kalerkantho


মেঘের রেখা কালো

শ্যামল চন্দ্র নাথ

২৫ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



মেঘের রেখা কালো

অঙ্কন : মানব

আকাশে মেঘের ভীষণ উত্পাত শুরু হয়েছে। বৃষ্টি এখনো নামেনি।

এখন চলছে দীর্ঘ শীতকাল। চৌমাথা পেরিয়ে এসে রাস্তার বিপরীত দিকে এসে পড়ল নয়ন। বাইরে পশ্চিমাকাশে সূর্য ডুবে গিয়ে লাল আলোর রেখা মুছে গেছে। পথের শেষ প্রান্তে নয়নদের বাড়ি। বাড়ির পাশেই কাশবন, কাশবনের পাশেই শালবন, শালবন পেরিয়েই মাঠ। মাঠ পেরোলেই একটি ছোট টিনের ঘরে বাতি জ্বলছে। জানালা খোলা। দরজা বন্ধ। ওই বাড়িটি সুবর্ণার। নয়ন এবার ভালো করে চারদিকে চেয়ে দেখল। সে মনে হয় অন্যমনস্কভাবে ভুল পথেই এসে পড়েছে। মাঠের ডান দিকের পথে না গিয়ে সে বাঁ দিকের পথে চলে এসেছে। সুবর্ণার বাড়িতে যে তার যাওয়া নিষেধ। নয়ন তার পকেটে থাকা সিগারেটটা ধীরেসুস্থে দু-চারটা টান দেওয়ার আগেই গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির রেখা এলিয়ে পড়তে লাগল মাঠের শুকনো মাটিতে। কিন্তু নয়ন সামনের একমুঠো ফাঁকা জমি পেরিয়ে দৌড়ে শালবনে ঢুকে পড়ল। আর এগোলো না সুবর্ণাদের ঘরের দিকে। শীতটা আরো প্রকোপ হলো, গায়ের কাশ্মীরি শালটায়ও শীত মানছে না। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দতরঙ্গ তেড়ে আসছে। সুবর্ণা বিবাহিত মেয়ে। সুবর্ণার চেহারা যেন সোনার প্রতিমার মতো। বিয়ের পরেও লাবণ্য ধরে রেখেছে প্রকৃতি তার। এখনো মাঝে মাঝে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা হয় তাদের। বিগত এক যুগের প্রেম ছিল তাদের। শৈশবের সময় থেকে উঠে আসা প্রেম। তা কি ভোলা যায়! নয়ন সদ্য পড়ালেখা শেষ করে চাকরি খুঁজছে। সন্ধ্যার আকাশটাও আরো ঘনীভূত হচ্ছে। সিগারেটের আগুন নিভে গেল; কিন্তু এত বছর ধরে বয়ে চলা মনের আগুন নেভাবে কী করে?

কাশবনের মধ্যে দেখা গেল ছোটবেলার বন্ধু রাশেদকে।—কী নয়ন, এখানে কী করিস? বাড়ি যাবি না?

