kalerkantho

কল্যাণ হোক কল্যাণী

আতা সরকার

২২ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে




কল্যাণ হোক কল্যাণী

অঙ্কন : মানব

: হুররে!

আনন্দে চাপা চিত্কার করে উঠলেন নজরুল। যেন ফুটবল খেলার নিজ পক্ষের গোল করা দেখছেন।

ভড়কে গিয়ে তাঁর মুখের দিকে ভয় ভয় চোখে তাকালেন হাজেরা। আতঙ্কিত হওয়ারই কথা। এইমাত্র এক বিস্ফোরণের আওয়াজ পাওয়া গেল। এই রাতে। কে জানে আর্মিরা আবার কোথায় হামলা চালিয়েছে! কাছে-ধারে কোথাও মনে হয়। আতঙ্কের দলাটা গুলটি পাকিয়ে যাচ্ছে ভেতরে। সেই পঁচিশে মার্চ রাত থেকে।

নজরুলের কী হলো? এই ভয়ের মধ্যেও তাঁর উল্লাস কেন? আজ তাঁকে অন্য রকম লাগছে। চেনা মানুষটাকে তাঁর অন্য দিনগুলোর সঙ্গে মেলানো যাচ্ছে না। সারা দিন বাসায় ছিলেন না। কোথায় গিয়েছিলেন কে জানে।

ফিরেছেন সন্ধ্যায়। খানিকটা কেমন যেন আনমনা। ভেতরে কিছু একটা অস্থিরতা যে কাজ করছে সেটাও টের পাওয়া যাচ্ছে। কী নিয়ে যেন উত্তেজিত তিনি। জিজ্ঞেস করার সাহস হলো না হাজেরার। তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে দেখছিলেন তাঁর ভাবগতিক।

ঘরে ফেরার পর হাজেরা নাশতা-পানি দিয়েছিলেন। তিনি খাবার টেবিলে বসেছিলেনও। কিন্তু তেমন কিছুই মুখে দেননি। এক ধরনের ছটফট নিয়ে উঠে পড়েছেন। ঢুকে পড়েছেন ঘরে।

রাত ৮টা। জুলাইয়ের ২০ তারিখ। এ সময়ই ভয়ংকর শব্দ। কেঁপে উঠল পুরো ভবন। কেঁপে উঠেছে মাটিও। ভয়ে কেঁপে উঠলেন হাজেরাও। ওরা আবার শুরু করেছে। পাকিস্তানি আর্মি। নজরুল কোথায়?

হাজেরা ছুটে এলেন ঘরে। স্বামীর খোঁজে। মুখে বলছেন : শুনছ, ওরা আবার কামান দাগছে!

ভয়ের কোনো চিহ্ন নেই নজরুলের চেহারায়। এক ধরনের চাপা উল্লাসে আনন্দ-ধ্বনি দিয়ে উঠছেন।

ঘরের ভেতর অস্থির পায়চারি করছিলেন। আর কিছু একটা শুনবেন বলে অপেক্ষা করছিলেন কান পেতে। সেই প্রত্যাশিত আওয়াজটি যেন তিনি পেয়ে গিয়েছেন। তারই আনন্দে চিকচিক করছে চোখ-মুখ।

হাজেরার দিকে তিনি তাকালেন। কথা শুনলেন কী শুনলেন না। আবার পায়চারি শুরু করলেন। বিড়বিড় করে বলছেন: একটা, এক-এক—

হতচকিত হাজেরা অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন। বোঝার চেষ্টা করছেন, তাঁর কী হয়েছে।

আবার আরেকটা বিকট শব্দ শোনা গেল। আগের মতোই। মাটি ও বাড়ি কাঁপানো শব্দ।

সঙ্গে সঙ্গে নজরুল দাঁড়িয়ে গিয়েছেন। সোল্লাসে বলছেন : দুটো। এবার দুটো।

আবার পায়চারি শুরু করলেন। বিড়বিড় করে বলতে লাগলেন : আরো। আরো আওয়াজ চাই।

পরপর আরো দুবার ঢাকা মহানগরী কাঁপিয়ে প্রচণ্ড শব্দ চারপাশের পরিবেশ সন্ত্রস্ত করে তুলল।

হাজেরা কিছুই বুঝতে পারছেন না। বিস্ময়ের ঘোর তাঁর চোখে-মুখে। কৌতূহলও। কিন্তু কিছু জিজ্ঞেস করে জেনে নেওয়ার সুযোগও পাচ্ছেন না।

