kalerkantho

তামিমের জবানিতে সেই ভয়াল মুহূর্তের অজানা গল্প...

যখন আরও লাশ দেখলাম, বুঝতে পারছিলাম না ঠিক কী করা উচিত। অনেকেই ভয়ে মাথা থেকে নামাজের টুপি খুলে ফেলল। মানে বুঝতে পারছিলাম কিছু একটা ঘটছে। যারা পাঞ্জাবি পরে ছিল, ওপরে জ্যাকেট পরে নিল। এ ছাড়া আর কী করার আছে?

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৭ মার্চ, ২০১৯ ১৫:৫৪ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



তামিমের জবানিতে সেই ভয়াল মুহূর্তের অজানা গল্প...

আল নূর মসজিদের সামনে থেকে ভয়ার্ত তামিমদের ফেরার দৃশ্য। ছবি : ভিডিও থেকে

ক্রাইস্টচার্চে সন্ত্রাসী হামলার দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে গতকাল রাতে দেশের মাটিতে নিরাপদে ফিরে এসেছে টিম টাইগার। অল্পের জন্য প্রাণে বাঁচলেও বড় মানসিক ধাক্কা তাদের অনেকদিন ভোগাবে। ক্রিকেট বিষয়ক শীর্ষ ওয়েবসাইট ক্রিকইনফোর কাছে আল নূর মসজিদে হামলার সেই ভয়াল মুহূর্তের পুরো ঘটনা বর্ননা করেছেন দেশসেরা ওপেনার তামিম ইকবাল। যা থেকে বোঝা যায়, তাদের প্রাণে বেঁচে যাওয়াটা ছিল স্রেফ দুই-তিন মিনিটের ব্যাপার! এবার তামিমের জবানিতেই জেনে নেওয়া যাক কী হয়েছিল সেদিন :

আমি এখন যে ঘটনা বলব, সেটা শুনলেই বুঝতে পারবেন, দুই-তিন মিনিটের ব্যাবধানে কী ঘটে যেতে পারত! মুশফিক ও রিয়াদ ভাই সাধারণত খুতবায় উপস্থিত থাকতে চান। এ কারণে আমরা একটু আগেভাগে জুমার নামাজে যেতে চেয়েছি। বাস ছাড়ার কথা ছিল বেলা দেড়টায়। কিন্তু রিয়াদ ভাই সংবাদ সম্মেলনে যান, সেখানে একটু দেরি হয়। সংবাদ সম্মেলন থেকে তিনি ড্রেসিংরুমে ফিরে আসেন। ড্রেসিংরুমে আমরা ফুটবল খেলেছি। তাইজুল হারতে চায় না। কিন্তু সবাই ওকে হারাতে চাচ্ছিল। তাইজুল আর মুশফিক খেলছিল, এতে কয়েক মিনিট দেরি হয়। এই ছোটখাটো বিষয়গুলোই শেষ পর্যন্ত আমাদের বাঁচিয়ে দিয়েছে।

এরপরই আমরা বাসে উঠি। পরিকল্পনা ছিল নামাজ শেষে হোটেলে ফিরব। এ কারণে শ্রী (দলের ভিডিও বিশ্লেষক শ্রীনিবাস চন্দ্রসিকারম) এবং সৌম্য (সরকার) আমাদের সঙ্গে গিয়েছে। আর অনুশীলনও ছিল ঐচ্ছিক। যারা করবে না, তারা হোটেলে থাকবে। যারা করতে চায়, তারা মাঠে আসবে।

আমি সব সময় বাঁ পাশের ছয় নম্বর আসনে (বাসে) বসে থাকি। মসজিদের কাছাকাছি পৌঁছালে আমার ডান পাশের সবাই জানালা দিয়ে একটা বিষয় সবার নজরে পড়ে। দেখি, মেঝেতে মানুষের একটা দেহ পড়ে আছে। মাতাল অথবা অজ্ঞান ভেবেছিলাম। বাস এগিয়ে গিয়ে মসজিদের কাছাকাছি দাঁড়াল। কিন্তু সবার মনোযোগ ছিল মেঝেতে পড়ে থাকা দেহটি ঘিরে। এ অবস্থায় আরেকটি লোককে দেখি রক্তমাখা শরীর, ধীরে ধীরে পড়ে যাচ্ছে। ভয়টা তখনই দানা বেঁধে উঠতে শুরু করে।

মসজিদের কাছাকাছি একটি গাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায় আমাদের বাস। দেখলাম, বাসচালক এক নারীর সঙ্গে কথা বলছেন, যিনি কাঁপছিলেন ও কাঁদছিলেন। উনি বলছিলেন, গুলি হচ্ছে, ওখানে যেও না, ওখানে যেও না! বাসচালক বললেন, ওরা (খেলোয়াড়) মসজিদে যাচ্ছে। তার (নারী) জবাব, না না মসজিদে যেও না। ওখানেই গুলি করা হচ্ছে। এরপর তিনি আবারও কাঁদতে শুরু করলেন। সবাই তার কথা শুনেছে ও দেখেছে। ভয়টাও আরও বাড়ল।

তখন মসজিদ থেকে আমরা মাত্র ২০ গজ দূরে। দেখলাম, মসজিদের আশপাশে বেশ কিছু রক্তমাখা শরীর পড়ে আছে। এত লাশ দেখে বুঝতে পারছিলাম না ঠিক কী করা উচিত। অনেকেই ভয়ে মাথা থেকে নামাজের টুপি খুলে ফেলল। মানে বুঝতে পারছিলাম কিছু একটা ঘটছে। যারা পাঞ্জাবি পরে ছিল, ওপরে জ্যাকেট পরে নিল। এ ছাড়া আর কী করার আছে? এরপর আমরা বাসের মেঝেতে শুয়ে পড়ি। এভাবে সাত-আট মিনিট কাটল।

