kalerkantho



বিশেষ আয়োজন

‘সত্য বলব নাকি পাশ কাটিয়ে যাব?’

৪৬তম বিজয় দিবস পালন করেছে দেশ। এই দেশ তৈরিতে রণাঙ্গনের যোদ্ধাদের মতোই মাঠে যুদ্ধ করেছিলেন একদল ফুটবলার। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রাপ্য সেই মর্যাদাটা তাঁরা পেয়েছেন? আমরা এই ধারাবাহিক আয়োজনে পুনর্পাঠ করতে চেয়েছি ইতিহাসের। বিস্তারিত অনুসন্ধানে বের করার চেষ্টা হয়েছে আমাদের সামনের প্রকাশিত সত্যের পেছনে লুকানো আরো সত্য আছে কি না! দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জীবিত প্রায় সবার সঙ্গে কথা বলে তৈরি এই ধারাবাহিক আয়োজনে আজ পড়ুন সুভাষ চন্দ্র সাহার গল্প। অনুসন্ধানী এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন নোমান মোহাম্মদ

৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



‘সত্য বলব নাকি পাশ কাটিয়ে যাব?’

সুভাষ চন্দ্র সাহা

‘জয় বাংলা’র জয়ধ্বনি তখন চারদিকে। ১৯৭১ সালের ২ জুলাই আগরতলায় যে প্রীতি ম্যাচ খেলবে শরণার্থী বাঙালি ফুটবলাররা, ওই দলটির নামও তাই দেওয়া হয় ‘জয় বাংলা একাদশ’। আয়োজন চূড়ান্ত; সমান্তরালে দুশ্চিন্তার পারদও বাড়ছে চড়চড় করে। মাঠে নামার জন্য কিছু প্রস্তুতির ব্যাপার আছে যে! আর কিছু না হোক, অন্তত জার্সি তো বানানো লাগবে! সে টাকাটাই বা আসবে কোত্থেকে?

পাকিস্তানিদের তাড়া খেয়ে পালিয়ে যাওয়া আরো অনেক বাঙালির মতো আগরতলায় আশ্রিত তখন রাজনীতিবিদ মিজানুর রহমান চৌধুরী। পরবর্তীকালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত হন যিনি। জয় বাংলা একাদশের ম্যাচ আয়োজন নিয়ে কথা বলার জন্য তাঁর কাছে যান কয়েকজন। সে দলে ছিলেন ফুটবলার সুভাষ চন্দ্র সাহাও। ওই রাজনীতিবিদের বলা সেদিনের কথাগুলো এত বছর পরও কানে বাজে সুভাষের, ‘‘মিজান ভাই খুব খুশি হলেন। আমাদের কিছু রুপিও দিলেন, সম্ভবত পাঁচ শ রুপি। এরপর বললেন, ‘ওভাল টেস্ট খেলে পাকিস্তানের ফাস্ট বোলার ফজল মাহমুদ যে নাম করেছেন, তোমরাও অমন নাম করতে পারবে। তাতে আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলন গতি পাবে।’ তাঁর কথায় আমরা সবাই অনুপ্রাণিত হই খুব।’’

জয় বাংলা একাদশের ম্যাচ খেলা হলো। পরদিন আগরতলার বেশ কিছু ফুটবলার নিয়ে ভারতীয় বিমানবাহিনীর একটি ডেকোটা প্লেন উড়ে যায় কলকাতা। ওই খেলোয়াড়রা যোগ দেন স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলে। নদীয়ার কৃষ্ণনগরে প্রথম অফিশিয়াল ম্যাচে মাঠে নামেন তাঁরা। তবে সুভাষের বেশি মনে পড়ে ‘গোষ্ঠপাল একাদশ’ নাম নিয়ে খেলা মোহনবাগানের বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচটি, ‘প্রতিপক্ষ মোহনবাগানের মতো বিখ্যাত ক্লাব। বড় ক্লাব। এই খেলাটি তাই তুমুল সাড়া জাগায়। পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি হয়। রেডিওতে ধারাবিবরণী প্রচার করে। তখন আমার মনে হয়—কী সত্য কথাই না বলেছিলেন মিজান ভাই!’

গল্পটি সুভাষ বলছিলেন তাঁর নরসিংদীর বাসায় বসে। ঢাকা থেকে বাসে করে নতুন বাসস্ট্যান্ড নেমে অটোতে করে পুরনো বাসস্ট্যান্ড। সন্ধ্যা হয় হয় সময়ে ওখানেই তিনি অপেক্ষায়। এরপর অস্য গলি তস্য গলিয়ে হাঁটিয়ে ১০৯, পশ্চিম কান্দাপাড়ার বাসায়। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল নিয়ে স্মৃতির ঝাঁপি মেলে ধরেন ওখানেই।

ঢাকা লিগে সুভাষ খেলেন ওয়াপদা, বিজি প্রেসের মতো দলে। ১৯৭১ সালে সীমান্ত পেরিয়ে আগরতলায় খেলা শুরু স্থানীয় লিগের বীরেন্দ্র ক্লাবে, ‘ওখানে ত্রিপুরা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনে আমার যোগাযোগ ছিল। তাদের বলে কায়কোবাদ ভাই, আইনুল ভাই, নওশের ভাইসহ অনেককে ওই লিগে খেলার ব্যবস্থা করে দিই।’ শুধু আগরতলা লিগে খেলা নয়, বাংলাদেশের শরণার্থী ফুটবলারদের নিয়ে কোনো দল করে খেলা যায় কি না, এমন চিন্তাভাবনাও নাকি করেন তিনি, ‘সে চেষ্টা করছিলাম আমি। এরপর তো শুনি কলকাতায় বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতি গঠিত হয়ে গেছে। ওখান থেকে প্রতাপদা, লুৎফর ভাইসহ কয়েকজন এসে আমাদের নিয়ে যান।’

