kalerkantho

সোমবার । ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ । ৮ ফাল্গুন ১৪২৩। ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮।


নিজের রেকর্ড ভাঙার চিন্তা নিয়ে ট্র্যাকে নামতাম

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



নিজের রেকর্ড ভাঙার চিন্তা

নিয়ে ট্র্যাকে নামতাম

ছবি : লুৎফর রহমান

সে এক দিন ছিল বটে, বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে মেয়েদের স্বর্ণযুগ বলা যায় অনায়াসে। বিভেদের দেয়াল ভেঙে ক্রীড়াজগতে নক্ষত্রের মর্যাদা নিয়ে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন তাঁরা। রাজিয়া সুলতানা অনু তাঁদেরই একজন। ৪০০ মিটারে খেলোয়াড়ি জীবনে হারেননি, বরং গড়েছেন-ভেঙেছেন আবার গড়েছেন নতুন রেকর্ড। ২০০ আর ১০০ মিটারেও দুর্দান্ত তিনি ট্র্যাক ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা শেষে আবারও ফিরেছেন ট্র্যাকে। তবে কোচ হিসেবে। তাঁর অতীত-বর্তমানের আয়নায় আলোকিত সে যুগ দেখেছেন নোমান মোহাম্মদ

প্রশ্ন : পুরনো দিনের ‘পাক্ষিক ক্রীড়াজগত’ দেখছিলাম। ১৯৭৭ সালের এক সংখ্যায় রয়েছে আপনার ও মোশাররফ হোসেন শামীমের বুলগেরিয়ায় যাওয়ার খবর। ওখানকার ট্র্যাকে রানিং শু’র স্পাইক নিয়ে সমস্যার কথা আছে সেখানে। কী সমস্যা হয়েছিল, তা থেকেই সাক্ষাৎকারটি শুরু হোক।

রাজিয়া সুলতানা অনু : আন্তর্জাতিক কোনো প্রতিযোগিতায় সেই প্রথম বাংলাদেশ থেকে দুজন ক্রীড়াবিদ বিদেশে যায়। আমি আর শামীম ভাই। সেটি ছিল ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি মিট। আমার বয়স তখন খুব কম, ১৫-১৬ বছর। এর আগে বাংলাদেশে আমাদের দৌড়ের শুরু ঘাসের মাঠে। আর ঢাকা স্টেডিয়ামে সিন্ডার ট্র্যাক। বুলগেরিয়া গিয়ে দেখি একেবারে ভিন্ন ধরনের গোলাপি রঙের টার্টান ট্র্যাক। দৌড় শুরুর আগে রিপোর্টিং সেন্টারে পোশাক, স্পাইক সব কিছু পরীক্ষা করে দেখা হয়। আমাদের স্পাইক দেখে ওরা বলে, ‘এটি দিয়ে তোমরা কিভাবে দৌড়াবে! স্পাইকগুলো তো অনেক বড়। ’ তাহলে কী করা? র‍্যাত দিয়ে ঘষে ঘষে স্পাইক ছোট করে দৌড়েছি। অচেনা ট্রাকে অনভ্যস্ত স্পাইকে দৌড়ানো সহজ ব্যাপার না। তবু আমি ৪০০ মিটারে সেমিফাইনাল পর্যন্ত উঠি। পরে আমি আর শামীম ভাই বুলগেরিয়া থেকে অ্যাডিডাসের রানিং শু কিনে ফেলি। ওরা তিন রকম স্পাইকের সেট দিয়ে দেয় সঙ্গে। ঘাস, সিন্ডার ও টার্টান ট্র্যাকের জন্য। যখন যেমন প্রয়োজন, তেমন স্পাইক লাগিয়ে নিলে হয়। ১৯৭৮ সালে ব্যাংককে পরবর্তী এশিয়ান গেমসে আমাদের তাই ট্র্যাক কিংবা স্পাইক নিয়ে কোনো সমস্যা হয়নি।

প্রশ্ন : ক্রীড়াজগতের ওই সংখ্যায় মারি নামের এক আমেরিকান দৌড়বিদের কথা উল্লেখ করেছেন আপনি। উনি আপনাকে বলেছিলেন, টার্টান ট্র্যাকে শুরুর দিকে দৌড়ানো তেমন সমস্যা না, শেষ ২০০ মিটারে সমস্যা হয়...

অনু : হ্যাঁ, মারি। ওর সঙ্গে খুব খাতির হয়ে যায়। দৌড় দিতে দেখি ওর কথা ঠিক। পরের দিকে কাফ মাসল, হ্যামস্ট্রিংয়ে টান পড়ে যায়। আর মারি কেন, আমার তো সবার সঙ্গেই খাতির হয়ে যায়। দৌড়ের ক্যারিয়ার শেষে পাতিয়ালায় কোচিং ডিগ্রি করার জন্য গিয়ে ওখানে পরিচয় পিটি ঊষার সঙ্গে। ওখানে অনুশীলন করত। আমাকে ডাকত ‘দিদি’ বলে। ওর আর আমার চেহারা নাকি একই রকম। ও একটু কালো, আমি একটু ফর্সা—এই যা পার্থক্য! পিটি ঊষা তখন বলত, ‘দিদি তুম ছোড় দিয়া, হাম চালা আয়া’। মানে আমি দৌড় ছেড়ে দিয়েছি আর ও শুরু করেছে। এই যে সম্মানটা দিত, তা অনেক বড় ব্যাপার না!

