kalerkantho


হাসান আজিজুল হক

অভিজ্ঞতার বাইরে কোনো কিছুই লিখি না

১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



অভিজ্ঞতার বাইরে কোনো কিছুই লিখি না

ছবি : কাকলী প্রধান

হাসান আজিজুল হক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গল্পকার। ১৯৩৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বর্ধমান জেলার যব গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্য’, ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’, ‘জীবন ঘষে আগুন’, ‘টান’, ‘আগুন পাখি’ ‘বৃত্তায়ন’, ‘নামহীন গ্রন্থহীন’ ইত্যাদি। সাহিত্যে অবদানের জন্য পাওয়া পুরস্কারের মধ্যে বাংলা একাডেমি ও আনন্দ পুরস্কার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। গত ১৩ জানুয়ারি তাঁর ৮১তম জন্মদিন উপলক্ষে এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন কবি শ্যামল চন্দ্র নাথ

শ্যামল চন্দ্র নাথ : আপনি একবার সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, লেখালেখির প্রায় দশ বছর পর কেউ একজন আপনার গল্প নিয়ে প্রশংসা করে আলোচনা লিখলেন।

হাসান আজিজুল হক : এটা ঠিক মনে পড়ছে না। যত দূর মনে পড়ে, আব্দুশ শাকুর আমার গল্পগ্রন্থ নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। যে বইটির নাম ছিল ‘সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্যে’ ১৯৬৪ সালে। আমি ১৯৬০ সালে প্রথম লিখতে শুরু করি। তখন যে গল্পটি আমি লিখি, তার নাম ছিল ‘শকুন’। গল্পটা ওই বইতে প্রথমেই ছিল। তার মানে ষাট, একষট্টি, বাষট্টি, তেষট্টি সালের লেখা গল্পগুলো নিয়ে বের হলো বই ‘সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্যে’। এর পরে বের হলো ১৯৬৭ সালে ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’। এরপর ১৯৭০ সালে বের হয়েছিল ‘জীবন ঘষে আগুন’। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রতি মাসে একটা একটা করে লিখে বের হলো আমার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বই ‘নামহীন গোত্রহীন’। এরপর ‘পাতালে হাসপাতালে’, ‘মা মেয়ের সংসার’ বের হয়েছে।

শ্যামল : আপনার লেখা ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ এবং ‘শকুন’—গল্প দুটি এত বিস্ময়কর এবং যা আমি পড়ে আশ্চর্য হয়েছি। বর্তমান কথাসাহিত্যে আপনাকে আমার শ্রেষ্ঠ গল্পকার মনে হয়। এই যে ভাষার নির্মিতি কিংবা লেখালেখির ক্ষেত্রে শুরুর দিককার আত্মকথন যদি শোনাতেন।

হাসান আজিজুল হক : আমি একই কথা বারবার বলি এই যে—প্রথম কথা হচ্ছে, আমি আমার অভিজ্ঞতার বাইরে কোনো কিছুই লিখি না। তাই কোনো কিছু উদ্ভাবন করলাম কিংবা সৃষ্টি করলাম বা বের করলাম, এ রকম কোনো কিছু করিনি। সব কিছুই জীবন থেকে তোলা। আমার সব কাজই জীবনের সঙ্গে যুক্ত। যা দেখি নাই, যা শুনি নাই, যার অনুভব হয় নাই—সেসব লিখি না, আন্দাজে কিছু লেখা—আমি সেটা করি না। গল্প বানিয়ে গল্প লিখব, আকাশকুসুম কল্পনা করে কিছু লিখব, আমি কখনোই করি না।

শ্যামল : ‘শকুন’ গল্প নিয়ে যদি আলাদা করে কিছু বলেন?

হাসান আজিজুল হক : ‘শকুন’ গল্প থেকেই আমি সেতারের তার বেঁধে নিয়েছি। ‘শকুন’ আমার গ্রামের ছোট্ট বাচ্চাদের নিয়ে লেখা গল্প। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাদের সঙ্গে ছিলাম। তার মানে ওটা অক্ষরে অক্ষরে একেবারে বাস্তবের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বানানো কিছু নেই। তার পরও লোকে বলে, অনেক কিছু পাওয়া যায় ওখান থেকে। হয়তো পাওয়া যায়। তাই আমি বলি, গল্প তো আর মানুষের ভেতরে নাই, গল্প আছে বাইরে, অনেক মানুষের মধ্যে, সমাজের মধ্যে, বাড়ির মধ্যে। যেখানে মানুষ সমাজবদ্ধ হয়ে বাস করে, একটা জীবনচক্র আছে, নানাজনের সঙ্গে যোগাযোগ আছে, ঘনিষ্ঠতা আছে। সেই সঙ্গে সঙ্গে আবার মানুষের খুব ব্যক্তিগত প্রবৃত্তি আছে, সেগুলো; আবার আমরা অনেকগুলোকে খারাপ বলি, আবার কখনো কখনো কোনো কোনো প্রবৃত্তিকে ভালো বলি। দানধ্যান করলে, সহানুভূতি দেখালে; এগুলো যদি করা যায়, দয়া-মায়া, ভালোবাসা সেগুলোকেও তো লোকে ভালোই বলে।

শ্যামল : আপনি ছোটগল্প লিখলেও একসময় কবিতা লিখেছিলেন...