এখনো নজরুলের ভেতর অস্থিরতা। পায়চারি করছেন, আর বিড়বিড় করে বলছেন : আর একটা।

তারপর হঠাত্ থামলেন। দাঁড়ালেন হাজেরার মুখোমুখি। শান্ত কণ্ঠে বললেন: জায়নামাজ দাও।

হাজেরা অবাক হয়ে তাকালেন তাঁর মুখের দিকে। এতক্ষণের উত্কণ্ঠা তাঁর মুখমণ্ডলে নেই। শান্ত সমাহিত একজন মানুষ। কোনো কিছু প্রশ্ন করার আগে তিনি নিজ থেকেই বললেন: নামাজ পড়ব। শোকরানা নামাজ। অপারেশন সাকসেসফুল। হাজেরা জায়নামাজ এনে দিলেন। তিনি কেবলামুখী হয়ে নামাজ আদায় করতে দাঁড়ালেন। হাজেরা দেখছেন নজরুলকে। তাঁর কাছে এক রহস্যপুরুষ মনে হচ্ছে। আজ এ লোকটাকে অচেনা মনে হচ্ছে। দুজনের এত দিনের জীবন। যত দিন যাচ্ছে, লোকটার প্রতি আকর্ষণ আর ভক্তি বেড়েই চলেছে। এখনকার এই উন্মাতাল দিনগুলোতেও।

বিজ্ঞানের ছাত্র নজরুল। হয়েছেন প্রকৌশলী। চাকরি নিয়েছেন ওয়াপদায়। বিদ্যুত্ প্রকৌশলী। এমন লোকগুলো চাকরিবাকরি আয়-রোজগার ঘর-সংসার নিয়ে ঘরকুনো হয়ে থাকে। নজরুল সে বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসেছেন। দেশের প্রতি বোধ করেন অপরিসীম মমত্ব আর সাধারণ মানুষের প্রতি হূদয়ের টান।

৭ মার্চ ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর বহু ভাষণ প্রচার করতে দেওয়া হলো না রেডিও পাকিস্তানে। তাই বলে কি তাঁর বজ্রকণ্ঠ থেমে থাকবে!

উত্তেজিন নজরুল ঘরে এসে বলে উঠলেন: আমাদের আওয়াজ দাবায়া রাখতে পারবা না।

সঙ্গে নিয়ে এসেছেন বঙ্গবন্ধুর রেকর্ডকৃত ভাষণ। শান্তিনগরের মোড়ে টাঙানো হলো মাইক। শুরু হলো বঙ্গবন্ধুর বজ্রনির্ঘোষ। সারা দিন-রাত সে কণ্ঠস্বর চারপাশের মানুষজনকে উদ্দীপ্ত করে চলল।

সেদিনের কথা মনে আছে হাজেরার। নির্দেশ এসেছে পাকিস্তানিদের বর্বরতার প্রতিবাদে বাংলার ঘরে ঘরে কালো পতাকা ওড়াতে হবে।

রাতে নজরুল এলেন। দোকানপাট সব বন্ধ। কোথাও কালো কাপড়ের জোগাড় নেই। কিন্তু কালো পতাকা তো উড়বেই। হাজেরার কালো রঙের একটা পেটিকোট ছিল। সেটা কেটেই রাতারাতি তৈরি করা হলো কালো পতাকা। সেই পতাকা পরের দিন ভোরে উড়ল ওয়াপদার ইকেট্রিক সাপ্লাই অফিসের ছাদে।

এমন উদ্দামতা তাঁর এখনো থামেনি। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী সশস্ত্র হামলা চালাল ঢাকার নিরস্ত্র জনপদে। তখনো স্বাধীনতা-পাগল ছেলেগুলোর সঙ্গে তিনি দেখেছেন প্রতিরোধের স্বপ্ন। রাস্তার ওপর ভারী ভারী ড্রাম ব্যারেল ফেলে মিলিটারিদের বহরের আনাগোনায় বিঘ্ন ঘটানোর চেষ্টা করেছেন। পরিবারের নিরাপত্তার জন্য ঢাকার এ-পাড়া থেকে ও-পাড়ায় আবাস বদল করেছেন। গ্রামে গিয়েছেন। গ্রাম থেকে আবার শহরে ফিরেছেন। কিন্তু সব সময় মাথার ভেতর মুক্তিযুদ্ধের ডাক।

