kalerkantho

মেলার শেষ সপ্তাহের নির্বাচিত ৫ বই
ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি ও কিছু জিজ্ঞাসা

ইতিহাসের বাস্তব সত্যদর্শন

সাবরিনা কবির

১ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



 ইতিহাসের বাস্তব সত্যদর্শন

ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি ও কিছু জিজ্ঞাসা : আহমদ রফিক। প্রকাশক : কথাপ্রকাশ। প্রচ্ছদ : সব্যসাচী হাজরা। মূল্য : ২৫০ টাকা

ভাষা আন্দোলনের অন্তর্নিহিত শক্তি ও দিকদর্শন সাধারণ নয়, বরং তা যথেষ্ট ঐতিহ্যসঞ্চারী এবং বহুযাত্রিক। ঐতিহ্যসঞ্চারী এ জন্য যে বাংলা ভাষার আবহমান রূপ, রস এবং প্রিয়তায় অনন্য। অনন্য এ জন্য যে এই ভাষা আমাদের মাতৃভাষা। এর একটি আবহমান ঐতিহ্য আছে। আছে বিবর্তনের ইতিহাস। বিবর্তনের ইতিহাস বেয়ে ভাষাটি যখন একটি ভূখণ্ডের হতে যাচ্ছিল, তখনই এর ওপর আসে আঘাত। এই আঘাতের ফলে যে অভিঘাত সৃষ্টি হয়, তা বহুমাত্রিক। বহুমাত্রিক এ জন্য যে এই আন্দোলনের রেশ ধরে আত্মপরিচয়ের চেহারাটি স্পষ্ট হয় ওঠে। ক্রমশ তার রূপ এমন অবস্থা পরিগ্রহ করে যে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম হয়ে যায়।

ভাষার ওপর চরম আঘাতটি অকস্মাৎ আসেনি। একটু একটু করে যখন পাকিস্তানিরা আগ্রাসন চালাচ্ছিল, তখন থেকেই এর প্রতিবাদ হতে থাকে। ক্রমশ এই প্রতিবাদ সংগ্রামের রূপ পরিগ্রহ করে। এর চূড়ান্ত অঘটন ঘটে যায় ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি।

এই সংগ্রামে যেমন ছিলেন পণ্ডিত ব্যক্তিরা, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষক-ছাত্র, তেমনি ছিলেন প্রগতিশীল ধারার বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ মানুষ। আহমদ রফিক তেমনি একজন ব্যক্তিত্ব, যিনি ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি সেই আন্দোলনের স্মৃতিচারণা করেছেন আর কিছু জিজ্ঞাসা করেছেন ভাষা নিয়ে, যা ‘ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি ও কিছু জিজ্ঞাসা’ নামে বই আকারে বের হয়েছে চলতি বইমেলায়।

ইতিহাসের অনেক ধারা থাকে। অনেক উপাদান থেকে ইতিহাসবেত্তারা ইতিহাস রচনা করেন। সেসব উপাদানের তথ্য কখনো ভেতরের হয়ে থাকে, কখনো বাইরের। বাইরের ইতিহাস যখন বের হয়ে আসে, তখন তার ভেতরের ফাঁপা রূপটিও একদিন ধরা পড়ে। ইতিহাস কখনো কাউকে ক্ষমা করে না। ইতিহাসবেত্তারা যখন উপাদান থেকে ইতিহাস রচনা করেন, সেখানে অনেক ফাঁকফোকর থাকার সম্ভাবনা থাকে। ড. আকবর আলি খান এ বিষয়ে একটি মজার কথা বলেছেন। তা হলো—যা ঘটে যায়, তা ঈশ্বর পাল্টাতে পারেন না, কিন্তু মানুষ পারে। বোঝা যাচ্ছে, ইতিহাস বিকৃতির দিকে তিনি ইঙ্গিত করেছেন। ইতিহাসের উপাদান যখন বহিঃস্থ কোনো ব্যক্তি দ্বারা রচিত হয়, তখন তিনি সৎ না-ও থাকতে পারেন, উপাদানের যথেষ্ট অভাব থাকতে পারে, থাকতে পারে অনেক শূন্যতা, থাকতে পারে অজ্ঞতা। এমনটি হলে ইতিহাস হয়ে পড়ে বিকৃত।

কিন্তু ইতিহাসের অংশীজন যখন সেই ইতিহাস লেখেন, তখন তা হয়ে ওঠে খাঁটি। আহমদ রফিক ভাষা আন্দোলনের একজন সক্রিয় অংশীজন। তাই তাঁর লেখা ইতিহাস সত্য হবে বলে আশা করা যায়।

তবে গ্রন্থটি ওই সচরাচর ইতিহাসগ্রন্থ নয়। বরং ইতিহাসের খণ্ডকাহিনির পার্শ্বমুখ, যাতে ইতিহাসছোঁয়া অনেক কিছু আছে। আহমদ রফিক তাতে নিজে অংশগ্রহণ করেছেন। ফলে গ্রন্থটি হয়ে উঠেছে সত্যনিষ্ঠ। কারণ লেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় ধৃত ভাষা আন্দোলনের, বিশেষ করে একুশের কিছু কিছু ঘটনা এবং ঘটনাভিত্তিক লেখকের নিজস্ব চিন্তাভাবনা বা বিচার-বিশ্লেষণ এখানে স্থান পেয়েছে। গ্রন্থটিতে এমন কিছু ঘটনার উল্লেখ আছে, যা একেবারেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাপ্রসূত এবং যা এ যাবৎ প্রকাশিত একুশের ইতিহাসে সংকলিত বা উল্লিখিত হয়নি। এগুলো একুশের ইতিহাসের অপূর্ণতা পূরণ করতে পারে।

একুশের ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে কিছু ঘটনা, কিছু বক্তব্য ও জিজ্ঞাসা উপস্থাপনের তাগিদ থেকেই আলোচ্য গ্রন্থটির জন্ম।

মন্তব্য