kalerkantho


ভূল বেভূলের কায়া

বুলবুল চৌধুরী

১৮ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



ভূল বেভূলের কায়া

অঙ্কন : মানব

আফিয়ার স্বামী ইলিয়াস মোল্লা দীর্ঘদেহী মানুষ। তার মাথায় কোঁকড়ানো বাবরি চুল দেখে যে কেউ ভাবতেই পারে, সে বুঝি গায়েন!

তবে গায়েনের পিরহানের বদলে পরনে প্যান্ট-শার্ট এবং পায়ে জুতা থাকায় কারো বুঝতে বাকি থাকে না, সে তা নয়। তা ছাড়া গান শোনাতে গেলে যেমন লাগে বেহালা বা দোতারা কিংবা অন্য কোনো বাদ্যযন্ত্র, তেমন কিছুই নেই তার হাতে। ফরসা বরণের এই রূপবান যুবক অভিনয়ে নামলে নাটক ও সিনেমার অনেক নায়ককেই হার মানাতে পারত।

রূপসি বলতে যেমনটা বোঝায়, তার চেয়েও বেশি আফিয়াকে রূপ দিয়েছেন ওপরওয়ালা। সেই সঙ্গে ও পেয়েছে কোমর ছাপানো ঘন কালো কেশ। সেদিকে যেকোনো পুরুষের চোখ যেমন আটকে যেতে বাধ্য, তেমন মেয়েরাও তার দিকে ঈর্ষার চাহনি ঢালে! গত রাতে বাসর শয্যায় ঢুকে স্বামীও স্ত্রীর চুলে নিজের মুখ ডুবিয়ে দিয়ে বলেছিল, তোমাকে দেখামাত্র পিছু নিয়েছিলাম কেন, জানো?

লজ্জাবতীপাতা হাতের ছোঁয়ায় যেমন লজ্জা-বোজা হয়, স্বামীর আদরে তেমন মথিত হতে হতে স্ত্রী জবাব দিয়েছিল, আমি কেমনে জানমু!

শোনো, একে একে তিনটি মেয়ে আমার প্রেমে মজেছিল। কিন্তু আমি ভাবতাম, বিয়ে যে করব, বউয়ের থাকা চাই কালো দীঘল চুল। কারোরই তা না থাকায় আমি সটকে পড়ছিলাম।

ব্যাপার হলো, গাজীপুরের গজারিবনে শুটিং চলার খবর পেয়ে আফিয়া ছুটে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল কৌতূহলী দর্শকদের সারিতে। ঘরফিরতি বেলায় অচেনা এক যুবক তার পিছু নিয়ে বাড়িতে এসে উঠেছিল। এই উপস্থিতির হেতু কী জানার প্রয়োজনে আফিয়ার চাচা হামিদ শেখ আগন্তুককে ডেকে নিয়েছিল সামনে। নিজের পরিচয় দেওয়া শেষে সে জানতে চেয়েছিল, যে মেয়েটাকে একটু আগে বাড়িতে ঢুকতে দেখলাম, তিনি কি বিবাহিতা?

তার দুদিন পর বর সেজে আফিয়াকে বউ করে নিয়ে ঢাকায় ফিরল ইলিয়াস মোল্লা।

গাজীপুরে শুটিং করতে গিয়ে ইলিয়াস মোল্লা কেন তার পিছু নিয়েছিল, সেটুকু স্পষ্ট হয়েছিল ওই উত্তর পেয়ে। সঙ্গে সঙ্গে স্ত্রী বলে উঠেছিল, মাগ্গো, মাইয়ালোকের চুলে আপনের এমুনেরই নেশা নিহি?

স্বামী উত্তর দিয়েছিল, হ্যাঁ, এমুনেরই নেশা গো।

রূপসি হওয়ায় আফিয়া ভাবত, বাবা হারানো গরিব ঘরের মেয়ে হলেও এ দিয়ে সচ্ছল গৃহস্থের সুন্দর কোনো যুবাকে মেলানো যাবে ভাগ্যে। কিন্তু হলো কী, প্রতিবেশী সোহাগ মিয়ার বউ টুলটুলি বিবির আমন্ত্রণে তাদের ঢাকার বাসায় আফিয়া বেড়াতে গিয়েছিল। আহ্, কে জানত ফরসা-থেবড়া মুখের ওই মোটা মহিলা আসলে বেশ্যার মাসি। সেখানে গিয়ে ভুল-বেভুলের ঘূর্ণিপাকে পড়ে আফিয়া অনেক পুরুষের শয্যাসঙ্গিনী হয়েছিল। বিষয়টা আন্দাজে নিয়ে তার মা বলেছিলেন, তুই যদি আবার ঢাকায় যাস, হেইলে আমি গলায় দড়ি লইয়া মরমু।