গ্রামের পথে পথে মানুষের লাশ দেখে নজরুল বিচলিত হয়ে ওঠেন। সে সময়ই তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের ব্যাপারে আত্মপ্রতিজ্ঞ হন।

গ্রামের রাস্তার এ দৃশ্যপট তাঁকে সারা রাত ঘুমোতে দেয়নি। তাঁর অঝোর চোখের পানির দৃশ্য এখনো মনে পড়ে হাজেরার। আর সেই কঠিন উচ্চারণ : আমি কী ছিলাম, জানি না। তবে এই মুহূর্ত থেকে আমার একমাত্র ধ্যান—ওদের পরাজিত করবই। গ্রামের বাড়িতে সবাই ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুমাতে পারেননি নজরুল। তাঁর সঙ্গে জেগে ছিলেন হাজেরা।

গ্রামে বসেই মুক্তিযোদ্ধা তৈরির কাজে মন দিয়েছিলেন নজরুল।

এক রাতে নজরুল হাজেরাকে ডেকে বললেন: গ্রামে এভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে হাত-পা গুটিয়ে আর বসে থাকলে চলবে না। ঢাকায় যেতে হবে। প্রতিবাদ করতে হবে। আমারও তো অনেক কিছু করার আছে। দায়িত্ব আছে।

ঢাকায় এসেও সেই একই চিন্তা। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একই ভাবনা। নজরুলের এমন ভাবনা হাজেরাকে আন্দোলিত করে। জানতে চান : তুমি একা কী করবে?

নজরুল বলেন : আমি তো বিদ্যুত্ প্রকৌশলী। বিদ্যুত্ বন্ধ করে দেব। বিদ্যুত্ যদি না জ্বলে তাহলে পানি বন্ধ হয়ে যাবে। টেলিফোন অফ হয়ে যাবে। জীবনের চাকাটাই অচল হয়ে যাবে। ওদের বুঝিয়ে দিতে হবে। রাতের অন্ধকারে মানুষ মারা চলবে না। চলবেই না।

নজরুল নামাজ শেষ করে এসে দাঁড়ান হাজেরার পাশে। বললেন, চলো ছাদে যাই। ছাদ থেকে ঢাকার চারপাশটা দেখা যাবে। চারপাশের নিঝুম অন্ধকার। তার মধ্য দিয়ে দুজন সিঁড়ি ভেঙে ছাদে উঠে এলো।

নজরুলকে খানিকটা প্রফুল্ল লাগছে। স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে বললেন : জানো, আজ আমি সার্থক। হাজেরা তখনো কিছু বুঝে উঠতে পারছেন না। অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন নজরুলের দিকে।

নজরুল চুপি চুপি যা বললেন তাতে বোঝা গেল, চারটি বিস্ফোরণের আওয়াজের পরিকল্পনার পেছনে তাঁরও অবদান রয়েছে। পাওয়ার স্টেশনগুলোতে বোম ব্লাস্ট করিয়ে ঢাকা অচল করে দেওয়ার পরিকল্পনা।

সাফল্যের তৃপ্তি নজরুলের চোখে-মুখে। পরক্ষণেই উদ্বেগের মেঘ ছেয়ে গেল। আপন মনে বিড়বিড় করে বললেন : ছেলেগুলো! ওদের কী খবর! ওরা ঠিকঠাক সরে যেতে পেরেছে তো!

তাঁর ভেতর দেখা দিল অস্থিরতা। ঘোর অন্ধকারের মধ্যেই ছাদজুড়ে পায়চারি করতে শুরু করলেন। তাঁর চেয়েও বেশি উদ্বেগ নিয়ে তাকিয়ে রইলেন হাজেরা।

হাজেরার কাছে এতক্ষণে পরিষ্কার হচ্ছে নজরুলের এত দিনকার কর্মকাণ্ডগুলো। তাঁকে নিয়ে তিনি বিদ্যুত্ সাপ্লাইয়ের বিভিন্ন সাবস্টেশনে ভিজিট করতে যেতেন। সস্ত্রীক এই ভিজিট নির্দোষ অফিশিয়াল ভিজিট মনে হতো। এর তাত্পর্য এখন বুঝতে পারছেন। তখন বলতেন: বউ সঙ্গে নিয়ে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছি দেখলে কেউ কোনো কিছুই সন্দেহ করবে না।

সাবস্টেশনে গিয়ে পাহারাদারদের সঙ্গে কথা বলতেন, জিজ্ঞেস করতেন, মুক্তিরা কোথায় কোথায় বোমা বসাতে পারে, যেখানে বোমা বসালে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে কম সময়ের মধ্যে। এরপর পাহারাদারদের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলতেন, তোমরা খেয়াল রেখে পাহারা দাও। সাবধান! এসব জায়গায় কোনোভাবেই যেন কোনো মুক্তি না আসতে পারে!

