kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ইংলিশদের কাঁপিয়ে দিয়েও পারল না টাইগাররা

খাইরুল আমিন তুহিন   

১২ অক্টোবর, ২০১৬ ২২:৩৫



ইংলিশদের কাঁপিয়ে দিয়েও পারল না টাইগাররা

বাংলাদেশ : ৬ উইকেটে ২৭৭ (৫০ ওভার)
ইংল্যান্ড : ৬ উইকেটে ২৭৮ (৪৭.৫ ওভার)
ম্যাচের ফল : ইংল্যান্ড ৪ উইকেটে জয়ী
সিরিজ : ইংল্যান্ড ২-১ এ জয়ী।

তাসকিন আহমেদের বলে ফার্স্ট স্লিপে ক্যাচটা ছেড়ে দিলেন ইমরুল কায়েস! হাত জেমল না! ক্রিস ওকস তখন ১৯ রানে।

ওই ক্যাচটা ইমরুল নিতে পারলে ২০ বলে আর ২১ রান লাগতো ইংল্যান্ডের। উইকেট থাকতো ৩টি। ইশ! ওই ক্যাচটা ইমরুল নিতে পারতেন যদি। বাংলাদেশ জিতুক হারুক এই আক্ষেপটা তো আর থাকতো না! ক্রিকেটে তো যে কোনো পরিস্থিতিতে ম্যাচের মোড় যায় ঘুরে। ইমরুল কি সিরিজের ট্রফিটাই হাত থেকে ফেলে দিলেন না! এই আক্ষেপের সাথেই শেষ হল ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ওয়ানডে সিরিজ। বৃটিশদের কাঁপিয়ে দিয়েও ম্যাচটা জেতা হল না। চট্টগ্রামে বুধবার ৪ উইকেটের ওই হারের সাথে বাংলাদেশ ২-১ এ ওয়ানডে সিরিজ হারল ইংলিশদের কাছে।

আগে ব্যাট করে ৮ উইকেটে ২৭৭ রান করেছিল বাংলাদেশ। জবাবে, ১৩ বল বাকি থাকতেই চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়াম ম্যাচ জিতেছে ইংল্যান্ড। আর তাতে দেশের মাটিতে টানা ৬ সিরিজ জেতার পর সিরিজ হারল বাংলাদেশ। দেশ ও দেশের বাইরে টানা ৫ ম্যাচ সিরিজ হারার পর আবার হারের দেখা পেতে হল মাশরাফি বিন মুর্তজার দলকে। দুই বছর পর সিরিজ হারল তা। থামল জয়রথ।

যথার্থ বড় দলের মতোই গোটা সিরিজে লড়ে গেল বাংলাদেশ। এদিনের ম্যাচেও ব্যাটিং-বোলিংয়ে একের পর এক চাপে পড়েছে টাইগাররা। মানসিকতার দৃঢ়তা দেখিয়ে লড়ে গেছে শেষ পর্যন্ত। হাল ছাড়েনি, ভেঙে পড়েনি কোনো পরিস্থিতিতে। ব্যাটিং বিপর্যয় শুরুতে সামলেছেন যেমন মুশফিকুর রহিম-মোসাদ্দেক হোসেনরা, শেষে শফিউল ইসলাম, মাশরাফিরা ম্যাচে ফিরিয়েছেন দলকে। শেষ ধাক্কাটাই দেওয়া হল না শুধু।

এই স্টেডিয়ামে সবচেয়ে বড় টার্গেট জয়ের লড়াইয়ে ইংলিশ ব্যাটসম্যনরা একের পর এক জুটি গড়েছে। প্রথম উইকেটে স্যাম বিলিংস (৬২), জেমস ভিন্সের (৩২) ৬৩ রানের জুটি। আগের দুই ম্যাচে বাংলাদেশ ১০০ রানের মধ্যে যথাক্রমে ইংল্যান্ডের ৩ ও ৪টি উইকেট নিয়েছে। এবার ১টি মাত্র। দ্বিতীয় উইকেটে বিলিংস ও বেন ডাকেট (৬৩) ৬৪ রানের জুটি গড়েছেন। আবার জনি বেয়ারস্টোকে (১৫) সাথে নিয়ে ডাকেট গড়েছেন ৪৫ রানের জুটি। ২ উইকেটে ১৭২ রান হয়েছে ইংল্যান্ডের।

কঠিন। এই পরিস্থিতি থেকে ম্যাচ জেতা কঠিন। কিন্তু অসম্ভব তো নয়। স্পিনাররা প্রত্যাশিত ফল পাচ্ছেন না। শিশির ঝামেলা করছে। এই অবস্থায় ২০১১ বিশ্বকাপে এখানে ইংল্যান্ডকে অসম্ভব এক ম্যাচ হারানো শফিউল ইসলাম জ্বলে ওঠেন। এই পেসারের জোড়া আঘাতে ফেরেন বেয়ারস্টো ও ডাকেট। মাশরাফি সেই ধারাবাহিকতায় ৯ রানের মধ্যে ফিরিয়ে দেন ইংলিশ অধিনায়ক জস বাটলার (২৫) ও মঈন আলিকে (১)। ওয়ানডেতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারের রেকর্ডটিও হয় তার। বাটলারকে আউট করে উদযাপন করেন না টাইগাররা। ৬ উইকেটে ২৩৬।