টুলটুলি বিবি অভিমত দিয়েছিল, কর সংসার। তয় থাকবি তো জামাইয়ের লগে শহরে। ফাঁক পাইলে আমার ফ্ল্যাটে ঘুরুণ্ডি দিয়া কয়ডা পয়সা নিতে পারস।

ঢাকায় টুলটুলি বিবির ফ্ল্যাটে থাকতে কতজনকেই তো শরীর দিতে হয়েছে তাকে। সেসব ফাঁস হলে ইলিয়াস মোল্লা মুহূর্তমাত্র দেরি না করে স্ত্রীকে নিশ্চয়ই তালাক দেবে। পরিণামে আপন পাপের সাজা হিসেবে তার জীবনের বাঁচোয়া তন্তুছাড়া হবেই হবে! মনের ওই আতঙ্ক দূরীভূত করতে না পারায় ইলিয়াস মোল্লার গভীর বেষ্টন মিললেও আফিয়া ফিরে ফিরে থমকে পড়ছিল। স্ত্রীর ওই লক্ষণ লজ্জার পর্ব ভেবে স্বামী বলেছিল, আজ থেকে আমরা হলাম জামাই-বউ। তাহলে কিসের লজ্জা, কিসের কী। এসো, ভালোবাসাবাসিতেই মেতে উঠি আমরা।

আপন দুর্ভাগ্য সত্ত্বেও স্বামীর উথলে ওঠা প্রেমে হাবুডুবু খাওয়া স্ত্রী বলেছিল, আপনে বহুত সিজিলের কথা কন। গেরামের মাইয়া হওনে কেমনে মিলাই আমি হেমুনের আলাপ!

ওহ, এই ব্যাপার! আচ্ছা, না জানো আমার মতো সিজিলের কথা। তা-ও কিনা আছে তোমার মনের ভাবসাব! সেসবই গ্রামের ভাষায় শোনাও আমাকে।

পরমুহূর্তে নিজের ঠোঁট দিয়ে স্ত্রীর ঠোঁট ঘষে দিয়ে স্বামী বলেছিল, চুমু চাই গো, চুমু। ভালো যদি বাসো মোরে, দাও দেখিন টুপুস করে একখান!

টুলটুলি বিবির অধীনে থাকতে এক কামুক কষে চুমু খেয়েছিল আফিয়ার ঠোঁটে। ফলে রক্ত জমাট বাঁধায় কালশিটে চিহ্ন ফুটে উঠেছিল তার ঠোঁটে। দুর্ভাগ্যের অমন স্রোত বহমান সত্ত্বেও স্বামীর ঠোঁটে স্ত্রী গভীর চুম্বন তুলে দিয়েছিল।

 

দুই.

সকালে স্বামী-স্ত্রীর ঘুম ভাঙল ফোন বেজে ওঠার আওয়াজে। তা শুনে ইলিয়াস মোল্লা বালিশের পাশে রাখা মোবাইল সেটখানা টেনে নিয়ে ডান কানে ঠেকিয়ে বলে উঠল, হ্যালো কবিতা, কেমন আছিস বোন?

অন্য প্রান্তে থাকা ননদ কী জবাব দিল তা কোত্থেকে জানবে আফিয়া! পরমুহূর্তে তার কানে এলো স্বামীর জবাব, আসছি গো বোন, নাশতা সেরেই তোর ভাবিকে নিয়ে আসছি আমি।

মোঠোফোন রেখে ইলিয়াস মোল্লা স্ত্রীর দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল, কার ফোন, জানো?

