kalerkantho


বই আলোচনা

ইমদাদুল হক মিলনের ‘পঞ্চাশটি গল্প’

১৮ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



ইমদাদুল হক মিলনের ‘পঞ্চাশটি গল্প’

পঞ্চাশটি গল্প : ইমদাদুল হক মিলন। প্রকাশক : আনন্দ পাবলিশার্স। প্রচ্ছদ : দেবাশিস সাহা। প্রকাশ সাল : এপ্রিল ২০১৮। দাম : ৫০০ টাকা (ভারতীয়)

উপন্যাস, নাটক, ছোটগল্প, শিশুসাহিত্য—বাংলা সাহিত্যের সব শাখায় ইমদাদুল হক মিলনের রাজসিক বিচরণ। ছোটগল্প রচনায় বরাবরই তিনি মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। ওপার বাংলা থেকে প্রকাশিত হয়েছে বরেণ্য এই কথাকারের গল্প সংকলন ‘পঞ্চাশটি গল্প’। বইটি প্রকাশ করেছে আনন্দ পাবলিশার্স। কালোত্তীর্ণ কথাকারদের এ ধরনের সংকলন প্রকাশ করে প্রকাশনা সংস্থাটি। তাই এটি বেশ মর্যাদাপূর্ণ।

নন্দিত কথাশিল্পী ইমদাদুল হক মিলনের গল্পগুলোতে দারুণভাবে ফুটে উঠেছে প্রান্তিক মানুষ, গ্রামীণ যাপিত জীবন, লোকাচার, সংস্কৃতি, প্রকৃতি, মানুষের দুঃখ-কষ্ট-দুর্দশা। তাঁর গল্পগুলোর অলিগলিতে মূর্ত হয়ে উঠেছে আনন্দ-বেদনা, আশা-নিরাশা, হতাশা-যন্ত্রণা, জন্ম-মৃত্যু, স্বপ্ন-কল্পনার আখ্যান।

তাঁর গল্পের চরিত্রগুলোকে আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে অতি তুচ্ছ। কিন্তু সেইসব চরিত্রের আড়ালে লুকিয়ে থাকে অনেক বড় সত্য, কঠিন বাস্তবতা—এটাই লেখকের বড় সার্থকতা। রূপক গল্প বয়ানে লেখক দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহারেও তিনি সিদ্ধহস্ত। শব্দচয়ন ও সংলাপ রচনা করেছেন অত্যন্ত দরদ ও যত্নের সঙ্গে, যা পাঠককে দুর্নিবার আকর্ষণে টেনে নিয়ে যাবে গল্পের শেষ পর্যন্ত।

সংকলনটির প্রথম গল্প ‘জোয়ারের দিন’। গল্পটির প্রধান চরিত্র ইরফান নামক এক যুবক। জোয়ারের সময়, বৃষ্টির দিনে তাকে পেয়ে বসে মাছ ধরার নেশা। ছোট মাছে খুব ঝোঁক নেই; কিন্তু বোয়াল শিকারে বিলে তার যাওয়া আটকাতে পারে না কেউ। ভূতের ভয়, এমনকি স্ত্রীর আহ্বানকেও উপেক্ষা করে সে। গল্পটিতে মাছ স্বপ্ন ও প্রত্যাশার প্রতীক, যার জন্য মানুষ তুচ্ছজ্ঞান করতে পারে সব কিছু। মাছের খলখল শব্দের মতো স্বপ্ন চিরকালই ধরাছোঁয়ার বাইরে; কিন্তু সেই অধরা স্বপ্নের পেছনে আমাদের নিরন্তর ছুটে চলা। এ ছুটে চলাই জীবন।

‘কিরমান ডাকাতের প্রথম ও দ্বিতীয় জীবন’ গল্পের কিরমান যৌবনে ছিল দুর্দান্ত সাহসী, শক্তিমান পুরুষ, চেহারা-সুরত ছিল ‘রাজা-বাদশার লাহান’। অনিবার্য নিয়মে সময়ের সঙ্গে সবই হারিয়ে ফেলে। অতঃপর তার পঙ্গু জীবনযাপন ও শাগরেদদের দয়ার দানে বেঁচে থাকার অমোঘ নিয়তি আর বুকচেরা দীর্ঘশ্বাসের মধ্য দিয়ে গল্পটি শেষ হলেও পাঠকমনে এর রেশ রয়ে যায় বহুক্ষণ। ‘রাজা বদমাস’ গল্পের রাজারও পরিণতি প্রায় একই।