—যাচ্ছি তো। —কী, সুবর্ণা আসবে নাকি? না রে... বন্ধু। ও কী আর আসে...! নয়ন মৃদু হেসে বলল, আমি আর ওসবের মধ্যে নাই, রাশেদ। আর কথা না বলে খুব অন্ধকারের মধ্যে নয়ন তাদের ইট-কাঠ-পাথরের বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ালো। নয়নের এমন অবস্থা যে সে ধৈর্য ধরে সেই মুহূর্তটিকে বারবার দূরে সরিয়ে রাখতে চায়। যেন উত্তেজিত হয়েও লাভ নেই, বিস্ময় প্রকাশের মতো মনের অবস্থাও নেই। আর কিছুটা সময় অপেক্ষা করলে কী হতো? মনে মনে আওড়ে যাচ্ছে নয়ন। সে শুধু নিয়তিকে দোষ দেয়। বড় বড় কালো চোখে আবার রাগও উঠে যায় সুবর্ণার ওপর। মনে হলো, একটা অশুভ অন্ধকার পরিবেশটাকে থমথমে করে রেখেছে। মধ্যবিত্ত পরিবারে তার বসবাস। এ যেন ছবি তৈরি করার মতো, করতে করতেই হারিয়ে যাওয়া। এইমাত্র নয়ন লক্ষ করল, তার চোখ দুটো জলে ভিজে গেছে। সে ভাবে, আজ সেসবের কিছুই নেই। নয়ন ভাবে, আজ সুবর্ণা যেন মানুষের রূপে একটা অশুভ গ্রহ। কত রাত ঘুম হয় না নয়নের। হঠাৎ হঠাৎ ঘুম ভাঙে তার। ঘরের ভেতর ঢুকে দরজা বন্ধ করে কখনো বসে, কখনো অস্থির পায়ে পায়চারি করছে নয়ন। দীর্ঘ দশ বছর পালিয়ে বেড়িয়েও তারা বিবেকের কাছে বন্দি কয়েদি। সুবর্ণার অন্যত্র বিয়ে হয়ে গেলেও দেখার লোভ, দেখার আক্ষেপ, না-পাওয়ার হতাশা তাকে বড় বেশি কাঁদিয়ে বেড়ায়। এখনো এমন অবস্থা নয়নের যে বেঁচেও লাভ নেই, মরেও পার পাবে না নিজের কাছে। সুবর্ণার বিয়ে অন্যত্র যখন হয়ে যাচ্ছিল, তখন নয়ন বাধা দিল না। হয়তো ভেবেছিল তার চেয়ে ভালো পাত্রী সে পাবে; কিন্তু তার চেয়ে বড় ভালোবাসা যে পাবে না, সেটা সে কল্পনাও করতে পারেনি। সুবর্ণা যখন নয়নকে ভালোবেসেছিল, তখন সে আর কারো দিকে তাকায়নি। কাশবনে যেমন ফুলগুলো শুধু সূর্যের ওঠার দিকে চেয়ে থাকে, ঠিক তেমনি। সব মন, প্রাণ, দেহ, যৌবন, আলো—সবই ছিল নয়নের দিকে।

বৃষ্টির গুঁড়িগুঁড়ি রেখা থেমেছে ওই শালবনের মাথায়। আজ হয়তো সুবর্ণার সঙ্গে দেখা হবে নয়নের। নয়ন হুট করে ঘরের দরজা না লাগিয়ে বের হয়ে অন্ধকারের মধ্যে শালবনের গাছপালা পেছনে ফেলে সুবর্ণাদের বাড়ির দিকে এগিয়ে যায়। সুবর্ণার স্বামী বিদেশে থাকে। ওই যে বিয়ে করে তাকে রেখে গেছে, বিগত চার বছরেও আসেনি। আজ যেন সুবর্ণা সহস্র গুণ লোভনীয় হয়ে তাকে আকর্ষণ করছে। মনে হলো, সে আজ, এখনই সুবর্ণাকে নিয়ে চলে যায় নিজের ঘরে। কোনো পাপ হবে না তাতে হয়তো। সুবর্ণাদের উঠোনে গিয়ে নয়ন তার হাতের মোবাইল থেকে একটা মিসড কল দিতেই বের হয়ে এলো সুবর্ণা। শাখা, সিঁদুর পরা। মনে হচ্ছিল, অন্ধকারে সাদা মূর্তি উঠানে এসে দাঁড়িয়েছে। সুবর্ণা মৃদু হেসে বলল, তুমি! হ্যাঁ। শরীরে নরম হাত দিতেই চমকে উঠল নয়ন। ওদিকে গ্রামের সবাই ব্যস্ত দুর্গাপূজা নিয়ে। সুবর্ণা খানিকক্ষণ মুগ্ধ হয়ে চেয়ে রইল, এরপর বলল—চলো মাঠের দিকে যাই। পাড়া আনন্দে মাতোয়ারা। ঢাকঢোল, শঙ্খধ্বনি হচ্ছে। আকাশের চোখ বেয়ে মাত্র দৃষ্টি মেলেছে চাঁদ। শালবনের মাথাটা ঝলমলে হয়ে উঠছে আর পাশেই পশুর নদীর জলে বাতাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নাচছে আলো। কিন্তু আলো শুধু নাচছে না, নাচছে গাছের পাতাগুলো, নাচছে মনের মধ্যে বয়ে চলা নদী। পশুর নদীর মৃদু জলস্রোতটা চাঁদের আলোয় চিকচিক করছে। যেমন অন্ধকারে জোনাকি পোকা চিকচিক করে ওঠে। হয়তো দুজনেই জানত যে, অন্যের সুখের জন্য নিজেকে বলি দিলেই আসল সুখ পাওয়া যাবে। কিন্তু কাপুরুষের মতো বলিদান কখনো নিজেকে নিজেই ক্ষমা করতে পারে না। তা শুধু চোখ দিয়ে কেঁদে রক্ত বের করার মতো নয়; কিংবা শুধু মানসিক অনুভূতিও নয় যা, তা শারীরিক আকর্ষণ-কামনার জলে ভেসে যাওয়া যেন এক মাঝিবিহীন নৌকা। ওই রাতেই গ্রামের শালবনের পাতারা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে তাদের পাহারা দেওয়ার সময়, দুজনে আর নিজেদের সামলাতে পারল না। পাগলের মতো একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। আলিঙ্গনের সঙ্গে সঙ্গে অনুভূতি আর শত কষ্টের স্রোতটা বাতাসের সঙ্গে সঙ্গে তরঙ্গায়িত হতে লাগল। মন এমনই বলছে যে যন্ত্রণায় ছটফট করা কোনো হরিণ শেষতক বাঘের কাছে গিয়েই নিঃশেষ হলো।

