kalerkantho


রেকর্ড নিয়ে আমার মাথাব্যথা কখনোই ছিল না

নোমান মোহাম্মদ, পার্ল থেকে   

১৮ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



রেকর্ড নিয়ে আমার মাথাব্যথা কখনোই ছিল না

প্রিশ্ন : আপনার আদুরে নাম ‘গাজ্জা’ নিয়ে প্রথম প্রশ্ন। সেটি তো বিখ্যাত এক ফুটবলার পল গ্যাসকোয়েনেরও আদুরে নাম। সেখান থেকেই কি আপনার এই নাম?

গ্যারি কারস্টেন : (হাসি) নাহ্। আমার প্রথম ক্রিকেট দলের সতীর্থরা এ নাম দেয়। গ্যারি থেকে গাজ্জা। এর সঙ্গে পল গ্যাসকোয়েনের কোনো সম্পর্ক নেই।

প্রশ্ন : ছোটবেলায় কাজিনদের সঙ্গে মিলে তো ক্রিকেটের পাশাপাশি রাগবি, টেনিস, স্কোয়াশের মতো খেলাও খেলেন। পরে ক্রিকেট বেছে নেন কেন?

কারস্টেন : হুম, মনে হয় ক্রিকেটই সবচেয়ে ভালো খেলতাম বলে। হ্যাঁ, সব খেলাই উপভোগ করতাম। রাগবি হয়তো আমার দ্বিতীয় পছন্দ ছিল। স্কোয়াশ, টেনিস খেলতেও ভালো লাগত খুব। কিন্তু সবচেয়ে ভালো লাগত ক্রিকেট। আর সেই ছোটবেলা থেকে ক্রিকেটারই হতে চেয়েছি। এখানে পরিবারের বড় ভূমিকা রয়েছে। কারণ আমাদের পুরো পরিবার ছিল ক্রীড়ামনস্ক।

প্রশ্ন : হ্যাঁ, আপনার বাবা নোয়েল কারস্টেনই যেমন ছিলেন কেপ টাউনের নিউল্যান্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ডের কিউরেটর। ক্রিকেটীয় আবহেই তো বড় হয়ে উঠেছেন আপনি?

কারস্টেন : সেটাই। আমি খুব ভাগ্যবান যে নিউল্যান্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ডের অবকাঠামোর মধ্যেই আট বছর বসবাস করেছি। বাবা সেখানকার কিউরেটর ছিলেন। পরিবারসহ ছিলাম সেখানে। সে কারণে ট্রেনিং ও অনুশীলনের দিক দিয়ে কেপ টাউনে সেরা সুবিধা পেয়েছি সব সময়। এদিক দিয়ে আমি অবশ্যই ভাগ্যবান। আর ক্রিকেটীয় আবহে বেড়ে ওঠার কারণে ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্নও বড় হচ্ছিল।

প্রশ্ন : ওই সময় কি ক্রিকেটের কোনো নায়ক ছিল?

কারস্টেন : আপনি নিশ্চয়ই জানেন, তখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বিচ্ছিন্ন দক্ষিণ আফ্রিকা। আমার ক্রিকেটের হিরো তাই ছিলেন তাঁরাই, যাঁরা তখন ইংল্যান্ডে কাউন্টি খেলতেন। অ্যালান ল্যাম্ব, রবিন স্মিথরা।

প্রশ্ন : আর ১৯৯২ বিশ্বকাপ খেলা পিটার কারস্টেন? আপনার সত্ভাই?

