kalerkantho


টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ

টাইগারদের হৃদয় ভাঙা হার

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০৮



টাইগারদের হৃদয় ভাঙা হার

বেঙ্গালুরুতে হৃদয় ভাংলো টাইগারদের। হাতের মুঠো গলে বের হয়ে গেলো ম্যাচ। ভারতকে হারানো হলো না। মাহমুদ উল্লাহ ও মুশফিকুর রহিম শেষ ওভারে বড় শট খেলতে গিয়ে সর্বনাশটা করলেন। অথচ উইকেটে টিকে থাকলেই জয় ধরা দিতো, এমনটাই ছিল পরিস্থিতি। টি-টোয়েন্টি ইতিহাসের অন্যতম সেরা নাটকীয়, রোমাঞ্চকর, শাসরুদ্ধকর ম্যাচটা ভারত জিতে নিলো ১ রানে।

শেষ ওভারে বাংলাদেশের দরকার ১১ রান। এমএস ধোনি এই ওভারটা হার্দিক পান্ডিয়ার জন্য রেখে ভুল করেছিলেন বলেই মত তখন। প্রথম ৩ বলেই বাংলাদেশের প্রায় মুঠিতে ম্যাচ। প্রথম বলে মাহমুদ উল্লাহ ১ রান নিলেন। পরের বলে মুশফিকের বাউন্ডারি! পরের বলে স্কুপ করে আবার চার মুশফিকের! ৩ বলে ২ রান! কিন্তু এই তিন বলে ৩ উইকেট হারিয়ে অবিশ্বাস্যভাবে হেরে গেলো বাংলাদেশ! মুশফিক (১১) ক্যাচ দিলেন! মাহমুদ উল্লাহ স্ট্রাইক নিয়েছেন।

২ বলে ২ রান দরকার। মাহমুদ উল্লাহও (১৮) তুলে মেরে আউট! ভুলের পর ভুল! দুজনই উইনিং শটের নেশায় তীরে এসে তরী ডুবিয়ে গেলেন। ভারত তখনই জয়ের উৎসবে মাতলো। যদিও বাংলাদেশের শেষ বলে ২ রান দরকার। শেষ বলে শুভাগতর ব্যাটে বলে হলো না। তবু ছুটলেন তিনি। টাই হলেই সুপার ওভার। ধোনি বল নিয়ে স্টাম্পের দিকে ছুটছেন। মুস্তাফিজ অন্য প্রান্তে ছুটছেন। ধোনি আগে পৌঁছলেন। আউট মুস্তাফিজ। ১ রানে হার বাংলাদেশের। স্নায়ুর ওপর চাপটা শেষ পর্যন্ত রাখতে না পেরে ঐতিহাসিক এক জয়ের বদলে বুক ভাঙা এক হারে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিলো টাইগাররা। বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়ার শঙ্কা থেকে মুক্তি পেলো ভারত।

দারুণ বোলিং-ফিল্ডিংয়ে ভারতকে ৭ উইকেটে ১৪৬ রানে আটকে দিয়েছিল বাংলাদেশ। এদিন টাইগারদের শরীরী ভাষায় ছিল আক্রমণ। মাশরাফি বিন মর্তুজার নেতৃত্বে দলটা জেগে উঠেছিল। পুরো ম্যাচেই জয়ের ধারায় ছিল বাংলাদেশ। কিন্তু ২০ ওভারে ৯ উইকেটে ১৪৫ রানে খেলা শেষ করলো তারা।