হাজেরার কাছে এখন সব কিছু পরিষ্কার। নজরুল সাবস্টেশনগুলোতে শুধু শুধুই ঘুরতেন না। সেগুলোর নকশা এঁকে পাঠিয়ে দিতেন মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে। হাজেরা জানেন, আগরতলায় ক্যাপ্টেন হায়দারের সঙ্গে নজরুলের যোগাযোগ রয়েছে। হয়তো তাঁর কাছেই পৌঁছে যেত নকশাগুলো। আর তারই ফলাফল আজকের ঢাকার অন্ধকার ঢাকার এই হাল। দেখে-শুনে হাজেরাও স্বামীর পথ ধরে মুক্তিযুদ্ধে কিছু না কিছু কাজ করার জন্য ছটফট করছিলেন।

ভাবনায় ছেদ পড়ল সামনে নজরুলকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। ছাদময় পায়চারি থেমে গেছে। নজরুল হাজেরার দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, শোনো, একটা কথা বলব। বুকটা ধড়াস করে উঠল হাজেরার। আবার কোন বিপদের কথা শোনাবেন! অনিশ্চিত ভঙ্গিতে এলেমেলো দৃষ্টিতে তাকালেন নজরুলের দিকে।

নজরুল বললেন, এবার আমাকে চলে যেতেই হবে। তুমি ভয় পেয়ো না। তোমার ওপর অনেক ভরসা। ওদের দায়িত্ব তোমার। আমি জানি, বইতে পারবে।

রাত এখন কত? গভীর। ছাদে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দুজন। ঝরঝর করে কেঁদে দিলেন হাজেরা। যে ভয়টা হচ্ছিল, তাই সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

হাজেরার গলায় মিনতি ঝরে পড়ল—নাগো, তুমি আমাকে একা ফেলে যেয়ো না।

একটু দম নিয়ে আবার বললেন, আমার কে আছে বলো? কলেজে পড়ার সময় মা চলে গেছেন। তারপর আব্বাও চলে গেলেন। এখন তুমি চলে যেয়ো না। কে দেখবে তাহলে আমাকে? বলো।

নজরুল পরম মমতায় হাজেরার মাথায় হাত রাখলেন। দরদমাখা কণ্ঠে বললেন, ওপরে আল্লাহ আছেন। তিনি মেহেরবান। একটা ব্যবস্থা করবেনই।

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, এমন দেশে বন্দি হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া ভালো। আজ তোমাকে যা বললাম, এ অপারেশনের কথা কাউকে বলো না। নজরুল চোখ ফিরিয়ে নিলেন হাজেরার দিক থেকে। তাঁরও কণ্ঠস্বর ভারী হয়ে আসছে। ভিজে যাচ্ছে চোখের পাতা। তিনি ঘুরে সিঁড়িতে পা রাখলেন। নামতে লাগলেন। তাঁর পেছনে অশ্রুসিক্ত হাজেরা। সামনে নজরুলের দীর্ঘ অবয়ব। ধীর পায়ে নেমে যাচ্ছেন। এ এক অন্য নজরুল। তাঁর দেহে নতুন বেশ।

হাজেরার চোখে পানি থাকলেও তিনি গর্ব অনুভব করছেন। ইচ্ছা হচ্ছে ছুটে গিয়ে নজরুলের পায়ে হাত রেখে সালাম করেন, যেমন সালাম করেন কেউ একজন নতুন কাপড় আর শাড়ি পরলে। আর তখন নজরুল তাঁকে জড়িয়ে ধরে আদর করেন। নজরুল নামতে নামতে ছায়া ছায়া হয়ে যাচ্ছেন। পেছনে হাজেরা। তাঁর কানের কাছে ফিসফিস আদুরে আওয়াজ হচ্ছে, কল্যাণ হোক তবে কল্যাণী!

মন্তব্য