কারস্টেন : এটি তো আরো পরের কথা। তত দিনে দক্ষিণ আফ্রিকা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরেছে। আমরা ওয়ানডে খেলেছি; টেস্ট খেলেছি। আর ওই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেললাম। দক্ষিণ আফ্রিকানদের জন্য ক্রিকেটের স্বপ্নের জায়গাটি আরো বড় হয়। হ্যাঁ, পিটারের প্রভাব আমার ওপর রয়েছে। আমি ওর সঙ্গে কিছু প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলেছি। কিছু আন্তর্জাতিক ম্যাচও খেলেছি। তবে একেবারে ছোটবেলায় যখন স্কুলে ক্রিকেট খেলি, পিটার তখনই পেশাদার ক্রিকেটার। প্রভিন্স দলের হয়ে খেলছে। তখন কিন্তু আমি পিটারের মতোই হতে চাইতাম। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে আমার ক্রিকেটার হওয়ার পেছনে ওর বড় প্রভাব তো রয়েছেই।

প্রশ্ন : প্রথম টেস্টের কথা নিশ্চয়ই ভোলেননি। ১৯৯৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষের মেলবোর্নের সেই দিন?

কারস্টেন : প্রথম টেস্ট খেলার কথা কেউ ভোলে না। সত্যি বলতে কী, এর আগ পর্যন্ত শুধু স্বপ্নই দেখেছি। কিন্তু কখনো ভাবিনি যে সত্যি সত্যি দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতিনিধিত্ব করতে পারব। আর সেই ম্যাচেও তো খেলার কথা ছিল না। ম্যাচের দিন সকালে ব্রায়ান ম্যাকমিলান ইনজুরিতে পড়ে। ওর জায়গায় খেলানো হয় আমাকে। এটি ছিল বিস্ময়কর অনুভূতি। দেশের প্রতিনিধিত্ব করার চেয়ে বড় কিছু হতে পারে না।

প্রশ্ন : ম্যাকমিলান তো ইনজুরিতে পড়েন মাঠের গর্তে অ্যাংকেল মচকে। সে মাঠে কিছুদিন আগে পপতারকা ম্যাডোনা কনসার্ট করে গেছেন এবং সে জন্যই ওই গর্তগুলো খোঁড়া। ম্যাডোনার কনসার্টের সঙ্গে আপনার টেস্ট অভিষেক মিলিয়ে সতীর্থরা নিশ্চয়ই মজা করেছেন?

কারস্টেন : আরে নাহ্। সতীর্থরা কিছু বলেনি। আমার মনে হয়, মিডিয়াই এটি খুঁজে বের করেছে। ম্যাডোনার সঙ্গে আমার টেস্ট খেলার সম্পর্ক তৈরি করেছে। এক বিষয়ের সঙ্গে আরেক বিষয়ের সম্পর্ক যেমন আপনারা বরাবর বের করেন। না, সতীর্থরা কিছু বলেনি। আর আমার তখন এত কিছু ভাবার সময় ছিল নাকি? দেশের হয়ে টেস্ট খেলতে যাচ্ছি, এই আনন্দেই বিভোর ছিলাম।

প্রশ্ন : একটু আগে বললেন, কখনো দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতিনিধিত্ব করতে পারবেন, তা ভাবেননি। কিন্তু সেই আপনিই কিনা প্রথম প্রোটিয়া হিসেবে খেলেন ১০০ টেস্ট। তা কতটা গর্বিত করে?

কারস্টেন : এটি ছিল বিস্ময়কর এক পথচলা। প্রথমবারের মতো কেউ না কেউ তো ১০০ টেস্ট খেলতই। আর তা দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেটের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমি ভাগ্যবান যে ওই মাইলফলকে পৌঁছেছি সবার আগে। ক্যারিয়ারের শেষ দিকে এটি ছিল আমার বড় অনুপ্রেরণা। চেয়েছি যেন ১০০ টেস্ট খেলতে পারি। সেটি করতে পেরেছি বলে তৃপ্তি আছে।

প্রশ্ন : সবগুলো টেস্ট খেলুড়ে দেশের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করা প্রথম দক্ষিণ আফ্রিকান ব্যাটসম্যানও আপনি। এও কি অনুপ্রেরণার আরেক জায়গা ছিল?