হাসান আজিজুল হক : আসলে ওগুলো কোনো ধরার কিংবা আলোচনার বিষয় নয়। কারণ ক্লাস থ্রি, ফোরে পড়ার সময় দু-একটা কবিতা লেখা কিংবা ক্লাস এইট-নাইনে পড়ার সময় কিছু কিছু শক্ত কবিতা লেখা; এমনকি ১৯৫৮-৫৯ সালেও বেশ কিছু কবিতা লিখেছিলাম। সে খাতাটা কোথায় আছে জানি না। সেটাকে আমি ইচ্ছা করেই হারিয়ে ফেলেছি। বুঝতে পেরেছিলাম এটা আমার ক্ষেত্রে নয়।

শ্যামল : আপনি বর্ধমান জেলার যব গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। প্রকৃতির বর্ণনা ও ছেলেবেলার কথা লিখেছেন ‘বোশেখ মাসের কোনো কোনো দিন বেলা কাটতেই ঈশান কোণে একটুখানি কালো মেঘ সর সর করে এগোতে এগোতে আর দ্যাখ দ্যাখ করে বড় হতে হতে নিমেষে সারা আকাশ ভরে ফেলে।’

হাসান আজিজুল হক : এখন আমূল পরিবর্তন হয়েছে। এখন আর এ রকম সুন্দর তো হয় না। হলে একই রকম মনে হবে। এখন কী রকম? কালবৈশাখী কী রকম? সেই দৃশ্যগুলো খুব একটা দেখা যায় না। ওই সময়ে একটা মেলা হতো খুব বড়—বৈশাখী মেলা। মেলায় যাব, আকাশ মেঘলা হয়ে থাকত। বৃষ্টি হবে। ওই ধরনের আবহাওয়া এখন আর নেই। বদলে গেছে। এ নিয়ে আমার স্মৃতিকথা ‘স্মৃতিকহন’ নামে বের হয়েছে। যেখানে আমার জন্ম থেকে শুরু করে একেবারেই শৈশবকাল, পাঠশালা, স্কুলের অভিজ্ঞতা একেবারে কলেজে ঢোকার আগ পর্যন্ত সময়ের বর্ণনা আছে।

শ্যামল : ‘তৃষ্ণা’ গল্পে বাসেদ চরিত্রের করুণ মৃত্যুব্যঞ্জনা আমরা পাই। ওই গল্প সম্পর্কে আপনার বিশ্লেষণ...

হাসান আজিজুল হক : আমি গল্পটি লিখেছি লেখক হিসেবে। এত দিন পরে ওই গল্পটা লেখার সময়কার কথা মনে নেই। তখন আমার কাছে যেভাবে লেখাটা এসেছিল এবং শেষটা যেভাবে শেষ করতে চেয়েছিলাম; ওটা ঠিক ব্যাখ্যা করা যায় না। লিখতে লিখতে কখন যে মনে হয় আর লেখার প্রয়োজন নেই, শেষ। যে পর্যন্ত পৌঁছে লেখাটা শেষ হলো, তখন দাঁড়ি টানার পরে ভাবলাম আমার কাজ শেষ। এর পরে আমাকে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে লেখার বাইরে ঢুকে আমি লেখক নই, এটা অন্য একজনের লেখা আমি বিচার করছি এই অবস্থানে যেতে হয়। আমি লেখার সেই অবস্থানে যাওয়ার চেয়ে যারা আমার লেখার পাঠক তাদের ওপরই ছেড়ে দিলাম। আমি করেছি আমার কাজটুকু, সম্পূর্ণ, অসম্পূর্ণ, যৌক্তিক, অযৌক্তিক সে কথাটা আমার। তোমার কাছে বলা যায় আত্মপক্ষ সমর্পণের কোনো প্রয়োজন নেই। যাঁরা পড়বেন, তাঁদের মধ্যে আলোচিত হবে, মতবিরোধ হবে। তুমি যে মত দিতে চাইছ, আরেকজন আরেক মত দেবে।

শ্যামল : লেখালেখি শুরুর সময়ে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ও সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সম্পাদিত ‘কণ্ঠস্বর’ পত্রিকা নিয়ে যদি কিছু বলেন।