প্রশ্ন : ক্রীড়াজগতের আরেক সংখ্যায় দেখলাম, ১৯৭৩ সাল থেকে টানা পাঁচ বছর জাতীয় অ্যাথলেটিকসের ৪০০ মিটারের চ্যাম্পিয়ন হন আপনি...

অনু : মাত্র পাঁচ বছর! আপনি আরো সাত বছর পরের ক্রীড়াজগত ঘাঁটলেও দেখবেন আমিই চ্যাম্পিয়ন। জাতীয় অ্যাথলেটিকসে ১৯৭৩ থেকে ১৯৮৪—টানা ১৪ বছর ৪০০ মিটারের স্বর্ণপদক আমার কাছ থেকে কেউ নিতে পারেনি।

প্রশ্ন : টানা ১৪ বছর!

অনু : আর প্রতি বছরই নতুন নতুন রেকর্ড গড়ে। আমার তখন মূল চ্যালেঞ্জ কিন্তু অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীরা নয়। কিভাবে নিজের রেকর্ড ভাঙব, তা মাথায় নিয়ে ট্র্যাকে নামতাম। সফলও হয়েছি।

প্রশ্ন : কিন্তু ৪০০ মিটার কেন? ১০০ মিটার স্প্রিন্ট তো অ্যাথলেটিকসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ইভেন্ট। জিতলেই ‘ট্র্যাকের রানি’ খেতাব। কখনো ১০০ মিটারে দৌড়াতে ইচ্ছে হয়নি?

অনু : আমার প্রেম ৪০০ মিটার। জানতাম, এই প্রেম আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না। ইভেন্টটা একেবারে ব্যক্তিগত সম্পত্তি হয়ে উঠেছিল। তা আমি কারো কাছে কখনো হারাতে চাইতাম না। এ ছাড়া পরবর্তীতে ২০০ মিটার দৌড়েছে। এই ইভেন্টে টানা ছয় বছর দেশসেরা ছিলাম। একবার দৌড়াই ১০০ মিটারেও। একটুর জন্য সেকেন্ড হই। আর সত্যি বলতে কী, ওই ইভেন্টের সেরা সুফিয়া আপাও আমাকে একটু ভয় পেতেন। কিন্তু সব মিলিয়ে ৪০০ মিটারটা সবচেয়ে আকর্ষণীয় মনে হতো। ১০০ মিটারে চোখের পলকে দৌড় শেষ হয়ে যায়। ২০০ মিটারে অর্ধেক ট্র্যাক দৌড়। আর ৪০০ মিটার দেখুন, একেবারে ট্র্যাক গোল করে পুরো মাঠ চক্কর দিতে হয়। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবার নজর থাকে।

প্রশ্ন : আন্তর্জাতিক ইভেন্টে কি শুধু ৪০০ মিটারেই দৌড়েছেন?

অনু : ১৯৭৮ সালের এশিয়ান গেমসে ২০০ মিটার, ৪০০ মিটার দুই ইভেন্টেই অংশ নিই। ২০০ মিটারে সেমিফাইনাল পর্যন্ত উঠি। ৪০০ মিটারে ফাইনাল। দুর্ভাগ্য যে, ফাইনালে আট নম্বর ট্র্যাকে পড়ে যাই। আর সবাই তো জানেন, ওই ট্র্যাকে দৌড়ানো কত কঠিন। তাতে পঞ্চম হই। অন্য ট্র্যাকে পড়লে পদক পেতে পারতাম। মনে আছে, ইভেন্টের পর থাইল্যান্ডে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত দস্তগীর সাহেব এসে আমার খোঁজ করেন, ‘ওই পুঁচকি মেয়েটা কোথায়?’ সামনে এলাম। উনি বলেন, ‘না তুমি না। ’ আমি বলি, ‘আমিই। শর্টস পরলে আরো ছোট লাগে। ’ উনি আমার প্রশংসা করেন। এছাড়া নয়াদিল্লিতে গ্রামীণ খেলার এক প্রতিযোগিতায় কথা মনে পড়ছে। সেখানে বাংলাদেশ থেকে একটি দল যায়। আমার যাওয়াটা অবধারিত। সেভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছি। কিন্তু দল দেশ ছাড়ার আগের সন্ধ্যায় বাদ দিয়ে দেওয়া হয় আমাকে। বলা হয়, ‘তোমার সামনে ভবিষ্যৎ পড়ে আছে। যেকোনো গেমসে তো যাবেই। এবার তাই না গেলেও কিছু হবে না। ’ কিছু বলিনি আমি। তবে কোচ এসএ জামান মুক্তা খুব বকাঝকা করেন আমাকে, ‘তুমি নিজের জায়গা ছেড়ে দিলে কেন? জীবনে লড়াই করতে শেখো। ’ উনি আমাকে খুব স্নেহ করতেন তো। আরেকজন খুব স্নেহ করতেন—খুকী আপা।

প্রশ্ন : খুকী মানে সুলতানা কামাল?

