kalerkantho


শত বাধা পেরিয়ে শততম টেস্ট

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৪ মার্চ, ২০১৭ ২২:১৩



শত বাধা পেরিয়ে শততম টেস্ট

আজ থেকে ১৬ বছর আগে টেস্ট ক্রিকেটে হাঁটিহাটি পা পা শুরু করেছিল নাঈমুল ইসলাম দুর্জয়ের বাংলাদেশ। পি সারা ওভালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে অধিনায়ক মুশফিক হতে চলেছেন বাংলদেশের শততম টেস্টের কাণ্ডারি। এই দীর্ঘ পথ কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। নানা বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে টেস্ট ক্রিকেটে আজকের অবস্থানে টিম টাইগার। ইতিমধ্যেই ওয়ানডেতে নিজেদের শক্তিমত্তা দেখিয়েছে বাংলাদেশ। তব টেস্ট পারফর্মেন্স আশানুরুপ নয়। তবে এর চাইতে ভালো হতে পারত বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাস। হয়নি; যার পেছনে রয়েছে বেশ কিছু কারণ। দেখে নেওয়া যাক, কতটা বন্ধুর পথে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেট:

বেশি ম্যাচ খেলার সুযোগ না পাওয়া
অভিষেকের পর গত ১৬ বছরে মাত্র ৯৯টি টেস্ট খেলার সুযোগ পেয়েছে বাংলাদেশ। বছরে টেস্ট খেলার গড় ৫.৮২। টেস্ট খেলুড়ে বড় বড় দেশগুলোর পরিসংখ্যানে নজর দিলে দেখা যায়, তারা বছরে গড়ে ১৫-২০টি টেস্ট খেলে।

বছরে বেশি টেস্ট খেলায় এগিয়ে ভারত ও ইংল্যান্ড। গত বছর ইংল্যান্ড খেলেছে ১৭টি টেস্ট, ভারত খেলেছে ১২টি, শ্রীলঙ্কা ৯টি আর বাংলাদেশ খেলেছে মাত্র ২টি টেস্ট! আরও একটি পরিসংখ্যান দেওয়া যেতে পারে। ২০০৫ সালের মে মাসে টেস্ট অভিষেক হয় বাংলাদেশের বর্তমান অধিনায়ক মুশফিকুর রহিমের। ২০০৬ সালের মার্চে টেস্ট অভিষেক হয় সদ্য সাবেক হওয়া ইংলিশ অধিনায়ক অ্যালিস্টার কুকের। অথচ, এখন কুকের ক্যারিয়ারে টেস্ট ম্যাচ ১৪০; আর মুশফিকের ৫৩টি।  

নিরাপত্তার খোঁড়া অজুহাত
নিরাপত্তা শঙ্কার খোঁড়া অজুহাতে ২০১৫ সালে বাংলাদেশে সফর করেনি অস্ট্রেলিয়া। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) তথা সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তার আশ্বাস দেওয়া সত্ত্বেও নিজেদের চিন্তা-ধারায় স্থির ছিলো অজিরা। এরপর গুলশান হামলার কারণে ভেস্তে যেতে বসেছিলো ইংল্যান্ডের আগমনও। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ভিভিআইপি নিরাপত্তার আশ্বাস পেয়ে সফরে আসে ইংল্যান্ড। ইংলিশরা পাওয়া নিরাপত্তায় সন্তোষ প্রকাশ করে। এমনকি বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশকে প্রশংসায় ভাসায় তারা। চলতি বছর আগস্টে আবারও বাংলাদেশে আসার ঘোষণা দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া।

তবে একটা দুঃখজনক ঘটনাও ঘটেছিল। ২০১৩ সালে দেশে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার কারণে বাংলাদেশ সফরে এসে মাঝপথেই দেশ ছাড়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ অনূর্ধ্ব ১৯ দল। ক্যারিবীয়দের হোটেলের পাশে দুটি বোমা বিস্ফোরণ হবার পর বাংলাদেশ সফরের মাঝপথেই দেশে ফিরে যায় সফরকারীরা।  

