kalerkantho

আমার জীবন একটা সফল জীবন

আনিসুজ্জামান আমাদের বাতিঘর শুধু নন, বাতিঘরের দীপ্তিময় আলোকও বটে। কলকাতায় জন্ম নেওয়া এই গুণী ও নিবেদিত মানুষটি পেরিয়ে এসেছেন যাপিত জীবনের ৮২তম জন্মদিন। জন্ম ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৭ সালে। একাধারে একজন শিক্ষাবিদ, লেখক ও জাতীয় অধ্যাপক। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস নিয়ে তাঁর গবেষণা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। গত ৪ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় তাঁর বাসায় সাক্ষাত্কারটি গ্রহণ করেন কবি শ্যামল চন্দ্র নাথ

২২ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



আমার জীবন একটা সফল জীবন

ছবি : কাকলী প্রধান

শ্যামল : আপনি কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। আপনার সম্পর্কে জানতে চাই।

আনিসুজ্জামান : আমার জন্ম ১৯৩৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি কলকাতায়। আমার বাবা এ টি এম মোয়াজ্জম পেশায় ছিলেন হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার, তিনি সামান্য লেখালেখিও করতেন। মা সৈয়দা খাতুন গৃহিণী হলেও তাঁর লেখালেখির অভ্যাস ছিল। পিতামহ শেখ আবদুর রহিম ছিলেন লেখক ও সাংবাদিক। তিনি ১৮৮৮ সালেই হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনী লিখেছিলেন। এটি ছিল কোনো বাঙালি মুসলমানের লেখা হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রথম জীবনী। আমরা পাঁচ ভাই-বোন। আমি চতুর্থ।

শ্যামল : জন্মের ১০ বছর পরে পরিবারসহ খুলনায় চলে আসেন। আপনার শৈশব এবং সেই সময়ের দেশভাগের কথা বলুন।

আনিসুজ্জামান : ১৯৪৭ সালে দেশ যখন বিভক্ত হলো, তখন আমরা আনন্দিত এই অর্থে যে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আবার বাংলা যে ভাগ হয়ে গেল, সে জন্য দুঃখিত হলাম। আমার মা খুব জোর করছিলেন আমাদের নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসতে। আমার আব্বার মত ছিল না। তাঁর আশৈশব শহর কলকাতা। তিনি কলকাতায় থেকে যেতে চেয়েছিলেন। তখন তাঁর ৫০ বছর বয়স। তিনি হোমিওপ্যাথি প্র্যাকটিস করতেন। নতুন জায়গায় গিয়ে প্র্যাকটিস জমানোটা দুরূহ হবে বলে মনে করতেন। শেষ পর্যন্ত মায়ের চাপে আব্বা পাকিস্তানে আসার সিদ্ধান্ত নিলেন। তখন সিদ্ধান্ত ছিল ঢাকায় নয়, আমরা যাব খুলনায়। খুলনা আমাদের বাড়ির কাছে বলে। আর পাকিস্তান যদি না টেকে, তাহলে খুলনা থেকে সহজে কলকাতায় ফিরে যাওয়া যাবে।

শ্যামল : মুনীর চৌধুরী, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, মুহম্মদ আবদুল হাই—তাঁদের শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন।

আনিসুজ্জামান : আমি ১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। তখন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ছিলেন আমাদের বিভাগীয় প্রধান। তারপর তিনি অবসরে যাওয়ার পর মুহম্মদ আবদুল হাই বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আমাকে শহীদুল্লাহ সাহেব যথেষ্ট স্নেহ করতেন। হাই সাহেব আমাকে গবেষণায় উত্সাহিত করেছিলেন। তিনি না থাকলে আমি পিএইচডি করার কথা ভাবতাম না। মুনীর চৌধুরীর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল অনেকটা বন্ধুর মতো।  

শ্যামল : আপনি মুক্তিযুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেছেন। সে সময়ের স্মৃতিচারণা যদি করেন।