তামিম ইকবাল, সাব্বির রহমান ও সাকিব আল হাসান জয়ের পথেই রেখেছিলেন দলকে। সৌম্য সরকারের জায়গায়ে ওপেনিংয়ে তামিম ইকবালের সঙ্গী হলেন মোহাম্মদ মিথুন। কিন্তু ১ রান করেই রবিচন্দ্রন অশ্বিনকে উইকেট দিয়ে এসেছেন এই ওপেনার। তামিমের এদিন ভাগ্য ভালো। ৬ রানে আশিস নেহরা ও ১৫ রানে জসপ্রিত বুমরাহ ক্যাচ ছাড়লেন। তামিমও নতুন জীবনের ফায়দা নিলেন। ষষ্ঠ ওভারে বুমরাহকে ৪টি বাউন্ডারি মেরে দিলেন। কিন্তু ৩২ বলে ৩৫ রান করে থামতে হলো তাকে। রবিন্দ্র জাদেজাকে নেমে এসে মারতে গিয়ে স্টাম্পিংয়ের শিকার তিনি। ৫৫ রানে দ্বিতীয় উইকেট হারালো বাংলাদেশ। তামিম আউট হলেও ভালো একটা শুরু দিয়ে গেছেন। সাব্বির রহমানের সাথে তার জুটি ৪৪ রানের।

৯ ওভারে ২ উইকেটে ৬৭ রান। পরের ৪ ওভারে ২৬ রানে ৩টি উইকেট হারিয়ে চাপে পড়লো বাংলাদেশ। তবে ম্যাচ তখনো নিয়ন্ত্রণে। ১৫ বলে ২৬ রান করে ফিরেছেন সাব্বির। মাশরাফি ৫ নম্বরে নেমে এক ছক্কায় ৬ রান করে ফিরেছেন। আর সাকিব দারুণ দুটি ছক্কা মারার পর ১৫ বলে ২২ রান করে আউট। ৫ উইকেটে ৯৫। জিততে টাইগারদের ৪৭ বলে আর ৫২ রান দরকার। মাহমুদ উল্লাহর ব্যাটের দিকে তাকিয়ে সবাই। সৌম্য যোগ হলেন তার সাথে। জাদেজাকে মারা সৌম্যের ছক্কা সাহস দিলো। মাঠে রুদ্ধশ্বাস অবস্থা।

দারুণ বোলিংয়ে ভারত হিসেবটা ১৮ বলে ২৭ হতে বাধ্য করলো। কিন্তু ১৮তম ওভারে নেহরাকে বাউন্ডারি মারা সৌম্য ছক্কা মারতে গিয়ে আউট! ২১ বলে ২১ রান করে গেলেন সৌম্য। মুশফিক-মাহমুদ উল্লাহ জুটির হাতেই তখন বাংলাদেশের ভাগ্য। শেষ বলে মাহমুদ উল্লাহর চার। এই ওভারে ১০। শেষ ১২ বলে ১৭ রান দরকার টাইগারদের। বুমরাহর ৬ বলে ৬ রান। শেষ ওভারে জয়ের হিসেবটা আর মেলানো হলো না বাংলাদেশের। এত কাছে এসেও হেরে যাওয়ার কষ্ট কাঁদিয়ে ছাড়লো টাইগার ভক্তদের।  
      
এর আগে টস জিতে মাশরাফি প্রথম ওভার করেছেন। এরপর টানা চার ওভারে চার বোলার এনেছেন। একে একে এসেছেন অফ স্পিনার শুভাগত হোম, আল-আমিন হোসেন, মুস্তাফিজুর রহমান ও সাকিব আল হাসানকে। প্রথম ৫ ওভারে ভারতের রান ২৭। গত বছর ভারতের বিপক্ষেই কাটার বিশেষজ্ঞ মুস্তাফিজের আবির্ভাব। এদিন ম্যাচের ষষ্ঠ ওভারে দুই ওপেনার তাকে দুই ছক্কা হাঁকালেন। কিন্তু ওভারের শেষ বলে শোধ নিলেন মুস্তাফিজ। রোহিত শর্মা (১৮) মিড উইকেটে ক্যাচ দিয়ে ফিরেছেন। পরের ওভারে সাকিব এলবিডাব্লিউর ফাঁদে ফেলেছেন অন্য ওপেনার শিখর ধাওয়ানকে (২৩)।

