kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৭ জানুয়ারি ২০১৭ । ৪ মাঘ ১৪২৩। ১৮ রবিউস সানি ১৪৩৮।


ভারতের মোহালিতে খেলা দেখতে আসা পাকিস্তানি দর্শকদের অভিজ্ঞতা

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৬ মার্চ, ২০১৬ ১২:৫৭



ভারতের মোহালিতে খেলা দেখতে আসা পাকিস্তানি দর্শকদের অভিজ্ঞতা

পাকিস্তানের মাটিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বন্ধ রয়েছে প্রায় ছয়-সাত বছর ধরে এবং দেশের সবচেয়ে কাছে পাকিস্তানিরা যেখানে নিজেদের দলের খেলা দেখার সুযোগ পান তা হলো ভারতের মোহালি।

ভারত-পাকিস্তানের ওয়াগা সীমান্ত থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ড্রাইভ এই মোহালি, কিন্তু ভিসার সমস্যা, পুলিশ ভেরিফিকেশন ইত্যাদি সামলে সেখানে পৌঁছনোটাও পাকিস্তানের সমর্থকদের কাছে বিরাট এক ঝকমারি। তবে এতকিছুর পরও পাকিস্তান থেকে যারা মোহালিতে খেলা দেখতে আসতে পারছেন তারা এই শহরের আতিথেয়তায় মুগ্ধ। ওদিকে পাকিস্তান থেকে আসা সমর্থকদের সংখ্যা কমে এলেও ভারত-শাসিত কাশ্মীর থেকে দলে দলে মানুষ পাকিস্তানকে সমর্থন করতে এসে সে অভাব পুষিয়ে দিচ্ছেন অনেকটাই। কিন্তু পাকিস্তানের এই সমর্থকদের সঙ্গে কেমন সম্পর্ক মোহালি তথা চণ্ডীগড় শহরের?

মোহালির গ্যালারিতে শনিবারের শেষ বিকেলে অবিশ্রান্তভাবে পাকিস্তানের হয়ে চিৎকার করে যাচ্ছিলেন লাহোর থেকে আসা একদল যুবক। পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে জেতেনি ঠিকই, কিন্তু প্রিয় জাতীয় দলকে অনেক দিন বাদে চোখের সামনে খেলতে দেখেই তারা ভীষণ খুশি। কিন্তু লাহোর থেকে চণ্ডীগড় এসে পৌঁছনোটাই যে একজন পাকিস্তানির জন্য কত কঠিন, তা হাড়ে হাড়ে জানেন সে দেশের প্রবীণ ক্রিকেট সাংবাদিক আবদুল মজিদ ভাট্টি। তিনি অন্তত বারদশেক ভারত এসেছেন, কিন্তু কখনও এত ঝামেলায় পড়েননি। তিনি বলছিলেন, ভাবতে পারেন, প্রতিটা শহরে গিয়ে আমরা প্রথমে পুলিশ সদর দপ্তরে যাই বিদেশি নাগরিক হিসেবে নাম রেজিস্ট্রি করাতে। শহর ছাড়ার আগে আবারও যেতে হয়, আর এই একই ছবি কলকাতা, দিল্লি, চণ্ডীগড়ে। আইসিসির টুর্নামেন্ট কভার করতে এসে পাকিস্তানি সাংবাদিকদের যদি এই হাল হয়, তাহলে সাধারণ দর্শকদের অবস্থাটা কী?

ফলে মোহালির মাঠে এবারে খাঁটি পাকিস্তান সমর্থকের সংখ্যা হাতে গোনা। কিন্তু লাহোরের একদল যুবকের কপালে শিকে ছিঁড়েছে, এবং মাত্র সাত দিনের জন্য শুধু চণ্ডীগড়-মোহালির ভিসা পেয়ে তারা বিশ্বকাপে দলের দুটো ম্যাচ দেখে নিতে পারছেন। এদেরই একজন মুদসসর বলছিলেন, আপনি আপনার দলকে কতটা ভালোবাসেন এটা আসলে তারই পরীক্ষা। শুধু পাকিস্তানকে খেলতে দেখা নয়, হৃদয় দিয়ে, গলা দিয়ে, সব অনুভূতি দিয়ে তাদের সমর্থন করতেই আমরা কষ্ট করে এতদূর এসেছি। চণ্ডীগড়ে এসে নানা পুলিশি ঝামেলায় তারা একটা লোকাল সিম কার্ড পর্যন্ত কিনতে পারেননি, কিন্তু ফয়জলদের এসব ছোটখাটো দুঃখ ভুলিয়ে দিয়েছে স্থানীয় মানুষদের মেহমানদারি।