হাসান আজিজুল হক : ওই পত্রিকায় তখন আমি লিখেও ছিলাম। আমি সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীকে নিয়ে যেটা বলতে চাই তা হলো, উনি তো কথাসাহিত্যে আসেননি। কথাসাহিত্যে উনার নামটা আসবে না। চিন্তক হিসেবে আসবে। প্রাবন্ধিক হিসেবে আসবে। উনি গভীর একজন চিন্তাবিদ, গভীর একজন ভাবুক, সমালোচক মানুষ, তীক্ষ ধী, অত্যন্ত বুদ্ধিমান মানুষ।

শ্যামল : তখন অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের সঙ্গে আপনার একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

হাসান আজিজুল হক : ঢাকায় আমার প্রথম যাওয়া যখন হয়েছিল, তখন আমার কোনো বন্ধু ছিল না। বিএ পরীক্ষা দেব আমার বড় ভাইয়ের বাড়িতে থেকে। মাস তিনেক ছিলাম। একবার আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। উনি তখন  সলিমুল্লাহ মুসলিম হোস্টেলে থাকতেন। কারণ ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গানটির রচয়িতাকে দেখতে। একবার হেঁটে সিকান্দার আবু জাফরের বাড়ি গিয়েছিলাম। সমকাল পত্রিকাটা বের হলো তো।  ঢাকায় আমার যাওয়াটা একবারে কম। তারপরে আমি একটা লেখা পাঠিয়েছিলাম ‘কণ্ঠস্বরে’, সেখান থেকে একটা চিঠি পেলাম আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের। তখন আমি ঢাকায় যাই, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের বাড়িতে। খুব ঘনিষ্ঠতা হয়ে গেল আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সঙ্গে। সেই ঘনিষ্ঠতা এখনো আছে। আমি যখন প্রথম আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের বাসায় যাচ্ছিলাম, তখন দেখা হয়ে যায় কবি রফিক আজাদের সঙ্গে। রফিক আজাদ ও আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ আমার ঢাকা জীবনের প্রথম বন্ধু বলা যায়। এর পরে আমাকে হাসান হাফিজুর রহমানের অফিসে নিয়ে গেলেন দৈনিক বাংলায়। কবি শামসুর রাহমান ওখানে কাজ করতেন। আমি তখন দৈনিক বাংলায় দু-চারটি লেখা লিখেছি। তখন ফজল শাহাবুদ্দীন, আহসান হাবীব এটা দেখেছেন। ওই সময়েই কবি শহীদ কাদরীর সঙ্গেও দেখা হয়েছিল। তখন একটা তর্ক ছিল, কে নাগরিক কবি, শহীদ কাদরী—না শামসুর রাহমান। হায়াৎ মামুদ, এখলাস উদ্দিন আহমদ, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত—এই তিনজনের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। হায়াৎ এখনোও আমার প্রিয় বন্ধুদের একজন।

শ্যামল : সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শওকত ওসমান, শওকত আলী—এঁদের লেখার যে মেজাজ তা নিয়ে কিছু বলবেন?

হাসান আজিজুল হক : সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ অসাধারণ লেখক। প্রথম উপন্যাস ‘লাল সালু’ থেকেই তিনি অসাধারণ লিখছেন। তাঁর আগে আবু ইসহাক লিখেছিলেন ‘সূর্যদীঘল বাড়ি’। প্রথম উপন্যাস হিসেবে আবু ইসহাকের বইটি ভালোই ছিল। তারপরে আর তেমন কিছু লেখেননি। সরদার জয়নুদ্দিন ছিলেন, তাঁরও ‘নয়ন ঢুলি’ ছাড়া দু-একটা উপন্যাস পড়ে আর ভালো লাগেনি। তারপরে তো গাফ্ফার চৌধুরী, সৈয়দ শামসুল হকদেরই যুগ। ১৯৫৮ সালের দিকে শওকত আলী। ওই সময়ে হুমায়ূন চৌধুরী বলে একজন ছিলেন, তিনি ভালো লিখতেন। সব তো চলে গেছে। খুবই শূন্য। জ্যোতিকে যে ধরব তারও উপায় নেই, সে আমেরিকা চলে গেছে। হায়াৎকে ধরব, হায়াৎও গেণ্ডারিয়া থাকে, সে-ও আসতে পারে না আজকাল। মোটামুটি একটা বিচ্ছিন্নতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। বিচ্ছিন্নতা বার্ধক্যের একটা ফল বুঝলে শ্যামল। পৃথক হতেই হবে। যত বৃদ্ধ হবে, তোমার বৃত্তটা ততই ছোট হতে থাকবে। কলকাতার কত লোকের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। এখন কলকাতা যাই না।

শ্যামল : শীর্ষেন্দু কিংবা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে নিয়ে জানতে চাই।