অনু : হ্যাঁ, উনিও আমাকে বাদ দেওয়ায় খুব অবাক হন। রেগেও যান। পরে দিল্লি থেকে ফেরার পর সবাই বলেন, আমি গেলে নাকি ফার্স্ট হতাম। খুকী আপাও বলেন, ‘তুই থাকলে অবশ্যই স্বর্ণপদক জিততে পারতি। ’ জবাব দিলাম, ‘আমাকে নেয়নি তো কিভাবে যাব?’ উনি মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দেন।

প্রশ্ন : বোঝাই যাচ্ছে, সুলতানা কামালের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক ছিল খুব ভালো। দু-একটি ঘটনা যদি বলেন?

অনু : খুকী আপা আমাকে ডাকতেন ‘হরিণ’। আমি নাকি হরিণের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে দৌড়াতাম। খুব আদর করতেন। সব সময় বলতেন, ‘আগামীটা তোমার। ’ এই কথাগুলো এখনো কানে বাজে। আর উনি যে কী অসাধারণ অ্যাথলেট ছিলেন! হার্ডলস, হাই জাম্প, লং জাম্প ছিল তাঁর ইভেন্ট। দু-একবার ১০০ মিটারেও দৌড়েছেন। আমি ৪০ বছরের বেশি সময় বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকসে কাটিয়ে দিলাম। কিন্তু খুকী আপার মতো অ্যাথলেট দেখিনি। দারুণ স্টাইল। আর ছিল তাঁর হাসি! কখনো তাঁকে গোমড়া মুখে দেখিনি। খুকী আপার পরিবারের সঙ্গে আমার এখনো যোগাযোগ আছে। ওনার ছোট ভাই টিটুর মেয়েটাকে হয়তো অ্যাথলেটিকসে দেবে। আমার কাছে কিছু দিন অনুশীলন করেছে। সামনে এসএসসি পরীক্ষা দেবে। এরপর দেখা যাক।

প্রশ্ন : আপনার দৌড়ের শক্তিশালী দিক ছিল কোনটি?

অনু : নিজেরটা নিজের বলা উচিত না। কিন্তু অন্যরা বলতেন যে, আমার স্টেপিং নাকি খুব সুন্দর ছিল। পুশিং পাওয়ার দারুণ। শুধু ওজন তেমন একটা ছিল না। একেবারে লিকলিকে ছিলাম।

প্রশ্ন : এবার শুরুর কথা জানতে চাই। অ্যাথলেটিকসের সঙ্গে শুরুটা?

অনু : মতিঝিল রেলওয়ে কলোনিতে আমার বেড়ে ওঠা। সেখানে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হতো। দৌড়ালেই আমি ফার্স্ট হই। পড়তাম টিঅ্যান্ডটি স্কুলে। সেখানেও দৌড়ে আমি সেরা। আমাদের স্কুলের ছাত্রী শামীম আরা টলি ভালো অ্যাথলেট। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় দৌড়ায়। আমি তখন স্কুল চ্যাম্পিয়ন কিন্তু বাইরের প্রতিযোগিতা সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। তো জাতীয় অ্যাথলেটিকসের আগে আগে টলি আপা আমাদের ক্লাসে এসে জিজ্ঞেস করেন, ‘স্কুলের দৌড়ে চ্যাম্পিয়ন হলো যে পুঁচকি মেয়েটা, ও কোথায়?’ এগিয়ে গেলাম। আমাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি কি বাইরের প্রতিযোগিতায় দৌড়াবে? ঢাকা স্টেডিয়ামে গিয়ে তাহলে অনুশীলন করতে হবে। ’ আমি তো মহাখুশি। কিন্তু বাসা থেকে অনুমতি তো নিতে হবে। টলি আপা তা শুনে বলেন, ‘এটি কোনো সমস্যা না। আমার আব্বা তোমার বাসায় গিয়ে অনুমতি নিয়ে আসবেন। ’

প্রশ্ন : অনুমতি পেলেন সহজে?

