kalerkantho


বই আলোচনা

ভালো থাকার বিবিধ বয়ান

২৫ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



ভালো থাকার বিবিধ বয়ান

যেভাবে ভালো থাকি : মাসুম মাহমুদ প্রকাশন : বেহুলাবাংলা। প্রচ্ছদ : দেবনাথ বিশ্বাস। মূল্য : ২০০ টাকা

মানবিক সংকট, সংকল্প ও সম্ভাবনার এক কোলাজ চিত্র ‘যেভাবে ভালো থাকি’ বইটি। সর্বপ্রথমে বলার বিষয়, মাসুম মাহমুদের সটান নির্মেদ ভাষার ছিমছাম উপস্থাপন। অহেতুক ভণিতা নেই, আছে গল্প বলার ব্যাকুল আগ্রহ।

অনুগল্পের নিজস্ব একটা বৈশিষ্ট্য রয়েছে আকার ও প্রয়োগবিন্যাসে। অতি অল্প পরিসরে ভাবনাকে বিস্তার ঘটানোই যার বিশেষত্ব, যা পাঠককে সচকিত করে তোলে; করে ভাবনার ভেতরে আহ্বান। লেখকের পর্যবেক্ষণ অনেকটা ভ্রাম্যমাণ পরিব্রাজকের মতো। বিভিন্ন পথে মানব মনের অলিগলিতে উঁকি দিয়ে দেখা। কখনো সমাজের স্তরে স্তরে লুকানো নানা কার্যকারণ ও পর্যায়বিধির রহস্য উদ্ঘাটন। গ্রহণ করেছেন বস্তুর সঙ্গে বস্তুর কাল্পনিক কথোপকথনের মধ্য দিয়ে বাস্তবের বিবিধ আঙ্গিক প্রকাশের পাঠক্রম।

সভ্য কিংবা বুনো মানুষের গল্প বর্তমান সময়েরই গলিত অবক্ষয়ের দগদগে চিহ্ন। সদ্য অবসর নেওয়া স্কুলশিক্ষক তাহের স্যারের লাঞ্ছিত হওয়ার মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে যার কালস্রোত। এ গল্প মূলত কৌশলে সোচ্চার এক প্রশ্নের মুখে বিবেককে দাঁড় করিয়ে দেওয়া, যার শীতল স্পর্শ অনুভূতিতে আটকে থাকে। মরহুম পিতার স্মৃতি স্মরণে অফিসের বড় কর্তা রহমান সাহেবের হঠাৎ পরিবর্তন ঘটে। কারণ? নিজেকে নিজে ফেরানোর আদর্শবাদ, বোধের ব্যাপ্তি। সযত্নে মনকে বাঁচিয়ে রাখা জীবনকে উদ্যাপনের যে প্রয়াস, তারই সারাত্সার চোখে পড়ে নানা রূপকে।

জনৈক ভদ্রলোকের মন গল্পে দেখা যায় আত্মসুখে উন্মত্ত, ভদ্রলোকের শেষদানে করুণ পরিণতি। বহু কথা বলার পর জানা যায় ভদ্রলোকের সহজ স্বীকারোক্তি।

—জানেন তো, আমার কখনোই মন খারাপ হয় না। বলেই হাউমাউ করে কেঁদে ফেললেন তিনি। এই যে রূঢ় বাস্তবতার কাছে নিয়ত খসে পড়া মিথ্যার মুখোশ, এসবই ছড়িয়ে আছে মাসুম মাহমুদের মূল বক্তব্যে। নানা অছিলায় হাসি হাসি মুখ করে সত্যকে আড়াল করার যে প্রবঞ্চনা, তা যেন উড়ে যায় এক ফুত্কারে; বেরিয়ে পড়ে নগ্ন নির্বিকার সত্য।

দাম্পত্য জীবনের চেনা লুকোচুরি, ভেতরের দূরত্ব—এসব নিয়েই গল্প জুয়াচুরি। কাঙ্ক্ষিত সুখের নাগাল থেকে বঞ্চিত ফিরোজার স্বামীর মানসিক সংকটই মূল প্রতিপাদ্য এ গল্পে। জ্যোতিষীর ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যা প্রমাণ হলে ফিরোজার স্বামী জানতে পারেন তাঁর ক্ষয়ে যাওয়া দাম্পত্য জীবনের করুণ পরিণতি। রাগে-দুঃখে-ক্ষোভে নিজেকে তাঁর পাথর মনে হয়। যদিও তাঁর অজানা থেকেই যায় ফিরোজার বহুদিন যাবৎ পাথর জীবন।

মানুষের মনের বিচিত্র গতিবিধি নিয়ে এ রকমই আরেকটি গল্প পাহারাদার। মা ও মেয়ের দৈনিক জীবনের লুকোচুরি, যার মধ্য দিয়ে খুঁজে পাওয়া যায় বয়স ও চিন্তার বিভাজন। অসুস্থ যুবকের জানালার প্রয়োজনে পিতার হুকুমে চারটি জানালা তৈরি হলেও সমস্যার সমাধান মেলে না। মনস্তাত্ত্বিক বিকাশে যে অনুকূল প্রতিবেশ প্রয়োজন, যে জানালায় মন বেঁচে ওঠে, সে খোঁজেই জানালা গল্পের অবতারণা।

পাথরে আঘাত পেয়ে মন ভেঙে গেলে কী করেন? প্রশ্নের জবাবে উত্তর আসে—পাথরকে কাছে রেখে দিই, যত্ন করি। পাথর ঘষে ঘষে আবার জ্বলে ওঠে মন। বেঁচে থাকার মূলমন্ত্রই যেন লেখক ছড়াতে চেয়েছেন প্রাণে প্রাণে। বাঁধতে চেয়েছেন সম্ভাবনার সাঁকো। জীবন যে সুন্দর, বেঁচে থাকার প্রতিটি মুহূর্তই যে উপলব্ধির—এ রকমই শাশ্বত ইশতেহারেরই ঘোষণা ছেয়ে আছে নানা গল্পের ডালপালায়। আশা করি, সুদৃশ্য প্রচ্ছদে মোড়া এ বইটি পাঠকের অনুগল্প পাঠের আগ্রহকে বৃদ্ধি করবে।

►মানব



মন্তব্য