁটলে দেখবেন, এমেকা ইউজিগো একমাত্র ফুটবলার যে গোলরক্ষক ছাড়া সব পজিশনে খেলেছে...

প্রশ্ন : কিন্তু উইকিপিডিয়া তো বলছে, আপনি নাইজেরিয়া জাতীয় দলে ম্যাচ খেলেছেন মোটে ১১টি। এর মধ্যেই ১০ পজিশনে খেললেন কিভাবে?

এমেকা : এখানে তাহলে ভুল আছে। আমি আরো বেশি ম্যাচ খেলেছি। ১৯৮৮ সিউল অলিম্পিকে খেলেছি। সেটি কি এই রেকর্ডে আছে?

প্রশ্ন : অলিম্পিক দলের ম্যাচ তো পুরোপুরি আন্তর্জাতিক ম্যাচ হিসেবে গণ্য হয় না।

এমেকা : ভুল। অবশ্যই হওয়া উচিত। অলিম্পিকের প্রস্তুতি এবং মূল টুর্নামেন্টে গিয়ে অনেক ম্যাচ খেলেছি। সেগুলো রেকর্ডে ধরেনি। নাইজেরিয়া দলের হয়ে আরো অনেক ম্যাচ নিশ্চয়ই বাদ দিয়েছে। মাত্র ১১টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ—তা হতে পারে না। ওদের সঙ্গে কথা বলতে হবে।

প্রশ্ন : আবার একটু ক্লাব ক্যারিয়ারে ফিরি। ঢাকা মোহামেডানের হয়ে ঢাকা আবাহনীর বিপক্ষে আপনার এত এত গোল করার রহস্য কী?

এমেকা : কারণ আবাহনীর বিপক্ষে ম্যাচ হালকাভাবে নেওয়ার উপায় ছিল না। আমি ওদের বিপক্ষে প্রত্যেক ম্যাচে গোল করেছি, কোনো ম্যাচে হারিনি...

প্রশ্ন : এখানে বোধহয় কিছু তথ্যগত ভুল আছে। সব ম্যাচে গোল করেননি, কয়েক ম্যাচ হেরেছিলেনও...

এমেকা : মনে হয় না। হলেও তা অল্প এক-দুটি ম্যাচে। আমি যা বলতে চাইছি সেটি হলো, আবাহনীর বিপক্ষে ম্যাচ খুব সিরিয়াসলি নিতাম। মনে হতো, গোল দিতেই হবে। নইলে গোল করাতে হবে। ওদের বিপক্ষে তাই আমার সাফল্য এত বেশি।

প্রশ্ন : ঢাকা মোহামেডানের পর কোথায় খেলেছেন?

এমেকা : চিমার ঢাকায় খেলা নিয়ে কী এক ঝামেলা হলো; এরপর সিদ্ধান্ত ঢাকায় বিদেশি খেলোয়াড় নিষিদ্ধ। আমি ফিরে যাই কলকাতা মোহামেডানে। ওখানে নেহরু গোল্ড কাপে ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট হওয়ার পর মালয়েশিয়ার পাহাং ক্লাবে। ব্রাজিলের সান্তোস, আর্জেন্টিনার এস্তুদিয়ান্তেসের মতো দল সে টুর্নামেন্টে খেলতে আসে। ওরা আমাকে নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু পাহাং কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নেওয়ার পর আমার হাতে গুঁজে দেয় ৫০ হাজার ডলার। বলে, ‘এটি তোমার উপহার। মালয়েশিয়ায় আসার পর পারিশ্রমিক নিয়ে আলোচনা করব।’ চলে গেলাম পাহাংয়ে খেলার জন্য।

প্রশ্ন : ইউরোপে?

এমেকা : পাহাং থেকে যাই ডেনমার্কের লিংবিতে। ডেনিস লিগে চার-পাঁচ মৌসুম খেলি। লিংবির হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগে রেঞ্জার্সের বিপক্ষে এক ম্যাচে দুর্দান্ত খেলার পর ব্রিটেনের অনেক বড় বড় ক্লাবে খেলার প্রস্তাব পাই। রেঞ্জার্স, আর্সেনাল, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড...

প্রশ্ন : স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডেও!

এমেকা : হ্যাঁ। কিন্তু আমি ওসব ক্লাবে যেতে চাইনি। কারণ ব্রিটেনের ক্লাবগুলোতে তখন মিডফিল্ডারদের কোনো কাজ ছিল না। ডিফেন্স থেকে বল উড়িয়ে মারে এক দল; অন্য দল বল ক্লিয়ার করলেও সেই উড়িয়েই মারে—মিডফিল্ডাররা আকাশে বিমান দেখার মতো বল চেয়ে চেয়ে দেখে শুধু। ব্রিটেনে তখন একটি মাত্র দলই মাটিতে বল রেখে ফুটবল খেলত—লিভারপুল। ওই ক্লাব থেকে প্রস্তাব পাইনি। পেলে বিনা পারিশ্রমিকেও খেলে দিতাম।

প্রশ্ন : ডেনমার্কের পর খেলতে গেলেন কোথায়?

