kalerkantho


আবাহনীকে লজ্জায় ডুবিয়ে উড়ল বসুন্ধরা কিংস

সনৎ বাবলা, নীলফামারী থেকে    

২৪ জানুয়ারি, ২০১৯ ১১:৫৭



আবাহনীকে লজ্জায় ডুবিয়ে উড়ল বসুন্ধরা কিংস

স্টেডিয়ামের পূর্ব প্রান্ত থেকে তিনি চেয়ে চেয়ে দেখলেন, তাঁর হাতে গড়া আবাহনী গোলে গোলে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল। বসুন্ধরা কিংসের কাছে ৩-০ গোলের হার! বেঁচে থাকলে শেখ কামালের জন্য বড় যন্ত্রণার হতো এই হার।

তবে নীলফামারীর প্রেক্ষাপটে অত যন্ত্রণার হতো কি না কে জানে।

কারণ এখানকার শেখ কামাল স্টেডিয়ামকে আপন করে নিয়েছে বসুন্ধরা কিংস। তাদের হোম ভেন্যু এটি। এভাবে তাকে যারা আপন ভাবে, তাদেরও তো সে দূরে ঠেলতে পারে না। তাই স্টেডিয়ামের পূর্ব প্রান্তে টাঙানো শেখ কামালের বিশাল ছবিটির জন্য এই ম্যাচটি এক ‘অম্ল-মধুর’ ব্যাপার হয়ে থাকবে। এই কৃতী সংগঠকের নামাঙ্কিত মাঠে কাল বসুন্ধরা কিংস খেলেছে কিংয়ের মতো। নিজেদের মাঠে তাদের এমন দাপটে চ্যাম্পিয়নের হয়েছে মহা পতন। একটি পেনাল্টির সুযোগ ও আরেকটি শট ক্রসবারে লাগানো ছাড়া পুরো ম্যাচে আবাহনীর কিছু নেই। প্রথম ম্যাচে ঢাকায় নোফেল স্পোর্টিংয়ের মুখোমুখিতে তারা হোঁচট খেতে খেতে বেঁচে গিয়েছিল। দ্বিতীয় ম্যাচে নীলফামারীতে স্বাধীনতা কাপজয়ীদের সামনে পড়ে তিন গোলের লজ্জাকর হারে মান-সম্ভ্রম সব খুইয়েছে। কিন্তু এমন জয়ের পরও যে প্রতিপক্ষের স্বাদ মেটেনি! কিংসের স্প্যানিশ কোচ অস্কার ব্রুজোনের হাসিটা যেন আরেকটু চওড়া হতে পারত ব্যবধানটা আরেকটু বড় হলে, ‘আমরাই খেলেছি মাঠজুড়ে। পুরো দল দাপটের সঙ্গে খেলেছে ম্যাচটি, এখনো পর্যন্ত এটি আমাদের সেরা পারফরম্যান্স। সুযোগ ছিল অনেক, মিস হয়েছে। তা ছাড়া রেফারি কেন অফসাইডের অজুহাতে একটি গোল বাতিল করেছে, জানি না।’

শুরুতে গুছিয়ে নিতে একটু সময় নিয়েছিল স্বাগতিকরা। ওই সময়ে ডান দিক থেকে রুবেল মিয়ার একটি শট লাগে ক্রসবারে। ১২ মিনিটে আবাহনীর এই সুযোগের পর থেকে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হাতবদল হয়। নিজেদের মাঠে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসে বসুন্ধরা কিংস। শহীদুলের অবিশ্বাস্য সেভ না হলে ১৪ মিনিটেই তারা গোলের খাতা খুলত। মতিনের চমৎকার ক্রসে আলমগীর রানার দুর্দান্ত ভলিটি ঠেকিয়ে আবাহনী গোলরক্ষক ম্যাচে রাখেন দলকে। কিন্তু কতক্ষণ ধরে রাখতে পারবেন তিনি! আক্রমণের এমন তোপের মধ্যে ১৪ মিনিটে মতিন মিয়া বাইরে মেরে সুযোগ নষ্ট করেন। এরপর ৩৩ মিনিটে কলিনড্রেসের দু-পায়ের জাদুতে আবাহনীর দুই ডিফেন্ডার ও গোলরক্ষককে পরাস্ত করেও পারেননি, বল ঠেকিয়ে দিয়েছে পোস্ট। এমন দাপটকে লঘু করে ৪২ মিনিটে হঠাৎ আবাহনীর সামনে গোলের হাতছানি। রায়হানের লম্বা থ্রো-ইন ক্লিয়ার করতে গিয়ে নাসির উদ্দিনের হাতে লাগে বল। পেনাল্টি গোলে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ। সানডে চিজোবা বাইরে মারলে আকাশি-নীলকে ছন্দে ফেরানোর সুযোগটিও হাতছাড়া হয়ে যায়।