হ, আপনের মুখেই তো হুনলাম কবিতার নাম।

চলো তবে কবিতার বাসায় গিয়েই সারব দুপুরের খাওয়াদাওয়া। ওখানে বসেই বউভাতের তারিখটাও ঠিক করা যাবে। যাও তো, যাও, বাথরুমে ঢুকে ঝটপট গোসল সেরে ফেলো।

প্রাতঃকৃত্য সারতে বাথরুমে ঢুকলেও আফিয়ার মনে প্রশ্ন জাগল, কবিতার বাসায় যাওয়ার সময় টুলটুলি বিবি যদি সামনে এসে পড়ে! অন্তরের এমন উত্থাপনে সিদ্ধান্ত হলো, বাইরে বেরিয়ে আঁচল ঢাকা মুখ হয়ে চলতে হবে তাকে।

গোসল সেরে স্ত্রী ফিরে আসতেই বাথরুম ঘুরে এসে ইলিয়াস মোল্লা বলল, ফ্রিজে কবিতার দেওয়া কিছু পোলাও-মাংস আর মিষ্টি আছে। ওসব দিয়েই সকালের নাশতা হয়ে যাবে।

পৈতৃক সূত্রে পাওয়া দয়াগঞ্জে চার কামরার একখানা বাড়ি পেয়েছে ইলিয়াস মোল্লা। স্ত্রীকে নিয়ে ডাইনিংরুমের ফ্রিজ খুলে মাংস আর পোলাও বের করে নিয়ে গরম করতে স্বামী ঢুকল রান্নাঘরে। সেসব হয়ে যেতেই টেবিলের ওপর খাবার সাজালো তারা। তারপর মুখোমুখি চেয়ারে বসে ইলিয়াস মোল্লা বলল—শোনো, খেতে বসে আজ মা-বাবার মুখটা বড়ই মনে পড়ছে। ছেলের বউ আনার অনেক চেষ্টাই করেছিলেন তাঁরা। আমি শুধু বলতাম, কালো হোক, ধলো হোক, চুলওয়ালা বউ চাই আমার। তারা বেঁচে থাকলে আজ বুঝতেন দেরিতে হলেও কেমন চুলওয়ালা বউ পেয়েছি আমি।

পেটে ক্ষুধা। তা সত্ত্বেও নিজের অতীত ভেবে আফিয়ার মুখে খাবার রুচল না। কথাও নেই তার মুখে। খাওয়াদাওয়ার পর স্ত্রী এঁটো বাসনপত্র ধুতে গেল। ইলিয়াস মোল্লা ডাইনিং টেবিলের ওপর থাকা খাবার ঢোকাল ফ্রিজে। তারপর বেডরুমে এসে বসতেই আফিয়া সামনাসামনি হয়ে বলল, যামু যে কবিতার ওইখানে, আমার কইলাম মোডে সাজতে ভালা লাগে না।

শোনো, বিনা সাজেও সুন্দরী তুমি। কিন্তু ব্যাপার হচ্ছে, নতুন বউ হওয়ায় সেখানে সেজেই যেতে হবে তোমাকে।

বিয়ের সময় স্বামীর দেওয়া স্বর্ণের কানপাশা, গলার হার আর আফিয়ার হাতে উঠেছিল দুখানা সোনার বালা। ইলিয়াস মোল্লা আলমারি খুলে নিজের পছন্দমতো হালকা সবুজ রঙের একখানা সিল্কের শাড়ি তুলে দিল স্ত্রীর হাতে। নিজে গায়ে চড়াল সিল্কের ঘিয়ে রঙের পাজামা-পাঞ্জাবি। তারপর ঘরের দুয়ারে তালা আটকে দুজনে নেমে এলো পথে। কবিতা থাকে কমলাপুর এলাকায়। সেখানে যাওয়ার উদ্দেশে দরদাম ঠিক করে নিয়ে একটা রিকশায় চেপে বসল নবদম্পতি। দয়াগঞ্জ পেছনে ফেলে স্বামীবাগের সীমানায় পৌঁছে ইলিয়াস মোল্লা বলল, তাকাও ডান দিকে, ওই যে—ওটা হলো বাবা লোকনাথের মন্দির। সারা বছর এখানে হিন্দুদের পূজা আর ধর্মীয় গান চলে। সময় করে তোমাকে নিয়ে যাব ভেতরটায়।

ঘোমটা ঢাকা হয়ে আফিয়া বসে আছে রিকশায়। তার মনের প্রবাহে এই ভয় জাগরূক যে টুলটুলি বিবি যদি পড়ে যায় সামনে। তাই ইচ্ছা সত্ত্বেও স্বামীর আলাপে মজতে বাধো বাধো ঠেকে তার।