ওখান থেকে আরেকটা ধাক্কা দিয়ে ইংল্যান্ডকে খাঁদের কিনার থেকে গভীরে ফেলাই যেত। কিন্তু ওই যে ইমরুলের হাত থেকে পড়ে গেল ক্যাচটা। কে জানে, ওখান থেকেই হয়তো বদলে যেতে পারতো সব কিছু। টেনশনের ম্যাচে কতো কিছুই না সম্ভব! বেন স্টোকস ৪৭ ও জীবন পাওয়া ওকস ২৭ রানে অপরাজিত থেকে ট্রফি নিতে মাঠ ছাড়েন। তাই বৃটিশদের সাথে চোখে চোখ রেখে লড়াইয়ের শেষটায় কেবল ওই আক্ষেপটাই রয়ে গেল। ক্যাচটা নিলে কি হতো? সেই জবাব তো আর মিলবে না কখনোই!

এর আগে স্পিনের কাছে বিপর্যস্ত হয়ে খুব বিপদেই ছিল বাংলাদেশ। কিন্তু ৭ ইনিংস পর ফিফটি করে মুশফিকুর রহিম স্লগ ওভারে বাঁচালেন বাংলাদেশকে। তার সাথে সপ্তম উইকেটে ৭১ বলে ৮৫ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি গড়া মোসাদ্দেক হোসেনের বীরত্বের কথাও বলতে হবে। ১৯২ রানে ৬ উইকেট হারানোর পরও তাই লড়ার মতো স্কোর টাইগারদের। টস হেরে আগে ব্যাট করে দিল ২৭৮ রানের চ্যালেঞ্জ। ৬২ বলে ৪ বাউন্ডারি ও এক ছক্কায় অপরাজিত ৬৭ রান মুশফিকের। ৩৯ বলে ৪ চারে অপরাজিত ৩৮ রান মোসাদ্দেকের।

দারুণ গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচে ব্যাটিংয়ে শুরু আর শেষে দারুণ টাইগাররা। মাঝখানে বেশ হতাশা। উদ্বোধনী জুটিতে তামিম ইকবাল (৬৮ বলে ৪৫) ও ইমরুল কায়েস (৫৮ বলে ৪৬ রান) ৮০ রানের জুটি গড়লেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওপেনিংয়ে নিজেদেরই গড়া ৬ বছর আগের ৬৩ রানের রেকর্ড ভাঙলেন। দারুণ সেই জুটি ওভার প্রতি ৪.২১ গড়ে হলেও এনে দিয়েছে চমৎকার ভিত্তি ও বিশ্বাস।

এরপর লেগ স্পিনার রশিদ ৪ উইকেট নেন তার টানা ১০ ওভারের স্পেলে। এক পর্যায়ে ১৬ রানের মধ্যে নামী ৩ ব্যাটসম্যান হারায় স্বাগতিকরা। ওখান থেকে রুখে দাঁড়ানো মুশফিক ও মোসাদ্দেকের ব্যাটে। অভিজ্ঞ মুশফিক রানে ফিরেছেন। আশা করা যায় ফিরে পাবেন চাপের মুখে পড়া আত্মবিশ্বাসও। মোসাদ্দেক বয়সের চেয়ে পরিণত। সিনিয়রকে সঙ্গ দিতে দিতে নিজের খেলাটাও খেলেছেন চাপ উপেক্ষা করে।

রশিদ এসেছিলেন ২৩তম ওভারে। পরের দুই ওভারেই শিকার করলেন তামিম ও আগের ম্যাচে ৭৫ রান করা মাহমুদ উল্লাহকে (৬)। ছক্কা মারার পরের বলে আউট মাহমুদ উল্লাহ। সাব্বির রহমান আক্রমণাত্মক শুরুটাকে ফিফটির পরিণতি দিতে চাইলেন। মুশফিকের সাথে তার চতুর্থ উইকেটে ৫৪ রানের জুটি। রশিদের ধাক্কায় ১২২ রানে ৩ উইকেট হারানোর পর। কিন্তু রশিদই ফেরান সাব্বিরকে (৪৬ বলে ৪৯)। দ্রুত ফিরে যান সাকিব আল হাসান (৪) ও নাসির হোসেন (৪)।

দুই প্রান্ত থেকে আক্রমণ করে দুই স্পিনার মঈন ও রশিদ চাপ বাড়াচ্ছিলেন। সেটা সামলে ৩৯তম ওভার থেকে মুশফিক ও মোসাদ্দেকের জুটি। ওখানেই শেষে সপ্তম উইকেটে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সর্বোচ্চ রানের জুটির নতুন রেকর্ড। নিরাশা দুর করে বাংলাদেশের আশা জাগানোর হার না মানা লড়াই তাদের। ব্যক্তিগত ৪৬ রানে বেন স্টোকস ক্যাচ ছাড়লে লাইফ পেলেন মুশফিক। পরের বলেই ছক্কা মেরে ক্যারিয়ারে ২৩তম ফিফটিতে। শেষ পর্যায়ের ওই জীবনের পর আগ্রাসণ বাড়ে মুশফিকের। আসে আরো ২১ রান। যার মূল্য অসীম। মোসাদ্দেকও ব্যাট চালিয়ে যান। এত বড় প্রতিপক্ষের বিপক্ষেও দারুণ নির্ভার। তাতেই বিপদ সামলে বোলারদের হাতে তুলে দেওয়া লড়ার মতো পুঁজি। বোলাররা লড়লেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না।


মন্তব্য