সুবর্ণা, শিত্কার করে যাচ্ছে কেবল। আর ওরা দুজন অনেক দিন পর তাদের আত্মার কথা শুনতে পায়। দুজনের মধ্যে এমন গভীর টানের জন্যই কেউ কাউকে ছেড়ে থাকতে পারে না। খানিক পর সুবর্ণা বলল, আমি কখনো তোমার জীবনকে নিজের জীবনের থেকে বেশি দাম দিইনি। তা-ই যদি হতো, তুমি যখন আমাকে বিয়ে করতে চাইলে না, এর পর থেকে আমি চাইলে তোমার সাথে যোগাযোগ না করলেই পারতাম। কিন্তু কী জানো, আমি কি তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছি; আমার পেটে যে অনাগত সন্তান, সে জন্ম নিলে তার অংশীদারও তুমি। ওই সন্তানের জনক তুমিই, এ সমাজ না জানুক, আমাদের পরিবার না জানুক, আমরা জানি। কিন্তু এ সন্তান তোমাকে বাবা বলে ডাকবে না, এটাও জেনে রেখো। এসব তুমি কী বলছ—নয়ন বিস্মিত হয়ে জানতে চায়। যা সত্যি, যা চিরন্তন, তা-ই বলছি। সুবর্ণা উত্তর দেয়। আর সঙ্গে সঙ্গে সুবর্ণার সুন্দর চোখ উদাস হয়ে এলো। তুমি সব কিছু যেমন সহজ-সরল ভাবো, তেমন সরল নয় কোনো কিছুই নয়ন! চরম উত্কণ্ঠার স্বরে বলে ওঠে সুবর্ণা। আমিও হয়তো সরল নই। কিন্তু আমি তো শুধু তোমারই হতে চেয়েছিলাম, অন্য কারো নয়।

