kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


তাসকিনের নিষেধাজ্ঞা থেকে ফেরার পেছনের গল্প

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৬ অক্টোবর, ২০১৬ ১২:২৫



তাসকিনের নিষেধাজ্ঞা থেকে ফেরার পেছনের গল্প

মাহবুব আলি জাকি। তাসকিন আহমেদকে বল করতে দেখেন।

স্বস্তি আর তৃপ্তিতে মনটা ভরে যায় তার। মাত্রই আইসিসির অবৈধ বোলিং অ্যাকশনের নিষেধাজ্ঞা থেকে ফিরেছেন তরুণ ফাস্ট বোলার। আফগানিস্তানের বিপক্ষে ত্রাস ছড়িয়েছেন। সিরিজের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারী হয়েছেন যুগ্মভাবে। তৈরি এখন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আরো বড় লড়াইয়ের জন্য। তাসকিনের অবৈধ বোলিং অ্যাকশন শুধরে নেওয়ার নেপথ্যের কারিগর হিসেবে যে কাজ করেছেন জাকি।

"আমি আসলে ওর জন্য খুব গর্বিত। " জাকি বললেন, "যেখানে থাকার কথা ছিল সেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরার হুমকিতে ছিল ও। তাকেই সন্দেহজনক বোলিং অ্যাকশন শুধরে ফিরে আসতে সহায়তা করেছি। দারুণ গতিতেই বাউন্সার ও ইয়র্কার দিচ্ছিল ও। তার অ্যাকশনে আসলে আমাদের তেমন পরিবর্তন আনতে হয়নি। তারপরও তাকে তাজা বোলারই লাগছে। আফগানিস্তান সিরিজের সময় স্পিডগান দেখিনি। তবে তাসকিন আমাকে বলেছে তার মনে হয়েছে আগের মতো গতিতেই বল করেছে। "

৫০ বছরের জাকি সাবেক ফাস্ট বোলার। এখন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) বিশেষজ্ঞ বোলিং কোচ। এই বছরের এপ্রিলে তখনকার জাতীয় দলের বোলিং কোচ হিথ স্ট্রিক জাকির শরণ নেন। তাকে বলেন তাসকিনের অ্যাকশন ভিডিও করতে। স্ট্রিক তখন আইপিএলে গুজরাট লায়ন্সের বোলিং কোচের দায়িত্ব পালন করছেন। এরপর স্ট্রিক বাংলাদেশের চাকরি ছেড়ে দিলে তাসকিনের অ্যাকশন শুধরানোর গোটা দায়িত্ব পড়ে জাকির ওপর।

গত মার্চে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সময় আইসিসি পরীক্ষার পর তাসকিনের বোলিং অ্যাকশন অবৈধ বলে ঘোষণা করে। ২১ বছরের বোলার নিষিদ্ধ হন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে। মাশরাফি বিন মর্তুজা ও তালহা জুবায়েরের পর তাসকিনকে বাংলাদেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ফাস্ট বোলার ধরা হয়। আর জাকিকে তো সেই অর্থে তেমন কেউ চেনে না।

জাকি জানিয়েছেন, তাসকিন স্পেশাল বোলার। তাই তাকে ভিন্ন ভাবে সামলানোর কথাও ভেবেছেন। "দ্রুত বুঝে নিয়েছিলাম যে তরুণ এক ফাস্ট বোলারকে নিয়ে কাজ করছি। তাকে অন্যদের সবার সাথে মিলিয়ে ফেললে তার অ্যাকশনে অনেক বায়োমেকানিকাল পরিবর্তন আনতে হতো। গতি ও বাউন্স ছাড়া তাসকিন হয় না। তাই ওর গতির দিকে নজর রেখে অ্যাকশন শুধরানোর কাজ করতে হয়েছে। "

খোলা চোখে তাসকিনের রান আপ ও বোলিং দেখলে সামান্যই পরিবর্তন ধরা পড়ে। অন্য ফাস্ট বোলারদের সাথে কিছু অমিল আছ তাসকিনের। সেটা তার ডেলিভারির সময়। তার কবজি থাকে মিড-উইকেটের (ডান-হাতি ব্যাটসম্যানের ক্ষেত্রে) দিকে। সরাসরি পিচের দিকে না। কবজির এই অবস্থান ভিন্ন। তার অ্যাকশনের বাকি সব আগের মতোই আছে।

চেন্নাইয়ের পরীক্ষার ব্যর্থতার পর সেপ্টেম্বরে তাসকিন পরীক্ষা দেন ব্রিসবেনে। এখান থেকেই আইসিসির বৈধতার রিপোর্ট নিয়ে ফেরেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে। ব্রিসবেনের পরীক্ষায় দেখা যাচ্ছে তাসকিনের বল ছাড়ার সময় তাসকিন গড়ে ৫ ডিগ্রিও পার হননি। তার ২৪ ডেলিভারির মধ্যে কেবল ৪টি ৭ ডিগ্রি পেরিয়েছে। বাকি সব ৬ ডিগ্রির মধ্যে থেকেছে। একই সাথে পরীক্ষা দেওয়া ও বৈধতা ফিরে পাওয়া স্পিনার আরাফাত সানির ক্ষেত্রে যেটি সর্বোচ্চ ১১ ডিগ্রি, সর্বনিম্ন ৬ ডিগ্রি। এখন বলা যায় যে অবৈধ বোলিং অ্যাকশনের অভিযোগে রিপোর্টেড বোলারদের মধ্যে তাসকিনের বোলিং টেকনিক্যালি অন্যতম সেরা।

১৫ ডিগ্রির বৈধতার সীমা যেন ডেলিভারির সময় কনুই অতিক্রম না করে সে জন্য ছোটোখাটো কিছু পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাসকিনকে। জাকির জন্য তাসকিনের পেস ঠিক রেখে সেই পরিবর্তন আনা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। আটটি ভিন্ন ক্যামেরায় তাসকিনের অ্যাকশন রেকর্ড করেছিলেন তিনি। যাতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যাপারও ধরতে পারেন।

"আমার ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল এটি। ক্যারিয়ার হুমকিতে এমন এক ছেলেকে সহায়তা করছিলাম। তাকে আগের ছন্দে ফেরানো আমার প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল। যাতে সে ঘণ্টায় ১৩৯ থেকে ১৪৮ কিলোমিটার গতিতে বল করতে পারে। " জাকি বলেছেন, "তার গতি হারানোর উপায় ছিল না। আমি ওর অ্যাকশন রেকর্ড করতে ফায়ার সার্ভিসের মইও ব্যবহার করেছিলাম। যাতে মাথার ওপর থেকে অ্যাকশনটা ধরতে পারি। এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে আগস্টের শেষ পর্যন্ত প্রতি সপ্তাহের তার বোলিং রেকর্ড করেছি। "

তাসকিনের জন্য ৯ ফুটের একটা আয়না প্রস্তুত করেন জাকি। তার বাসায়ও ৬X৪ ফুট আয়না বসানোর ব্যবস্থা করেন। যাতে এর সামনে নিজের অ্যাকশন দেখে তাসকিন সঠিক ধারণাটা পান। এই সময়ে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে আবাহনীকে চ্যাম্পিয়ন হতেও সহায়তা করেন তাসকিন। তবে জাকির পরিশ্রমের কথা ভুললে চলবে না। এই যে বাংলাদেশের হয়ে আবার মাঠ কাঁপাচ্ছেন তাসকিন তার পেছনে যে জাকির অনেক পরিশ্রম, মেধা আর সময় লুকিয়ে।


মন্তব্য