kalerkantho


আজ দুই পক্ষ

তবু বারবার ফিরে আসছেন তিনি

১৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



তবু বারবার ফিরে আসছেন তিনি

ছবি : মীর ফরিদ

ক্রীড়া প্রতিবেদক : অন্যের দুঃখে সুখী হওয়ার দিন কবে পেরিয়ে এসেছে বাংলাদেশ! অন্যের সুখে দুঃখী হবারও। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট মানচিত্রের এক কোণে যখন পড়ে থাকত লাল-সবুজ, তখন ছিল সে অবস্থা। ভারত, পাকিস্তান, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, অস্ট্রেলিয়ায় ভর করত বাঙালির ক্রিকেটপ্রেম। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের সদর্প পথচলা শুরু হলে সে প্রয়োজন পড়েনি আর!

বহুকাল আগের সেই স্মৃতি ফিরিয়ে আনল শ্রীলঙ্কা। বলা ভালো, ফিরিয়ে আনলেন চন্দিকা হাতুরাসিংহে। নইলে ত্রিদেশীয় সিরিজের প্রথম ম্যাচে জিম্বাবুয়ের কাছে লঙ্কানরা হারার পর অমন উল্লাসে ভাসবেন কেন এ দেশের সিংহভাগ ক্রিকেটপ্রেমী! যার সশব্দ বিস্ফোরণ তো বন্ধুদের আড্ডা কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঢুঁ মারলেই বোঝা যায়।

আজকের বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা ম্যাচেও তাই উত্তেজনার বাড়তি বারুদ। যেন শ্রীলঙ্কা নয়, শুধু হাতুরাসিংহের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ। তাঁর দলকে হারিয়ে মুখের ওপর জবাব দিতে হবে! কিসের জবাব? এমন প্রশ্নের সামনে কাঁচুমাচুই করবেন হয়তো অনেকে। এই হাতুরাসিংহের অধীনে নিজেদের ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ। কোচ হিসেবে কিছু কৃতিত্ব তো তাঁরও প্রাপ্য। অথচ পদত্যাগ করে শ্রীলঙ্কার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এই জনপদে হাতুরাসিংহে এক নম্বর ভিলেন। যেন ফুটবলের হোসে মরিনহো। চেলসির ইতিহাসসেরা কোচ তিনি; পেপ গার্দিওলার সেই কালজয়ী দলের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে লিগ শিরোপা জিতিয়েছেন রিয়াল মাদ্রিদকে—তবু ওই দুই ক্লাবে মরিনহো চিত্রিত ভিলেন হিসেবে। বাংলাদেশে এখন হাতুরাসিংহে যেমন।

ওই লঙ্কান দায়িত্ব ছাড়ার পর যতগুলো সংবাদ সম্মেলন হয়েছে, অবধারিতভাবে এসেছে হাতুরাসিংহের প্রসঙ্গ। মাশরাফি বিন মর্তুজা থেকে সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল থেকে সাব্বির রহমান—সবাই তোতার মুখস্থ বুলির মতো বলেছেন একই কথা। হাতুরাসিংহে অধ্যায় পেছনে ফেলে এগোতে চায় বাংলাদেশ ক্রিকেট; ক্রিকেটারদের এ বিষয় নিয়ে মাথাব্যথা নেই। কিন্তু ক্রিকেটারদের মাথাব্যথা না থাকলেও তো আমজনতার রয়েছে। আজ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জিতে ওই অধ্যায়কে কি সত্যিকার অর্থে পেছনে ফেলা যায়? জেতার উচ্ছ্বাস থিতিয়ে এলে হাতুরাসিংহে পেছনে পড়ে যাবেন; কিন্তু হারলে তো আবার এ নিয়ে চলবে কচকচানি। উঠবে প্রশ্ন। লঙ্কানদের বিপক্ষে আজকের ম্যাচে জয় তাই কত গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশের জন্য?