ফয়জলের কথায়, মানুষ কিন্তু এখানে ভীষণ অতিথিপরায়ণ, খুব বন্ধুর মতো। দুই দেশের মিডিয়া আমাদের সম্পর্ক নিয়ে তো কত কিছুই লেখে, কিন্তু আমরা নিজে এখানে এসে দেখছি এখানকার মানুষও কিন্তু আমাদের সাহায্য করার জন্য সব সময় তৈরি। সেদিন এখানে একটা রেস্তোরাঁয় গেছি, ওটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, শুধু আমরা পাকিস্তানি বলে সেটা খুলে আমাদের খাবার ব্যবস্থা করল। অতীতে এমনও হয়েছে, চণ্ডীগড়ের বহু লোক সম্পূর্ণ অচেনা পাকিস্তানি সমর্থকদের জন্য তাদের বাড়ির একটা ঘর ছেড়ে দিয়েছেন, তারা হোটেলের ভাড়াটুকু সাশ্রয় করতে পেরেছেন। ফলে চণ্ডীগড়ের লোকজন এই পাকিস্তানিদের এতটাই আপন করে নিয়েছেন যে তাদের মনে হচ্ছে ভারতের এই পাঞ্জাবের খানাপিনা লাহোরের চেয়েও ভালো।

কিন্তু মুশকিল হলো, এই ভাগ্যবানদের সংখ্যা একেবারেই হাতেগোনা। পাকিস্তানের নাইন্টি টু নিউজের সাংবাদিক আয়েশা ইউসুফ যেমন বলছিলেন, তিনি ভিসা পেলেও তার আত্মীয় পরিজনদের জন্য কিন্তু ভারতে আসা অত সহজ নয়। তার কথায়, আমার বাবা-মা, দাদা-দাদি খেলা দেখতে আসতে চাইলেও তারা কিন্তু ভিসা পাচ্ছেন না। আর আমাদের দেশে তো কবে থেকে ক্রিকেট বন্ধ, ফলে এখানে এসে প্রিয় দলকে খেলতে দেখলে যেমন ভালো রাগে, তেমনি আফসোসও হয় নিজের দেশে এদের খেলতে দেখলে কত ভালো লাগত! মজা হচ্ছে, এরপরও মোহালিতে কিন্তু পাকিস্তানের জন্য স্লোগান কম নয়- কারণ ভারত-শাসিত কাশ্মীর থেকে প্রচুর লোক আসছেন পাকিস্তানকে সমর্থন করতে।

কাশ্মীরের পাহাড় থেকে তিন শ কিলোমিটার দুর্গম রাস্তায় বাসে চেপে জম্মু, তারপর সেখান থেকে নাইট বাসে চেপে সাতসকালে চণ্ডীগড়। তারপর কোথাও একটু নাস্তা সেরেই সোজা মাঠে। কিন্তু এত কষ্ট করে কাশ্মীর থেকে কেন মোহালিতে খেলা দেখতে আসা? উত্তর মিলছে আমরা ক্রিকেটের ভক্ত- আর পাকিস্তানের খেলা হলে তো কথাই নেই। কেউ আবার বুম বুম আফ্রিদির ছক্কা দেখতেই শুধু মাঠে আসছেন। কিন্তু কে জানে, কাশ্মীর থেকে এত লোক খেলা দেখতে আসছে বলেই হয়তো ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলো পাকিস্তানিদের ভিসায় এত কড়াকড়ি শুরু করেছে!

সাংবাদিক ভাট্টি বলছিলেন, এবারে পাকিস্তান থেকে সাকুল্যে মাত্র ৩০/৪০ জন দর্শক ভারতে খেলা দেখতে আসতে পেরেছেন। আমার আশঙ্কা, ক্রিকেট এককালে দুই দেশের মধ্যে সেতুবন্ধের কাজ করত, কিন্তু এবারে সেই সেতুটাও না ভেঙে পড়ে! নানা কারণে ভারত-পাকিস্তানের কূটনৈতিক সম্পর্ক যত তিক্ত হচ্ছে, তার ছায়া পড়ছে ক্রিকেটেও। কিন্তু এই সন্দেহ আর অবিশ্বাসের পরিবেশেও দুই দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে টিমটিম করে কিছুটা ভালোবাসা বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছে মোহালি!

 


মন্তব্য