kalerkantho


বিশেষ আয়োজন

গর্ব নিয়ে কেউ পরলোকে কেউ বা প্রবাসে

৪৬তম বিজয় দিবস পালন করেছে দেশ। এই দেশ তৈরিতে রণাঙ্গনের যোদ্ধাদের মতোই মাঠে যুদ্ধ করেছিলেন একদল ফুটবলার। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রাপ্য সেই মর্যাদাটা তাঁরা পেয়েছেন? আমরা এই ধারাবাহিক আয়োজনে পুনঃপাঠ করতে চেয়েছি ইতিহাসের। বিস্তারিত অনুসন্ধানে বের করার চেষ্টা হয়েছে আমাদের সামনের প্রকাশিত সত্যের পেছনে লুকানো আরো সত্য আছে কি না! দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জীবিত প্রায় সবার সঙ্গে কথা বলে তৈরি এই ধারাবাহিক আয়োজনে আজ পড়ুন তাঁদের কথা, যাঁদের অনেকেই ধরাছোঁয়ার বাইরে নয়তো দূরের মানুষ। অনুসন্ধানী এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন নোমান মোহাম্মদ

১০ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



গর্ব নিয়ে কেউ পরলোকে কেউ বা প্রবাসে

২২ জনের গল্প তো হলো। একেকদিন একেকজনের। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের ওই কীর্তিমানদের একাত্তরের আনন্দ-স্মৃতিতে কেঁপেছে পাঠকের মন, বেদনার বর্তমানে ভিজেছে হৃদয়। কিন্তু বাকি ১৫?

মৃত্যুর ওপারে চলে যাওয়া ১০ এবং যোগাযোগ করতে না পারা প্রবাসী পাঁচজনেরও একটু না হয় অংশগ্রহণ থাকুক কালের কণ্ঠ’র এই আয়োজনে! আজ প্রবাসী পাঁচের গল্প।

ওই পঞ্চকে সবচেয়ে বিখ্যাত এনায়েতুর রহমান খান। বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা ফুটবলারের লড়াইয়ে কাজী সালাউদ্দিনের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী। অনেক দিন ধরেই কানাডায় বসবাস এই ফরোয়ার্ডের। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলে তাঁর যোগদানের সূত্র মোহাম্মদ কায়কোবাদ। পরে স্বাধীন দেশে মোহামেডানে যোগ দেওয়ারও।

কায়কোবাদ তখন আগরতলায়। স্থানীয় লিগে বীরেন্দ্র ক্লাবের হয়ে দুটি ম্যাচ খেলা হয়ে গেছে। হঠাৎ খবর পান, এনায়েত সেই শহরে। তাঁর খোঁজে অভিযানের গল্পটা শোনা যাক কায়কোবাদের মুখেই, “আমাদের ব্রাক্ষণবাড়িয়ার অনেকেই থাকতেন আগরতলায়। ওদের কাছ থেকে খোঁজ নেওয়া শুরু করি। খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে আজাদ হোটেলে গিয়ে পাই এনায়েতকে। ওকে বলি, ‘হোটেলে থাকবে কেন? বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের থাকার ব্যবস্থা আছে বীরেন্দ্র ক্লাবে, চলো’।”

চলে আসেন এনায়েত। বীরেন্দ্র ক্লাবের হয়ে শুরু করেন খেলা। ‘জয় বাংলা একাদশ’-এর হয়ে প্রদর্শনী ম্যাচও খেলেন। পরে কলকাতা থেকে আসা প্রতিনিধিদের সঙ্গে উড়াল দেন স্বাধীন বাংলা দলে যোগ দেওয়ার জন্য। স্বাধীনতাযুদ্ধের আগে ঢাকার ক্লাব ফুটবলে ভিক্টোরিয়ায় খেলেছেন এনায়েত। পরে বিআইডিসি, নাম বদলে হওয়া বিজেএমসিতে। ১৯৭৮ সালে ইনজুরিতে পড়া এই ফরোয়ার্ডকে ওই একাত্তরের মতোই নারায়ণগঞ্জ থেকে খুঁজে পেতে এনে মোহামেডানে নাম লেখানোর কাজটিও করেন কায়কোবাদ। ‘আবাহনীর সালাউদ্দিন’-এর সমান্তরালে ‘মোহামেডানের এনায়েত’ কাল্ট তৈরির পথ সুগম হয় তাতে।

স্টপার প্রাণগোবিন্দ কুণ্ডু যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী। পরিবার নিয়ে বাস নিউ ইয়র্কে। ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ঘোষণা শুনে তিনি কলকাতায় গিয়ে যোগ দেন স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলে। স্বাধীনতার আগে ইপিআইডিসিতে খেলেছেন। পরে ছিলেন ১৯৭৩ সালে লিগ চ্যাম্পিয়ন বিআইডিসি দলের সদস্য। বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে মারদেকায়ও অংশ নেন গোবিন্দ।

কুমিল্লার পাট চুকিয়ে ১০-১২ বছর আগে ভারতে স্থায়ীভাবে চলে যান নিহারকান্তি দাস। ১৯৭১ সালে তাঁর ওই সীমান্ত পেরোনোটা ছিল পালিয়ে। আগরতলায় স্থানীয় লিগে খেলার পর কায়কোবাদ-এনায়েত-নওশেরদের সঙ্গে উড়াল দেন কলকাতায়। নিহার শুরুতে মিডফিল্ডার ছিলেন, পরে ডিফেন্ডার। খেলেছেন মোহামেডান, সাধারণ বীমা, বিআরটিসিতে।

গোলরক্ষক অনিরুদ্ধ চট্টোপাধ্যায়ও এখন থাকেন ভারতে। নিহারের বেশ কয়েক বছর আগে তাঁর চলে যাওয়াটা মনে করতে পারেন স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সতীর্থ বীরেন দাস বীরু। কলকাতায় গিয়ে সরাসরি রিপোর্ট করেন অনিরুদ্ধ। ঢাকার ক্লাব ফুটবলে ফায়ার সার্ভিসে খেলেছেন, পরে আবাহনীতে। ১৯৭৪ সালে আবাহনীর প্রথম লিগ চ্যাম্পিয়ন দলে নিজামের পাশাপাশি বেশ কিছু ম্যাচে আগলান গোলবার। খেলা শেষে অনিরুদ্ধ ফিরে যান খুলনার দৌলতপুরের মহেশ্বপাশার বাড়িতে। মাঝে বেশ কিছুদিন কাতারেও ছিলেন। এরপর স্থায়ীভাবে ভারতে চলে যাওয়া।

গোলরক্ষক আবদুল মোমিন জোয়ার্দার অনেক দিন ধরে কানাডাপ্রবাসী। একাত্তরে কুষ্টিয়া দিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে ফুটবল-যুদ্ধে শরিক হন তিনি। অমন নামকরা কোনো ফুটবলার ছিলেন না হয়তো। কিন্তু স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অংশ হওয়ার গর্ব তো আছে তাঁরও।



মন্তব্য