প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের মান দ্বিতীয় শ্রেণির মত
বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের প্রতিভা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। তবে অবকাঠামোগত দিক দিয়ে বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় অনেক পিছিয়ে বাংলাদেশ। এখানে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের বিশ্বমানের না হওয়ার পরও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সাকিব-তামিম-মুস্তাফিজরা দেশকে সম্মান এনে দিয়েছেন। বাংলাদেশের দুটি ৪ দিনের ম্যাচের টুর্নামেন্ট আছে। কিন্তু ক্যালেন্ডারে নির্দিষ্ট সময়ের অভাব এবং ম্যাচগুলো প্রায় একতরফাভাবে হয়ে থাকে। ব্যাটসম্যানরা বারবার ডাবল-সেঞ্চুরি করলেও পরের সপ্তাহে টেস্ট ফরম্যাটে খেলতে এসে ব্যর্থ হন। একই রকম স্পিনিং উইকেট তৈরি নিয়ে বারবার গণমাধ্যমে লেখালেখি হয়েছে। এছাড়া আম্পয়ারদের মান নিয়েও কিছুটা বিতর্ক আছে।

পেস বোলারের ঘাটতি
বাংলাদেশের উঁচুমানের স্পিনার আছে। সাকিব আল হাসান অভিজ্ঞ ও বিশ্বসেরা স্পিনার। তরুণ মেহেদি হাসান মিরাজ ভবিষ্যত তারকা। কিন্তু টেস্ট জয়ের জন্য দলে পেস বোলারের প্রয়োজন। ২০০১ সালে মাশরাফি বিন মর্তুজাকে পেয়ে স্বপ্ন দেখেছিলো বাংলাদেশ। কিন্তু তার হাঁটুতে মারাত্মক সব ইনজুরিতে পড়ে সেই স্বপ্ন ধুলিসাৎ হয়েছে বাংলাদেশের। এখন দুই পেসার মুস্তাফিজুর রহমান ও তাসকিন আহমেদকে ভবিষ্যত তারকা ভাবা হচ্ছে। কিন্তু তাদেরকে নিয়েও ভয়ে আছে ক্রিকেট ভক্তরা। ইনজুরিতে পড়ে যদি সাইডলাইনে চলে যেতে হয় তাদের। ২০১৫ সালে অভিষেকের পর মাত্র তিনটি টেস্ট খেলেছেন ফিজ এবং সর্বশেষ নিউজিল্যান্ড সফরে টেস্ট অভিষেক ঘটা তাসকিনের ফিটনেস নিয়ে তো উদ্বেগ আছেই। দলের পেস গভীরতা বাড়াতে জিম্বাবুয়ের সাবেক অধিনায়ক হিথ স্ট্রিককে আগে এবং সম্প্রতি ওয়েস্ট ইন্ডিজের কিংবদন্তি কোর্টনি ওয়ালশকে দলের বোলিং কোচের দায়িত্ব দেয় বোর্ড।

বন্ধু এবং শত্রু
টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের শত্রুর অভাব নেই। একের পর এক ম্যাচ হারার ফলে এক সময় জিওফ বয়কট, নভোজিত সিং সিধুরা বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাস কেড়ে নিতে বলেছিলেন। ভারতের বীরেন্দ্র শেবাগ বাংলাদেশকে ‘অর্ডনারি দল’ বলে বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন। গত বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে সেই ম্যাচটি আম্পায়ারিংয়ের স্বেচ্ছাচারিতার জন্য আজও কুখ্যাত হয়ে আছে। দুর্বল দল বলে বড় দলগুলো খেলতে চাইত না বাংলাদেশের বিপক্ষে। এর বিপরীত দিকও আছে। যখন কেউ বাংলাদেশের সঙ্গে খেলতে চাইত না, তখন একের পর এক ম্যাচ খেলত বর্তমান সময়ে ক্রিকেটের খর্বশক্তি জিম্বাবুয়ে। শ্রীলঙ্কাও বাংলাদেশ ক্রিকেটের বড় বন্ধু। এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ১৭টি টেস্ট শ্রীলঙ্কার বিপক্ষেই খেলেছে বাংলাদেশ। ভারতের প্রয়াত ক্রিকেট ব্যক্তিত্ব জগমোহন ডালমিয়া বাংলাদেশের ক্রিকেটের অকৃত্রিম বন্ধু ছিলেন। টাইগারদের টেস্ট স্ট্যাটাস প্রাপ্তিতে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়।


মন্তব্য