কী যে কষ্টে থাকি তা তুমি বুঝবে না নয়ন, কখনো বোঝার চেষ্টাটুকুও করোনি। আমার বারবার মনে হয়, এ জীবন নিয়ে আফসোস করার কিছু নেই। আমরা জন্মের সময় কিছু নিয়ে আসিনি, যাওয়ার সময়ও কিছুই নিয়ে যাব না সঙ্গে করে। তবে এ জীবনটা একটি মৃত্যুর প্রস্তুতি ছাড়া কিছুই নয় সুবর্ণা; নয়ন অনর্গল বলে যাচ্ছিল। আমাকে ছেড়ে যেয়ো না। আমি পাগলের মতো তোমাকে ভালোবাসি। এই বলতে বলতে নয়নের চোখ দুটি বেয়ে জল গড়াচ্ছে, সে চোখের জল মুছতে মুছতে বলল, ও কিছু না, আর নাই। চাঁদের আলো, তরঙ্গায়িত বাতাস, শালবনের ছায়া তাদের সঙ্গে সঙ্গে মুহূর্তে যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। যদিও নয়নের কান্না দেখে হঠাৎ গম্ভীর ক্লান্ত মুখখানি খানিক উজ্জ্বল হয়ে উঠল সুবর্ণার। মাথায় টকটকে রাঙা অস্তগামী সূর্যের মতো যে সিঁদুর সুবর্ণার কপালের ওপর লেগে থাকে, তা অকস্মাৎ নয়নকে জড়িয়ে ধরায় খানিক মুছে গেছে। নয়নের বুকের মধ্যে মাথা রেখে একটা গভীর দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল সুবর্ণা। ‘তুমি চাইলেই আমাকে বিয়ে করতে পারতে নয়ন।’ তুমি শুধু আমাকে ভুল বুঝছ, আমি চাইলেই সব পারতাম না। আমি একা বাঁচতে পারি না। দেখো সুবর্ণা, তুমি যদি ওই বখাটে ছেলেটির সঙ্গে না মিশতে, ওই অমানুষের সঙ্গে না মিশতে তাহলে আমি তোমাকে তখনই মেনে নিতাম। যে কিনা তোমার জীবনটা ছারখার করে দিচ্ছে। বিদেশ থেকে আসার নামগন্ধও তার নেই। আমি তো সমাজের বাইরে না। কিন্তু তুমি এত সুন্দর বলে, দুজন কত সুখে থাকব বলে কতবার স্বপ্ন দেখেছি, কত অকপটে তোমাকে সব বলতে পারি। জানো তো একাকিত্ব আমার কাছে গর্বের বিষয়। নয়ন এই কথা বলে থেমে গেল। সুবর্ণা চুপ করে না থেকে বলল—দেখো নয়ন, আমি কিছুই চাই না। আমার জীবন এতটাই হতাশার, এতই নিঃস্ব যে তোমার সঙ্গে থেকেও বাঁচার ইচ্ছে করে না। নয়ন বলে উঠল, আমার কাছে কী চাও তুমি! কী করলে আর মরতে চাইবে না।’ এবার সুবর্ণা নয়নের হাত ও মুখ চেপে ধরে বলল, চুপ—একেবারে চুপ! সুবর্ণাকে হারিয়ে নয়ন বুঝতে পারে, জীবন এত ছোট কেন? ছোট এ জীবনে ভালোবাসা কেন জিততে পারে না? ভাবতে ভাবতে মাথার ওপরের আকাশজুড়ে ঘন ঘন কালো মেঘের রেখা দেখা দিয়েছে। হু হু করে বাতাস বইছে। সঙ্গে তারা দুজন। কিন্তু বারেবারে মনে হয় কে কার? পশুর নদী সোনার মতো বাঁক নিয়ে সবুজ মাঠের মধ্যে ছলছলিয়ে আছড়ে পড়ছে। ওদিকে সুবর্ণা ভুরুতে প্রশ্ন জাগিয়ে বলল, আজ যাবে না? রাত তো অনেক হলো!

যা হওয়ার হবে, নয়ন বলল। সুবর্ণা বলল, তাই! যা হওয়ার হবে! ‘তুমি কি বলতে পারো, কোনো মানুষ কি ভবিষ্যৎ দেখতে পারে? না পারলেও ভবিষ্যৎ দেখে সুখী হতে পারে? নয়ন বলল। সুবর্ণা কোনো উত্তর দিল না। অতঃপর বিন্দু পরিমাণ সময় অপচয় না করে তারা একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরে অনুভূতির নিঃশ্বাস ফেলছে। খানিক দূর থেকে একটি আলোময় নৌকা তাদের দিকে ভেসে আসছে।



মন্তব্য