এরপর মাশরাফি আবার ফিরলেন। ফিরলেন শুভাগতও। পাওয়ার প্লের ৬ ওভারে ৪২ রান তোলা ভারতকে রানের জন্য খাটতে হচ্ছিল। বিরাট কোহলি ও সুরেশ রায়না উইকেটে। কিন্তু সাকিব-মাশরাফি-শুভাগত পরের ৪ ওভারে দিয়েছেন মাত্র ১৭ রান। ১০ ওভার শেষে ২ উইকেটে ৫৯ রান ভারতের। স্বাগতিকদের বড় রান করার চেষ্টাটা বড় ধাক্কা খেয়েছে তো বটেই।

রায়না-কোহলি জুটিকে সেভাবে খেলতেই দিচ্ছিলেন না বোলাররা। ১২ ওভারের মধ্যে নিজের ৪ ওভার শেষ করেছেন মাশরাফি। উইকেট পাননি। কিন্তু রান দিয়েছেন মাত্র ২২। সাকিব তো অসাধারণ। প্রথম ৩ ওভারে মাত্র ১২ রান দিয়েছেন। ১ উইকেট নিয়েছেন। এই সময়ের সেরা টি-টোয়েন্টি ব্যাটসম্যান কোহলি শুভাগতকে ১৪তম ওভারে ছক্কা মারলেন। পরের বলে তাকে কোহলিকে (২৪ বলে ২৪) বোল্ড করে দিয়েছেন শুভাগত। যুবরাজ-ধোনির আগেই নেমেছেন হার্দিক পান্ডিয়া। সাকিবকে দুটি বাউন্ডারি মারলেন। ৪ ওভার শেষে তবু সাকিবের বোলিং ফিগার চমৎকার : ৪-০-২৩-১।

১৫ ওভারে ৩ উইকেটে ১১২ রান করা ভারত তো মারবেই। কিন্তু ৪ ওভার পর ফিরেই জোড়া আঘাত হেনেছেন আল-আমিন। বিপজ্জনক রায়না (২৩ বলে ৩০) মারতে গিয়েই সাব্বিরকে ক্যাচ দিলেন। ভাঙ্গে ৫০ রানের জুটি। পরের বলে বাউন্ডারি লাইনে সৌম্য সরকার অনেকদিন মনে রাখার মতো একটি ক্যাচ নিলেন। আড়াআড়ি দৌড়ের পর ডাইভ দিয়ে বল ধরেছেন। যেন পাখির মতো উড়লেন! পান্ডিয়া (১৫) আউট। হ্যাটট্টিক করতে না পারলেও পরের চার বলের তিনটি ডট দিলেন আল আমিন।

১৭তম ওভারে মাশরাফি বল দিলেন মাহমুদ উল্লাহকে। ১ ওভারের জন্য। শুভাগত আগের ওভারে মার খেয়েছেন বলে। যুবরাজ (৩) পুল করতে গিয়ে জীবন দিয়ে এলেন। ৪ রানে ১ উইকেট মাহমুদ উল্লাহর। ডেথ ওভারেও দারুণ বাংলাদেশ। মুস্তাফিজ ১৮তম ওভারে দিলেন ৫ রান। ১৯তম ওভারে ধোনি-জাদেজার ৩ বাউন্ডারি। আল-আমিন ১৪ রান দিলেন। তারপরও আল-আমিনের বোলিং ফিগার: ৪-০-৩৭-২।

শেষ ওভারের প্রথম বলেই মুস্তাফিজ উপড়ে দিয়েছেন রবিন্দ্র জাদেজার (১২) উইকেট। ধোনি ছিলেন। তারপরও মাত্র ৯ রান দিলেন মুস্তাফিজ। ৪ ওভারে ৩৪ রানে ২ উইকেট তার। ১২ বলে ১৩ রানে অপরাজিত থেকেছেন ধোনি। শেষ ১০ ওভারে ৮৭ রান তুলেছে ভারত। হারিয়েছে ৫ উইকেট। স্বাধীনভাবে ভারতের ব্যাটসম্যানদের খেলতে দেননি বোলাররা। তাতে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা পেয়েছে জয় করার মতো একটি স্কোর। কিন্তু শেষ ওভারে ৩ উইকেট হারিয়ে সর্বনাশ হলো বাংলাদেশের।      


মন্তব্য