‘রাজার চিঠি’ গল্পে আমরা একজন সত্যিকারের রাজার সঙ্গে পরিচিত হই। প্রতীকধর্মী গল্পটিতে আখের গোছাতে ব্যস্ত মন্ত্রী-যন্ত্রী ও চাটুকার দ্বারা পরিবেষ্টিত রাজামশাই। দেশের দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের হাহাকার, করুণ আকুতি রাজার কান পর্যন্ত পৌঁছায় না। একদিন রাজপ্রাসাদ থেকে বেরিয়ে রাজা তাঁর প্রিয় স্বদেশভূমিকে বিপন্ন, রিক্ত এবং রাজ্যের মানুষকে দুর্ভিক্ষপীড়িত অবস্থায় দেখতে পান। নিজ কানে শোনেন প্রজাকুলের দুঃখ-দুর্দশার কথা। ‘রাজার চিঠি’ আসবে বলে তিনি কথা দেন। কিন্তু চিঠি আর আসে না! কারণ সেই রাতেই তিনি নিহত হন ষড়যন্ত্রকারীদের দ্বারা। গণমানুষের নেতাকে হত্যার এমনই আরেক গল্প ‘নেতা যে রাতে নিহত হলেন’। গাঁও-গেরামের চাষি রতন মাঝি অনেক দূর থেকে নেতাকে দেখার জন্য সঙ্গে নিয়ে আসে চিঁড়ার পোঁটলা। নেতাকে প্রচণ্ড ভালোবাসলেও পুলিশি প্রহরার ফাঁক গলে তাঁর কাছে পৌঁছতে পারে না সে; বরং পুলিশি জেরায় কেটে যায় সারা রাত। ভোরে জানা যায়, নেতা নিহত হয়েছেন তাঁরই ঘনিষ্ঠ লোকজনের দ্বারা। গল্প দুটির রাজা বা নেতা যে একই ব্যক্তি, পাঠকের বুঝতে অসুবিধা হয় না মোটেও।

গাঁও-গেরামের সাধারণ মানুষের অন্ধবিশ্বাস আর কুসংস্কারকে পুঁজি করে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার উপাখ্যান ‘মমিন সাধুর তুকতাক’। নিজেকে অলৌকিক ক্ষমতাধর, ব্যতিক্রম ও রহস্যময় মানুষ হিসেবে তুলে ধরার জন্য নানা ফন্দি-ফিকির করে মমিন সাধু। গায়ে চাপায় গেরুয়া পোশাক, গলায় এক শ এক পদের জীবের হাড় দিয়ে তৈরি কথিত মালা। একসময় সব গুমর ফাঁস হয়ে যায়, মুখ ফিরিয়ে নেয় গ্রামের মানুষ। আয়ের সব পথ বন্ধ হয়ে কিরমান ডাকাতের মতো তারও পরিণতি হয় করুণ। গল্পটিতে ঠকবাজি, কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাসকে চমত্কারভাবে তুলে এনেছেন লেখক।

‘নারীমুখ’ গল্পে লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন কোলের শিশুকে নিয়ে শহরে আসা এক নারীর করুণ আকুতি। গল্পের একপর্যায়ে ক্ষুধার কষ্ট নিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে শিশুটি। তখন অনেকেই শিশুটির দিকে ছুড়তে থাকে খুচরা পয়সা। ময়নার চিত্কারও ভারী হয়, ‘মইরা যাওনের পর অহন পয়সা দেও কেন? বাঁইচা থাকতে দিতে পারো না?’

‘গাহে অচিন পাখি’ গল্পটিতে সর্বস্ব হারানো পবন ঠাকুর ওরফে পবনা পাগলাকে দেখলে কুত্তা-বিড়াল তাড়ানোর মতোই দূর দূর করে লোকজন। তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী একটি নেড়ি কুকুর। কুকুর আর তার জীবনযাপনের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। পাঠকমনে গল্পটি সৃষ্টি করে গভীর আবেগ-মমতা-সহানুভূতি-সহমর্মিতা। এমনিভাবে সংকলনটির প্রতিটি গল্প পাঠককে দীর্ঘ সময় মোহাবিষ্ট ও আচ্ছন্ন করে রাখবে।

বইটির প্রচ্ছদ ও বাঁধাই চমত্কার; এতে ব্যবহার করা হয়েছে উন্নতমানের কাগজ। গল্পপ্রেমীদের জন্য সংগ্রহে রাখার মতো সংকলনটি গল্পকার উত্সর্গ করেছেন আরেক কিংবদন্তি কথাকার সমরেশ বসুকে। এ নিশ্চয়তা দিতে পারি—বইটির মন্ত্রমুগ্ধকর সব গল্প পাঠে পাঠকরা প্রবেশ করবেন অন্য ভুবনে।

আরাফাত শাহরিয়ার

 



মন্তব্য