kalerkantho

26th march banner

স্টেডিয়ামের নামে ভ্রমণবিলাস

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



স্টেডিয়ামের নামে ভ্রমণবিলাস

ক্রীড়া প্রতিবেদক : পূর্বাচলে নতুন ক্রিকেট স্টেডিয়ামের জায়গা নিশ্চিত হতেই শুরু হয়েছে বিদেশ ভ্রমণ। প্রথম দফায় ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং ক্রীড়া পরিষদ কর্মকর্তারা অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরেছেন অস্ট্রেলিয়া থেকে। দুর্দান্ত মেলবোর্ন স্টেডিয়ামের স্মৃতি নিয়ে ফিরলেও তার কোনো প্রভাব কি নতুন স্টেডিয়ামে থাকবে? আর সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার, ক্রিকেটের স্টেডিয়াম হলেও তাদের এই সফরে সঙ্গে ছিলেন না ক্রিকেট-সংশ্লিষ্ট কেউ। এমনকি ক্রিকেট বোর্ড তাদের সফর সম্পর্কে ঠিক জানেও না।

প্রধানমন্ত্রী পূর্বাচলে ক্রিকেটের জন্য নতুন এক স্টেডিয়াম নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিছুদিন আগে এ জন্য রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ প্রায় সাড়ে ৩৭ একর জমি বরাদ্দ করে। এর পরই গত ৭ ফেব্রুয়ারি ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব আখতার উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে এক প্রতিনিধিদল অস্ট্রেলিয়া সফরে গেছেন এক সপ্তাহের জন্য। এই দলে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সচিব ছাড়াও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ওমর ফারুক ও ক্রীড়া পরিষদের প্রকৌশলী ছিলেন। উদ্দেশ্য অস্ট্রেলিয়ার আধুনিক মেলবোর্ন ও সিডনি স্টেডিয়ামসহ আরো কিছু স্থাপনা দেখা। এ নতুন নয়। এর আগেও বিভিন্ন সময় অনেক কর্মকর্তা এ রকম অভিজ্ঞতা অর্জনের সফরে গিয়েছিলেন ইউরোপে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তাঁদের সেই আধুনিকতা দর্শনের অভিজ্ঞতা দিয়ে বাংলাদেশে কোনো ক্রীড়া স্থাপনা তৈরি হয়নি। আর হবেই বা কিভাবে? ক্রিকেটের মাঠের জন্য যখন ক্রিকেট-সংশ্লিষ্ট মানুষজন বাদ দিয়ে সচিব-কর্তারা বিদেশ সফরে যান, তখন হওয়ার কথাও নয়। কিন্তু ক্রীড়া পরিষদ সচিব মনে করেন, তাঁদের এই সফরের অভিজ্ঞতাও ঠিক কাজে লাগবে। কিভাবে? ‘অভিজ্ঞতারও দরকার আছে, যারা যায় তারা সেই অনুযায়ী একটা প্ল্যান করে। তবে সব কিছু বাস্তবায়ন করতে গেলে অর্থও তো একটা বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায় শেষ পর্যন্ত’ বলছেন ক্রীড়া পরিষদ সচিব।