কারস্টেন : বলতে পারেন। দেখুন, আমি রেকর্ড-পরিসংখ্যান নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাই না। কিন্তু যখন আপনি জাতীয় দলে চলে আসবেন, তখন কিন্তু নিজের সামনে লক্ষ্য ঠিক করতে হয়। এখন বিস্ময়কর শোনাতে পারে, তবে আমি দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে খেলার শুরুর পর থেকেই ভেবেছি, সব দেশের বিপক্ষে আমাকে সেঞ্চুরি করতে হবে। সেটি করতে পেরেছি।

প্রশ্ন : ১৯৯৬ বিশ্বকাপে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে অপরাজিত ১৮৮ রানের ইনিংস খেলেন। ওয়ানডেতে তখন সর্বোচ্চ রানের বিশ্বরেকর্ড ভিভ রিচার্ডসের ১৮৯। সেটি টপকাতে পারেননি বলে একটু কি আফসোস ছিল?

কারস্টেন : না না। এগুলো নিয়ে উদ্বিগ্ন হলে ব্যাটিং করা যায় নাকি? দলের জন্য ব্যাটিং করে গেছি, তাতে আমার রান যা হওয়ার হয়েছে। আমি খুশি। আগেও তো বললাম, রেকর্ড নিয়ে আমার মাথাব্যথা কখনো ছিল না।

প্রশ্ন : তবু অনেক অনেক রেকর্ডে আপনার নাম জ্বলজ্বল করছে। টেস্টে দক্ষিণ আফ্রিকার তখনকার সর্বোচ্চ ২৭৫ রানের ড্যারিল কালিনানের রেকর্ডে যেমন ভাগ বসান। নিশ্চয়ই বলবেন না, ট্রিপল সেঞ্চুরি মিস করাতেও কষ্ট পাননি?

কারস্টেন : আমার কিন্তু মনে হয় না কষ্ট পেয়েছি। সত্যি বলতে, এক ইনিংসে এত রান যে করতে পারব—তাই তো কখনো ভাবিনি। সব সময় চেষ্টা করেছি নিজের সেরাটা দেওয়ার। তাতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ডারবানের সেই ম্যাচে সেঞ্চুরি হয়েছে; ডাবল সেঞ্চুরি হয়েছে। এরপর গ্রায়েম পোলকের ২৭৪-ও পেরিয়ে যাই। ওই বছরের (১৯৯৯) শুরুর দিকে কালিনান যে ২৭৫ রান করে, সে রেকর্ডও স্পর্শ করি আমি। ড্যারিল গ্রেট ব্যাটসম্যান। ওর সঙ্গে অনেক খেলেছি। ওর কাছ থেকে রেকর্ড কেড়ে নিতে হবে, এমন কোনো ব্যাপার ছিল না। আমি একেবারে মনের কথা বলছি, ২৭৫ করেই আমি সন্তুষ্ট ছিলাম। দেশের হয়ে সবচেয়ে বড় ইনিংস খেলা তো চাট্টিখানি ব্যাপার না। ট্রিপল সেঞ্চুরি মিস করায় তাই আফসোস হয়নি। তেমন কোনো কষ্টও না।

প্রশ্ন : আপনার টেস্ট সেঞ্চুরি মানেই দক্ষিণ আফ্রিকার না হারার এক রকম নিশ্চয়তা। ২১টি টেস্ট সেঞ্চুরির মধ্যে ১১টিতে দল জিতেছে; ৯টি সেঞ্চুরির ম্যাচ হয় ড্র। টেস্টে সেঞ্চুরি করে পরাজিত দলে ছিলেন কেবল এক ম্যাচে। এত ভালো রেকর্ড কিভাবে সম্ভব!

কারস্টেন : আমার সেঞ্চুরির রেকর্ড এত ভালো নাকি? জানতাম না (হাসি)। আমার সেঞ্চুরির পরও কোন ম্যাচটি হেরেছি, বলুন তো?