অনু : আমার বাবা রেজাউর রহমান ছিলেন রেলওয়ের অ্যাকাউন্টস অফিসার। মা হামিদা বেগম। আমরা তিন বোন, চার ভাই। আমি পঞ্চম। বড় ভাই হাইজাম্প করত একটু-আধটু। আসলে আব্বা ও বড় ভাইয়ের ইচ্ছে ছিল আমি যেন খেলাধুলায় কিছু করি। টলি আপা, তাঁর আব্বা, হামিদা আপা, ছবি আপারা আমার বাসায় গিয়ে বলাতে আর কোনো সমস্যা হয়নি। টলি আপার আব্বা অভিভাবক হয়ে দায়িত্ব নিলে খুশি মনেই বাসা থেকে অনুমতি দেওয়া হয়। আমি তখন বোধহয় পঞ্চম বা ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি। আমাদের অ্যাথলেট হওয়ায় স্কুলের গেমস টিচার কেরামত আলী স্যারেরও অনেক অবদান। আমাদের অনুশীলনে নিয়ে যান, আবার বাসায় দিয়ে যান।

প্রশ্ন : অ্যাথলেটিকসের আরেক কিংবদন্তি সুফিয়া খাতুনের স্বামী আনসার আলীর অবদানের কথাও আপনি কোথাও বলেছেন বলে পড়েছি...

অনু : আনসার আলী স্যার। উনি আমাদের অঙ্কের টিচার। হ্যাঁ, তিনিও বলেছেন। তবে এর আগেই টলি আপার সঙ্গে আমার কথা হয়ে গেছে। ওনার বাবা আমার বাসায় গিয়ে অনুমতিও নিয়ে এসেছেন।

প্রশ্ন : ১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় অ্যাথলেটিকসে অংশ নিয়ে ৪০০ মিটারে স্বর্ণপদক জেতেন। প্রতিযোগিতা শুরুর আগে অমন কোনো লক্ষ্য ছিল কি?

অনু : নাহ্্। জাতীয় প্রতিযোগিতা কী, তাই বুঝতাম না। এখনকার ছেলেমেয়েরা তো পাক্কু, সব বুঝে যায়। আমাদের দৌড়াতে ভালো লাগত, দৌড়েছি। স্বর্ণ জিতে গেছি। ব্যস!

প্রশ্ন : টলি আর আপনি একেবারেই সমসাময়িক। জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় দুজন মুখোমুখি হতেন নিশ্চয়ই?

অনু : তা তো হতেই হতো। ট্র্যাকের বাইরে আমার জানের বন্ধু, কিন্তু ওখানে নেমে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ছাড়া উপায় কী! একবার ওকে হারিয়ে স্বর্ণপদক জিতি। এরপর আমার কী কান্না! কারণ টলির জন্য খুব খারাপ লাগছিল। তখন ওর আব্বা এসে আমাকে সান্ত্ব্তনা দেন, ‘তুই বোকার মতো কাঁদছিস কেন? টলি অন্য কারো কাছে হারেনি; তোর কাছে হেরেছে। আমার এক মেয়ে জিততে না পারলেও আরেক মেয়ে তো জিতেছে। ’ সত্যি উনি আমাকে মেয়ের মতো দেখেছেন।

প্রশ্ন : প্রথম ট্র্যাকসুট, প্রথম রানিং শুর কথা মনে আছে?

অনু : এমনিতেই তো বাংলাদেশে তৈরি জিনিস দিয়ে দৌড়াতাম। শুরুতে আজাদ স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে যে দৌড়াই, ওরাই দেয়। পরে বিটিএমসি, বিজিএমসির হয়ে। বিদেশি ভালো ট্র্যাকসুট ও রানিং শু প্রথম পাই হামিদা আপার কাছ থেকে। ওনারা ব্যবহার করাটি দেন অনুশীলনের জন্য। পরে বাসা থেকেই সব এনে দেয়। মনে আছে, আমার বড় ভাবির মামাকে দিয়ে জার্মানি থেকে অ্যাডিডাসের রানিং শু আনাই ১৯৭৪ সালে। তখনকার সময়েই দাম পড়ে ১৭ হাজার টাকা।

প্রশ্ন : এত দাম?

অনু : অ্যাথলেটিকস তো স্টাইলিস্ট খেলা। দামি রানিং শু, দামি ট্র্যাকসুট না পরলে চলে! আমি তো পরবর্তী সময়ে বিদেশে গেলে সব সময় নতুন নতুন কিনে নিয়ে আসতাম। আরেকটি কথাও মনে পড়ছে। ১৯৭৮ সালে এশিয়ান গেমসে যাওয়া বাংলাদেশ দলের অংশ ছিলাম। সেবার ফুটবল দলের কোচ বেকেলহফট। উনি আমাকে, শামীম ভাইকে ও লিপিকে অ্যাডিডাসের তিন জোড়া রানিং শু দেন।

প্রশ্ন : প্রতি বছর যে জাতীয় অ্যাথলেটিকস কিংবা সামার মিটে স্বর্ণপদক পান, এর পুরস্কার কি শুধুই পদক ছিল? নাকি আর্থিক প্রণোদনাও ছিল সঙ্গে?