সফরের উদ্দেশ্য পূর্বাচলের ক্রিকেট স্টেডিয়াম হলেও প্রতিনিধিদলে ক্রিকেটের কেউ ছিল না। সেটাই হলো আশ্চর্য ব্যাপার। তবে অশোক কুমার আশ্চর্য হচ্ছেন না। বরং তিনি মনে করেন, তাঁরা এই সফর দিয়ে মাত্র শুরু করলেন। এরপর আরো অনেক সফর হবে। তখন ক্রিকেটের লোকদেরও সুযোগ আসবে, ‘এটা তো প্রাথমিক পর্যায়। যখন ডিজাইন তৈরির প্রসঙ্গ আসবে, তখন তো ক্রিকেটের লোকজনকে যেতে হবে। কনসালট্যান্টকে যেতে হবে। কারণ আমাদের উদ্দেশ্য নতুন স্টেডিয়ামটা যেন আধুনিক মানসম্পন্ন একটা জিনিস হয়। ’ কিন্তু ক্রিকেট বোর্ড তাদের সঙ্গে বিদেশ সফরে যেতে খুব একটা আগ্রহী নয়। ক্রীড়া পরিষদের ওপর তারা ভরসাই রাখতে পারছে না! ঢাকাসহ বিভাগীয় ইনডোর স্টেডিয়ামের নকশা নিয়ে তাদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ আছে। সরকারি কর্মকর্তাদের স্টেডিয়ামের অভিজ্ঞতা অর্জনের সফর নিয়ে বিসিবি পরিচালক ও মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যান জালাল ইউনুস বলেছেন, ‘এ রকম কিছু আমার জানা নেই। স্টেডিয়ামের মালিক তারা। হয়তো সে কারণেই দেখতে গিয়েছিলেন মেলবোর্ন স্টেডিয়ামটা কেমন। ’

কিন্তু ক্রীড়া পরিষদ কিংবা মন্ত্রণালয়ের লোকজন উন্নত স্থাপনা দেখে আসার সুফল তো কখনোই মেলেনি। এবার কি মিলবে? জালাল ইউনুস বলেছেন অন্য কথা, ‘আমি যত দূর জানি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাতেই এ স্টেডিয়ামের পরিকল্পনা হয়েছে। মিরপুরের গ্যালারি ছোট। তাই তিনি চান অন্তত ৫০ হাজার ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন স্টেডিয়াম তৈরি করতে। এ ব্যাপারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমাদের বোর্ড সভাপতির সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। বোর্ডের চাহিদামতেই এ স্টেডিয়াম তৈরি হবে। এ লক্ষ্যে এরই মধ্যে বোর্ডের পক্ষ থেকে অস্ট্রেলিয়া এবং ইংল্যান্ডের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যোগাযোগও করা হয়েছে। সময়মতো তাঁদের ডিজাইনসহ প্রস্তাবনা দেওয়ার কথা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর ডিজাইন চূড়ান্ত হবে। ’ তিনি সরাসরি না বললেও একটা ব্যাপার পরিষ্কার হয়ে গেছে, ক্রিকেট বোর্ড যেভাবে চাইবে সেভাবেই হবে পূর্বাচলের স্টেডিয়াম নির্মাণ। তারা ইতিমধ্যে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যোগাযোগও শুরু করে দিয়েছে। তাহলে অস্ট্রেলিয়া ফেরত কর্মকর্তাদের নিয়ে আসা অভিজ্ঞতার কী হবে! আর তাঁরা এভাবে যাবেনই বা কেন? অবশ্য বাংলাদেশে সব ক্ষেত্রেই বিশেষজ্ঞদের বাদ দিয়ে কর্তাব্যক্তিদের ভ্রমণবিলাসই মুখ্য হয়ে ওঠে যেকোনো স্থাপনা তৈরির সময়।

তার মানে একটা ব্যাপার স্পষ্ট হয়ে গেল, এই স্টেডিয়াম নির্মাণের ব্যাপারে ক্রিকেট বোর্ড ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। ক্রীড়া পরিষদের লোকজন মনে করছেন, বরাবরের মতোই তাঁরাই তৈরি করবেন। এ জন্যই অস্ট্রেলিয়া সফর। কিন্তু কোনো সফরে না গিয়ে ক্রিকেট বোর্ড বিদেশি বিশেষজ্ঞদের ডেকেছে স্টেডিয়ামের নকশা নিয়ে ঢাকায় আসার জন্য। এবং এটাই হচ্ছে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এই যুগে ঠিকমতো কিছু করতে হলে বিদেশে যাওয়া লাগে না। অবশ্য যারা ‘বিদেশ ভ্রমণ’ আর ‘অভিজ্ঞতা অর্জন’কেই গুরুদায়িত্ব মনে করেন তাঁদের হিসাব অন্য রকম হবে স্বাভাবিক।


মন্তব্য