এমেকা : হাঙ্গেরিতে। বুদাপেস্ট হনভেদ ক্লাবে...

প্রশ্ন : বুদাপেস্ট হনভেদ মানে ফেরেঙ্ক পুসকাসের ক্লাব?

এমেকা : আরে বাহ্, আপনি জানেন দেখছি!

প্রশ্ন : জানব না! পুসকাস তো তখন বেঁচে; তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে নিশ্চয়ই?

এমেকা : নিয়মিত। আমাদের প্রায় সব ম্যাচ দেখতে আসতেন। ছোটখাটো মানুষ, বিশাল ভুঁড়ি আর ভীষণ মজার লোক। বেশি মজা করতেন হাঙ্গেরিয়ান ফুটবলারদের সঙ্গে, যাঁরা ম্যাচে ভালো খেলতে পারেনি। হাসাহাসি করে ওদের উজ্জীবিত করতেন। আমি ছিলাম ওই দলের অন্যতম সেরা ফুটবলার। সে কারণে আমার সঙ্গে মজা করার কিছু পেতেন না বোধ হয়। সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার পুসকাস কিন্তু তাঁর সঙ্গে কথাবার্তায় সামান্যতম অহংকার দেখিনি।

প্রশ্ন : পেলের সঙ্গে দেখা হয়েছে?

এমেকা : বেশ কয়েকবার। ১৯৯২ সালের আফ্রিকান কাপ অব নেশনসে উনি ছিলেন ‘গেস্ট অব অনার’। একটি ম্যাচে অতিথি ছিলেন মিশেল প্লাতিনি। তাঁর সঙ্গেও দেখা হয়েছে।

প্রশ্ন : আর ডিয়েগো ম্যারাডোনার বিপক্ষে তো খেলেছেনই বিশ্বকাপে?

এমেকা : যদিও আমার মাঠে নামার সুযোগ হয়নি। তবে ভারতে এক প্রদর্শনী ম্যাচে ডিয়েগোর সঙ্গে খেলেছি। আন্দামান-নিকোবর দ্বীপে বন্যা হয়েছিল; বন্যার্তদের সাহায্যার্থে এক প্রদর্শনী ম্যাচে খেলি আমরা একসঙ্গে।

প্রশ্ন : ১৯৯৪ বিশ্বকাপে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের পরই তো ম্যারাডোনার শরীরে নিষিদ্ধ মাদক পাওয়া যায়। সে ম্যাচের কিছু মনে আছে?

এমেকা : আমার স্মৃতিশক্তি বেশ ভালো। সব মনে থাকে। আমরা মাঠেই জেনে যাই, ডিয়েগো মাদক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি। নাইজেরিয়া থেকে মাদক পরীক্ষার জন্য নেওয়া হয় অ্যামোকাচিকে।  ও-ই এসে আমাদের বলে ডিয়েগোর কথা।

প্রশ্ন : ১৯৯৮ বিশ্বকাপ দলে সুযোগ পাননি আপনি। কেন?

এমেকা : তখন যে আমি বেঁচে ছিলাম, সেটাই তো মিরাকল!

প্রশ্ন : মানে!

এমেকা : ১৯৯৪ বিশ্বকাপের পর পর দেপোর্তিভো লা করুনায় খেলতে যাই। জুনে গেলাম তো, ডিসেম্বরেই পড়ি ভয়ংকর গাড়ি দুর্ঘটনায়। লন্ডনের এক হাসপাতালের বিছানায় কেটেছে আমার পরের আড়াই বছর।

প্রশ্ন : আড়াই বছর!

এমেকা : ১৯৯৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর নাইজেরিয়ায় ভয়ংকর সেই দুর্ঘটনা। আমার গাড়ির ওপর দিয়ে বিশাল ট্রাক চলে যায়। ইলেকট্রিক করাত দিয়ে কেটে আমাকে গাড়ি থেকে বের করতে হয়। নাইজেরিয়া থেকে লন্ডনে পাঠানো হয়। হাসপাতালের বিছানায় এভাবে পা ওপরে ঝুলিয়ে শুয়ে থাকতে হয়েছে দুই বছরের বেশি। আমার মাথা থেকে পা পর্যন্ত সব কিছু ভেঙে গিয়েছিল। একটু ভালো করে আমার চেহারার দিকে তাকান। বাঁ দিকের ঠোঁট, নাক, চোখ, ভুরু, গালে বেশ কিছু অসামঞ্জস্য দেখতে পাচ্ছেন  না?