অনু : ওই পদকই। পরে এরশাদ সাহেব যখন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের চেয়ারম্যান, উনি প্রাইজমানি দেন। ১৯৭৭ সালে ময়মনসিংহে জাতীয় অ্যাথলেটিকস হওয়ার আগে আমরা বলি, ‘শুধু শুধু ফার্স্ট হয়ে লাভ কী, কোনো টাকাপয়সা তো পাই না। ’ এরশাদ সাহেব তখন ঘোষণা দেন, যারা নতুন জাতীয় রেকর্ড করবে, তাদের টাকা দেওয়া হবে। আমি সেবার সর্বোচ্চ টাকা পাই। সম্ভবত ৫৫ হাজার। চার ইভেন্টে নতুন রেকর্ড করি। ২০০ মিটার, ৪০০ মিটার, ৪ গুণিতক ১০০ মিটার রিলে এবং ১০০ মিটার স্প্রিন্ট। ১০০ মিটারে সুফিয়া আপার পেছনে দ্বিতীয় হই কিন্তু নতুন রেকর্ড হয়েছিল। সে কারণে এই চার ইভেন্ট মিলিয়ে ৫৫ হাজার টাকার মতো প্রাইজমানি।

প্রশ্ন : সব মিলিয়ে জাতীয় পর্যায়ে পদক সংখ্যা কত?

অনু : অনেক। জাতীয় অ্যাথলেটিকস, সামার গেমস সব মিলিয়ে ৮০-৯০টির মতো হবে।

প্রশ্ন : রেকর্ড করেছেন কয়বার?

অনু : এত সব কি আর এখন মনে আছে? তবে ৪০০ মিটারে ওই যে টানা ১২ বছর স্বর্ণপদক জিতি, তা এখনো কেউ ভাঙতে পারেনি।

প্রশ্ন : বাংলাদেশের সমাজ বাস্তবতায় এখনো মেয়েদের পক্ষে খেলাধুলা করা ছেলেদের তুলনায় কঠিন। সেই সত্তরের দশকে আপনাকে নিশ্চয়ই আরো অনেক কঠিন সময় পেরোতে হয়েছে?

অনু : সত্যি বলতে কী, না। আমি কখনো তেমন বাধার সামনে পড়িনি। বাসা থেকে উৎসাহ দেওয়া হতো বরং। কলোনিতে বড় হয়েছি। সেখানে মুরব্বিদের কাছ থেকে সব সময় উৎসাহ পেয়েছি। ‘অনু, সামনের বছর স্বর্ণটা ধরে রেখো’—এমনটা বলতেন। বিদেশ যাওয়ার সময় সবাই দোয়া করতেন। তবে হ্যাঁ, অন্য মেয়েদের কাছে শুনেছি যে, ওদের অনেক কঠিন সময়ের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। নিজেকে তাই আমার ভাগ্যবানই মনে হয়। আরেকটি ব্যাপার বলি। এখনকার সমাজ যেন কেমন হয়ে গেছে। মেয়েদের খেলাধুলাকে এখন বরং অনেক বেশি নিরুৎসাহ করা হয়। আমাদের সময়ে এতটা ছিল না।

প্রশ্ন : আপনি তাহলে বলছেন, ৩০-৪০ বছর আগের তুলনায় এখনকার সমাজ আরো পিছিয়ে গেছে?

অনু : সমাজ পেছায়নি, আমরা পিছিয়ে গেছি। আর এখনকার ছেলে-মেয়েরা তো খেলেই না। কী এক কম্পিউটার পেয়েছে, সারা দিন ওটা নিয়ে পড়ে থাকে। ফার্মের মুরগি হয়ে গেছে সব।

প্রশ্ন : আপনার সমসাময়িক অ্যাথলেটদের মধ্যে কাকে সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী মনে হতো?

অনু : কাউকে না।

প্রশ্ন : কাউকেই না?

অনু : না। কোচ ইউসুফ ভাই এসে মজা করে বলতেন, ‘অনু, এবার একজনকে নিয়ে এসেছি। ও তোমাকে হারিয়ে দেবে। ’ আমি বলতাম, ‘ইউসুফ ভাই, ভয় পাই না। দৌড়াব তো একসঙ্গেই। দেখা যাবে কী হয়!’ নিজের ওপর আসলে সব সময় আত্মবিশ্বাস ছিল। আমি অনুশীলন করতাম ছেলেদের সঙ্গে। কারণ ছেলেদের সঙ্গে অনুশীলন করলে মেয়েদের উন্নতি হয় অনেক। আমি তো এমনকি ফুটবলারদের সঙ্গেও অনুশীলন করতাম। ব্রাদার্সের মহসিন ভাইরা যখন ফুটবল খেলার আগে ওয়ার্ম-আপ করত, সেখানেও থাকতাম। ওনারা খুব প্রশংসা করতেন। আসলে তখন সময়টাই ছিল অন্য রকম। পুরো ক্রীড়াঙ্গনের সবাই খুব কাছের মানুষ। এখন তো কেমন যেন হয়ে গেছে। তবে মহসিন ভাইয়ের একটি ঘটনা মনে হলে খুব কষ্ট লাগে। বলব?

প্রশ্ন : বলুন প্লিজ...

