kalerkantho


লেনিনের রাশিয়ায় রাত পোহালেই বিশ্বকাপ

১৩ জুন, ২০১৮ ১১:০৮



লেনিনের রাশিয়ায় রাত পোহালেই বিশ্বকাপ

শিরোপা ধরে রাখার মিশনে মস্কোতে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন জার্মানিও। ছবি : এএফপি

‘বিপ্লব স্পন্দিত বুকে, মনে হয় আমিই লেনিন।’ তিনি দাঁড়িয়ে আছেন সেই চেনা ভঙ্গিতে। শিরদাঁড়া সোজা করে গর্বিত চেহারায়। গায়ে ওভারকোট, ডান হাত খানিকটা তোলা অবস্থায় বুকের কাছে। ঘাড় বাঁকা করে সকালের সূর্যের দিকে তাকিয়ে বিপ্লবের মহানায়ক। ভ্লাদিমির  ইলিচ লেনিন।

সুকান্ত ভট্টাচার্যের ওই কবিতার লাইনের মতো বিপ্লবের লাল আলো এখনো জ্বলে সবুজ এই গ্রহের কোণে কোণে; কত কত তরুণের মনে! আগামী এক মাসে অবশ্য পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ‘বিপ্লব’-এর নাম ফুটবল। আর এর তীর্থভূমি এই লুঝনিকি স্টেডিয়াম। ব্রাজিলের যেমন মারাকানা, আর্জেন্টিনার এস্তাদিও মনুমেন্তাল, ইংল্যান্ডের ওয়েম্বলি—রাশিয়ার তেমনি লুঝনিকি, যে মঞ্চে কাল পর্দা উন্মোচন হবে বিশ্বকাপের; ১৫ জুলাই ফাইনাল দিয়ে পর্দাও নামবে এখানে। এই স্টেডিয়ামের ঠিক প্রবেশমুখেই লেনিনের বিশাল ভাস্কর্য। যেন  বিশ্বসেরা ক্রীড়াযজ্ঞে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন বাকি বিশ্বকে। আর সে জন্য লেনিনের চেয়ে আদর্শ আর কে হতে পারেন!

পুঁজিবাদীরা তেড়ে আসবেন রে রে করে। বর্তমান বিশ্বমোড়লরাও নাক সিটকাবেন নিশ্চিতভাবে। কিন্তু রাশিয়ার তাতে থোড়াই কেয়ার। আরেক ‘ভ্লাদিমির’ যে এখন রাশিয়ার রাজাধিরাজ, সেই ভ্লাদিমির পুতিনেরও তাতে কিচ্ছুটি যায়-আসে না। তাঁর কাছে বরং এর ক্যানভাস আরো বড়। শুধু বিশ্বকাপ ফুটবল নয়, রাশিয়ার জন্য এটি বাকি বিশ্বের সম্মান আদায় করার বড় উপলক্ষ। রাশিয়া যে আবার তাঁর মহত্ত্ব নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে, আবার শ্রেষ্ঠত্বের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারে বাকি বিশ্বের কাছে—সেটি দেখানোর সুযোগ পুতিনের। সফল বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজনের মাধ্যমেই শুধু সম্ভব তা।

কাল সকালের লুঝনিকি স্টেডিয়ামে বিশাল কর্মযজ্ঞের ছাপ পাওয়া গেল। অ্যাক্রেডিটেশনের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকদের ভিড়; তার চেয়েও ঢের বেশি ভিড় সমর্থকদের। ফ্যান আইডি জোগাড় করতে হবে যে! লাল রঙের জ্যাকেট গায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন ভলান্টিয়াররা। সংখ্যায় অসংখ্য। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, ভাষাগত দূরত্ব দূর করা যায় না কিছুতেই। ইংলিশ, স্প্যানিশ, পর্তুগিজ—কত কত ভাষায় প্রশ্ন, কিন্তু উত্তর ওই রুশ ভাষাতেই। যে কারণে সাংবাদিক-সমর্থকদেরও তাঁদের অ্যাক্রেডিটেশন ও ফ্যান আইডির জন্য বার কয়েক চক্কর মারতে হয়েছে লুঝনিকির ক্রীড়া কমপ্লেক্সের ভেতর।

তবে রুশদের আন্তরিকতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। পরশু বিকেলে মস্কোর দোমোদেদোভো বিমানবন্দরে নামার পর থেকেই এর পরিচয় মিলছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আর্তুভের যেচে পড়ে সাহায্য করার ইচ্ছা। শহরে, মেট্রোতে, স্টেডিয়ামে—সব জায়গাতেই তাই। ভাষার ব্যবধান ঘোচানো অবশ্য কঠিন। যে কারণে ভেনিজুয়েলা থেকে বিশ্বকাপ দেখতে আসা জনির মুখে রাজ্যের বিরক্তি, ‘ওরা একবার বলছে এদিকে যাও, আরেকবার ওদিকে। এভাবে আর কতক্ষণ ঘুরব!’ তবে বিরক্তি ঘুচে যায় প্রিয় দল নিয়ে কথা বলার সময়, ‘আমার দেশ ভেনিজুয়েলা তো নেই বিশ্বকাপে। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার মতো লাতিন আমেরিকার অন্য দলগুলোকে সমর্থন করার প্রশ্নই ওঠে না। আমার দল স্পেন। দেখবে, ওরা ঠিকই বিশ্বকাপ জিতবে।’