প্রশ্ন : তাই তো!

এমেকা : এই মুখে ১৭টি অপারেশন হয়েছে। বাঁ পায়ে কয়টি অপারেশন হয়েছে, জানি না। তবু আমি অদম্য মানসিক শক্তির কারণে বেঁচে উঠেছি। খেলার মাঠেও ফিরেছি।

প্রশ্ন : ওই সময় আরেকবার ভারতে এসেছিলেন। খেলেন কলকাতায় আরেক বড় দল মোহনবাগানে...

এমেকা : তা মাত্র এক ম্যাচের জন্য। আমি ইনজুরি থেকে সেরে ওঠার পর ওয়েলসের এক ক্লাবে খেলি। এরপর চলে যাই যুক্তরাষ্ট্রে। সেখান থেকে এসেছিলাম মোহনবাগানে খেলার জন্য। কিন্তু ওরা আমার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেনি। মূল একাদশে রাখেননি পর্যন্ত কোচ। যে কারণে এক ম্যাচ খেলে আমেরিকা ফিরে যাই।

প্রশ্ন : অবসর নেন কবে?

এমেকা : আমেরিকার হার্শি ওয়াইন্ডক্যাটস ও কানেকটিকাটস উলভসে খেলার পর প্রস্তাব আসে পেরুতে খেলার। লাতিন আমেরিকায় খেলার সুযোগটা আমি তো হাতছাড়া করতে পারি না। পেরুতে দেপোর্তিভো ওয়াঙ্কা, এস্তুদিয়ানতেস দে মেদিসিনা ও দেপোর্তিভো মিউনিসিপালে তিন মৌসুম খেলার পর অবসর নিই ২০০২ সালে।

প্রশ্ন : এরপর কোচিং করিয়েছেন?

এমেকা : পেরুর দেপোর্তিভো মিউনিসিপালেই আমি খেলোয়াড় কাম কোচ হই। আমেরিকায় কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় দলের কোচিং করাই। নাইজেরিয়ায় ফিরে দুটি প্রিমিয়ার লিগের দলকেও। ২০০৮ সালে ভারতে চার্চিল ব্রাদার্সকে কোচিং করানোর পর ২০১১ সালে ঢাকা মোহামেডানের কোচ হিসেবে আসি।

সে অভিজ্ঞতা যে ভালো হয়নি, তা আপনারা জানেন।

প্রশ্ন : এখন আপনি নাইজেরিয়াতেই থাকেন?

এমেকা : না, আমি আমেরিকার নিউ ইয়র্কে থাকি। নাইজেরিয়ায় যাই প্রায়ই। পারিবারিক দায়বদ্ধতার ব্যাপার রয়েছে।

প্রশ্ন : বিয়ে করেছেন?

এমেকা : করতে বাধ্য হয়েছি আর কি! বাবা এমন ‘ইমোশনাল ব্লাকমেইল’ করলেন যে, না করতে পারলাম না। বিয়ে করি ২০১২ সালে। আমার স্ত্রী চিকিৎসক; ওর নাম জুলিট। আমাদের এক মেয়ে আছে। ওর নাম শুনলে চমকে যাবেন। ইন্ডিয়া ইন্দিরা ইউজিগো।

প্রশ্ন : এমন নাম কেন?

এমেকা : ভারত দেশটাকে আমার খুব ভালো লাগে। ওখানে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে এসেছিলাম। আর ভারত, বিশেষত কলকাতা আমাকে অনেক ভালোবাসা দিয়েছে। সে কারণে মেয়ের প্রথম নাম ‘ইন্ডিয়া’।

প্রশ্ন : এটি কি ‘বাংলাদেশ’ হতে পারত না?

এমেকা : (অট্টহাসি দিয়ে) অবশ্যই হতে পারত। বাংলাদেশ থেকে, মোহামেডানের সমর্থকদের কাছ থেকেও অনেক ভালোবাসা পেয়েছি।

প্রশ্ন : মাঝের ‘ইন্দিরা’ও তো এ অঞ্চলের নাম। নিশ্চয়ই বলবেন না, ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নামানুসারে তা রেখেছেন?