অনু : একদিন সকালে প্র্যাকটিস শেষে সবাই ডাব খাচ্ছি। মহসিন ভাই বললেন, ‘অনু, কাল আমি আসব না। খ্যাপ খেলতে খুলনা যাব। ’ ফট করে মুখ ফসকে বলে দিলাম, ‘এই খ্যাপ খেলতে খেলতেই আপনি মরবেন। ’ এই কুফা কথাটা যে লেগে যাবে, তা কী বুঝেছিলাম! বিকেলে খবর পাই, মহসিন ভাই খুলনায় দর্শকের ছোড়া বোমার আঘাতে ব্যথা পেয়েছেন। কী যে খারাপ লেগেছে তখন! পরে উনাকে ঢাকা সিএমএইচে আমরা সবাই দেখতে যাই। ওই মানুষ যে বেঁচে ফিরে আসবে, ভাবতে পারিনি। জার্মানিতে গিয়ে অনেক দিন চিকিৎসা করিয়ে উনি পরে সুস্থ হন।

প্রশ্ন : আপনাদের সময়ে অ্যাথলেটিকসে তো অনেক তারকা। আপনার সঙ্গে বেশি খাতির ছিল কাদের?

অনু : আমরা সবাই তারকা ছিলাম। যার যার ইভেন্টে সবাই নক্ষত্র। ‘আমি ফার্স্ট হয়েছি, তুই যেন ফার্স্ট হোস’—এমনটা বলে সবাই সবাইকে উৎসাহিত করতাম। মেরিনা, টলি, সুফিয়া আপা, মিমু সবার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক।

প্রশ্ন : তখনকার সময়ে বাংলাদেশ ক্রীড়াঙ্গনের মেয়েদের অনেকেই তো এক সঙ্গে অনেকগুলো খেলা খেলতেন। আপনি অ্যাথলেটিকস ছাড়া অন্য কোনো ইভেন্টে অংশ নেননি?

অনু : না। এক তরকারির আলু ভালো। সব তরকারির আলু খেতে মজা না। এমনিতে অনুশীলনে যেতাম। জিমন্যাস্টিকস যখন বাংলাদেশে শুরু হয়, মেয়ে পায় না। আমাদের বলল, তোমরা এটি চালু করে দিয়ে যাও। গিয়েছি। বাংলাদেশে মেয়েদের জিমন্যাস্টিকসের ইতিহাস লিখতে হলে আমাদের কথা লিখতে হবে। ভলিবলে যখন শুরু হয়, খেলেছি। কিন্তু ভালোবাসার জায়গাটা সব সময়ই ছিল দৌড়।

প্রশ্ন : দৌড়ের কোচদের মধ্যে কাকে কাকে পেয়েছেন?

অনু : প্রথম কোচ মুক্তা ভাই। মান্নান ভাই, চাকমাদা, ইউসুফ ভাই, শাহ আলম ভাই এমন অনেকে ছিলেন। এ ছাড়া আমেরিকা, জার্মানি, রাশিয়া, মালয়েশিয়ার কোচ বিভিন্ন সময় এসে আমাদের কোচিং করিয়েছেন। তাঁদের সবার কাছে আমার কৃতজ্ঞতা।

প্রশ্ন : পাক্ষিক ক্রীড়াজগতের বর্তমান সম্পাদক দুলাল মাহমুদ আপনার এক কোচের কথা বলছিলেন, যিনি আপনাকে খুঁজতে বহু বছর পর বাংলাদেশে এসেছিলেন...

অনু : সেটা অবাক করা এক ঘটনা। ১৯৭৮ সালে আমাদের কোচিং করানোর জন্য বাংলাদেশে আসেন প্যাট হেপ নামের এক কোচ। আমাদের সবার সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক হয়। উনি বাংলা ভাষাও শিখে ফেলেন। সেই ভদ্রলোক আবার বাংলাদেশে আসেন গত বছর। মানে প্রায় ৩৮ বছর বছর। এই দীর্ঘ সময়ে সব কিছুই তো বদলে গেছে। কিন্তু প্যাট হেপের কাছে যত্ন করে রাখা ক্রীড়াজগতের একটি কাভার পৃষ্ঠা। সেখানে পাঁচজন অ্যাথলেটের ছবি। আমি, মেরিনা, সুফিয়া আপা, রোকেয়া ও প্রীতি রানি। লেমিনেট করা সেই ছবিটি নিয়ে উনি যান স্টেডিয়ামে। জনে জনে জিজ্ঞেস করতে থাকেন, এঁদের কোথায় পাওয়া যাবে। ছবি দেখে চিনে ওনাকে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে নিয়ে আসেন একজন। আমি কী যে অবাক হয়েছি! ‘অনু, তুমি তো বড় হয়ে গেছ’—সুন্দর বাংলায় বলে দিলেন প্যাট। ৩৮ বছর পর আমাদের সঙ্গে দেখা করার জন্য উনি এলেন বাংলাদেশে। ক্রীড়াজগতের ছবির সূত্র ধরে খুঁজে বের করলেন। কী অবিশ্বাস্য না ব্যাপারটা!