কলকাতায় গেলেন। স্বাধীন বাংলা দলে খেলাও শুরু করেন এই ফরোয়ার্ড। সেখানে কটি গোল করেছেন, তা আর মনে নেই সুভাষের, ‘তবে ফরোয়ার্ড লাইনে খেলেছি যখন, দু-চারটা গোল কি আর দিইনি! দক্ষিণ কলকাতা একাদশের বিপক্ষে ম্যাচে যেমন কর্নার থেকে সরাসরি গোল করেছি।’ তবে স্বাধীন বাংলা দল গঠনের প্রাথমিক পর্যায়টা মনে করতে পারেন না। কিংবা হয়তো মনে করতে চান না। সুভাষের সঙ্গে কথোপকথনে মেলে অমনই ইঙ্গিত।

—স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গঠনে সাইদুর রহমান প্যাটেলের ভূমিকা কতটা?

: এই তো দিলেন প্যাঁচে ফেলে। এখন সত্যি কথা বলব নাকি পাশ কাটিয়ে যাব?

—সত্যিটা বলবেন বলে আশা করছি।

: নরসিংদীর মাহমুদকে দলে নিলাম। কলকাতার ট্রায়ালে প্যাটেলসহ গেণ্ডারিয়ার গ্রুপটা আউট হয়ে যায়। ওদিকে ইমাম ভাইয়ের ইচ্ছা অধিনায়ক হওয়ার। কারণ স্বাধীন বাংলা দল উনি তৈরি করেছেন, কিন্তু সেভাবে হাইলাইটেড হতে পারছিলেন না...

—আপনি কিন্তু সেই পাশ কাটিয়েই যাচ্ছেন। স্বাধীন বাংলা দল গঠনে প্যাটেলের ভূমিকা সরাসরি জানতে চাইছি।

: এটি বলব কিভাবে? আগরতলায় বসে কলকাতায় কী হচ্ছে, জানব কিভাবে?

—কিন্তু সেই আগরতলায় বসেই তো জেনেছেন, আলী ইমাম দল গঠন করেছেন?

: জেনেছি, কারণ ইমাম ভাই আমাকে তা বলেছেন।

—প্যাটেলও তো এটি শত শতবার বলেছেন। তা বিশ্বাস করেননি। আপনি, জাকারিয়া পিন্টু, প্রতাপ শংকর হাজরার মতো কয়েকজনই কেবল সে কৃতিত্ব দেন না। অন্য অনেক সতীর্থই তো পরে ঘটনাবলি শুনে-জেনে প্যাটেলকে স্বাধীন বাংলা দলের প্রতিষ্ঠাতা বলেন। আপনারা তা মানেন না কেন?

: দেখুন, কলকাতা অংশে আমি শূন্য। ওখানকার কথা বলতে পারব না।

—তাহলে তো নওশের, আশরাফ, তসলিমদেরও না বলতে পারার কথা?

: ওরা কিভাবে কী বলেছে, জানি না। তবে আমার জানা মতে, প্যাটেল ঢাকা মাঠে তেমন কোনো ফুটবলার ছিল না।

—তিনি ভালো ছিলেন কিনা, সে প্রশ্ন নয়। স্বাধীন বাংলা দল গঠনের ব্যাপারটা জানতে চাইছিলাম।

: আমি জানি না।

স্বাধীন বাংলা দলে ভাঙন ধরে দ্রুত। দুই ম্যাচ পরই প্যাটেল ছেড়ে যান দল। লেপ-তোষক পানিতে ভিজে যাবার ঘটনায় যে মারামারি, তাতে পিন্টু-প্রতাপের দলে থাকা সুভাষের এখনো দাবি, ‘প্যাটেলের দল ছাড়া পানি ছাড়ার মানুষ নেই।’ আরেক তেতো ঘটনার সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততা প্রবলভাবে। যেখানে বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতির সেক্রেটারি লুৎফর রহমানের কপাল ফাটিয়ে দেওয়া হয়। ওই মারামারিতে সামনের সারিতে থাকা সুভাষ এ নিয়ে এখন আর কথা বলতে চাইলেন না, ‘বাদ দেন ওসব কথা।’

স্বাধীনতার পর সুভাষের ফুটবল ক্যারিয়ার দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। পরবর্তী সময়ে ব্যবসা করেছেন, রাজনীতির সঙ্গেও রয়েছেন। তবে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের স্মৃতিটা তাঁর মনে গাঁথা হয়ে আছে ঠিকই। বিভাজনের অংশটুকুর চর্চা আর করতে চান না। আগরতলা লিগে খেলা, ওখান থেকে স্বাধীন বাংলা দলে যোগ দেওয়া, দক্ষিণ কলকাতার বিপক্ষে কর্নার থেকে গোল দেওয়া—আরো কত স্মৃতি!

আর সব ছাপিয়ে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে মিজানুর রহমান চৌধুরীর ওই কথাগুলো!



মন্তব্য