এমেকা : (আবারও হাসি) অবশ্যই তাই। ওনাকে আমার এত ভালো লাগত। চণ্ডিগড়ে আমাদের পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলেন। কী মনে করে আমার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলেন কিছুক্ষণ। আমাকে দিল্লিতে আমন্ত্রণ জানান। আমি এরপর যতবার দিল্লি গিয়েছি, দেখা করেছি তাঁর সঙ্গে। নিজের মেয়ের নামও রাখলাম ইন্দিরা। কিন্তু আবারও বলছি, ঢাকা মোহামেডানের কাছ থেকেও অনেক ভালোবাসা পেয়েছি। বিশেষ করে বলব আকমল হোসেনের কথা। আর কায়সারের সঙ্গে বন্ধুত্ব তো এখনো অটুট।

প্রশ্ন : সর্বশেষবার ঢাকায় আসেন যখন, এই কায়সার হামিদের সঙ্গেই অস্ত্র নিয়ে ওয়েস্টিন হোটেলে ঢুকে সংবাদ শিরোনাম হয়েছিলেন।

এমেকা : আপনাদের গণমাধ্যমের কথা আর কী বলব! আর্জেন্টিনা-নাইজেরিয়া ম্যাচ দেখার জন্য বাফুফে আমাকে আমন্ত্রণ জানায়। আমি উঠি ওয়েস্টিন হোটেলে। ওখানে ভারতের কোন এক মন্ত্রী এবং নাইজেরিয়া জাতীয় দলও ছিল। কায়সার ওর ব্যাগ আমার হাতে দিয়ে গাড়ি পার্কিং করতে যায়। ওর ভেতরে যে অস্ত্র আছে, আমি কিভাবে জানব! মেটাল ডিটেক্টরে অস্ত্র দেখেও আমি ভড়কাইনি; কারণ সেই ’৮৭-৮৮ সালেই কায়সারের কাছে লাইসেন্স করা অস্ত্র দেখেছি। কিন্তু সেবার কায়সার গাড়িটা রেখে আসার সময় পেল না, তার আগেই টিভিতে ব্রেকিং নিউজ, ‘অস্ত্রসহ এমেকা ধরা’। নাইজেরিয়ার সংবাদপেত্রও এ নিয়ে খুব নেতিবাচক খবর হয়। অথচ কায়সার গাড়ি রেখে এসে লাইসেন্স দেখাতেই আর কিছু হয়নি। ওই পাঁচ মিনিটের ভেতরেই গণমাধ্যম যাচ্ছেতাই খবর প্রচার করে।

প্রশ্ন : আমরা শেষ দিকে চলে এসেছি। একটু জানতে চাই, আপনি বাংলায় কথা বলতে পারেন?

এমেকা : টুকটাক পারি। আর বুঝতে পারি মোটামুটি।

প্রশ্ন : তাহলে সাক্ষাৎকারটি ইংরেজিতে নিলাম কেন?

এমেকা : বাংলায় আমরা কথা বলতে পারতাম। তবে অনেক দিন বাইরে ছিলাম তো। তিন ঘণ্টার কথা ১২ ঘণ্টা লাগত। ‘দোস্ত’, ‘খবর কি?’, ‘ভালো আছ?’, ‘দেখা হবে’—এসব বলতে পারি। আমি আট ভাষায় কথা বলতে পারি। ইংরেজি, বাংলা, হিন্দি, স্প্যানিশ, পর্তুগিজ, ডেনিস, সুইডিশ, নরওয়েজিয়ান। সঙ্গে যোগ করুন আমাদের আফ্রিকান ভাষা ইবো। যদিও এটি আন্তর্জাতিক ভাষা নয়।

প্রশ্ন : শেষ প্রশ্ন। ক্যারিয়ার নিয়ে, জীবন নিয়ে তৃপ্তি কতটা?

এমেকা : আমি তৃপ্ত। ঢাকা মোহামেডানের কথাই ধরুন। প্রায় ৩০ বছর আগে খেলে গেছি কিন্তু সমর্থকরা এখনো আগের মতোই ভালোবাসে। দেখলেন না, আজ দুপুরেও খাওয়ার পর বিলটা দিতে পারিনি। ওরা নেয়নি। একটা আফসোস আছে। যদি অল্প বয়সে ইউরোপের ভালো কোনো ক্লাবের একাডেমিতে সুযোগ পেতাম, তাহলে ফুটবলে আরো অনেক বড় কিছু করতে পারতাম। আবার হিসেব করে দেখুন, জে জে ওকোচা, রাশিদি ইয়েকিনির মতো আফ্রিকার সর্বকালের সেরা তারকাদের চেয়েও আমার জনপ্রিয়তা কিন্তু বেশি। আফ্রিকা, এশিয়া, উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরোপ—পাঁচ মহাদেশে ফুটবল খেলেছি। আমার সমর্থক রয়েছে চার থেকে সাড়ে চার বিলিয়ন। এতটা তো জে জে, রাশিদিদেরও নেই। যে যাই বলুক না কেন, আফ্রিকান ফুটবলারদের মধ্যে বিশ্বে জনপ্রিয়তার নিরিখে আমি সর্বকালের সবচেয়ে ওপরের দিকেই থাকব। এর চেয়ে বড় তৃপ্তি আর কী হতে পারে!



মন্তব্য