প্রশ্ন : অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিডনিতে ২০০২ সালে। ফলো অন করার পর দ্বিতীয় ইনিংসে করেন ১৫৩ রান, দল তবু হারে ১০ উইকেটে।

কারস্টেন : ও আচ্ছা, সেই টেস্ট। হ্যাঁ, এমন পরিসংখ্যানের কথা জেনে ভালো লাগছে। তবে এর আলাদা কোনো ফর্মুলা নেই। আমরা সবাই মাঠে যাই বড় রান করার জন্য। কোনো ব্যাটসম্যান যখন বড় রান করে, সব সময় ভাবে সে জয়ী দলে থাকবে। আমি যথেষ্ট ভাগ্যবান যে আমার ক্ষেত্রে এটি অনেকবার হয়েছে। বেশির ভাগ সময় হয়েছে।

প্রশ্ন : ওয়ানডেতেও তাই। আপনার ১৩ সেঞ্চুরির মধ্যে দল জিতেছে ১২ বার...

কারস্টেন : বাহ্, শুনে ভালো লাগল। কিন্তু সত্যি বলছি, এর আলাদা কোনো ব্যাখ্যা আমার কাছে নেই।

প্রশ্ন : পাকিস্তানের বিপক্ষে ১৯৯৭ সালের ফয়সালাবাদের সেই ইনিংসটি সম্পর্কে কী বলবেন? যেখানে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ‘ক্যারি দ্য ব্যাট’ করেন?

কারস্টেন : অবশ্যই তৃপ্তির বড় এক জায়গা। একজন ওপেনার হিসেবে সব সময় চাইবেন, যেন পুরো ইনিংস ব্যাটিং করতে পারেন। দলের বিপর্যয়ের মধ্যে আমি তা করেছি। সেটিও কাদের বিপক্ষে? পাকিস্তানে তখন ওয়াসিম আকরাম, ওয়াকার ইউনিস, মুশতাক আহমেদদের মতো বোলার। হ্যাঁ, পুরো ইনিংস ব্যাটিং করে তৃপ্তি পেয়েছি।

প্রশ্ন : এটিই কি আপনার সেরা ইনিংস?

কারস্টেন : অন্যতম সেরা। আমি সেরা বলব ইংল্যান্ডের বিপক্ষে হেডিংলির সেঞ্চুরিকে (২০০৩ সালে)। ২১ রানে পড়ে যায় ৪ উইকেট; দল ভীষণ বিপদে—এমন সময় বড় সেঞ্চুরি করি। আমার মনে হয় ১৩০ রানের। ভালো কিছু জুটি তৈরি হয়। দলকে বের করে নিয়ে আসি বিপদ থেকে। সে কারণে ওই সেঞ্চুরি আমার কাছে সবচেয়ে স্মরণীয়।

প্রশ্ন : ক্যারিয়ারে মুখোমুখি হওয়া সবচেয়ে কঠিন বোলার কাকে বলবেন?

কারস্টেন : গ্লেন ম্যাকগ্রা। অনেকক্ষণ তো হলো, আচ্ছা আমি আর সময় দিতে পারছি না...

প্রশ্ন : একেবারে শেষ একটি প্রশ্ন। কোচ হিসেবেও ভীষণ সফল আপনি। বিশেষত ভারতকে ২০১১ বিশ্বকাপ জেতানো এবং টেস্ট র‍্যাংকিংয়ের শীর্ষে তোলা কতটা গর্বিত করে?

কারস্টেন : অব্যশই গর্বিত হওয়ার মতো। শচীন টেন্ডুলকারের মতো গ্রেট ক্রিকেটারের সঙ্গে আমি কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। আরো অনেক দুর্দান্ত ক্রিকেটার ছিল ওই দলে। সেখানে আমি নিজের অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে পেরেছি। বিশ্বকাপ জেতায় ভূমিকা রাখার সুযোগ পেয়েছি। হ্যাঁ, এটি গর্বিত করে।



মন্তব্য