এই গোল হলে খেলার চরিত্র হয়তো বদলাত। সেটা হয়নি, তাই বসুন্ধরা কিংস যেন আরো দুরন্ত হয়ে ওঠে। বিরতিতে যাওয়ার আগেই তারা সেরে ফেলে গোলের কাজটি। ড্যানিয়েল কলিনড্রেসের ভয়ংকর ফ্রি-কিকে বিভ্রান্ত আবাহনীর ডিফেন্স, সেটি নাসির উদ্দিনের মাথা ছুঁয়ে পৌঁছে গেল জালে। এক গোলের লিডে খেলা শেষ হয় না। বিরতির পর তেড়েফুঁড়ে খেলায় ম্যাচে ফেরার সুযোগ থাকে। ড্রেসিংরুম থেকে সেই প্রতিজ্ঞা নিয়ে মাঠে ফিরে সানডে-তপুরা দেখে উল্টো ছবি। লিড নেওয়া কিংসের খেলায় আরো গতি, আরো আক্রমণের ঝাঁজ। ৫৭ মিনিটে ভিনিসিয়াসের বুদ্ধিদীপ্ত ব্যাকহিলে বল আবাহনীর জালে জমা হলেও রেফারির অফসাইডের বাঁশিতে সবাই হতবাক। কারণ এই ব্রাজিলিয়ানের গায়ে গায়ে লেগে ছিলেন আবাহনীর তিনজন। এর পরও অফসাইড! সেই আক্ষেপ বড় হতে দেননি মতিন মিয়া। ভিনিসিয়াসের বাড়ানো বলটি ধরে হঠাৎ গতি বাড়িয়ে দেন প্রথম শুরুর একাদশে ঢোকা এই দেশি ফরোয়ার্ড, এরপর কোনাকুনি শটে শহীদুলকে পরাস্ত করে কিংসের জয় একরকম নিশ্চিত করে ফেলেন। ৩০ মিনিট খেলা বাকি থাকলেও তখন আবাহনী অতলে তলিয়ে যাচ্ছে। ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো ইঙ্গিত নেই। নেই বোঝাপড়াও। উল্টো তর্কাতর্কি চলছে নিজেদের মধ্যে। এসবই যে লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়ার লক্ষণ। ৬৯ মিনিটে বখতিয়ারের দারুণ বানিয়ে দেওয়া বলটি ড্যানিয়েল কলিনড্রেস আগুয়ান গোলরক্ষকের ওপর দিয়ে জালে পৌঁছে দিয়ে ৩-০ গোলের লজ্জার আয়োজন সেরে ফেলেন। 

আবাহনীর পর্তুগিজ কোচ মারিও লামোসও অকপটে স্বীকার করে নিয়েছেন, ‘আমাদের কোনো খেলাই হয়নি। কলিনড্রেস আর ভিনিসিয়াস কি চমৎকার খেলেছে, ম্যাচের পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। কিন্তু সানডে-বেলফোর্টের কাছে আমাদের অনেক প্রত্যাশা ছিল।’ আবাহনীর সেই প্রত্যাশা পূরণের জায়গা যেন নীলফামারী নয়। বসুন্ধরা কিংস আক্রমণে উঠলেই পুরো স্টেডিয়াম জেগে উঠছে। সাত-আট হাজার দর্শক সমস্বরে হুল্লোড় তুলে যেন বলছে—এটা বসুন্ধরা কিংসের ‘হোম গ্রাউন্ড’, এখানে কলিনড্রেস-নাসিরদের পায়েই ফুটবল ফুল হয়ে ফোটে। সেপ্টেম্বরে নিউ রেডিয়েন্টকে ৪-১ গোলে হারানোর পর কাল পেশাদার লিগের ছয়বারের চ্যাম্পিয়নদের দিয়েছে আরেক লজ্জার উপহার।



মন্তব্য