kalerkantho

মেলার দ্বিতীয় সপ্তাহের নির্বাচিত ৫ বই
স্মৃতিলিপি ১৯৭২

জীবনের গভীরতম উপলব্ধির কথাও রয়েছে ডায়েরিতে

শাহিন আহমেদ

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



জীবনের গভীরতম উপলব্ধির কথাও রয়েছে ডায়েরিতে

স্মৃতিলিপি ১৯৭২ : শওকত ওসমান। প্রকাশক : প্রথমা প্রকাশন। প্রচ্ছদ : মাসুক হেলাল। মূল্য : ২০০ টাকা

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের কথা প্রচুর লেখা হয়েছে। কিন্তু দেশ হানাদারমুক্ত হওয়ার পর বাহাত্তরের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বিবরণ বিশেষ পাওয়া যায় না। একটি বড় যুদ্ধ ও রক্তপাতের পর এ দেশের সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠভাবে জানা যাবে শওকত ওসমানের এই ‘স্মৃতিলিপি’ থেকে। তাঁর ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের কথাও লিখেছেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়টাই তিনি ছিলেন ভারতে, কলকাতায়। সেখানে প্রবাসী বাঙালিদের জীবনযাপন কাছ থেকে দেখেছেন। তাঁদের অনেকের আচার-আচরণ সম্পর্কে কৌতূহলোদ্দীপক বিবরণ রয়েছে এ বইয়ে। এবারের একুশে গ্রন্থমেলায় ‘স্মৃতিলিপি ১৯৭২’ বইটি বের হয়েছে। বইটির মুখবন্ধ লিখেছেন সৈয়দ আবুল মকসুদ। আমরা জানি যে শওকত ওসমান আধুনিক বাংলা সাহিত্যের আধুনিক কথাশিল্পী। চল্লিশের দশকের শুরুতে লেখক হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু। বাংলা ছোটগল্পে তিনি অসামান্য। ষাটের দশকে শওকত ওসমানের উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি ক্রীতদাসের হাসি। এটি একটি ভিন্নধর্মী সৃষ্টিকর্ম। শওকত ওসমান ছিলেন সংবেদনশীল, তবে অতি আবেগপ্রবণ মানুষ। তিনি ছিলেন অবিচল বাঙালি জাতীয়তাবাদী এবং সমাজতন্ত্রের সমর্থক। পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলনের দুই শীর্ষ নেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনীতিকে তিনি সমর্থন দিয়েছেন। ধর্মান্ধতা, প্রতিক্রিয়াশীলতা ও সাম্প্রদায়িকতাকে ঘৃণা করতেন। ওসবের বিরুদ্ধে তিনি অব্যাহত লিখেছেন। ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে যখন বাংলাদেশে ইসলামী মৌলবাদের উত্থান ঘটে জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য ধর্মীয় সংগঠন এবং সরকারি প্রশ্রয়ে, তিনি তার বিরুদ্ধে কলম চালিয়েছেন, কখনো গদ্যে, কখনো পদ্যে। তিনি ধর্মীয় মৌলবাদকে এতটাই ঘৃণা করতেন যে তাঁর ছড়া ও লিমেরিকগুলো কখনো রুচির সীমা অতিক্রম করত। যেহেতু তাঁর উদ্দেশ্য ওই অপশক্তিকে তীব্রভাবে আঘাত করা, তাই অনেক সময় ভাষায় সংযমের অভাব দেখা যায়। এই দিনলিপিতেও তা লক্ষ করা যাবে। এতে আরো দেখা যায়, একটি বড় যুদ্ধবিগ্রহ ও রক্তপাতের পর সমাজের অবস্থা শওকত ওসমানের মতো একজন সংবেদনশীল লেখক ও বুদ্ধিজীবীর রোজনামচা থেকে জানা যায় বস্তুনিষ্ঠভাবে। এই বই পাঠ করতে করতে এগিয়ে গেলে দেখব শওকত ওসমানের দিনলিপির ‘২১ জানুয়ারি ১৯৭২’-এর বয়ান। বয়ান এমন যে ‘বর্তমান পরিস্থিতি কী রকম দাঁড়িয়েছে, তা একটু বিশ্লেষণ করা যাক। ভারতবর্ষ, সোভিয়েত ইউনিয়নের কৃপায় বাংলাদেশের এত সত্বর নিজ অস্তিত্বে প্রকাশ ঘটেছে। সুতরাং এই দেশ তাদের প্রতিমূর্তি গ্রহণ করবে না—এমন হতে পারে কি? হতে পারে না। গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্রের পথ পরিত্যাগ করে কোনো ফ্যাসিস্ট কায়দায় এক পার্টির শাসন চালানোর চেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য। অবিশ্যি রাজনৈতিক পরিস্থিতি আগের মতো ভেবে যদি শাসকরা নিজের মতো চলতে চান, খুব ভুল করবেন। ইতিহাস কি এঁদের কোনো শিক্ষা দেয়নি? অন্তত শেখ সাহেব যে মর্যাদার আসনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, সেখান থেকে অমন মূর্খতার নাগাল পাওয়া যাবে, তা কল্পনা করাও অন্যায়। প্রাথমিক চালে হয়তো কিছু ভুল হতে পারে। পার্টির প্রধানকে সদস্যদের আবদার রাখতে হয়। কিন্তু তিনি এমনই প্রধান যে প্রথম থেকেই এসব অনাচার দূর করে দিতে পারতেন। তা হয়নি, এ কথাও সত্যি। নিরাশ হব না। তবে মনের প্রসন্নতা ফিরে পাচ্ছি না কেন গত তিন দিন থেকে?’

শওকত ওসমান তাঁর লেখায়, চিন্তায়, মন ও মননে কখনো নৈরাশ্যবাদী ছিলেন না। বরং ছিলেন আশাবাদী। এ আশা সুন্দরের, এ আশা সত্যের ও ন্যায়ের। এ বইয়ে তাঁর ব্যক্তিগত সুঃখ-দুঃখের অনুভূতিই শুধু পাওয়া যাবে না, পাওয়া যাবে দেশ ও সমাজের নানা প্রসঙ্গও।

জীবনের গভীরতম উপলব্ধির কথাও রয়েছে শওকত ওসমানের ডায়েরিতে। দেশের ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রসঙ্গে মন্তব্য আছে। সামগ্রিকভাবে তাঁর এই দিনলিপির ঐতিহাসিক মূল্য অসামান্য। একজন কথাশিল্পীর রোজনামচার সাহিত্যিক মূল্যও সামান্য নয়।

মন্তব্য