স্পেনের নাম আসছে, ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা-জার্মানি-ফ্রান্সের নামও ঘুরেফিরে। তবে ভুলেও কেউ রাশিয়ার সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলছে না। ইউরোর প্রথম আসর জিতেছে সোভিয়েত ইউনিয়ন, এইতো ২০০৮ ইউরোতেও সেমিফাইনাল খেলেছে রাশিয়া। তবে এ আসরে ফুটবলীয় সাফল্য নিয়ে ততটা মাথা ঘামাচ্ছে না দেশটি। তাদের যাবতীয় চিন্তাভাবনা আয়োজনের সাফল্য নিয়েই।

এই যে ক্রীড়াযজ্ঞ, তা যে প্রথমবারের মতো আয়োজন হচ্ছে রাশিয়ায়। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নেও তা হয়নি কখনো। আট বছর আগে ২০১০ সালের ডিসেম্বরে সিদ্ধান্ত হয়, প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ হবে রাশিয়ায়। তা অবশ্য বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। আগ্রহী বাকি দেশগুলোর মধ্যে ছিল ইংল্যান্ডও, যারা বাদ পড়ে যায় ভোটাভুটির প্রথম পর্বে। দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন তো অভিযোগ তোলেন, দুর্নীতির মাধ্যমে স্বাগতিক হওয়ার অধিকার আদায় করেছে রাশিয়া। সাবেক ফিফা প্রেসিডেন্ট সেপ ব্লাটার পর্যন্ত পরবর্তী সময়ে স্বীকার করেছেন, ভোটের আগেই নির্ধারিত হয়ে যায়, ২০১৮ বিশ্বকাপ ফুটবল হবে রাশিয়ায়।

এসবের সত্যাসত্য যা-ই হোক, আট বছর আগের রাশিয়া যে এখনকার মতো ছিল না, তা নিয়ে সংশয় নেই কোনো। দুই মেয়াদে প্রেসিডেন্ট থাকার পর পুতিন তখন ক্ষমতার বাইরে। বাইরে বলতে একেবারে বাইরে নয়, তিনি তখন প্রধানমন্ত্রী। তুলনামূলক উদারপন্থী দিমিত্রি মেদভেদেভ প্রেসিডেন্ট। পুতিনের সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। কিন্তু ২০১২ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ের মাধ্যমে তাঁর প্রবল প্রত্যাবর্তন। এখনো রাজত্ব করছেন রুশদের শ্রেষ্ঠত্বের নিশান উড়িয়ে।

বিশ্বকাপের স্বাগতিক নির্বাচিত হওয়ার পর ইউক্রেনের যুদ্ধে জড়িয়েছে রাশিয়া। সিরিয়াতেও। বিশ্বরাজনীতির ক্ষমতার দাবা খেলায় এখন বড় এক ঘুঁটির নাম পুতিন। আমেরিকান প্রপাগান্ডায় বাকি বিশ্বকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চলছে নিরন্তর, এর জবাব দেওয়ার বড় সুযোগ এই বিশ্বকাপ। পুতিন ও রাশিয়ার জন্য এর চেয়ে বড় সুযোগ আর হতে পারে না।

বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে রোমাঞ্চ রয়েছে অবশ্যই। উত্তেজনা-উন্মাদনা-হৈহল্লার কমতি নেই। কিন্তু সব কিছুর পরও ওই চাপা সংশয়। রাশিয়া কি পারবে ঠিকঠাক বিশ্বকাপ আয়োজন করতে? বাকি বিশ্ব যেন ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে আছে মেঘ দেখার আশঙ্কায়। তাদের পূর্ণিমার চাঁদ দেখিয়ে দেওয়ার চ্যালেঞ্জ রাশিয়ার। এবং অতি অবশ্যই ভ্লাদিমির পুতিনের।

ভ্লাদিমির লেনিনের তাতে গর্বিতই হওয়ার কথা। ১৫ জুলাই ওই ব্রোঞ্জের মূর্তি আরো ঝলমলিয়ে উঠবে তাহলে। তাঁর রাশিয়া যে তাহলেই আবার বাকি বিশ্বের কাছে সম্মান পুনরুদ্ধার করতে পারবে! শ্রেষ্ঠত্বের দাবি নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াবে আবার।

এবং তা ফুটবলের মাধ্যমে! 


মন্তব্য