আনিসুজ্জামান : আমি ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০ বছর শিক্ষকতা করার পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যাই। সেখানে থাকতেই ১৯৭১ এসে যায়। আমরা শিক্ষকরা মার্চ মাসে একটি প্রতিরোধ কমিটি গঠন করি। আবার চট্টগ্রামের সংস্কৃতিজনেরা আরেকটি সংগঠন করেন। আমরা এই দুটি সংগঠনের সঙ্গে মিলে কাজ করতে থাকি। ২৫ আগস্টের পর আমরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইপিআরের বাঙালি সৈনিকদের থাকার ব্যবস্থা করি। তারা তখন সেনানিবাস ঘিরে রাখে। কিন্তু তাদের এই প্রতিরোধ বেশিদিন চলেনি। তারা ক্রমেই সরে পড়ে। আমরা তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দুই পথে রওনা করে দিই। সব শেষে ভাইস চান্সেলর এ আর মল্লিক সপরিবারে এবং রেজিস্ট্রার খলিলুর রহমান ও আমি ক্যাম্পাস ত্যাগ করি। পরে আমার পরিবার ও আমার শ্যালকের পরিবার নিয়ে আমরা এক মাস থাকি দেশের নানা জায়গায়। তারপর চলে যাই আগরতলায়। এরপর চলে যাই কলকাতায়। কলকাতায় তাজউদ্দীন সাহেব আমাকে তাঁর দপ্তরে যোগ দিতে বলেন। আমি তখন বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হব—এ রকম একটা কথা দিয়ে বসে আছি। তাই আমি তাজউদ্দীন সাহেবের সে প্রস্তাব গ্রহণ করিনি। প্রথমে বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক থাকতে এবং পরে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে তাজউদ্দীন সাহেবের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হয়ে কাজ করি। ড. খান সরওয়ার মুরশীদ এবং আমি তাজউদ্দীন সাহেবের বক্তব্য লেখার কাজ করতাম। সেটি অনেকে হয়তো জানেন। ১৯৭২ সালের গোড়ায় বাংলাদেশে ফিরে এসে পুরনো কর্মস্থল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিলাম। 

শ্যামল : ‘মুসলিম-মানস ও বাংলা সাহিত্য’ আপনার গবেষণাধর্মী বই। এ বইয়ের বিষয় নির্বাচনে কতটা সতর্ক ছিলেন?

আনিসুজ্জামান : আমার গবেষণা অভিসন্দর্ভ ‘মুসলিম-মানস ও বাংলা সাহিত্য’ নামে প্রকাশিত হয়। ১৯৬৪ সালে। এটা বেশ সমাদৃত হয়। এখন পর্যন্ত বোধ হয় আমার সবচেয়ে বেশি মুদ্রিত বই ‘মুসলিম-মানস ও বাংলা সাহিত্য’। তা ছাড়া আমি ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় অন্যান্য বইপত্র লিখেছি, যেগুলো ঢাকা-কলকাতা-লন্ডন-টোকিও থেকে বের হয়েছে। এরই মধ্যে বেশির ভাগ আমার রচিত। আর কিছু সম্পাদিত। আমি আমার গবেষণার কাজ মোটামুটি করতে পেরেছি এবং আমার সুদীর্ঘ শিক্ষকতার স্বীকৃতিও লাভ করেছি। আমি একুশে পদক পেয়েছি, স্বাধীনতা পদক পেয়েছি, ভারত থেকে পদ্মভূষণ খেতাব পেয়েছি, তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি-লিট সাম্মানিক উপাধি পেয়েছি। কাজেই আমি বলতে পারি, আমার যা কিছু কাজ, তার যথাযথ এমনকি প্রাপ্যের অধিক স্বীকৃতি আমি লাভ করেছি।

শ্যামল : আপনার ভালোবাসার কথা জানতে চাই। সিদ্দিকা জামান, যিনি এখন আপনার সহধর্মিণী।

আনিসুজ্জামান : আমার স্ত্রী সিদ্দিকা জামান, তাকে আমি ভালোবেসেই বিয়ে করি। ১৯৬১ সালে। আমার এক ছেলে ও দুই মেয়ে। আমি এখন অবসরে গেছি। অবসরে যাওয়ার পর আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক ও ইমেরিটাস অধ্যাপকের পদে কাজ করি। সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার আমাকে জাতীয় অধ্যাপক পদে উন্নীত করেছে। এ জন্য আমি তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ। আমার ৮২ বছর অতিক্রান্ত হতে যাচ্ছে। আমি মনে করি যে আমার জীবন একটা সফল জীবন। আমি দেশকে যা দিতে পেরেছি, দেশ থেকে আমি তার চেয়ে অনেক বেশি লাভ করেছি।

শ্যামল : জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং গণতন্ত্র—মুক্তিযুদ্ধের এই চার নীতি থেকে তো আমরা সরে এসেছি। এ নিয়ে আপনার অভিমত কী?