ঠিক কী ঘটছে তা বুঝতে পারছিলাম না। তবে সহিংস কিছু যে ঘটছে, তা ভালোভাবেই টের পেয়েছি। ভীষণ ভয় পাচ্ছিলাম। দেখুন, এখনও ঠিকমতো কথা বলতে পারছি না। আমরা বাসচালককে বললাম, এখান থেকে আমাদের বের করুন। কিছু একটা করুন। কিন্তু তার নড়চড় নেই! সবাই চিৎকার করে তাকে বললাম। আমিও চিৎকার করেছি। কিন্তু বাসচালক কী ভঅবছিলেন আমরা জানি না। ওই ৬-৭ মিনিট কোনো পুলিশ ছিল না।

হঠাৎ করেই পুলিশ চলে এল। ঝড়ের বেগে পুলিশের বিশেষ বাহিনী মসজিদে ঢুকে গেল। এই তৎপরতা দেখে আমরা ভাষাহীন হয়ে যাই। প্রায় অনুভূতিশূন্য অবস্থা। শরীর ঠান্ডা হয়ে আসছিল। ততক্ষণে রক্তমাখা শরীরে আরও অনেকে বের হতে শুরু করে মসজিদ থেকে। তখন আর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। চিৎকার করতে শুরু করি 'আমাদের যেতে দাও, যেতে দাও।' কেউ একজন বলল, 'বাসে থাকলে আমরা বিপদে পড়ব।' আমারও তাই মনে হলো, বাস থেকে বের হতে পারলে পালানোর সুযোগ পাওয়া যাবে। বাসে আমরা সহজ লক্ষ্যবস্তু। কিন্তু যাব কোথায়? দুটি দরজাই বন্ধ।

ঠিক সেই মুহূর্তে বাসচালক ১০ মিটারের মতো বাসটি এগিয়ে নেন। জানি না তিনি এই কাজটা কেন করলেন। আমরা তখন ভেঙে পড়েছি। সবাই প্রায় আশা ছেড়ে দিয়েছে। মাঝের দরজায় ধাক্কা ও লাথি মারছি। বাসচালক দরজা খুললেন। বাসটা তিনি (চালক) যখন সামনে নিচ্ছেন, তখন আপনাকে (ক্রিকইনফোর প্রতিবেদক) ফোন করেছিলাম। আপনি ভেবেছিলেন মজা করছি। কিন্তু আমি কতটা সিরিয়াস, তা বলা কিংবা বোঝানোর মতো অবস্থায় ছিলাম না।

প্রায় ৮ মিনিট পর বাস থেকে শেষ পর্যন্ত নামতে পারি আমরা। সবাই বলছিল, পার্ক দিয়ে দৌড় দেব। কেউ বলল, পার্কে আমরা সহজ লক্ষ্যে পরিণত হব। বন্দুকধারী যদি আমাদের দেখে গুলি করতে শুরু করে? আমার কাছে যেটা ভীতিকর লাগছিল, পুলিশ আমাদের দৌড়াতে দেখে কী ভাববে? এর মধ্যে দেখলাম আপনারা তিনজন (ক্রীড়া প্রতিবেদক মোহাম্মদ ইসাম, উৎপল শুভ্র ও মাজহারউদ্দিন) আসছেন।

তখন বুঝতে পারিনি; কিন্তু কাল রাতে বুঝলাম, আপনারা কত বড় ঝুঁকি নিয়েছিলেন। অনেক কম মানুষই এমন ঝুঁকি নেয়। ওই রকম পরিস্থিতিতে কাছের মানুষেরাও হয়তো আপনাদের মতো ভূমিকা নেয় না। আসলে আপনাদের দেখে কিছুটা শান্ত হই এবং হাঁটতে শুরু করি। কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পর সবাই মাঠের দিকে দৌঁড়াতে শুরু করে। মৃত্যুকে নিজের চোখে দেখেছি। শরীর ঠান্ডা হয়ে আসছিল। আমরা সারা জীবনে ভুলতে পারব না। দলের সবারই এই এক কথা। সবার মুখে কিছুটা হাসি ফিরেছে ঠিকই কিন্তু ভেতরে-ভেতরে বিধ্বস্ত।

আমরা হোটেলে ফিরে সোজা রিয়াদ ভাইয়ের কামরায় চলে যাই। বন্দুকধারীর ভিডিও দেখি। বেশিরভাগ খেলোয়াড়েরা কাঁদতে শুরু করে। ড্রেসিংরুমে আমরা সবাই কেঁদেছি। একটা কথা নিশ্চিত করে বলতে পারি, এই ঘটনা ভুলতে অনেক সময় লাগবে। পরিবারের সাহায্য লাগবে। চোখ বুজলেই দৃশ্যগুলো ভেসে ওঠে। কাল (শুক্রবার) রাতে বেশিরভাগ ক্রিকেটার একসঙ্গে ঘুমিয়েছে। আমি ঘুমিয়েছি মিরাজ ও সোহেল ভাইয়ের সঙ্গে।

স্বপ্নে দেখেছি, বাইকে করে ওরা গুলি করছে। বিমানবন্দরে আসার পথে আমরা একে অপরকে বলছিলাম, একটু এদিক-সেদিক হলেই আমরা নয়, লাশগুলো ঘরে ফিরত। মাত্র ত্রিশ সেকেন্ডের ব্যাপার।

মন্তব্য