লোকনাথ বাবার মন্দির ছাড়িয়ে রিকশা খানিক এগিয়ে যেতেই ইলিয়াস মোল্লা বাঁ দিকে হাত নির্দেশ করে বলল, এটা হলো মেথরপট্টি। আর ডান দিকের ওই যে মার্কেটটা, সেটির নাম রাজধানী মার্কেট। ওখানে যার যেমন চাই, তেমন সব জিনিসপত্রের দোকান আছে।

স্বামীর কথোপকথনে সায় জানানোর মতো করেই নড়ে ওঠে স্ত্রী। কিন্তু জীবনের মনে পড়া কখন যে কী ধারায় উঁকি দেয়, তা কি আগে থেকে জানা সম্ভব! ফলে হলো কী, তার মনের আয়নায় হঠাৎ করেই এক খদ্দেরের চেহারা ভেসে উঠল। সাধারণত এ ধরনের কেউ ঘরে ঢুকে প্রথমেই নারীর শরীর পেতে লোভ চুকচুক হয়ে উঠলেও সে কিন্তু একবারও ছুঁয়ে দেয়নি আফিয়াকে। ফিরতি বেলায় ধার্যকৃত দুই হাজার টাকার বিনিময়ে তিনি পাঁচ হাজার টাকা গুঁজে দিয়েছিলেন তার মুঠোয়। আফিয়া তাতে প্রশ্ন করেছিল, কিচ্ছুমিচ্ছু না, তা-ও যে এত্তগুলান টাকা দিলেন?

উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ভালোবেসেই তোমাকে এসব দিলাম মেয়ে। তবে আমার ভাবসাবে তুমি আবার ভেবো না, যেন আমি কোনো ভালো মানুষ। এবারে না হোক, পরেরবারে দেখো তোমাকে দিয়ে আমি কেমন নারীলোভ পুরো করে যাই।

শেষ মুহূর্তে আফিয়া তার নাম জানতে চাইলে উত্তর এসেছিল, আমার নাম পক্ষীরাজ বাবু। এ-ও বলি, কখনো আমাকে পেতে চাইলে চোখ বুজে তিনবার পক্ষীরাজ বাবু নামটা মুখে নিলেই তুমি আমার হাজিরা পাবে।

যাহ্, এ রকম কথা কী কখনো সত্য হওয়ার নাকি! কিন্তু এখন হঠাৎ কী খেয়ালে আফিয়া চোখ বুজে তিনবার ‘পক্ষীরাজ বাবুর’ নাম নিল। চোখ মেলতেই অথৈ বিস্ময়ে হাবুডুবু অবস্থা দাঁড়ালো তার। কী আশ্চর্য! ওই তো পক্ষীরাজ বাবু দাঁড়িয়ে আছেন বাঁ দিকের ফুটপাতে। সঙ্গে সঙ্গে আফিয়া অস্ফুট স্বরে বলে উঠল, মাগ্গো, এমুনও হয়!

স্ত্রীর কথা কানে যেতেই ইলিয়াস মোল্লা প্রশ্ন করল, কী এমুনেরও হয় গো বউ?

সত্য উত্তর দিতে গেলে আফিয়া ধরা পড়বে। আবার স্বামীর জিজ্ঞাসায় চুপ থাকাটাও অনুচিত। এমন অবস্থায় সামনের একটা সুউচ্চ দালানের দিকে আঙুল উঁচিয়ে ও বলে উঠল, শহরে এত্ত ওঁচা দালানও উডে?

এই ব্যাপার! শোনো, এরও বেশি উঁচু দালান ঢাকায় আছে। সেগুলোর নাম হলো হাইরাইজ বিল্ডিং।

আফিয়ার মুখে জবাব নেই। জীবনের হাটে পয়সার বিনিময়ে অনেক পুরুষকে দেহ দিতে হয়েছে তাকে। এক্ষণে সেসব ছাপিয়ে পক্ষীরাজ বাবুকে ঘিরেই তার বিষম প্রশ্ন দাঁড়ায়। তিনি যেমন বলেছিলেন, তেমন করেই চোখ বুজে পরপর তিনবার পক্ষীরাজ বাবু বলে ডেকে উঠেছিল আফিয়া। আর চোখ মেলতেই সেই মানুষটা কিনা এসে পড়লেন সামনে। তবে দ্বিধা হলো, এ কি সত্য, না তা ছিল শুধুই ভুল-বেভুলের এক কায়া!

 



মন্তব্য