মাশরাফি বিন মর্তুজা প্রশ্নটি শুনলেন। এরপর মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে দেন উত্তর, ‘পেশাদার জগত্টা এ রকম, হারলে তো প্রশ্ন উঠবেই। হাতুরাসিংহের জায়গায় আমি থাকলেও প্রশ্নটা উঠত। দক্ষিণ আফ্রিকায় কেউই পারছে না, আমরাও পারিনি—তার পরও একই সমালোচনা হয়েছে। হয়নি তা তো না। আবার কেউ পারছে না বলে আমরা পারব না, এটা কোনো অজুহাত নয়। আমাদের মাথায় রাখতে হবে, যেখানেই যাই আমাদের কাজ পারফরম করা। সেটা করতে হবে।’ আগের সফরের ব্যর্থতাই দলকে সাফল্যবুভুক্ষু করে তুলেছে বলে অধিনায়কের দাবি, ‘দক্ষিণ আফ্রিকায় পারিনি, এখানে আমাদের জন্য বড় সুযোগ। কাল চেষ্টা করব সেরাটা দেওয়ার। আমরা ইতিবাচক আছি। অনুশীলন দেখে নিশ্চয় বুঝতে পারছেন, ছেলেরা অনেক চেষ্টা করছে টুর্নামেন্টে ভালো করার। বিশেষ করে গত সিরিজটা আমাদের জন্য ভালো যায়নি বলে।’

রংধনুর দেশে রংহীন পারফরম্যান্সের কারণে সমালোচনায় জর্জরিত হয়েছেন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। কোচ হাতুরাসিংহের বিদায়ের পর প্রথম ম্যাচে জিম্বাবুয়েকে উড়িয়ে শুরুটা করেছে দারুণ। আজ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে হাতুরাসিংহের মুখোমুখি হবে মাশরাফির দল। চ্যালেঞ্জটা কি তাই বেশি থাকবে না? মাশরাফি তা মানতে চাইলেন না, ‘চ্যালেঞ্জ আসলে সব জায়গাতেই থাকে। হাতুরাসিংহে যখন এখানে ছিল তখন তার ওপরে একরকম চ্যালেঞ্জ ছিল। হয়তো দক্ষিণ আফ্রিকায় আমরা পুরোটা হেরে আসার পর চ্যালেঞ্জটা আরো বেশি হতো। আরো উপভোগ্য হতো। তিনি থাকেননি, তিনি শ্রীলঙ্কাকে বেছে নিয়েছেন। এখন তাঁর আরেক রকম চ্যালেঞ্জ। আর আমাদের তো চ্যালেঞ্জ সব সময় নিতে হয়।’ আজ তো বটেই, এই টুর্নামেন্টে জিতলেও সব চাপ সরে যাবে বলে মানেন না তিনি, ‘আমরা এই টুর্নামেন্টটা যদি জিতি, তবু পরের সিরিজে একই চাপ থাকবে। প্রত্যাশাও তৈরি হয়। আপনি যখন বাংলাদেশের হয়ে খেলবেন এই চ্যালেঞ্জ থাকবেই। এটা নতুন কিছু না। আমরা যে কখনো চাপ সামলাইনি এমন নয় বা এখন সামলাতে পারব না এমন না। এখন ব্যাপার হচ্ছে আমরা বাস্তবায়ন কেমন করি। প্রথম ম্যাচে আমরা ঠিকঠাক করতে পেরেছি; শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে পরিকল্পনাগুলো কিভাবে বাস্তবায়ন করি, তার ওপর সব কিছু নির্ভর করছে।’

তবু চারদিকে যে শুধুই হাতুরাসিংহকে নিয়ে আলোচনা, তা কি ক্রিকেটারদের স্পর্শ করে না? হয়তো করে, কিন্তু বাংলাদেশ অধিনায়ক সেটি স্বীকার করবেন কেন? মাশরাফি তাই নির্দ্বিধায় বলে দেন, ‘সত্যি কথা বলতে, এসব আলোচনা আমাদের ওপর প্রভাব ফেলে না। মনে একটাই ভাবনা থাকে, ম্যাচটা জিততে হবে। এর বাইরে কোনো চিন্তার সুযোগ নেই। চিন্তা করলে আরো বেশি চাপ আসে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে যেভাবে খেলেছি, সেভাবে যেন খেলি—সেটাই সবাই ভাবছি।’

ওভাবে খেলে যদি আজ শ্রীলঙ্কাকে হারাতে পারে বাংলাদেশ, তাহলে যদি হাতুরাসিংহে-অধ্যায় পেছনে ফেলা যায়! বাংলাদেশ ক্রিকেটের এগিয়ে চলার জন্যও তা জরুরি।


মন্তব্য