প্রশ্ন : দৌড় ছেড়ে দেন কবে?

অনু : ১৯৮৪ সালে। আমি টিঅ্যান্ডটি স্কুল, বদরুন্নেসা কলেজের পর ভর্তি হই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। অর্থনীতিতে পড়াশোনা শেষ করে এমএস করতে চলে যাই আমেরিকায়। দেখুন, পড়ালেখাটা আমার নিজের সম্পত্তি। এখানে ভালো না করলে বাকি সব কিছু অর্থহীন। আমার জেতা অনেক পদক অনেককে দিয়ে দিয়েছি। কিন্তু পড়ালেখার সার্টিফিকেটগুলো কেউ চাইলে দেব? দেব না। ওই ১৯৮৪ সালে এমএস করার জন্য আমেরিকা যে যাই, ফিরে আর দৌড়াইনি। ১২ বছর ৪০০ মিটারে আমাকে কেউ হারাতে পারেনি, গর্বটা এখনো রয়েছে। কেউ বলতে পারবে না, ‘৪০০ মিটারে অনুকে হারিয়েছি’। এই সম্মান নিয়ে, গৌরব নিয়ে আমি দৌড় ছেড়ে দিই। আর এত বছর এক ইভেন্টে সেরা হওয়া কিন্তু সহজ না। ভেবেছিলাম, বিউটি হয়তো আমার রেকর্ড ভাঙবে। ওকে কবে যেন জিজ্ঞেসও করলাম। ও বলে, ‘নাহ্্ আপা, আপনার রেকর্ড ভাঙতে পারলাম না। ’

প্রশ্ন : দৌড় ছাড়ার পরও তো অ্যাথলেটিকসের সঙ্গেই আছেন। এখন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের অ্যাথলেটিকসের কোচ। কোচিংয়ে কি আগ্রহ ছিল আগে থেকে?

অনু : অ্যাথলেটিকস আমার জায়গা। এখানকার সবাই আমার পরিচিত। এখানে থেকে যাওয়াটা ভালো না! আমেরিকায় এমএস করে দেড় বছর পর ফিরি। বিয়ে করি। এরপর ১৯৮৬-৮৭ সালের দিকে ইমাম ভাই একদিন বললেন, ‘অনু, পাতিয়ালা যাবি? ওখান থেকে ডিপ্লোমা করে এলে কোচিং করাতে পারবি। ’ চলে গেলাম।

প্রশ্ন : ফিরেই জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে কোচ হিসেবে যোগ দেন?

অনু : না। ১০ মাসের ডিপ্লোমা করে ফিরি। এরপর মুক্তা ভাই আমাকে বিকেএসপিতে নিয়ে যান। উনি আমার কোচ, আমার গুরু। ওনার দেওয়া ঘড়ি, বাঁশি এখনো আমার কাছে আছে। বিকেএসপিতে কোচ হিসেবে কাজ করি দেড় বছর। অনেক দূর তো, যাওয়া-আসায় সমস্যা হয়। পরে তা ছেড়ে সাউথ ব্রিজ স্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিই। কিন্তু অ্যাথলেটিকস আমার প্রাণের জায়গা, মনটা এখানে পড়ে থাকে। এনএসসির ডিরেক্টর অ্যাডমিন মহিউদ্দিন ভাই যখন বলেন এখানে যোগ দেওয়ার জন্য, চলে আসি। ১৯৯৫ সাল থেকে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের কোচ হিসেবে কাজ করছি।

প্রশ্ন : দৌড়ানোর মতো আনন্দ নিশ্চয়ই কোচিংয়ে নেই?

অনু : আরে না, কী বলেন! আমার কোচিংয়ের একটি ছেলে বা মেয়ে যখন ভালো করে কী যে আনন্দ হয়! নিজের দৌড়ানোর চেয়েও তা বেশি। আর নিজের দৌড়টাকেই যদি বেশি আনন্দের মনে করি, তাহলে তো আমি স্বার্থপর হয়ে গেলাম। আমি ২০০২ সালে জার্মানিতে কোচিং ডিপ্লোমা করে ‘এ’ লাইসেন্স পাই। আমেরিকা, ইন্দোনেশিয়া, ভারত থেতে কোচিংয়ে ডিপ্লোমা করেছি। ১৯৯৬ সালের পাকিস্তানে মেয়েদের ইসলামিক গেমস এবং ২০০৪ সালের সাফ গেমসে টেকনিক্যাল অফিশিয়াল হিসেবে কাজ করি। নবম-দশম সাফ গেমস, ইন্দো-বাংলা গেমসেও তাই। এ ছাড়া ২০১০ সালে ইন্টান্যাশনাল ইসলামিক উইমেন্স ফেডারেশনের এক কনফারেন্সে মালয়েশিয়া যাই আমি, সালমা আপা, আলেয়া আপা। নতুন কমিটি হবে। বলা হয়, চেয়ারম্যান পদে আগ্রহী কেউ থাকলে নিজেদের সম্পর্কে তিন মিনিট করে বলতে হবে। এরপর নির্বাচনের মাধ্যমে হবে নতুন কমিটি। চেয়ারম্যান পদের জন্য তিন প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে যায়। বাংলাদেশ থেকে আমি, কাতার আর কোন দেশ থেকে যেন আরেকজন। তিন মিনিট করে বললাম। আমার কথায় মুগ্ধ হয়েই চার বছরের জন্য আমাকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করা হয়। পরে ইরানের স্পোর্টস ফেডারেশনের সঙ্গে কী এক ঝামেলায় আপাতত তা স্থগিত আছে। কিন্তু আমি মনে করি, এটি অনেক বড় ব্যাপার।