আনিসুজ্জামান : ১৯৭২ সালে আমরা যে সংবিধান রচনা করি, তাতে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি বলা হয়েছিল গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দেশে যে সামরিক শাসন প্রবর্তিত হয়, সেই সামরিক শাসকরা এই সংবিধান সংশোধন করে জাতীয়তাবাদকে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে রূপান্তরিত করে ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দেন এবং সমাজতন্ত্রকে একটা ন্যায়বিচারমূলক সমাজ গঠনের কথা বলেন। ১৯৭৫ থেকে দীর্ঘকাল আমাদের সংবিধান এই ছেড়াখোঁড়া ছিল। আওয়ামী লীগ সরকার এবার ক্ষমতায় আসার পর সংবিধান সংশোধন করে রাষ্ট্র পরিচালনার পুরনো মূলনীতি ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তবে সেই সঙ্গে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম রয়ে গেছে। আমি মনে করি যে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম এবং ধর্মনিরপেক্ষতা একসঙ্গে চলতে পারে না।

শ্যামল : ১৯৪৮ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর অবদান কম নয়। তাঁকে ছাড়া তো এ দেশই স্বাধীন হতো না বলে আমার অভিমত। আপনি কী মনে করেন?

আনিসুজ্জামান : ১৯৪৮ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত, অন্তত ১৯৭১ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু এ দেশের মানুষকে মুক্ত করার জন্য, গণতন্ত্র প্রবর্তনের জন্য একটা ন্যায়পরায়ণ সমাজের জন্য সংগ্রাম করে এসেছেন। তিনি দীর্ঘকাল কারাগারে বন্দি ছিলেন। একসময় যখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা করা হয় তাঁকে প্রধান আসামি করে, তখন তাঁর জীবনসংশয় দেখা দিয়েছিল। তিনি কিন্তু ভয় পাননি। কোনো রকম আপস করেননি। ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর মুক্তি অর্জিত হলো। বঙ্গবন্ধুর এই যে ভূমিকা, তা ১৯৭১ সালে তাঁর চরম পরিণতি আমরা দেখি, যখন ৭ই মার্চের ভাষণে তিনি স্বাধীনতার ডাক দেন এবং সব বাঙালি তাঁর স্বাধীনতার ডাকে সাড়া দেয়। বঙ্গবন্ধু অনুপস্থিত থাকলেও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ তাঁর নামে পরিচালিত হয়েছিল এবং মানুষ তাঁকেই নিজেদের নেতা বলে জেনেছিল। বঙ্গবন্ধুকে যারা খাটো করতে চায়, ১৯৭৫ সালের পর থেকে তারা নানাভাবে চেষ্টা করেছে; কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে। এখানে একটি কথা বলা উচিত বলে মনে করি, বাকশালের বিরোধিতা করা মানে বঙ্গবন্ধুকে মুছে ফেলার চেষ্টা নয়। অনেকেই মনে করেন, আমিও মনে করি—তা বাকশালের মধ্য দিয়ে যে একদলীয় শাসন প্রবর্তন করা হয়েছিল, সেটি গণতন্ত্রের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ছিল না। কিন্তু আমি এ-ও মনে করি, বঙ্গবন্ধু আমাদের অবিসংবাদিত নেতা। তাঁর দেখানো পথ ধরে এবং তাঁর নেতৃত্বে আমরা স্বাধীন হয়েছি। এ দেশের কিছু কুলাঙ্গার তাঁকে হত্যা করেছে; কিন্তু বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় তাঁর যে ভূমিকা, সেটি কখনো মলিন হবে না।

মন্তব্য