হাসান আজিজুল হক : সুনীলের লেখা পড়তে ভালো লাগত। আলাপও হয়েছিল। ওই একই কথা—শীর্ষেন্দু সুনীলের মতো আমার অত পছন্দের লেখক নন। তবে যেহেতু তিনি এখনো লিখে চলেছেন, তাই বাংলা সাহিত্যের অত্যন্ত একজন ব্যতিক্রমী লেখক মনে হয়।

শ্যামল : যখন লিখতে শুরু করেন, তখনকার সময়ে বুদ্ধদেব বসু কিংবা কমলকুমার মজুমদার নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

হাসান আজিজুল হক : বুদ্ধদেব বসুকে পড়তে শুরু করেছি অনেক পরে, আগে নয়। তিনি ডিটেক্টিভ গল্প লিখেছিলেন। যেমন তিনি লিখেছেন ‘ছায়া কালো কালো’, দেব সাহিত্য কুটির থেকে বের হয়েছে। আমি বলি আরে বাবা! কঙ্কাবতী—এসব নিয়ে কবিতা লিখেছেন। বুদ্ধদেব বসু আমার কাছে মাঝারি আকারের কবি। কমলকুমার মজুমদার অসাধারণ লেখক। অত অসাধারণত্ব ভালো না। অত অসাধারণত্ব মানুষকে মানুষের কাছে যেতে দেয় না।

শ্যামল : স্যার, সাহিত্যের কাজ হচ্ছে মানুষের কাছে পৌঁছানো...

হাসান আজিজুল হক : নিশ্চয়ই। মানুষের কাছেই লেখা। আমাদের সবাই তাই করেছেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তা-ই করেছেন। মানুষের দুঃখ-কষ্ট, যন্ত্রণা একেবারে নিংড়ে বের করা। ওদের তুলনা হয়, বিভূতিভূষণের তুলনা হয়! বাংলার দারিদ্র্যকে কী রকম করে মধুর করে ভাবে।

শ্যামল : স্যার তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়...

হাসান আজিজুল হক : তারাশঙ্কর বিরাট লেখক। তাঁকে নিয়ে আমার একটা পক্ষপাতিত্ব আছে। তিনি আর আমি একই জায়গার লোক। কারণ উনিও রাঢ়ের লেখক, আমিও রাঢ়ের লেখক। উনি একটু পশ্চিম-উত্তরের দিকে, আমি একটু পূর্ব-দক্ষিণের দিকে। তাঁর প্রথম লেখা খুব ভালো ‘কবি’। তারপরের লেখা ‘নাগিনী কন্যা কাহিনী’। উনার লেখা তো ছড়ানো, বন্ধনটা নিবিড় নয়। গল্পকথকের মতো। মনে হবে কথা বলছেন উনি। এরপরে সতীনাথ ভাদুড়ী, পরবর্তীকালে জ্যোতিরিন্দ নন্দীর নাম করতে হবে অবশ্যই।

শ্যামল : আপনি তো দর্শনের ছাত্র ছিলেন। সাহিত্য নির্মাণের ক্ষেত্রে দর্শন শাস্ত্রের ভূমিকা কতটা জরুরি বলে আপনি মনে করেন?

হাসান আজিজুল হক : দর্শনে তত্ত্ব জ্ঞান, চিন্তার গভীরতা, উপলব্ধির উৎকর্ষ, সত্যপ্রিয়তা—তাহলে দর্শন পড়লে লাভ হবে। দর্শন পড়লেই তো আর সবাই সাহিত্যিক হয়ে যায় না। অনেকেই আছেন দর্শন পড়েন নাই; কিন্তু অসাধারণ সাহিত্যিক। এটা তো এমন কোনো যুক্তি বহন করে না। সাহিত্যিক হওয়ার জন্য তো আর দর্শনে এম এ করার প্রয়োজন পড়ে না। রবীন্দ্রনাথও করেন নাই, নজরুলও করেন নাই। কে কিভাবে নিতে পেরেছেন সেটাই বড় কথা।

শ্যামল : আপনার একাশি বছর পূর্ণ হতে চলেছে। এই সময়ে এসে আপনার জীবন নিয়ে আত্মোপলব্ধি কী?

হাসান আজিজুল হক : লাট্টু খেলেছো, লাট্টুর খেলার সময় একটা গোল গণ্ডি করে দিতে হবে। লাট্টু ঘুরাতে ঘুরাতে যদি ওই গণ্ডি থেকে তুমি বেরিয়ে আসো, তাহলে তুমি ফেল। যতক্ষণ খুশি ঘুরুক, ঘুরে ঘুরে যেন গড়িয়ে গণ্ডির বাইরে চলে না যায়। আমার একটা লাট্টু ছিল বের হতো না। এ রকম লক্ষ্মীর একটা লাট্টু ছিল আমার। আমার কাছে জীবনটা ঠিক ওই লাট্টুর মতোই।



মন্তব্য