প্রশ্ন : বাবা-মার কাছ থেকে উৎসাহ পাওয়ার কথা আগে বলেছেন। বিয়ের পর স্বামী-শ্বশুরবাড়িতে থেকেও অমন উৎসাহ পেয়েছেন?

অনু : না পেলে আমি এখনো কিভাবে কোচিং করাই? ওনারা সব সময় আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন। এ জন্য আমি সবার কাছে কৃতজ্ঞ। ছোট বাচ্চা রেখে জার্মানিতে ছয় মাসের কোচিং কোর্স করে এসেছি। শাশুড়ি দুষ্টুমি করে বলেছিলেন, ‘এবার দেশে ফেরার পর দেখবে, ছেলের জন্য আরেকটা বউ নিয়ে আসব। ’ আমি বলি, ‘নিয়ে আসেন, অসুবিধা নেই। ’ দেশে ফিরে ওনাকে জিজ্ঞেস করি, ‘মা, এনেছেন কাউকে?’ উনি বলেন, ‘না আনতে পারলাম না। তোমার জন্য মায়া লাগল। ’ আসলে আমার শ্বশুরবাড়ির সবাই ভালো। নইলে এখনো কোচিং করাতে পারতাম না। আমার স্বামী মুস্তাফিজুর রহমান পাবলিক সার্ভিস কমিশনে কাজ করতেন। এখন অবসরে। আমাদের একটাই ছেলে রাজিন মুস্তাফিজ। আমেরিকা থেকে গ্র্যাজুয়েশন করে দেশে ফিরেছে।

প্রশ্ন : জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারও তো পেয়েছেন? কবে?

অনু : ২০০০ সালে। টিভির খবরে নিজের নাম যখন শুনি, চোখ দিয়ে পানি বের হয়ে আসে। আজ এত বছর পর বলতে গিয়েও আমি আবেগ সামলাতে পারছি না। আমি বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতি, বাংলাদেশ ক্রীড়া সাংবাদিক সংস্থার পুরস্কার পেয়েছি। কিন্তু জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার তো ভিন্ন বিষয়। সর্বোচ্চ সম্মান। অ্যাথলেটিকসের কারণেই এই সম্মানটা পেয়েছি আমি।

প্রশ্ন : সব মিলিয়ে ক্যারিয়ার নিয়ে, জীবন নিয়ে আপনার তৃপ্তি কতটা?

অনু : পুরোপুরি তৃপ্ত। কোনো দুঃখ নেই, কোনো আফসোস নেই। সবার সহযোগিতা পেয়েছি, কেউ আমাকে নিয়ে নেতিবাচক কোনো মন্তব্য করেননি। অ্যাথলেটিকসে সেরা হতাম, পেপারে ছবি আসত—এগুলো বিরাট ব্যাপার। ২০১৩ সালে পুনেতে অ্যাথলেটিকস দল নিয়ে যাই। ওখানে একজন শিখ এসে আমাকে বলেন, ‘অনু, তুমি বাংলাদেশ থেকে এসেছ?’ আমি মাথা নাড়ি কিন্তু ভদ্রলোককে চিনতে পারি না। শিখদের সবাইকে দেখতে তো একই রকম লাগে। ও পরিচয় দেয়, ‘আমি রান্ধুয়া। তুমি যখন পাতিয়ালায় এসেছিলে, আমি সেখানে ছিলাম। ’ কী যে ভালো লাগল! এত বছর পরও ভিনদেশের একজন আমাকে মনে রেখেছেন! না দৌড়ালে এসব কী হতো! শ্রদ্ধেয় আবদুল হামিদ ভাই আমার একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন চ্যানেল আইতে। সেখানে যখন আমার রেকর্ডগুলোর কথা বলছিলেন, খুব ভালো লাগছিল। একটাই আক্ষেপ, নিজের দৌড় নিজে দেখতে পারিনি। মাঝেমধ্যেই মনে হয়, যে দৌড়ের কারণে খুকী আপা আমাকে ‘হরিণ’ বলতেন কিংবা সবাই যে বলতেন আমার দৌড়টা দারুণ—সেটি যদি কোথাও রেকর্ড করা থাকত! নিজের দৌড় যদি নিজে দেখতে পেতাম!


মন্তব্য